ক্ষমতায় থাকা দল সবকিছুতে ষড়যন্ত্র দেখে— পোষাকশ্রমিকদের আন্দোলন প্রসঙ্গে সাংবাদিক রাজিব

পোশাকশ্রমিকদের মজুরি বৃদ্ধির দাবিতে চলমান আন্দোলনকে যৌক্তিক উল্লেখ করে সরকারের ভূমিকার সমালোচনা করেছেন সাংবাদিক রাজিব আহমদ। তিনি বলেন, ক্ষমতায় থাকা দলগুলো সবকিছুতেই ষড়যন্ত্র দেখে। শ্রমিকদের আন্দোলন দমনে পুলিশের বলপ্রয়োগ এবং রাজনৈতিক দলের নেতা-কর্মীদের মাঠে নামানোরও সমালোচনা করেছেন তিনি।
সোমবার (২ নভেম্বর) সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম ফেসবুকে নিজের অ্যাকাউন্টে দেওয়া এক পোস্টে রাজিব আহমদ বলেন, ‘ক্ষমতায় থাকা দল সব কিছুতেই ষড়যন্ত্র দেখে। বিএনপি এখন আন্দোলনে আওয়ামী লীগের ষড়যন্ত্র দেখছে। প্রধানমন্ত্রীর সহকারী আবার বিরোধীদলীয় নেতার উসকানি দেখছেন। শেখ হাসিনাও ক্ষমতায় থাকাকালে এগুলো বলতেন।’
পোশাকশ্রমিকদের মজুরি বৃদ্ধির দাবির বিষয়ে তিনি লেখেন, ‘গার্মেন্টস শ্রমিকদের মজুরি বৃদ্ধির দাবিতে আন্দোলন অবশ্যই যৌক্তিক। ন্যূনতম মজুরি ৩০ হাজার টাকা দাবি করছেন শ্রমিকরা। সেটা হয়তো বর্তমান বাস্তবতায় সম্ভব না। কিন্তু মিনিমাম মজুরি ১৮-২০ হাজার টাকা অবশ্যই হওয়া উচিত।’
রাজিব আহমদের মতে, ২০২৩ সালের ডিসেম্বরে পোশাকশ্রমিকদের ন্যূনতম মজুরি সাড়ে ১২ হাজার টাকা নির্ধারণ করা হয়েছিল। এরপর থেকে মূল্যস্ফীতি ও জীবনযাত্রার ব্যয় বেড়েছে। তার হিসাবে, মূল্যস্ফীতির প্রভাব বিবেচনায় শ্রমিকদের ন্যূনতম মজুরি অন্তত ১৮ হাজার টাকা হওয়া উচিত। পাশাপাশি আগের মতো সাতটি গ্রেড চালু করে অভিজ্ঞ শ্রমিকদের মাসে ৩০ হাজার টাকার বেশি আয়ের সুযোগ রাখার পক্ষেও মত দিয়েছেন তিনি।
চলমান আন্দোলন মোকাবিলায় সরকারের ভূমিকা নিয়েও প্রশ্ন তুলেছেন রাজিব আহমদ। তিনি বলেন, ‘আলাপ আলোচনার পরিবর্তে পুলিশের লাঠির ভাষায় জবাব দিচ্ছে সরকার।’ তবে মজুরি বোর্ড গঠনের পর শ্রমিকদেরও সরকারকে কিছুটা সময় দেওয়া উচিত ছিল বলে মনে করেন তিনি। তার মতে, নতুন মজুরি কাঠামো ঘোষণার পর দাবি পূরণ না হলে শ্রমিকদের আবার আন্দোলনে যাওয়ার সুযোগ রয়েছে।
২০২৩ সালের পোশাকশ্রমিক আন্দোলনের প্রসঙ্গ টেনে রাজিব আহমদ লেখেন, ওই সময় শেখ হাসিনা সরকারের আমলে শ্রমিকদের আন্দোলন কঠোরভাবে দমন করা হয়েছিল। তার দাবি, সে সময় পাঁচজন শ্রমিক নিহত হয়েছিলেন। তাদের মধ্যে চারজন পুলিশের গুলিতে এবং একজন কারখানায় অগ্নিকাণ্ডে প্রাণ হারান বলে উল্লেখ করেন তিনি।
পোস্টে নিহত শ্রমিকদের কয়েকজনের নাম ও পরিচয়ও তুলে ধরেন রাজিব আহমদ। তাদের মধ্যে রয়েছেন গাজীপুরে পুলিশের গুলিতে নিহত রাসেল হাওলাদার, আঞ্জুয়ারা খাতুন ও জালাল উদ্দিন। এ ছাড়া কামরুল হাসানের মৃত্যুর কথাও উল্লেখ করেন তিনি।
আওয়ামী লীগের সাম্প্রতিক শ্রমিক আন্দোলনকেন্দ্রিক প্রচারের সমালোচনা করে রাজিব আহমদ লেখেন, ‘অথচ শ্রমিকের রক্ত হাতে লেগে থাকা আওয়ামী লীগ বাঙালির গোল্ডফিশ মেমোরির সুযোগ নিয়ে কয়েকদিন ধরে শ্রমিক দরদি সেজেছে। শ্রমিক জনতার অভ্যুত্থানের ডাক দিচ্ছে!’
বর্তমান সরকারের সঙ্গে আগের সরকারের আচরণের তুলনা করে তিনি বলেন, বিএনপি সরকারের আমলেও শ্রমিকদের ওপর পুলিশ দিয়ে বলপ্রয়োগ করা হয়েছে। তবে তার পর্যবেক্ষণে, এখন পর্যন্ত পুলিশের বলপ্রয়োগের মাত্রা আওয়ামী লীগ সরকারের সময়ের মতো ছিল না। গাড়িতে আগুন ও ভাঙচুরের ঘটনায় পুলিশ গুলি চালায়নি বলেও উল্লেখ করেন তিনি।
তবে শ্রমিকদের আন্দোলন দমনে ছাত্রদল, যুবদল ও শ্রমিকদলের নেতা-কর্মীদের লাঠি হাতে মাঠে নামার সমালোচনা করেছেন রাজিব আহমদ। তার ভাষায়, ‘আজ নানা জায়গায় ছাত্রদল, যুবদল, শ্রমিকদল লাঠি হাতে নেমেছিল শ্রমিকদের দমনে। যে কাজটা আওয়ামী লীগ সময়ে ছাত্রলীগ, যুবলীগ, শ্রমিকলীগ করত। বিএনপিকে এই বদমায়েশি বন্ধ করতে হবে।’
বিএনপির সাংগঠনিক দুর্বলতা ও শ্রমিক সংগঠনগুলোর ভূমিকা নিয়েও প্রশ্ন তোলেন রাজিব আহমদ। তার মতে, শ্রমিকদের সঙ্গে ক্ষমতাসীন দলের শ্রমিক সংগঠনগুলোর কার্যকর যোগাযোগ নেই। শ্রমিক নেতারা সাধারণ শ্রমিকদের সংগঠিত করা ও তাদের প্রতিনিধিত্ব করার পরিবর্তে ঝুট ব্যবসা, চাঁদাবাজি এবং কারখানার মালিকদের সঙ্গে আর্থিক লেনদেনে বেশি মনোযোগী হয়ে পড়েছেন। এ কারণেই শ্রমিকদের আন্দোলনে তাদের কার্যকর নেতৃত্ব ও নিয়ন্ত্রণ নেই বলে মন্তব্য করেন তিনি।
source: The Dhaka Diary