News

ইলিশের জন্য হাহাকার, শূন্য বরিশালের আড়ত

ইলিশের ভরা মৌসুম চলছে। নদী এবং সাগরে জেলেদের জালে ধরা পড়ছে কাঙ্ক্ষিত ইলিশ। তবে বরিশালের ইলিশের মোকাম পোর্ট রোড খাঁখাঁ করছে ইলিশশূন্যতায়। ঘাটে রুপালি ইলিশের দেখা না মেলায় মাছ কেনাবেচার সঙ্গে সংশ্লিষ্ট শ্রমিক-কর্মচারীদের চোখে-মুখে হতাশার ছাপ। বছরের এই ভরা মৌসুমে মোকামে প্রতিদিন হাজার মণেরও বেশি ইলিশের আমদানি থাকার কথা। অথচ চলতি মৌসুমে প্রতিদিন গড়ে ১০০ মণের বেশি ইলিশ আমদানি হচ্ছে না পোর্ট রোডের এই আড়তে।

ইজারাদারদের খামখেয়ালি, ব্যবসায়ীদের কাছ থেকে অতিরিক্ত টোল আদায়ের কারণেই বরিশালের ইলিশ মোকাম থেকে জেলেসহ ইলিশ ব্যবসায়ীরা মুখ ফিরিয়ে নিচ্ছেন বলে অভিযোগ। সাগরে বা নদীতে ধরা পড়া ইলিশ বরিশালের মোকামে না এনে নদীর মোহনা ও সুবিধাজনক স্থান থেকেই ব্যবসায়ীদের কাছে বিক্রি করে দিচ্ছেন জেলেরা।

এছাড়া ব্যবসায়ীদের মাধ্যমে বিভিন্ন পয়েন্ট থেকে চাঁদপুর, যশোরসহ উত্তারঞ্চলে মাছ চলে যাচ্ছে বলে জানান বরিশালের পাইকারি ইলিশ ব্যবসায়ীরা। ফলে পুরো ভরা মৌসুমেই পোর্ট রোডের ইলিশ মোকাম ইলিশ থেকে বঞ্চিত হওয়ার শঙ্কা তৈরি হয়েছে।

বরিশাল পোর্ট রোডের মৎস্য আড়তদাররা জানান, বিগত ইউনূস সরকারের আমলে এই ইলিশ মোকাম থেকে জেলেদের কাছ থেকে মণপ্রতি ১০০ টাকা করে টোল আদায় করতেন ইজারাদাররা। যে কারণে সাগর বা নদীতে কম ইলিশ ধরা পরা সত্ত্বেও জেলেরা ইলিশসহ সব মাছই পোর্ট রোডের আড়তে নিয়ে আসতেন। তখন ভরা মৌসুমে প্রতিদিন গড়ে এক থেকে দেড় হাজার মণ ইলিশ আসত এখানে। কিন্তু বিএনপি সরকার ক্ষমতায় আসার পর সিটি করপোরেশন থেকে মো. কামাল হোসেন এবং বিআইডব্লিউটিএর কাছ থেকে স্বেচ্ছাসেবক দল নেতা মো. সোবাহান নতুন করে ইজারা নেন।

বরিশালের সবচেয়ে বড় ইলিশের মোকাম হিসেবে পরিচিত পোর্ট রোডের ইজারা পেয়েই তারা জেলেদের কাছ থেকে মণপ্রতি ইজারা ফি হিসেবে ৩০০ টাকা এবং পাইকারি ক্রেতাদের কাছ থেকে মণপ্রতি ৮০ টাকা আদায় করছেন। এ কারণে জেলে ও পাইকারি ক্রেতারা ইজারাদারদের ওপর অনেকটা ক্ষুব্ধ হয়ে ওঠেন। এমনকি ওই সময় অতিরিক্ত টোল আদায়ের প্রতিবাদ করেন বরিশাল মৎস্য আড়তদার সমিতির সাবেক সাধারণ সম্পাদক কামাল সিকদারসহ স্থানীয় ব্যবসায়ীরা। প্রতিবাদ করায় কামাল সিকদারসহ ব্যবসায়ীদের বেধড়ক মারধর করেন ক্ষমতাসীন দলের ইজারাদাররা। এ ঘটনার পর অন্য ব্যবসায়ীরা ইজারাদারদের বিরুদ্ধে অবস্থান নিয়ে কোনো প্রতিবাদ করতে সাহস পাননি।

এদিকে অতিরিক্ত টোল আদায় করায় বরিশালের সর্ববৃহৎ এই মৎস্য আড়ত থেকে মুখ ফিরিয়ে নিচ্ছেন সংশ্লিষ্ট জেলে ও পাইকারি ক্রেতারা। অনেক ক্রেতা সাগরের বা নদীর মোহনা থেকেই জেলেদের কাছ থেকে ইলিশ সংগ্রহ করে তা পাঠিয়ে দিচ্ছেন দেশের বিভিন্ন এলাকায়। এতে জেলেরা যেমন লাভবান হচ্ছেন, তেমনি হচ্ছেন পাইকারি ক্রেতারাও। আর ভরা মৌসুমেও খাঁখাঁ করছে বরিশালের ইলিশ মোকাম।

এ বিষয়ে এখানকার মাছের আড়তদার নাসির উদ্দিন আমার দেশকে বলেন, বরিশালের পোর্ট রোড মোকামে ইলিশ নেই বললেই চলে। গত এক সপ্তাহ ধরে কিছু ইলিশ আসতে শুরু করেছে। গতকাল শুক্রবার এক কেজি ২০০ গ্রাম সাইজের ইলিশ প্রতি কেজি ২,৮৫০ টাকা, এক কেজির ইলিশ ২,৬৫০ টাকা, এলসি (৮০০-৯০০ গ্রাম) ২,৩০০ টাকা, ৫০০ গ্রাম ওজনের ইলিশ ২,০৫০ টাকা, ৪০০ গ্রাম সাইজের ইলিশ ১,৫০০ টাকা, ৩০০ গ্রাম সাইজের ইলিশ ১,২৫০ টাকা এবং জাটকা ৮০০ থেকে ৯০০ টাকা দরে বিক্রি হয়েছে।

গতকাল এখানে সর্বোচ্চ ১০০ মণ ইলিশ উঠেছে। নাসির বলেন, নদীর মোহনায় ধরা পড়া লোকাল মাছ পোর্ট রোডে আসছে না বললেই চলে। যোগাযোগব্যবস্থা উন্নত হওয়ায় নদী ও সাগরের মোহনাসহ বিভিন্ন স্থান থেকে বিক্রেতারা ইলিশ সংগ্রহ করে বিভিন্ন স্থানে পাঠিয়ে দিচ্ছে। এ কারণে জেলেরা বরিশালের মোকামে ইলিশ কম আনছে। তবে অতিরিক্ত টোল আদায়ের বিষয়ে তিনি কোনো মন্তব্য করতে রাজি হননি।

মেঘনা নদীতে ইলিশ শিকার করা জেলে কামরুল ইসলাম আমার দেশকে বলেন, ইলিশের ভরা মৌসুম চলছে। তবে যে পরিমাণ ইলিশ ধরা পড়ার কথা সে রকম পড়ছে না। এছাড়া অনেক জেলে বরিশালের মোকামে না নিয়ে নদীর মোহনা থেকেই ইলিশ বিক্রি করে দিচ্ছেন। এখানে ইজারাদাররা জেলেদের কাছ থেকে অতিরিক্ত টোল আদায় করছেন। এ কারণে অনেক জেলে চাঁদপুর মোকামেও ইলিশ নিয়ে যাচ্ছেন।

হিজলা উপজেলার বাসিন্দা মামুন সিকদার নামের এক জেলে বলেন, এখন আর আগের দিন নেই। নদীতে জাল ফেললেও সচরাচর ইলিশের দেখা মেলে না। খালি হাতে অনেকটা হতাশা নিয়ে বাড়ি ফিরতে হয়। দু-চারটা পেলেও তার সাইজ ৪০০ থেকে ৫০০ গ্রামের মধ্যে থাকে। তবে গত এক সপ্তাহ ধরে কিছু মিলছে। এসব ইলিশ তারা স্থানীয় বাজারে বিক্রি করছেন।

এদিকে টোলের টাকা বাড়ানোর প্রতিবাদ করায় পোর্ট রোড মৎস্য আড়তদার সমিতির সাবেক সাধারণ সম্পাদক কামাল সিকদারসহ কয়েকজন ব্যবসায়ীকে বেধড়ক মারধর করা হয়েছে বলে অভিযোগ করেন তিনি। স্বেচ্ছাসেবক দলের ৬নং ওয়ার্ডের সাধারণ সম্পাদক মো. সোবাহান, স্বেচ্ছাসেবক দল নেতা মো. মনির ও মহানগর শ্রমিক লীগের সহ-সভাপতি মো. আইয়ুবের নেতৃত্বে তার ওপর হামলা হয়েছিল বলে অভিযোগ করেন কামাল হোসেন। ফলে অন্য আড়তদাররা কোনো প্রতিবাদ করার সাহস পাননি। অতিরিক্ত টোল আদায়ের কারণে মৎস্য বিক্রেতা ও ব্যবসায়ীরা ক্ষতির সম্মুখীন হচ্ছেন বলেও অভিযোগ করেন তিনি।

এ বিষয়ে বরিশাল পোর্ট রোডের ইজারাদার ও মৎস্য আড়তদার সমিতির সাধারণ সম্পাদক কামাল হোসেন বলেন, তারা দায়িত্ব নেওয়ার আগে মণপ্রতি ২৮০ টাকা করে টোল আদায় করা হতো। ঘাট পরিচালনা করতে ইজারাদারদের লোকসান হওয়ায় টোল বৃদ্ধির জন্য আড়তদারদের কাছে আবেদন করা হয়। তাদের আবেদনের প্রেক্ষিতে ১০০ টাকা বাড়িয়ে ৩৮০ টাকা আদায় করা হচ্ছে। জোর করে টোল বাড়ানো হয়নি। টোল বৃদ্ধি নিয়ে কাউকে মারধর করা হয়নি বলেও দাবি করেন তিনি।

বরিশাল জেলা মৎস্য কর্মকর্তা মো. হাদিউজ্জামান আমার দেশকে বলেন, চলতি মৌসুমে নদ-নদী কিংবা সাগরের মোহনায় ইলিশের পরিমাণ কিছুটা কম। তা সত্ত্বেও গত এক মাস ধরে মোটামুটি নদী ও সাগরে ইলিশ ধরা পড়ছে। তিনি জানান, নদীর বিভিন্ন স্থানে অসংখ্য ডুবোচর জেগে উঠেছে। এসব ডুবোচরের কারণে প্রজনন মৌসুমে সাগর থেকে ডিমওয়ালা মা ইলিশ নদীতে প্রবেশে বাধাপ্রাপ্ত হচ্ছে। ফলে উপযুক্ত পথ না পেয়ে তারা অনত্র চলে যাচ্ছে। এছাড়া জেলেরা নিষিদ্ধ ঘোষিত জাল ব্যবহার করে মাছ শিকার করছেন। এসব জালের ফাঁদে রেণুপোনা পর্যন্ত ধরা পড়ে যাচ্ছে। এ কারণে মাছের বৃদ্ধি ও উৎপাদন কমে যাচ্ছে বলে দাবি করেন তিনি।

এমএমআর

source: Daily Amar Desh

Leave a Reply

Back to top button