ইসরাইলি কায়দায় আমাদের এই স্বাস্থ্য কেন্দ্রকে ভেঙে দেয়া হয়েছে: সেলিম উদ্দিন

রাড্ডা মেডিক্যাল সেন্টারে হামলা, ভাঙচুর ও লুটপাটের ঘটনাকে রাজনৈতিক মাফিয়াতন্ত্রের চরম বহিঃপ্রকাশ বলে মন্তব্য করেছেন বাংলাদেশ জামায়াতে ইসলামীর কেন্দ্রীয় নির্বাহী পরিষদ সদস্য, ঢাকা মহানগরী উত্তরের আমির ও ঢাকা উত্তর সিটি করপোরেশনের মেয়র পদপ্রার্থী মোহাম্মদ সেলিম উদ্দিন।
তিনি বলেন, বাংলাদেশের ইতিহাসে যতগুলো লজ্জাজনক ঘটনার জন্ম হয়েছে, এটি নিকৃষ্টতার দিক থেকে, অসভ্যতার দিক থেকে, বর্বরতার দিক থেকে একটি নিকৃষ্টতম ঘটনা, একটি বর্বর ঘটনা। এটা আইয়ামে জাহিলিয়াতকেও হার মানিয়েছে।
বৃহস্পতিবার (১ অক্টোবর) দুপুর সাড়ে ১২টায় ওমরাহ সফর শেষে দেশে ফিরেই রাজধানীর ক্ষতিগ্রস্ত রাড্ডা মেডিক্যাল সেন্টার পরিদর্শন করেন তিনি। পরে সমবেত সাংবাদিকদের সামনে আয়োজিত প্রেস ব্রিফিংয়ে হামলায় জড়িতদের দ্রুত গ্রেফতার ও বিচারের দাবি জানান। একইসাথে হাসপাতালটি আগের চেয়ে উন্নত ও আধুনিক মানে পুনর্নির্মাণের দাবি জানান তিনি।
সেলিম উদ্দিন বলেন, ‘এই ধরনের হাসপাতালে হামলার ঘটনা আমরা পৃথিবীর একটি অসভ্য রাষ্ট্র কর্তৃক ফিলিস্তিনে করতে দেখি।’
তিনি বলেন, ‘জুলাই আন্দোলন আমরা করলাম। চোখের সামনে আমাদের তরুণেরা জীবন দিয়ে যে বাংলাদেশকে আনল, সেখানে হাসপাতালে আমার শিশু, আগামী প্রজন্মের শিশুরা টিকা নেয়ার অধিকার থেকে বঞ্চিত হবে—এই জন্য কি আমাদের যুবকেরা রক্ত দিয়েছিল? আমার মায়েরা, গর্ভবতী মায়েরা তাদের চিকিৎসা নিতে পারবে না, টিকা নিতে পারবে না, ইনজেকশন নিতে পারবে না—এই জন্য কি আমরা যুদ্ধ করেছিলাম? না।’
সুষ্ঠু তদন্তের দাবি জানিয়ে তিনি বলেন, ‘কোনোরকম লেফাফা দুরস্ত করার মতো, মূলা ঝুলানোর মতো, ধামাচাপা টাইপের কোনো তদন্তের নামে যদি সময় ক্ষেপণ করা হয়, আমি আল্লাহকে সাক্ষী রেখে এখানে ঘোষণা দিয়ে যাচ্ছি—এই ঘটনার সুষ্ঠু তদন্তের ক্ষেত্রে যদি কোনো দুর্বলতা সরকারের তরফ থেকে করা হয়, তাহলে শুধু মিরপুরবাসী নয়, পুরো ঢাকাবাসীকে সাথে নিয়ে আমরা এই সরকারকে কড়ায়-গণ্ডায় জবাব দেয়ার ব্যবস্থা করব। কোনো টালবাহানা করলে চলবে না।’
তিনি আরো বলেন, ‘এটা প্রয়োজনে আন্তর্জাতিক পর্যায়ে নিয়ে যাওয়ার জন্য আমরা ব্যবস্থা করব, আন্তর্জাতিক মানবাধিকার কমিশনের কাছে আমরা নালিশ করব, আন্তর্জাতিক তদন্তের দাবি জানাব। যদি সরকার ব্যর্থ হয় এবং এখানে কত বড় “হোমরা-চোমরা” জড়িত ডাজ নট ম্যাটার, যদি কোনো মন্ত্রী জড়িত থাকে তাকে পদত্যাগ করতে হবে, তাকে বিচারের মুখোমুখি করতে হবে।’
হাসপাতাল পুনর্নির্মাণের বিষয়ে সেলিম উদ্দিন বলেন, ‘৫০ লাখ টাকা আমাদের আমিরে জামায়াত ঘোষণা করেছেন। প্রয়োজনে পুরো ঢাকা মহানগরীর জনগণ আমরা আরো টাকা দেব, কিন্তু এটাকে একটা অত্যাধুনিক হাসপাতাল হিসেবে, মা এবং শিশুর একটা নিরাপদ চিকিৎসার কেন্দ্র হিসেবে আমরা দেখতে চাই।’
তিনি বলেন, ‘আর যে মাস্তান আর চাঁদাবাজরা আমার শিশুর অধিকার, আমার মায়ের জাতির উপরে আঘাত করেছে, এদেরকে কঠিন শাস্তির কাঠগড়ায় দাঁড় করাতে হবে। আর যদি সেটা করতে না পারেন, আপনারা বিদায়ের রাস্তা খুঁজুন।’
চাঁদাবাজি ও সন্ত্রাসের বিরুদ্ধে অবস্থানের কথা জানিয়ে তিনি বলেন, ‘চাঁদাবাজির শাসন, বাংলাদেশ থেকে আমরা বিদায় করে দেবো। এই ঢাকা শহরে যদি চাঁদাবাজি, ধান্দাবাজি, সন্ত্রাস বন্ধ না করলে গত জুলাইয়ের চাইতে ভয়াবহ জুলাই আপনাদের জন্য সামনে অপেক্ষা করছে।’
তিনি আরো বলেন, ‘আমাদের বক্তব্য সরকারের বিরুদ্ধে নয়, চাঁদাবাজের বিরুদ্ধে, সন্ত্রাসের বিরুদ্ধে; সরকার যদি চাঁদাবাজ বা সন্ত্রাসী হয়, তাইলে তারও বিরুদ্ধে।’
সংবাদ সম্মেলনে কেন্দ্রীয় নির্বাহী পরিষদ সদস্য ও ঢাকা মহানগরীর সেক্রেটারি ড. মুহাম্মদ রেজাউল করিম বলেন, ‘দীর্ঘ অর্ধ শতাব্দীকাল যে স্বাস্থ্য কেন্দ্রটি এলাকার মানুষের জন্য, শিশুদের জন্য, গর্ভবতী নারীদের জন্য চিকিৎসা সেবা দিয়ে আসছে, সেই হসপিটালটি গত বৃহস্পতিবার গভীর রাতে সন্ত্রাসীরা গুঁড়িয়ে দিয়েছে এবং ইতোমধ্যেই বিশ্ব দরবারে বাংলাদেশের ভাবমর্যাদা দারুণভাবে ক্ষুণ্ণ হয়েছে।’
তিনি বলেন, ‘ইসরাইলি কায়দায় আমাদের এই স্বাস্থ্য কেন্দ্রকে ভেঙে দেয়া হয়েছে। এটি দেখার জন্য ইতোমধ্যেই আমাদের বিরোধীদলীয় নেতা জামায়াত আমির ডা: শফিকুর রহমান এটি ভিজিট করেছেন এবং ৫০ লাখ টাকা তিনি এখানে অনুদানের ঘোষণা দিয়ে গেছেন।’
সবশেষে বক্তব্য দেন ঢাকা-১৪ আসনের সংসদ সদস্য ব্যারিস্টার মীর আহমেদ বিন কাসেম আরমান। তিনি বলেন, ‘আল্লাহর ঘর সফর করে, তওবা করে এসেছি। আমার মানুষের অধিকার যারা হরণ করেছে, তাদের বিচারের জন্য যা করা প্রয়োজন তাই করব। মৃত্যুর জন্য তৈরি হয়ে এসেছি। এদের বিচার না হওয়া পর্যন্ত আমরা লড়াই করব।’
তিনি দাবি করেন, ‘ফুটেজের ছবি এসেছে, শুটার লেলিন এখন পর্যন্ত গ্রেফতার হয় নাই, এই হামলার মূল পরিকল্পনাকারী, সমন্বয়কারী মোহাম্মদ হানিফ এখন পর্যন্ত গ্রেফতার হয় নাই। দুইজন সংসদ সদস্যের নাম উচ্চারণ করে গেলাম, এদেরকে গ্রেফতার করে চার্জশিট দিয়ে বিচারের ব্যবস্থা যদি না করা হয়, আমরা মিরপুরকে অচল করে দেবো ইনশাআল্লাহ।’
ব্যারিস্টার আরমান বলেন, ‘এই সন্ত্রাসী গডফাদারদেরকে ধরতে হবে, এটি শুধু মিরপুরের জন্য নয়। মনে রাখতে হবে, এই রাড্ডা মেডিক্যাল সেন্টার শুধু মিরপুরের একটি বিচ্ছিন্ন ঘটনা নয়, সারা বাংলাদেশের আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতির সারসংক্ষেপ।’
তিনি আরো বলেন, ‘যদি আমরা এখানে হামলাকারীদের বিচার নিশ্চিত করতে পারি, সারা বাংলাদেশের দখলবাজ, চাঁদাবাজ, মাফিয়ারা সাবধান হয়ে যাবে ইনশাআল্লাহ। আমাদের সন্তানদের জন্য একটি নিরাপদ বাংলাদেশ রেখে যাওয়ার এই আন্দোলনে সবাইকে আমরা পাশে পাব তো ইনশাআল্লাহ?’ এ সময় সমবেত জনতা হাত তুলে সম্মতি জানান।
হাসপাতাল পুনর্নির্মাণের দাবি জানিয়ে তিনি বলেন, ‘অবিলম্বে সরকারি ও আন্তর্জাতিক বরাদ্দ নিয়ে একটি আন্তর্জাতিক মানের গরিবের হাসপাতাল আমরা এখানে তৈরি করব ইনশাআল্লাহ।’
এ সময় ড. মুহাম্মদ রেজাউল করিমের সঞ্চালনায় প্রেস ব্রিফিংয়ে উপস্থিত ছিলেন কেন্দ্রীয় কর্মপরিষদ সদস্য ও ঢাকা মহানগরীর নায়েবে আমির আব্দুর রহমান মূসা, কেন্দ্রীয় কর্মপরিষদের সদস্য ও ঢাকা মহানগরী সহকারী সেক্রেটারি মাহফুজুর রহমান, কেন্দ্রীয় মজলিসে শূরা সদস্য ও মহানগরীর সহকারী সেক্রেটারি নাজিম উদ্দিম মোল্লা, ডা: ফখরুদ্দিন মানিক, ইয়াসিন আরাফাত, কেন্দ্রীয় মজলিসে শূরা সদস্য ও মহানগরীর প্রচার-মিডিয়া সম্পাদক আতাউর রহমান সরকার, জামাল উদ্দিন, নাসির উদ্দীন, ডা: মঈন উদ্দীন ও জিএম হাফিজুর রহমান।
source: Barta Bazar