Jannah Theme License is not validated, Go to the theme options page to validate the license, You need a single license for each domain name.
জাতীয়

অর্থনীতি ঘুরে দাঁড়াতে কর্মসংস্থান সৃষ্টিকে অগ্রাধিকার দিতে হবে

বাংলাদেশের অর্থনীতিকে ঘুরে দাঁড় করাতে হলে নতুন নতুন কর্মসংস্থান সৃষ্টিকে সর্বোচ্চ অগ্রাধিকার দেওয়ার আহ্বান জানিয়েছেন আমার দেশ সম্পাদক ড. মাহমুদুর রহমান। তিনি বলেন, কর্মসংস্থান সৃষ্টিতে ম্যানুফ্যাকচারিং শিল্প ও কৃষি খাতকে সর্বোচ্চ গুরুত্ব দিতে হবে। নতুন কর্মসংস্থান সৃষ্টি ছাড়া জাতীয় সম্পদ বাড়ানো সম্ভব নয় এবং সম্পদ সৃষ্টি না হলে টেকসই উন্নয়নও নিশ্চিত করা যাবে না। বৈষম্যহীন রাষ্ট্র গঠনের জন্য সম্পদ সৃষ্টির পাশাপাশি তার ন্যায্য বণ্টন নিশ্চিত করার ওপরও গুরুত্বারোপ করেন তিনি।

বৃহস্পতিবার (২৩ জুলাই) ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের সামাজিক বিজ্ঞান অনুষদের মোজাফফর আহমেদ চৌধুরী অডিটোরিয়ামে সেন্টার ফর অ্যাডভান্সড স্টাডিজ অ্যান্ড থটস (সিএএসটি) আয়োজিত ‘জুলাইয়ের আকাঙ্ক্ষায় বাংলাদেশের অর্থনীতি’ শীর্ষক সেমিনারে প্রধান বক্তার বক্তব্যে তিনি এসব কথা বলেন।

সেমিনার শেষে সেন্টার ফর অ্যাডভান্সড স্টাডিজ অ্যান্ড থটস থেকে প্রকাশিত ‘বাংলাদেশের সাম্প্রতিক অর্থনীতির ব্যবচ্ছেদ’ এবং ‘Bangladesh Economy: A Holistic Evaluation’ শীর্ষক দুটি গ্রন্থের মোড়ক উন্মোচন করা হয়।

সেমিনারে জুলাই গণ-অভ্যুত্থানের আকাঙ্ক্ষার আলোকে দেশের অর্থনীতির বর্তমান অবস্থা, গত দেড় দশকের অর্থনৈতিক ব্যবস্থাপনা, বৈষম্য, কর্মসংস্থান, শিল্পায়ন এবং ভবিষ্যৎ অর্থনৈতিক রূপরেখা নিয়ে আলোচনা হয়।

ড. মাহমুদুর রহমান বলেন, বাংলাদেশে অর্থনীতি নিয়ে আলোচনা হলেই সবাই জিডিপি প্রবৃদ্ধির কথা বলেন। কিন্তু সেই সম্পদ কীভাবে মানুষের মধ্যে বণ্টিত হচ্ছে, তা নিয়ে আলোচনা খুবই কম। অথচ এই দুই বিষয়কে সমান গুরুত্ব না দিলে বৈষম্যহীন রাষ্ট্র গঠন সম্ভব নয়।

বক্তব্যে ড. মাহমুদুর রহমান বলেন, বর্তমান অর্থনৈতিক সংকট থেকে উত্তরণে প্রথম কাজ হওয়া উচিত নতুন সম্পদ সৃষ্টি, আর তা সম্ভব কর্মসংস্থানের মাধ্যমে। তিনি বলেন, আমার চিন্তাধারা হয়ত অনেকের কাছে পুরোনো মনে হতে পারে। কিন্তু আমি এখনো বিশ্বাস করি, বাংলাদেশের অর্থনীতিকে পুনরুজ্জীবিত করতে হলে জব ক্রিয়েশনই একমাত্র কার্যকর পথ। ফ্যামিলি কার্ড কোনো সমাধান নয়; প্রকৃত সমাধান হলো কর্মসংস্থান সৃষ্টি।

তিনি বলেন, কর্মসংস্থান সৃষ্টিতে উৎপাদনশীল শিল্প ও কৃষি খাতকে সর্বোচ্চ গুরুত্ব দিতে হবে। গত দেড় দশকে উৎপাদনশীল শিল্পের পরিবর্তে মেগা প্রকল্পকেন্দ্রিক উন্নয়নকে অগ্রাধিকার দেওয়া হয়েছে বলেও মন্তব্য করেন তিনি। তিনি বলেন, মেগা প্রকল্পে দুর্নীতির সুযোগ বেশি থাকায় উৎপাদনশীল শিল্পকে গুরুত্ব দেওয়া হয়নি।

সরকারি অর্থনৈতিক পরিসংখ্যানের বিশ্বাসযোগ্যতা নিয়েও প্রশ্ন তোলেন ড. মাহমুদুর রহমান। তিনি বলেন, গত ১৫ বছরে ‘স্ট্যাটিস্টিক্যাল ইঞ্জিনিয়ারিং’-এর মাধ্যমে বাস্তবতার চেয়ে উন্নয়নের চিত্র বেশি ভালো দেখানো হয়েছে। তিনি জানান, এ বিষয়ে তিনি বিশ্বব্যাংক ও এডিবিসহ আন্তর্জাতিক সংস্থাগুলোকেও লিখেছিলেন।

বিনিয়োগ বোর্ডের সাবেক নির্বাহী চেয়ারম্যান হিসেবে নিজের অভিজ্ঞতা তুলে ধরে তিনি বলেন, উৎপাদনশীল শিল্পে প্রবৃদ্ধি অর্জন করা গেলে কর্মসংস্থানও বাড়ে। কৃষিকে শুধু জিডিপিতে অবদানের ভিত্তিতে মূল্যায়ন না করে কর্মসংস্থান ও খাদ্য নিরাপত্তার দৃষ্টিকোণ থেকেও গুরুত্ব দেওয়ার আহ্বান জানান তিনি।

তিনি বলেন, সরকারের উচিত সব অংশীজনকে নিয়ে জাতীয় সম্পদ বৃদ্ধির কৌশল নির্ধারণ করা। একই সঙ্গে উৎপাদন বাড়াতে গ্যাস-বিদ্যুৎ, অবকাঠামো ও দক্ষ মানবসম্পদ নিশ্চিত করা জরুরি। যে দেশে গ্যাস ও বিদ্যুতের সংকট রয়েছে, সেখানে শুধু বিনিয়োগ সম্মেলন করলেই বিদেশি বিনিয়োগ আসবে না।

সেমিনারে বক্তব্য রাখেন নর্থ সাউথ ইউনিভার্সিটির বিজনেস অ্যান্ড ইকোনমিকস অনুষদের ডিন ড. একেএম ওয়ারেসুল করিম। তিনি বলেন, গত এক দশকে দেশের সামষ্টিক অর্থনীতি, সরকারি ঋণ, খেলাপি ঋণ ও আর্থিক খাত নিয়ে তার গবেষণায় উদ্বেগজনক চিত্র উঠে এসেছে।

তার উপস্থাপিত তথ্য অনুযায়ী, দেশে বর্তমানে খেলাপি ঋণের পরিমাণ প্রায় ৬ লাখ ৪০ হাজার কোটি টাকা। পুনঃতফসিল, অবলোপন ও আদালতের স্থগিতাদেশে আটকে থাকা ঋণসহ সমস্যাগ্রস্ত ঋণের পরিমাণ প্রায় ১১ লাখ কোটি টাকা। তিনি পুনঃতফসিল করা ঋণকে ‘শুভঙ্করের ফাঁকি’ আখ্যা দিয়ে বলেন, এতে সমস্যার সমাধান হয় না; বরং প্রকৃত চিত্র আড়াল করা হয়।

ড. ওয়ারেসুল করিম বলেন, মূল্যস্ফীতির কারণে সাধারণ মানুষের জীবনযাত্রার ব্যয় বেড়েছে। কিন্তু কৃষক উৎপাদিত পণ্যের ন্যায্যমূল্য পাচ্ছেন না এবং গার্মেন্টস শ্রমিক, পরিবহন শ্রমিক, ইমাম-মুয়াজ্জিনসহ নিম্ন আয়ের মানুষের আয়ও ব্যয়ের সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণভাবে বাড়েনি।

তিনি বলেন, বন্ধ শিল্পকারখানা পুনরায় চালুর নামে নেওয়া ২০ হাজার কোটি টাকার পরিকল্পনা এবং রাষ্ট্রায়ত্ত শিল্পপ্রতিষ্ঠান হস্তান্তরের ক্ষেত্রে সর্বোচ্চ স্বচ্ছতা নিশ্চিত করতে হবে। পাশাপাশি অর্থনৈতিক সংকট মোকাবিলায় তরুণদের জন্য গবেষণার সুযোগ ও গবেষণা তহবিল বাড়ানোর ওপর গুরুত্বারোপ করেন তিনি। তার মতে, বিশ্ববিদ্যালয়গুলোতে গবেষণা, কম্পিউটার ল্যাব, বিদ্যুৎ ও স্যানিটেশন খাতে বরাদ্দ কমে যাওয়ায় শিক্ষার্থীরা ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছেন।

শিক্ষাখাতে প্রযুক্তিনির্ভর প্রকল্প গ্রহণের আগে মৌলিক অবকাঠামো নিশ্চিত করার আহ্বান জানিয়ে তিনি বলেন, প্রত্যেক শিক্ষককে ট্যাবলেট দেওয়া বা প্রতিটি শ্রেণিকক্ষে সিসিটিভি স্থাপনের আগে বিদ্যালয়গুলোতে পর্যাপ্ত শ্রেণিকক্ষ, বিজ্ঞানাগার, টয়লেট ও প্রয়োজনীয় শিক্ষাসামগ্রী নিশ্চিত করা উচিত। একই সঙ্গে শিশু নির্যাতন প্রতিরোধে প্রযুক্তির পরিবর্তে শিক্ষক প্রশিক্ষণ, নৈতিক শিক্ষা ও সচেতনতা বৃদ্ধির ওপর জোর দেন তিনি।

ডাকসুর জিএস এস এম ফরহাদ বলেন, দেশে মূল্যস্ফীতি বেড়েছে, কিন্তু কৃষক তার উৎপাদিত ধান, সবজি বা অন্যান্য কৃষিপণ্য আগের মতোই কম দামে বিক্রি করতে বাধ্য হচ্ছেন। বাজারে ভোক্তা পর্যায়ে দাম বাড়লেও কৃষক সেই সুবিধা পাচ্ছেন না। গার্মেন্টস শ্রমিকদের মজুরি উল্লেখযোগ্যভাবে বাড়েনি। একইভাবে মসজিদের ইমাম ও মুয়াজ্জিনদের বেতনও এখনো অত্যন্ত কম। একজন মুয়াজ্জিনকে সাত হাজার টাকার মতো এবং একজন ইমামকে প্রায় দশ হাজার টাকায় সংসার চালাতে হয়। একই অবস্থা পরিবহন শ্রমিক বা অন্যান্য নিম্ন আয়ের মানুষের। অথচ নিত্যপ্রয়োজনীয় সব পণ্যের দাম বেড়েই চলেছে।

তিনি বলেন, সাধারণ মানুষ অল্প অল্প করে যে অর্থ ব্যাংকে সঞ্চয় করেন, সেই অর্থ লুটপাট করে কেউ কেউ বিদেশে পাচার করে। আরও দুঃখজনক বিষয় হলো, অনেক ঋণখেলাপিকে সংসদ সদস্য হিসেবে মনোনয়ন দেওয়া হয়েছে এবং তারা সংসদে দাঁড়িয়ে ঋণখেলাপিকে স্বাভাবিক বিষয় হিসেবে উপস্থাপন করেছেন। এটি রাষ্ট্র ও অর্থনীতির জন্য অত্যন্ত নেতিবাচক বার্তা।

গবেষণা খাতের প্রসঙ্গ তুলে তিনি বলেন, যদি সত্যিই দেশের সমস্যার সমাধান করতে হয়, তাহলে তরুণদের গবেষণার সুযোগ তৈরি করতে হবে। কিন্তু বাস্তবে দেখা যাচ্ছে, বিশ্ববিদ্যালয়গুলোতে গবেষণার জন্য পর্যাপ্ত বরাদ্দ নেই। বরং গবেষণা তহবিল কেন্দ্রীয়ভাবে নিয়ন্ত্রণের প্রবণতা দেখা যাচ্ছে। এতে ভবিষ্যতে সরকারবিরোধী বা সমালোচনামূলক গবেষণা নিরুৎসাহিত হওয়ার আশঙ্কা রয়েছে।

সেন্টার ফর অ্যাডভান্সড স্টাডিজ অ্যান্ড থটসের এক্সিকিউটিভ ডিরেক্টর ও মানারাত ইন্টারন্যাশনাল ইউনিভার্সিটির উপাচার্য ড. আব্দুর রবের সভাপতিত্বে অনুষ্ঠিত সেমিনারে আলোচক হিসেবে উপস্থিত ছিলেন চিন্তক ও গবেষক ফরহাদ মজহার, অর্থনীতিবিদ অধ্যাপক আবু আহমেদ, ডাকসু জিএস এস এম ফরহাদ, ওয়েস্টার্ন নরওয়ে ইউনিভার্সিটি অব অ্যাপ্লায়েড সায়েন্সেসের অধ্যাপক ড. আব্দুল কুদ্দুস, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের অর্থনীতি বিভাগের অধ্যাপক ড. দ্বীন ইসলাম, রাজনৈতিক বিশ্লেষক ড. শিব্বির আহমেদসহ বিভিন্ন বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষক, গবেষক ও বিশিষ্টজন।

source: Daily Amar Desh

Leave a Reply

Back to top button