মিরপুরে ১৫০ টির বেশি স্পটে চলছে চাঁদাবাজি, তালিকার বেশিরভাগই জড়িত বিএনপির রাজনীতির সাথে

প্রবাস কন্ঠ ডেস্ক রিপোর্ট:
রাজধানীর মিরপুর ১০ নম্বর গোলচত্বর থেকে ১৩ নম্বর সেকশনের সড়ক ও ফুটপাতে শত শত দোকান বসে। আশপাশে কয়েকটি স্কুল থাকলেও সেগুলোর সামনে রাস্তা, গলি ও ফুটপাতজুড়ে দোকান বসানো হয়েছে, যা অনেকটা বিপণিবিতানের মতো দেখায়। সড়ক সিটি করপোরেশনের হলেও এসব জায়গা দখল করে দোকান বসানো হয়। অভিযোগ রয়েছে, সেখান থেকে স্থানীয় বিএনপির কিছু নেতা-কর্মী ও সন্ত্রাসীরা চাঁদা তোলেন। পুলিশের উপস্থিতিতেই দোকান বসানো ও চাঁদা আদায় চললেও উচ্ছেদ বা চাঁদাবাজি বন্ধ হচ্ছে না।
ঢাকায় চাঁদাবাজদের একটি তালিকা তৈরি করেছে পুলিশ। এতে বলা হয়েছে, চাঁদাবাজির সুযোগ করে দিয়ে পুলিশের কিছু কর্মকর্তাও টাকার ভাগ পান। গত মার্চে ঢাকা মহানগর পুলিশ (ডিএমপি), ডিবি, এসবি ও কমিশনারের গোয়েন্দা ইউনিট মিলে তালিকাটি প্রস্তুত করে। এতে ১ হাজার ২৮০ জনকে চাঁদাবাজ এবং ৩১৪ জনকে আশ্রয়দাতা হিসেবে উল্লেখ করা হয়েছে। পুলিশ বলছে, তালিকায় নিয়মিত নতুন নাম যুক্ত হচ্ছে। বিশ্লেষণে দেখা যায়, তালিকাভুক্তদের বেশির ভাগই বিএনপির স্থানীয় নেতা-কর্মী বা নিজেদের ওই দলের সঙ্গে সম্পৃক্ত বলে পরিচয় দেন। পেশাদার সন্ত্রাসীসহ অন্যান্য দলের কিছু সদস্যের নামও রয়েছে।
মিরপুর অঞ্চলে সাতটি থানায় দেড় শতাধিক চাঁদাবাজির স্পট রয়েছে। এসব জায়গায় চাঁদা তোলার সঙ্গে জড়িত ৭২ জন এবং আশ্রয়দাতা ২৫ জন। ডিএমপি সদর দপ্তরে গত ৪ মার্চ এক সভা শেষে স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী সালাহউদ্দিন আহমদ বলেন, চাঁদাবাজদের তালিকা করে আইনি ব্যবস্থা নেওয়া হবে। পুলিশ জানিয়েছে, ১ মে শুরু হওয়া অভিযানে গত সোমবার পর্যন্ত তালিকাভুক্ত ১০০ জন এবং সহযোগী হিসেবে ১৭৪ জনকে গ্রেপ্তার করা হয়েছে। ডিএমপির অতিরিক্ত কমিশনার এস এন মো. নজরুল ইসলাম বলেন, চাঁদাবাজির সঙ্গে জড়িতদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেওয়া হবে এবং পুলিশ সদস্যদের বিরুদ্ধে অভিযোগ পেলে বিভাগীয় ব্যবস্থা নেওয়া হবে।
মিরপুর, গাবতলী, শাহ আলী, পল্লবী, কাফরুল, দারুস সালাম, রূপনগর ও ভাষানটেক এলাকায় ফুটপাতের দোকান, বাস-ট্রাক পার্কিং, অটোরিকশা গ্যারেজ, লেগুনাস্ট্যান্ড, বাজার, বস্তি, নির্মাণকাজসহ বিভিন্ন খাতে চাঁদাবাজির অভিযোগ রয়েছে। অভিযোগ রয়েছে, মিরপুর ১০ নম্বর এলাকায় ফুটপাতের দোকান থেকে দৈনিক ১০০ থেকে ৩০০ টাকা পর্যন্ত চাঁদা নেওয়া হয়। হকারদের দাবি, প্রতিটি বৈদ্যুতিক বাতির জন্য দৈনিক ৫০ টাকা এবং দোকান বসাতে আরও ১০০ টাকা দিতে হয়। একাধিক হকার জানান, নির্দিষ্ট একজন 'লাইনম্যান' প্রতিদিন বিকেল বা সন্ধ্যায় টাকা সংগ্রহ করেন।
পুলিশের তথ্য অনুযায়ী, মিরপুর ১০ থেকে ১৩ নম্বর পর্যন্ত এলাকায় প্রায় ১ হাজার ৪০০ থেকে ১ হাজার ৭০০ দোকান রয়েছে। দোকানপ্রতি দৈনিক গড়ে ২০০ টাকা ধরে মাসে অন্তত ৯০ লাখ টাকা চাঁদা আদায় হয়। এলাকার চাঁদাবাজির সঙ্গে আব্বাস আলী, মো. তাজ, মো. সোহেল ও রাকিবুল হাসান সোহেলসহ কয়েকজনের নাম রয়েছে। পুলিশের এক উপপরিদর্শকের মাধ্যমে থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তাও এই টাকার ভাগ পান বলে অভিযোগ রয়েছে। তবে সংশ্লিষ্টরা এসব অভিযোগ অস্বীকার করেছেন। মিরপুর ১ নম্বর এলাকায় লেগুনাস্ট্যান্ড বসিয়ে প্রতিটি গাড়ি থেকে দৈনিক ২০০ টাকা করে আদায় করা হয়। এভাবে মাসে প্রায় ১ লাখ ৮০ হাজার টাকা তোলা হয়।
এদিকে পল্লবীতে নির্মাণপ্রতিষ্ঠানসহ বিভিন্ন খাত থেকে চাঁদা আদায়ের অভিযোগ রয়েছে। গত ১২ জুলাই এক নির্মাণপ্রতিষ্ঠানে হামলার ঘটনায় পাঁচ কোটি টাকা চাঁদা দাবির অভিযোগ ওঠে। পুলিশ জানিয়েছে, এতে জড়িত স্থানীয় এক বিএনপি নেতার একটি বাহিনী রয়েছে। রূপনগর এলাকায় বস্তিতে অবৈধ বিদ্যুৎ, গ্যাস ও পানির সংযোগ দিয়ে প্রতি মাসে ঘরপ্রতি এক হাজার টাকা নেওয়ার অভিযোগ রয়েছে। এসব ক্ষেত্রেও চাঁদাবাজির অভিযোগ উঠেছে।
বিশ্লেষকদের মতে, ফুটপাত দখল ও চাঁদাবাজি দীর্ঘদিনের সমস্যা। পুরোপুরি উচ্ছেদে জীবিকার বিষয় জড়িত থাকায় পরিকল্পিত ব্যবস্থাপনা প্রয়োজন। সিটি করপোরেশন চাইলে নির্দিষ্ট অংশে দোকান বসানোর অনুমতি দিতে পারে এবং বস্তিতে বৈধ সংযোগ নিশ্চিত করা যেতে পারে। এ বিষয়ে ইনস্টিটিউট ফর প্ল্যানিং অ্যান্ড ডেভেলপমেন্টের নির্বাহী পরিচালক আদিল মুহাম্মদ খান বলেন, সমস্যার সমাধান সম্ভব হলেও রাষ্ট্রীয় উদ্যোগের ঘাটতি রয়েছে। তিনি বলেন, চাঁদাবাজদের সঙ্গে রাজনৈতিক নেতা-কর্মী ও পুলিশের 'নেক্সাস' (অসাধু জোট) এ ক্ষেত্রে বাধা হয়ে দাঁড়ায়।
প্রবাস কন্ঠ ডেস্ক রিপোর্ট/আ/মু
Source: thedeltalens.com

