স্বতন্ত্র সড়ক নিরাপত্তা আইন প্রণয়ন গুরুত্বের সঙ্গে বিবেচনা করা প্রয়োজন: নিসচা

নিরাপদ সড়ক চাই (নিসচা) বলেছে, সড়ক নিরাপত্তাকে দীর্ঘমেয়াদি ও টেকসই কাঠামোর মধ্যে আনতে একটি স্বতন্ত্র সড়ক নিরাপত্তা আইন প্রণয়নের বিষয়টি গুরুত্বের সঙ্গে বিবেচনা করা প্রয়োজন। অতিরিক্ত গতি, বেপরোয়া চালনা, অনিরাপদ যানবাহন, মানসম্মত হেলমেট ও সিটবেল্ট ব্যবহার না করা এবং পথচারী নিরাপত্তার ঘাটতিসহ বিভিন্ন ঝুঁকিকে Safe System Approach -এর আলোকে বিবেচনা করতে হবে।
বৃহস্পতিবার জাতীয় প্রেস ক্লাবের আকমার খাঁ হলে আগামী ২২ অক্টোবর জাতীয় নিরাপদ সড়ক দিবস উপলক্ষে এক সংবাদ সম্মেলনে এ দাবি জানিয়েছে সংগঠনটি।
সংবাদ সম্মেলনে নিসচা ভারপ্রাপ্ত চেয়ারম্যান মিরাজুল মইন জয় বলেন, ২২ অক্টোবর জাতীয় নিরাপদ সড়ক দিবস শুধু একটি আনুষ্ঠানিক দিবস নয়, বরং মানুষের জীবন রক্ষায় জাতীয় অঙ্গীকারকে আরও শক্তিশালী করার নতুন সূচনা। নিরাপদ সড়ক চাই, এটি শুধু একটি সংগঠনের দাবি নয়, এটি মানুষের জীবন রক্ষার দাবি।
লিখিত বক্তব্যে নিসচা মহাসচিব লিটন এরশাদ নিরাপদ সড়ক চাই আন্দোলনের প্রেক্ষাপট তুলে ধরে গণমাধ্যম ও দেশবাসীর প্রতি কৃতজ্ঞতা জানিয়ে বলেন, ‘আমাদের দীর্ঘ এই জার্নিতে এ দেশের কোটি কোটি জনগণ সমর্থন দিয়েছেন, ভালোবাসা দিয়েছেন। বিশেষ করে মিডিয়া এবং আমাদের সাংবাদিকবৃন্দ কর্মকাণ্ডকে অকুণ্ঠ সমর্থন দিয়ে গেছেন, যার ফলে ২২ অক্টোবর জাতীয় নিরাপদ সড়ক দিবসের স্বীকৃতি অর্জন করেছে। কৃতজ্ঞতা আপনাদেরসহ দেশবাসীর প্রতি। এ বছরও দিবসের প্রতিপাদ্য বিষয় হচ্ছে ‘নিরাপদ সড়ক সমৃদ্ধ দেশ, সবার আগে বাংলাদেশ’, যার আলোকে সরকারি উদ্যোগে এবং আমাদের সংগঠনের পক্ষ থেকে সচেতনতামূলক ও শিক্ষণীয় নানা কর্মসূচি পালিত হবে।
তিনি বলেন, গত ১৪ সেপ্টেম্বর ২০২৬ সড়ক পরিবহন ও মহাসড়ক বিভাগ জেলা, মেট্রোপলিটন ও উপজেলা পর্যায়ের সড়ক নিরাপত্তা কমিটি পুনর্গঠনের বিষয়ে নির্দেশনা জারি করেছে। নিসচা এ উদ্যোগকে স্বাগত জানিয়ে স্থানীয় পর্যায়ে সড়ক নিরাপত্তা কার্যক্রমে সমন্বয় আরও জোরদারের আহ্বান জানাই। প্রযুক্তিনির্ভর ট্রাফিক ব্যবস্থাপনা ও যানজট নিরসনসহ সরকারের বিভিন্ন উদ্যোগের সঙ্গে নাগরিক সমাজ ও সড়ক নিরাপত্তা নিয়ে কাজ করা সংগঠনগুলোর অভিজ্ঞতা সমন্বয়ের গুরুত্ব দেওয়ার আহ্বান জানান।
তিনি আরও বলেন, নিসচার দীর্ঘ পথচলা কখনোই সহজ ছিল না। বিভিন্ন সময়ে নানা বাধা, প্রতিকূলতা, চড়াই-উতরাই এবং নানা ধরনের প্রতিবন্ধকতা অতিক্রম করেই সংগঠনটি আজকের অবস্থানে এসেছে। বিশেষ করে ২২ অক্টোবরকে জাতীয় নিরাপদ সড়ক দিবস হিসেবে প্রতিষ্ঠার দাবিটি বাস্তবায়ন করতে নিসচাকে দীর্ঘ আন্দোলন-সংগ্রামের পাশাপাশি আদালতের দ্বারপ্রান্তেও যেতে হয়েছে। দাবিটি বাস্তবায়নে নানা জটিলতা ও প্রতিবন্ধকতা সৃষ্টি হলেও নিসচা তার অবস্থান থেকে একটুও পিছপা হয়নি। দীর্ঘদিনের ধারাবাহিক প্রচেষ্টা, কর্মসূচি, জনমত সৃষ্টি এবং আইনি লড়াইয়ের মধ্য দিয়ে অবশেষে ২২ অক্টোবর জাতীয় নিরাপদ সড়ক দিবস হিসেবে রাষ্ট্রীয় স্বীকৃতি লাভ করে। এটি শুধু নিসচার অর্জন নয়, বরং সড়কে নিরাপত্তার দাবিতে দীর্ঘদিন সংগ্রাম করা কোটি মানুষের অর্জন। তবে দুঃখজনকভাবে, এখনো কিছু স্বার্থান্বেষী মহল জাতীয় নিরাপদ সড়ক দিবসের প্রতিষ্ঠিত ইতিহাস ও মর্যাদাকে প্রশ্নবিদ্ধ কিংবা পরিবর্তনের অপচেষ্টা চালিয়ে যাচ্ছে। কোনো দিবসের পেছনে যদি দীর্ঘদিনের আন্দোলন, জনসম্পৃক্ততা এবং আইনি সংগ্রামের ইতিহাস থাকে, তাহলে তা খেয়াল-খুশিমতো পরিবর্তন করার বিষয় হতে পারে না। ২২ অক্টোবর জাতীয় নিরাপদ সড়ক দিবসের সঙ্গে নিসচার ৩৩ বছরের সংগ্রাম এবং দেশের মানুষের আবেগ ও প্রত্যাশা জড়িয়ে আছে। নিসচার দীর্ঘ সংগ্রাম প্রমাণ করেছে, মানুষের জীবন রক্ষার একটি ন্যায্য দাবি কখনোই বৃথা যায় না। বাধা এসেছে, প্রতিকূলতা এসেছে, আদালতের দ্বারস্থ হতে হয়েছে, তবুও নিসচা তার আন্দোলন থেকে সরে যায়নি। ৩৩ বছরের সেই নিরলস সংগ্রামের ধারাবাহিকতায় আজ নিরাপদ সড়কের দাবি বাংলাদেশের মানুষের কণ্ঠের দাবিতে পরিণত হয়েছে।
তিনি আরও বলেন, বাংলাদেশের সড়কে প্রাণহানি ও আহত হওয়ার ঘটনাকে দীর্ঘদিন ধরে সড়ক দুর্ঘটনা বলা হলেও আধুনিক সড়ক নিরাপত্তা ব্যবস্থাপনায় Road Crash বা Road Traffic Crash ধারণাটি বেশি গুরুত্ব পাচ্ছে। কারণ Accident শব্দটি অনেক সময় ঘটনাটিকে অনিবার্য হিসেবে দেখার প্রবণতা তৈরি করে। অন্যদিকে Crash শব্দটি সংঘর্ষের পেছনে থাকা ঝুঁকি, ব্যবস্থাগত দুর্বলতা এবং প্রতিরোধের সুযোগকে সামনে আনে। তিনি বলেন, সড়কে প্রাণহানি ঘটলে শুধু চালকের ভুল খুঁজে সমাধান সম্ভব নয়। কেন সংঘর্ষ ঘটল, সড়ক ও যানবাহনে কী ঝুঁকি ছিল, চালক বা পথচারীর ভুলের পেছনে কোনো ব্যবস্থাগত কারণ ছিল কি না এবং ভবিষ্যতে একই ধরনের ঘটনা কীভাবে প্রতিরোধ করা যায়, তা বিশ্লেষণ করতে হবে। বাংলাদেশের সড়ক নিরাপত্তা ব্যবস্থাকে আধুনিক করতে Safe System Approach অনুসরণ করা জরুরি। মানুষের ভুল হতে পারে, কিন্তু সেই ভুল যেন মৃত্যু বা গুরুতর আহত হওয়ার কারণ না হয়, এমন ব্যবস্থা গড়ে তোলাই এ পদ্ধতির মূল দর্শন। দীর্ঘমেয়াদে বাংলাদেশকে Vision Zero -এর দিকে এগিয়ে যেতে হবে। এজন্য Road Safety Management, Safer Roads and Mobility, Safer Vehicles, Safer Road Users Ges Post-Crash Response-কে সমন্বিত কাঠামোর মধ্যে আনতে হবে।
এ জন্য আমরা নিসচার পক্ষ থেকে একটি National Road Safety Road Map প্রণয়নের দাবি জানাচ্ছি- যেখানে স্বল্প, মধ্য ও দীর্ঘমেয়াদি লক্ষ্যমাত্রা, দায়িত্বপ্রাপ্ত প্রতিষ্ঠান, সময়সীমা, অর্থায়ন ও বাস্তবায়ন অগ্রগতি পরিমাপের সু¯পষ্ট কাঠামো থাকতে হবে। একই সঙ্গে একটি সমন্বিত National Road Crash Data Management System গড়ে তোলার ওপর গুরুত্ব দেওয়া দরকার। নির্ভরযোগ্য তথ্য ছাড়া ঝুঁকিপূর্ণ স্থান চিহ্নিতকরণ, নীতিনির্ধারণ এবং কার্যকর ব্যবস্থা গ্রহণ সম্ভব নয়। প্রযুক্তিনির্ভর Smart Road Safety Management System চালুর পাশাপাশি, ঝুঁকিপূর্ণ স্থান শনাক্তকরণ, ট্রাফিক ব্যবস্থাপনা, আইন প্রয়োগ, র্ক্যাশ বিশ্লেষণ ও গৃহীত পদক্ষেপের ফলাফল পর্যবেক্ষণে প্রযুক্তির ব্যবহার বাড়াতে হবে। একই সঙ্গে সংঘর্ষের পর দ্রুত উদ্ধার, অ্যাম্বুলেন্স, জরুরি চিকিৎসা, ট্রমা কেয়ার, পুলিশি সহায়তা ও নিরপেক্ষ তদন্ত নিশ্চিত করে Post-Crash Response শক্তিশালী করতে হবে। নিসচার মতে, সড়কে মৃত্যু অনিবার্য নয়। পরিকল্পিত Safe System, নির্ভরযোগ্য তথ্যভাণ্ডার, দক্ষ চালক, নিরাপদ যানবাহন, নিরাপদ অবকাঠামো, কার্যকর আইন ও আইন প্রয়োগ, জবাবদিহি এবং দ্রুত Post-Crash Response নিশ্চিত করা গেলে প্রতিরোধযোগ্য Road Crash ও প্রাণহানি উল্লেখযোগ্যভাবে কমানো সম্ভব। নিসচা সরকারের সড়ক নিরাপত্তামূলক উদ্যোগগুলোকে আরও কার্যকর ও টেকসই করতে সমন্বিত পদক্ষেপ গ্রহণের আহ্বান জানিয়ে বলেছে, সরকার, সংশ্লিষ্ট মন্ত্রণালয় ও বিভাগ, আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী, পরিবহন মালিক-শ্রমিক, চালক, শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান, চিকিৎসা ও জরুরি সেবা, গণমাধ্যম, গবেষক, নাগরিক সমাজ এবং সাধারণ জনগণকে একই লক্ষ্যে কাজ করতে হবে।
সংবাদ সম্মেলনে নিসচা মহাসচিব বক্তব্যে তুলে ধরে বলেন, গত ২৩ সেপ্টেম্বর ২০২৬ নিসচার একটি প্রতিনিধি দল সড়ক পরিবহন ও রেলপথ প্রতিমন্ত্রী হাবিবুর রশিদ হাবিবের সঙ্গে সাক্ষাৎ করে সড়ক, রেল ও নৌপথের নিরাপত্তা জোরদারে নতুন সড়ক নিরাপত্তা আইন দ্রুত প্রণয়নসহ ১৫ দফা প্রস্তাব উপস্থাপন করা হয়েছে। এর মধ্যে জাতীয় সড়ক নিরাপত্তা কাউন্সিলে প্রতিনিধিত্ব, সরকারি সড়ক নিরাপত্তা কার্যক্রমে নিসচাকে সম্পৃক্ত করা, মহাসড়কে Emergency Response Unit, পর্যাপ্ত অ্যাম্বুলেন্স ও ট্রমা সেন্টার এবং স্বল্প, মধ্য ও দীর্ঘমেয়াদি Road Safety Road Map প্রণয়নের প্রস্তাব রয়েছে। প্রতিমন্ত্রী প্রস্তাবগুলো ইতিবাচকভাবে বিবেচনা এবং পরবর্তী সময়ে নিসচার প্রতিনিধিদের সঙ্গে আবারও আলোচনার আশ্বাস দিয়েছেন।
এরপর নিসচা মহাসচিব সংগঠনের পক্ষ থেকে মাসব্যাপী কর্মসূচির বিবরণ তুলে ধরেন। এবারের জাতীয় নিরাপদ সড়ক দিবস ২০২৬ উপলক্ষে কেন্দ্রীয় ও শাখা পর্যায়ে ১০০০টি কর্মসূচী হাতে নেয়া হয়েছে। নিসচা কর্তৃক সারাদেশে গৃহীত উল্লেখযোগ্য কর্মসূচিসমূহ হচ্ছে- বিদ্যমান চালকদের দক্ষ করে গড়ে তুলতে প্রশিক্ষণ প্রদান, শিক্ষার্থীদের সড়ক নিরাপত্তা বিষয়ে প্রশিক্ষণ প্রদান, ট্রাফিক আইন জানতে ও মানতে রোড ক্যাম্পেইন, বৃক্ষরোপণ কর্মসূচি, সংবাদ সম্মেলন, র্যালি, পোস্টার প্রকাশ, সচেতনতামূলক লিফলেট বিতরণ, সড়কের পাশে অবৈধ স্থাপনা উচ্ছেদ, সড়ক ও অরক্ষিত লেবেল ক্রসিংয়ে সতর্কতামূলক সাইন স্থাপন এবং অনেকে রেললাইনের উভয় পাশে চলাচল করতে গিয়ে অলিখিতভাবে তৈরি হওয়া লেবেল ক্রসিং চিহ্নিত করে রেল কর্তৃপক্ষের নজরে আনা, বিপজ্জনক বাঁকে সচেতনতামূলক রোড সাইন স্থাপন, মটরসাইকেল চালকদের মাঝে হেলমেট বিতরণ, শিক্ষার্থীদের নিয়ে বয়সভিত্তিক সড়ক নিরাপত্তামূলক রচনা প্রতিযোগিতা, বিতর্ক প্রতিযোগিতা, পরিবহন মালিক-শ্রমিকদের সাথে মত বিনিময়, বাস ও ট্রাক টার্মিনালে সচেতনতামূলক কর্মকাণ্ড পরিচালনা, সড়ক নিরাপত্তা সংক্রান্ত নির্মিত ভিডিওচিত্র প্রদর্শন, প্রশাসনের সাথে মত বিনিময়সহ সরকারিভাবে ২২ অক্টোবরকে ঘিরে যেসব কর্মসূচি পালিত হবে সকল কর্মসূচিতে অংশগ্রহণ। এছাড়া বিভিন্ন জাতীয় সংবাদ মাধ্যমে নিসচার উদ্যোগে নিবন্ধ প্রকাশ এবং ইলেকট্রনিক মিডিয়া আয়োজিত টক শোতে অংশগ্রহণ করা হবে। সেইসাথে এইদিনে (২২ অক্টোবর) যে মহিয়সী নারী জাহানারা কাঞ্চনের মৃত্যুর মধ্য দিয়ে জাতীয় নিরাপদ সড়ক দিবস স্বীকৃতি এসেছে তাঁর স্মরণে নানা কর্মসূচি পালিত হবে এবং সড়ক দুর্ঘটনায় নিহত সকল ব্যক্তি ও জাহানারা কাঞ্চনের আত্মার মাগফেরাত কামনায় সারা দেশে মিলাদ ও দোয়া মাহফিল অনুষ্ঠিত হবে। যদি প্রতিকূল কোন অবস্থার সৃষ্টি না হয় ইনশাআল্লাহ নিসচা যোদ্ধারা উল্লেখিত সকল কর্মসূচী বাস্তবায়নে সচল থাকবে।
এ সময় আরও উপস্থিত ছিলেন জাতীয় নিরাপদ সড়ক দিবস উদযাপন কমিটির সদস্য সচিব এম নাহিদ মিয়া। শুভেচ্ছা বক্তব্য রাখেন জাতীয় নিরাপদ সড়ক দিবস উদযাপন কমিটির আহবায়ক এম কাইয়ুম খান।
source: Daily Amar Desh