Jannah Theme License is not validated, Go to the theme options page to validate the license, You need a single license for each domain name.
বিশ্ব

ভারতে বন্যায় বিধ্বস্ত ১০ লাখ গণেশ মূর্তি

ভারতের মহারাষ্ট্রের রায়গড় জেলায় ভয়াবহ বন্যায় ধ্বংস হয়ে গেছে হাজারো মাটির গণেশ মূর্তি। ধর্মীয় উৎসব গণেশ চতুর্থীর কয়েক সপ্তাহ আগে এমন ক্ষতির মুখে পড়ে বিপাকে পড়েছেন মূর্তি নির্মাতারা। নষ্ট হয়েছে মাসের পর মাসের শ্রম, কাঁচামাল ও আয়ের প্রধান উৎস।

রায়গড়ের একটি কর্মশালায় শত শত ভাঙা মাটির মূর্তির মধ্যে দাঁড়িয়ে নিজের আবেগ ধরে রাখতে পারছিলেন না ভাস্কর দিলীপ মাত্রে। ৪০ বছর বয়সী এই কারিগর গণেশ চতুর্থীর জন্য প্রায় ৫০০টি মাটির মূর্তি তৈরি করেছিলেন। এসব মূর্তির আনুমানিক মূল্য ছিল ৮ লাখ রুপি (প্রায় ৮ হাজার ৩০০ মার্কিন ডলার)। আগামী কয়েক সপ্তাহের মধ্যে মহারাষ্ট্রের বিভিন্ন এলাকায় এসব মূর্তি সরবরাহ করার কথা ছিল।

দিলীপ মাত্রে বলেন, “কিন্তু বন্যার পানি সবকিছু ভাসিয়ে নিয়ে গেছে। এখন আমাদের কাছে কোনো মূর্তি নেই, ছাঁচ নেই, কাঁচামালও নেই। কীভাবে অর্ডার পূরণ করব, তা বুঝতে পারছি না।”

দিলীপের মতো একই সংকটে পড়েছেন রায়গড়ের হাজারো মূর্তি নির্মাতা। প্রতি বছর গণেশ চতুর্থী উপলক্ষে ভারতের লাখো পরিবার ও সামাজিক সংগঠন মাটির তৈরি গণেশ মূর্তি স্থাপন করে। উৎসব শেষে এসব মূর্তি পানিতে বিসর্জন দেওয়া হয়।

এই মূর্তিগুলোর বড় অংশই তৈরি হয় রায়গড়ে। জেলার প্রায় ২০ হাজার কর্মশালায় প্রতি বছর ৮০ লাখ পর্যন্ত মূর্তি তৈরি হয়। এ শিল্পে মৌসুমি কর্মসংস্থান হয় প্রায় দেড় লাখ মানুষের। বছরে প্রায় ৩৫০ কোটি রুপির ব্যবসা হওয়ায় এটি এলাকার বহু পরিবারের জীবিকার প্রধান ভিত্তি।

তবে এ বছর বন্যায় ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে হাজার হাজার মূর্তি ও শত শত কর্মশালা। এতে সরবরাহ ব্যবস্থা ব্যাহত হওয়ার পাশাপাশি বিপাকে পড়েছেন কয়েক হাজার কারিগর।

রায়গড়ের মূর্তি নির্মাতাদের সংগঠন গণেশ মূর্তিকার উৎকর্ষ মণ্ডলের সভাপতি শচীন পাটিল বলেন, “জেলার বিভিন্ন এলাকায় ভারী বৃষ্টিতে প্রায় ১০ লাখ গণেশ মূর্তি ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে।” তার দাবি, বৃষ্টির কারণে প্রায় ৩ হাজার মূর্তি তৈরির কর্মশালা ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে।

স্থানীয় প্রশাসন ক্ষয়ক্ষতির পরিমাণ নিরূপণের কাজ শুরু করেছে। সরকারি কর্মকর্তা তানাজি শেজাল জানান, ক্ষয়ক্ষতির হিসাব সম্পন্ন হলে সরকারি নিয়ম অনুযায়ী আর্থিক সহায়তা দেওয়া হবে।

মহারাষ্ট্রে বর্ষাকালে ভারী বৃষ্টি নতুন কোনো ঘটনা নয়। রায়গড়ের মূর্তি নির্মাতারাও প্রতিবছর বন্যার ঝুঁকি মোকাবিলায় কর্মশালা ঢেকে রাখা ও মূর্তি উঁচু স্থানে রাখার ব্যবস্থা করেন। কিন্তু এবার টানা ভারী বৃষ্টি ও ঝোড়ো বাতাসে সেই প্রস্তুতিও কাজে আসেনি।

ভারতের আবহাওয়া বিভাগের তথ্য অনুযায়ী, ৫ থেকে ৭ জুলাই পর্যন্ত রায়গড়ে ৫৪৮ মিলিমিটারের বেশি বৃষ্টি হয়েছে। গত বছরের পুরো জুলাই মাসে জেলাটিতে যে ৬৬৩ মিলিমিটার বৃষ্টি হয়েছিল, এবার মাত্র তিন দিনেই তার কাছাকাছি বৃষ্টি হয়েছে।

দিলীপ মাত্রে বলেন, “আগে গ্রামের মধ্যে পানি জমলেও কর্মশালার এলাকায় কখনো পানি আসত না। এবার সবকিছু ভেসে গেছে।”

বন্যায় শুধু তৈরি মূর্তিই নয়, নষ্ট হয়েছে মূর্তি তৈরির ছাঁচ, মাটি ও প্লাস্টার অব প্যারিসের মতো কাঁচামালও। ফলে নতুন করে উৎপাদন শুরু করাও কঠিন হয়ে পড়েছে।

একটি গণেশ মূর্তি তৈরি করতে ছাঁচ তৈরি, গড়ন, শুকানো ও রং করার মতো কয়েকটি ধাপ পার হতে হয়। ছোট একটি মূর্তি তৈরি করতেও প্রায় দুই সপ্তাহ সময় লাগে। বড় আকারের মূর্তি তৈরিতে কয়েক সপ্তাহ সময় লাগে এবং এর দাম কয়েক হাজার রুপি পর্যন্ত হতে পারে।

দিলীপ মাত্রে জানান, এবারের বন্যায় তার প্রায় ১২ লাখ রুপির ক্ষতি হয়েছে। তিন দশক ধরে মূর্তি তৈরির এই কাজই তার পরিবারের একমাত্র আয়ের উৎস। এই আয় দিয়েই তিনি সংসারের খরচ ও সন্তানদের পড়াশোনা চালিয়েছেন।

এখন তিনি গ্রাহকদের জানাতে বাধ্য হচ্ছেন যে, তাদের অর্ডার পূরণ করা সম্ভব হবে না। তিনি বলেন, “মানুষ হতাশ হয়েছে, কিন্তু আমাদের আর কোনো উপায় নেই। আমি ঋণ নেওয়ার কথা ভাবছি এবং গ্রাহকদের অগ্রিম টাকা ফেরত দেওয়ার চেষ্টা করব।”

অনেক কারিগরের জন্য এই ক্ষতি পূরণ করা কঠিন হয়ে পড়েছে। বৃষ্টিতে ভিজে যাওয়া অধিকাংশ মূর্তি আর বিক্রি করা সম্ভব নয়। সামান্য ক্ষতিগ্রস্ত কিছু মূর্তি শুকিয়ে মেরামত করে ব্যবহার করা যেতে পারে।

কিছু কর্মশালার মালিকের বীমা থাকলেও তারা বলছেন, ক্ষতির তুলনায় বীমার অর্থ খুবই কম হতে পারে। কালভে গ্রামের মূর্তি নির্মাতা অনিতা পাটিল বলেন, “ক্ষতি যদি ১০ লাখ রুপি হয়, তাহলে বীমা থেকে হয়তো মাত্র ১০ হাজার রুপি পাওয়া যাবে।”

তিনি বলেন, “বীমার ক্ষেত্রে অনেক শর্ত রয়েছে। কার্যকর ক্ষতিপূরণ পাওয়া সহজ নয়।”

বন্যায় পুরো উৎপাদন চক্র ব্যাহত হয়েছে বলেও জানান তিনি। “এত বেশি মূর্তি পানিতে ভিজেছে যে কোনগুলো উদ্ধার করা যাবে, সেটিও আমরা জানি না।”

কিছু কর্মশালার স্বাভাবিক অবস্থায় ফিরতে কয়েক মাস, এমনকি কয়েক বছরও লেগে যেতে পারে। এর প্রভাব রায়গড়ের বাইরেও পড়তে পারে বলে আশঙ্কা করছেন কারিগররা। কারণ বিদেশ থেকে আসা কিছু অর্ডারও বিলম্বিত হতে পারে।

শচীন পাটিল বলেন, “বিশ্ব অর্থনীতির কারণে আন্তর্জাতিক চাহিদা আগেই কমেছিল। এখন বন্যার কারণে কিছু বিদেশি অর্ডার দেরিতে সরবরাহ করতে হতে পারে।”

ভবিষ্যতে বর্ষার ক্ষতি এড়াতে অনেক কারিগর নতুন পরিকল্পনা করছেন। কেউ স্থায়ী ছাউনি নির্মাণ, উঁচু প্ল্যাটফর্ম তৈরি ও সুরক্ষা ব্যবস্থা জোরদার করার কথা ভাবছেন। কেউ আবার ভারী বৃষ্টির পূর্বাভাস পেলে মূর্তিগুলো ঘরের ভেতরে বা উঁচু স্থানে সরিয়ে নেওয়ার পরিকল্পনা করছেন।

তবে এখন তাদের প্রধান লক্ষ্য—গণেশ চতুর্থীর আগেই যতটা সম্ভব মূর্তি উদ্ধার করা এবং গ্রাহকদের অর্ডার পূরণের চেষ্টা করা।

মূর্তি নির্মাতা মহেন্দ্র পাটিল জানান, তিনি কয়েক দিন ধরে আশপাশের কর্মশালায় যোগাযোগ করে বিকল্প মূর্তি সংগ্রহের চেষ্টা করছেন। তবে উৎসবের সময় ঘনিয়ে আসায় একই পরিমাণ মূর্তি নতুন করে তৈরি করা প্রায় অসম্ভব।

তিনি বলেন, “যদি অন্য কোথাও থেকে মূর্তি সংগ্রহ করতে না পারি, তাহলে অগ্রিম টাকা ফেরত দিতে হবে।”

রায়গড়ের বিভিন্ন এলাকায় বন্যায় ডুবে যাওয়া কর্মশালাগুলো ধীরে ধীরে আবার সচল হচ্ছে। কারিগররা বেঁচে যাওয়া মূর্তি শুকাচ্ছেন, মেরামত করছেন, ধ্বংসস্তূপ পরিষ্কার করছেন। প্রজন্মের পর প্রজন্ম ধরে চলে আসা এই শিল্প বাঁচিয়ে রাখতে আর্থিক ক্ষতির পরও লড়াই চালিয়ে যাচ্ছেন তারা।

source: Daily Amar Desh

Leave a Reply

Back to top button