News

জুলাই জাদুঘর যেন দলীয় ইতিহাসের জায়গা না হয়: নাহিদ ইসলাম

জুলাই গণঅভ্যুত্থান স্মৃতি জাদুঘর পরিদর্শন শেষে সাংবাদিকদের সঙ্গে কথা বলেন এনসিপির আহ্বায়ক নাহিদ ইসলাম© সংগৃহীত ও সম্পাদিত

জুলাই গণঅভ্যুত্থান স্মৃতি জাদুঘরে অন্তর্বর্তী সরকারের সময়ের তুলনায় পরবর্তীতে বেশ কিছু তথ্য ও প্রদর্শনীতে পরিবর্তন আনা হয়েছে এবং নতুন করে দলীয় বক্তব্য ও বয়ান যুক্ত করা হয়েছে বলে অভিযোগ করেছেন জাতীয় নাগরিক পার্টির (এনসিপি) আহ্বায়ক ও জাতীয় সংসদে বিরোধীদলীয় চিফ হুইপ মো. নাহিদ ইসলাম।

তিনি বলেন, “এই জাদুঘর যেন কোনোভাবেই দলীয় ইতিহাসের জায়গায় পরিণত না হয়। এটি প্রকৃত ইতিহাস চর্চার জায়গা এবং জাতীয় ইতিহাসের কেন্দ্র হিসেবে প্রতিষ্ঠিত হওয়া উচিত।”

শনিবার (৮ আগস্ট) সকালে রাজধানীর শেরেবাংলা নগরে অবস্থিত জুলাই গণঅভ্যুত্থান স্মৃতি জাদুঘর পরিদর্শন শেষে সাংবাদিকদের সঙ্গে আলাপকালে তিনি এসব কথা বলেন।

নাহিদ ইসলাম বলেন, “স্বৈরাচার ও ফ্যাসিস্ট শেখ হাসিনা এখান থেকেই রাষ্ট্র পরিচালনার বিভিন্ন সিদ্ধান্ত নিতেন। মানুষের ওপর নির্যাতন, রাষ্ট্রীয় প্রতিষ্ঠান ধ্বংস, অর্থনীতি তছনছ ও দুর্নীতিসহ গত ১৬ বছরে দেশে যে ক্ষয়ক্ষতি হয়েছে, সেই নির্যাতন-নির্মমতা, মানুষের প্রতিরোধ ও বিজয়ের স্মৃতিচিহ্ন ধারণ করেই এই স্থানকে জাদুঘরে রূপ দেওয়ার সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছিল।”

তিনি বলেন, “অন্তর্বর্তী সরকারের সময় জাদুঘরের কাজ মোটামুটি শেষ হয়ে উদ্বোধনের উপযোগী হয়েছিল। পরবর্তী সরকার দায়িত্ব নেওয়ার পর আরো প্রায় পাঁচ মাস সময় নেয়।” সংসদের ভেতরে ও বাইরে তারা জাদুঘরটি দ্রুত খুলে দেওয়ার দাবি জানিয়েছিলেন।

নাহিদ ইসলাম জানান, “এর আগে অন্তর্বর্তী সরকারের সময়ও তিনি জাদুঘরটি পরিদর্শন করেছিলেন। সে সময়ের সঙ্গে বর্তমান প্রদর্শনীর তুলনা করে তিনি বেশ কিছু পরিবর্তন দেখতে পেয়েছেন।” তার ভাষ্য, জাদুঘরে সীমান্ত হত্যার একটি সেগমেন্ট ছিল। সীমান্তে বিএসএফের হাতে নিহত বাংলাদেশিদের একটি তালিকা এবং ফেলানীর একটি ভাস্কর্যও ছিল। সেগুলো এখন সরিয়ে ফেলা হয়েছে। একইভাবে মোদি বিরোধী আন্দোলনের কিছু স্মৃতি ও ছবি সরিয়ে দেওয়া হয়েছে বলেও অভিযোগ করেন তিনি।

নাহিদ ইসলাম আরও বলেন, “বিএনপির গত ১৬ বছরে নির্যাতিত হওয়ার বিষয়গুলো আগে দল হিসেবে জাদুঘরে দেখানো হয়েছিল। বর্তমানে সেই কনটেন্ট আরো বাড়ানো হয়েছে এবং কিছু দলীয় বক্তব্য ও বয়ানও যুক্ত হয়েছে।”

নাহিদ ইসলাম বলেন, “জাদুঘর সবসময় আপডেটের মধ্যে থাকবে। আমরা গতবারও মতামত দিয়েছিলাম, আজকেও যারা বর্তমানে দায়িত্বে আছেন তাদের আমাদের পর্যবেক্ষণ জানিয়েছি।”

জুলাই গণঅভ্যুত্থানের অংশ আরো বিস্তৃত করার প্রয়োজনীয়তার কথা তুলে ধরে তিনি বলেন, “জাদুঘরে জুলাই আন্দোলনের ঘটনাগুলো আরো বিস্তারিতভাবে টাইমলাইন ধরে তুলে ধরা উচিত। বিশেষ করে প্রাইভেট বিশ্ববিদ্যালয় ও মাদ্রাসার শিক্ষার্থীদের ভূমিকা আলাদাভাবে তুলে ধরা প্রয়োজন। ঢাকার বাইরের বিভিন্ন বিশ্ববিদ্যালয় ও জেলাগুলোতে যে আন্দোলন হয়েছে, সেখানেও নির্যাতন, নির্মমতা ও প্রতিরোধের গল্প রয়েছে। সেগুলোও যথাযথভাবে আসেনি।” জাদুঘরে অনেক ক্ষেত্রে পরিচিত মুখগুলোকে কেন্দ্র করে ইতিহাস উপস্থাপন করা হয়েছে। এ কারণে এর পরিধি আরো বিস্তৃত করার আহ্বান জানান তিনি।

নাহিদ ইসলাম বলেন, এই জাদুঘর যেন কোনোভাবেই দলীয় ইতিহাসের জায়গায় পরিণত না হয়। এটি প্রকৃত ইতিহাস চর্চার জায়গা এবং জাতীয় ইতিহাসের কেন্দ্র হিসেবে প্রতিষ্ঠিত হওয়া উচিত।” 

তিনি বলেন, “অতীতেও মুক্তিযুদ্ধের ইতিহাস দলীয়করণের ঘটনা দেখা গেছে। একদল ক্ষমতায় এলে পাঠ্যপুস্তক পরিবর্তন হয়েছে, ইতিহাসের বয়ানও পরিবর্তন হয়েছে। জুলাই গণঅভ্যুত্থানের ইতিহাসের ক্ষেত্রেও এমন কিছু না ঘটিয়ে জাতীয় চরিত্র নিশ্চিত করতে হবে, যাতে প্রকৃত সত্যই এখানে উঠে আসে এবং সেটি সবাই গ্রহণ করতে পারে।”

জাদুঘরের সক্ষমতা নিয়েও প্রশ্ন তোলেন নাহিদ ইসলাম। তিনি বলেন, “বিপুলসংখ্যক দর্শনার্থীর চাপ সামাল দেওয়ার মতো কাঠামো ও জনবল বর্তমানে জাদুঘরের নেই। পর্যাপ্ত জনবল নিয়োগ দেওয়া হয়নি। বর্তমানে প্রায় ১৫ থেকে ২০ জন জনবল দিয়ে কাজ চলছে এবং স্বেচ্ছাসেবকদের সহযোগিতায় জাদুঘর পরিচালনা করা হচ্ছে।”

তার মতে, জাদুঘরটি সঠিকভাবে পরিচালনা করতে প্রায় ২০০ জনের মতো জনবল প্রয়োজন।

নিরাপত্তার বিষয়টিও অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ উল্লেখ করে তিনি বলেন, “এখানে যেকোনো ব্যক্তিকে নিয়োগ দেওয়া যাবে না। বিশেষজ্ঞ ও জুলাইয়ের চেতনা ধারণ করেন এমন ব্যক্তিদের মাধ্যমে জাদুঘর পরিচালনা করা প্রয়োজন।” 

জাদুঘরকে স্বায়ত্তশাসিত কাঠামোর আওতায় আনার প্রয়োজনীয়তার কথাও বলেন নাহিদ ইসলাম। এ জন্য প্রয়োজনীয় আইন ও কাঠামো পরিবর্তনের আহ্বান জানান তিনি।

এই নেতা বলেন, “জুলাই গণঅভ্যুত্থানের শুরু থেকে যারা এখানে কাজ করেছেন শিক্ষার্থী, গবেষক, বিভিন্ন দল-মতের মানুষ এবং যারা অরাজনৈতিকভাবে আন্দোলনে অংশ নিয়েছেন তাদের অগ্রাধিকার দিয়ে জাদুঘর পরিচালনায় যুক্ত করা উচিত।”

জাদুঘরে শহীদ আবু সাঈদের ছবি না থাকার বিষয়েও প্রশ্ন তোলেন নাহিদ ইসলাম। তিনি বলেন, “আবু সাঈদের ছবি থাকা উচিত ছিল। বিষয়টি জাদুঘর কর্তৃপক্ষকে জানানো হয়েছে। কর্তৃপক্ষ জানিয়েছে, আবু সাঈদকে নিয়ে একটি চলচ্চিত্র তৈরির পরিকল্পনা রয়েছে এবং সেটি জাদুঘরে প্রদর্শন করা হবে।”

বিরোধীদলীয় চিফ হুইপ বলেন, “আবু সাঈদসহ জুলাই গণঅভ্যুত্থানের অন্যান্য শহীদদের স্মৃতিচিহ্নের বড় একটি অংশ এখনো প্রদর্শিত হয়নি। শহীদ পরিবারের পক্ষ থেকে প্রদত্ত স্মৃতিচিহ্নের পরিমাণ বর্তমানে প্রদর্শিত সামগ্রীর চেয়ে কয়েক গুণ বেশি। এগুলো কীভাবে আরো শৈল্পিকভাবে প্রদর্শন করা যায়, সে বিষয়েও পরিকল্পনা থাকা প্রয়োজন।”

নাহিদ ইসলাম বলেন, “পুরো ১৭ একর জায়গাকে কেন্দ্র করে জাদুঘরটিকে আরও বিস্তৃতভাবে ব্যবহারের সুযোগ রয়েছে।” ভবনের বাইরেও বিভিন্ন পরিকল্পনা ছিল, তবে সেগুলোর বর্তমান অগ্রগতি সম্পর্কে তিনি জানতে পারেননি।

জুলাই গণঅভ্যুত্থানের ইতিহাসে ভারতের ভূমিকা ও সীমান্ত হত্যার বিষয়গুলো যথাযথভাবে তুলে ধরা হয়নি বলেও অভিযোগ করেন তিনি। তার দাবি, গত ১৬ বছরে বাংলাদেশে ভারতের প্রভাব ও বিভিন্ন ঘটনার সঙ্গে যে সম্পর্ক ছিল, সেটিও ইতিহাসের অংশ হিসেবে তুলে ধরা প্রয়োজন।

নাহিদ ইসলাম বলেন, “সীমান্ত হত্যা, বিডিআর হত্যাকাণ্ড, ফেলানী হত্যাকাণ্ড এবং মোদি বিরোধী আন্দোলনের মতো ঘটনাগুলো বাংলাদেশের রাজনৈতিক ইতিহাসের গুরুত্বপূর্ণ অংশ। এগুলো সরিয়ে দিয়ে ভারতের সঙ্গে সম্পর্ক ভালো রাখার চেষ্টা করা হলেও তাতে প্রকৃত ইতিহাস পূর্ণাঙ্গভাবে উঠে আসবে না “

বাংলাদেশের সঙ্গে ভারতের সম্পর্ক মর্যাদাপূর্ণ হওয়া উচিত উল্লেখ করে নাহিদ ইসলাম বলেন, আপস করে বাংলাদেশের স্বাধীনতা, সার্বভৌমত্ব ও গণতন্ত্র রক্ষা করা সম্ভব নয়।

source: The Dhaka Diary

Leave a Reply

Back to top button