ভারতীয় স্ত্রী, কর্ণাটকে শ্বশুরবাড়ি—যুক্তরাষ্ট্রের নির্বাচনে জিতে আলোচনায় আবদুল আল-সাইয়েদ

যুক্তরাষ্ট্রের মধ্যবর্তী নির্বাচনে সিনেটর নির্বাচিত হয়ে আলোচনায় এসেছেন আবদুল আল-সাইয়েদ। গুরুত্বপূর্ণ দোদুল্যমান অঙ্গরাজ্য মিশিগানে তীব্র প্রতিদ্বন্দ্বিতাপূর্ণ নির্বাচনে প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের রিপাবলিকান দলের প্রার্থী মাইক রজার্সকে পরাজিত করেছেন তিনি। তাঁর এই জয়ে যুক্তরাষ্ট্রের পাশাপাশি আনন্দের উপলক্ষ তৈরি হয়েছে ভারতের কর্ণাটক রাজ্যে থাকা শ্বশুরবাড়িতেও। পরিবারের সদস্যদের কাছে তিনি শুধু একজন নবনির্বাচিত মার্কিন সিনেটর নন, বরং ‘কর্ণাটকের জামাই’।
মিসরীয় অভিবাসী পরিবারের সন্তান আবদুল আল-সাইয়েদ পেশায় চিকিৎসক। তাঁর স্ত্রী সারা জুকাকুও একজন মনোরোগ চিকিৎসক। সারার পারিবারিক শিকড় ভারতের দক্ষিণাঞ্চলীয় রাজ্য কর্ণাটকে।
যুক্তরাষ্ট্রের মিশিগান বিশ্ববিদ্যালয়ে পড়াশোনার সময় আল-সাইয়েদের সঙ্গে সারার পরিচয় হয়। পরে ২০০৬ সালে তাঁরা বিবাহবন্ধনে আবদ্ধ হন।
সারার জন্ম ও বেড়ে ওঠা যুক্তরাষ্ট্রের মিশিগানে হলেও তাঁর আত্মীয়স্বজনের অনেকেই এখনো ভারতের কর্ণাটকের ভাটকল শহরে বসবাস করেন। বেঙ্গালুরু থেকে প্রায় ৪৯০ কিলোমিটার পশ্চিমে অবস্থিত এই শহরেই রয়েছে তাঁদের পৈতৃক পরিবারের বসতি।
সারার কাজিন বিবি হুসনা জানান, নির্বাচনী প্রচারের উত্তেজনা থেকে শুরু করে ভোট গণনার শেষ সময় পর্যন্ত পরিবারের সদস্যরা উদ্বেগের মধ্যে ছিলেন। তবে আল-সাইয়েদের জয়ের খবরে তাঁদের মধ্যে স্বস্তি ফিরে আসে। তিনি বলেন, ‘আল্লাহর রহমতে, এটি দারুণ একটি জয় হয়েছে।’
সারার চাচা ও কেরালার ব্যবসায়ী জুকাকু আবদুল মজিদের কাছেও এই জয় বিশেষ তাৎপর্য বহন করে। তাঁর মতে, এটি শুধু রাজনৈতিক সাফল্য নয়, বরং পুরো পরিবারের জন্য আনন্দের ঘটনা।
নিউ ইন্ডিয়ান এক্সপ্রেসকে আবদুল মজিদ বলেন, যুক্তরাষ্ট্রের মোট জনসংখ্যার মাত্র ২ দশমিক ৫ শতাংশ মুসলিম। এমন পরিস্থিতিতে আল-সাইয়েদের জয়ের সম্ভাবনা তাঁরা কখনো কল্পনাও করেননি। তাঁর এই বিজয়কে আশীর্বাদ হিসেবে দেখছেন পরিবারের সদস্যরা।
পরিবারের কাছে ‘কর্ণাটকের জামাই’
আল-সাইয়েদকে পরিবারের সদস্যরা আদর করে ‘কর্ণাটকের জামাই’ বলে ডাকেন। তাঁদের ভাষ্য, তিনি অত্যন্ত আন্তরিক এবং সহজেই সবার সঙ্গে মিশে যেতে পারেন।
আল-সাইয়েদ ও সারার দুই মেয়ে রয়েছে। এক দশকেরও বেশি সময় আগে এক আত্মীয়ের বিয়েতে যোগ দিতে তাঁরা ভারতের ভাটকল শহরে এসেছিলেন। সেখানে পরিবারের সদস্যদের সঙ্গে চার দিন কাটিয়েছিলেন এই দম্পতি।
নির্বাচনী প্রচারের সময় নিজের ভারতীয় পারিবারিক পরিচয় নিয়ে রসিকতাও করেছেন আল-সাইয়েদ। দক্ষিণ ভারতীয় এক নারীকে প্রায় দুই দশক ধরে বিয়ে করে থাকার কারণে তিনি নিজেকে আরবের চেয়ে বেশি ভারতীয় মনে করেন বলে মন্তব্য করেন।
একটি পডকাস্টে তিনি বলেন, ‘মানুষ আরবদের চেয়ে দেশিদের (দক্ষিণ এশীয়দের) বেশি পছন্দ করে।’
নিজেকে সম্মানসূচক ভারতীয় উল্লেখ করে আল-সাইয়েদ বলেন, ভারতীয় সংস্কৃতির মধ্যে একধরনের স্থিরতা রয়েছে, যা তিনি সেখানে গিয়ে উপলব্ধি করেছেন। তাঁর ভাষায়, ভারতে এক শ কোটির বেশি মানুষ বসবাস করেন, তাই সেখানে কোনো কাজই খুব দ্রুত হয় না।
আগস্টে প্রকাশিত আরেকটি পডকাস্টে নিজের বিয়ে নিয়ে মজার একটি স্মৃতির কথা জানান তিনি। আল-সাইয়েদ বলেন, তাঁর এক চাচা একবার প্রশ্ন করেছিলেন, মিসরে আট কোটি মানুষ থাকতে তিনি কেন একজন ভারতীয় নারীকে বিয়ে করেছেন।
জবাবে তিনি বলেছিলেন, ‘আমু (চাচা), ভারতে তো এক শ কোটি মানুষ। পরিসংখ্যানের হিসাবে, এমনটা হওয়ার (ভারতে বিয়ের) সম্ভাবনাই বেশি ছিল।’
অন্য এক বক্তব্যে নিজের পরিবারের ভারতীয় পরিচয় তুলে ধরে তিনি বলেন, তাঁর স্ত্রী ও দুই মেয়েই দক্ষিণ এশীয় সংস্কৃতির সঙ্গে যুক্ত।
কর্ণাটকের পরিবারের রাজনৈতিক ঐতিহ্য
সারার বাবা জুকাকু তাইয়েব বেঙ্গালুরু মেডিকেল কলেজে পড়াশোনা করেন। ১৯৭৬ সালে তিনি যুক্তরাষ্ট্রে পাড়ি জমান। অন্যদিকে সারার দাদা জুকাকু শামসুদ্দিন সাবেক মহীশূর রাজ্যের অর্থবিষয়ক উপমন্ত্রী ছিলেন।
নিজের পারিবারিক ঐতিহ্য নিয়েও প্রায়ই কথা বলেন আল-সাইয়েদ। মিসরের খাবার ও সংস্কৃতির প্রতি তাঁর বিশেষ আগ্রহ রয়েছে। তাঁর বাবা ভূমধ্যসাগরীয় শহর আলেকজান্দ্রিয়ায় বড় হয়েছেন। বাবার শৈশবের শহরে গ্রীষ্মকাল কাটানোর স্মৃতিও তিনি বিভিন্ন সময়ে তুলে ধরেছেন।
নির্বাচনী প্রচারে স্বাস্থ্যসেবা ও সাধারণ মানুষের অংশগ্রহণ
জনস্বাস্থ্য খাতের সাবেক কর্মকর্তা আবদুল আল-সাইয়েদ নির্বাচনী প্রচারে সাধারণ মানুষের অংশগ্রহণের ওপর বিশেষ গুরুত্ব দিয়েছিলেন। সবার জন্য স্বাস্থ্যসেবা নিশ্চিত করা, নির্বাচনে বাইরের অর্থের প্রভাব বন্ধ করা এবং ইসরায়েলের নীতির কঠোর সমালোচনা ছিল তাঁর প্রচারের উল্লেখযোগ্য বিষয়।
মিশিগানের ডেমোক্রেটিক পার্টির প্রাথমিক বাছাইপর্ব এবং ৩ নভেম্বরের মধ্যবর্তী নির্বাচনে তাঁর প্রচারশিবিরকে বড় অঙ্কের বাইরের অর্থের প্রতিদ্বন্দ্বিতার মুখে পড়তে হয়। তাঁর প্রতিদ্বন্দ্বীর পক্ষে রিপাবলিকান ও ইসরায়েলপন্থী লবির অর্থ ব্যয়ের বিষয়টিও নির্বাচনী আলোচনায় আসে। এসব প্রতিকূলতার মধ্যেও শেষ পর্যন্ত জয় পান আল-সাইয়েদ।
তাঁর এই বিজয় ২০২৮ সালের মার্কিন প্রেসিডেন্ট নির্বাচনকে সামনে রেখে রাজনৈতিক অঙ্গনে তাঁর অবস্থান ও আন্দোলনকে আরও আলোচনায় আনতে পারে। গুরুত্বপূর্ণ অঙ্গরাজ্যগুলোতে তাঁর রাজনৈতিক কর্মসূচির প্রতি সমর্থন জানানো প্রার্থীদের বিজয়ও এ নির্বাচনে আলোচনার বিষয় হয়ে উঠেছে।
নির্বাচনী প্রচারে আল-সাইয়েদের পক্ষে মাঠে নেমেছিলেন ডেমোক্রেটিক পার্টির প্রভাবশালী নেতারা। তাঁদের মধ্যে ছিলেন সাবেক মার্কিন প্রেসিডেন্ট বারাক ওবামা ও সাবেক ভাইস প্রেসিডেন্ট কমলা হ্যারিস। তাঁরা বিভিন্ন প্রচার কর্মসূচিতে অংশ নিয়ে ভোটারদের তাঁর পক্ষে সংগঠিত করার চেষ্টা করেন।
source: Azadir Dak