Jannah Theme License is not validated, Go to the theme options page to validate the license, You need a single license for each domain name.
জাতীয়

রাজনৈতিক মিত্রদের পুরস্কৃত করছেন প্রধানমন্ত্রী

সরকারের কাছে মূল্যায়ন চান বিএনপির মিত্ররা। আন্দোলন-সংগ্রামে সহযাত্রী, এক সময়ের জোটসঙ্গী আবার নির্বাচনে ‘ভোটসঙ্গী’ ছিলেন এমন নেতারা যথাযথভাবে মূল্যায়িত হতে কখনো অভিমান করছেন, আবার কখনো কৌশলে চাপ দিচ্ছেন। এর মধ্যে পুরস্কৃত হয়েছেন কেউ কেউ। রাষ্ট্রের গুরুত্বপূর্ণ পদেও অধিষ্ঠিত হয়েছেন ভাগ্যবান কয়েকজন। যারা হননি, তাদের কেউ হতাশ। অনেকে আবার আশা ছাড়েননি। এমন পরিস্থিতিতে বিএনপি চেয়ারম্যান তারেক রহমান মান ভাঙানোর উদ্যোগ নিয়েছেন। গতকাল সোমবার রাতে তাদের নিয়ে নৈশভোজে মিলিত হয়েছেন। এর আগে নিজ দল ছেড়ে ‘ভোটসঙ্গী’ হওয়া রাশেদ খানকে ‘বিশেষ সহকারী নিয়োগ করে অন্যদের আশাহত না হয়ে ধৈর্যের পরীক্ষা দিয়ে যাওয়ার বার্তা দিয়েছেন।

প্রাপ্তি-অপ্রাপ্তির জটিল অঙ্কে কেউ সন্তুষ্ট, কেউবা ক্ষুব্ধ। দীর্ঘদিনের সহযাত্রী হয়েও কোনো কোনো রাজনৈতিক দল এখনো সরকারে কোনো পদ-পদবি পায়নি। এ নিয়ে তাদের মধ্যে অসন্তোষ রয়েছে। কেউ কেউ সেটা প্রকাশ্যেও এনেছেন। ইসলামপন্থি দুয়েকটি দল বিএনপি জোটে না থাকলেও সরকারের পদ পেতে আগ্রহ প্রকাশ করে বক্তব্য-বিবৃতি দিয়েছেন। দেড় দশকের বেশি সময় ধরে স্বৈরাচার হাসিনাবিরোধী আন্দোলনে বিএনপির সঙ্গে যুগপৎ আন্দোলন করে কিছু না পেয়ে হতাশার সুর তাদের কণ্ঠে।

অসন্তুষ্টদের অনেকের অনুযোগ, বিএনপির জোটসঙ্গী হিসেবে স্বৈরাচারবিরোধী আন্দোলন করতে গিয়ে তারাও কম জুলুম-নির্যাতনের শিকার হননি। কিন্তু দুয়েকটি দল প্রতিদান হিসেবে ক্ষমতার অংশীদার হলেও অধিকাংশ রাজনৈতিক দল বঞ্চিত রয়ে গেছে।

ছাত্রজনতার বিপ্লবের মাধ্যমে হাজারো প্রাণের বিনিময়ে ২০২৪ সালের ৫ আগস্ট স্বৈরাচার শেখ হাসিনার পতন ও পলায়নের পর নোবেল বিজয়ী অর্থনীতিবিদ অধ্যাপক ড. মুহাম্মদ ইউনূসের নেতৃত্বে অন্তর্বর্তী সরকার গঠিত হয়। একটি অবাধ, সুষ্ঠু ও গ্রহণযোগ্য নির্বাচন দিয়ে তারা বিদায় নেয়। গত ১২ ফেব্রুয়ারি অনুষ্ঠিত সেই নির্বাচনে বিএনপি নিরঙ্কুশ সংখ্যাগরিষ্ঠতা লাভ করে। এতে বিএনপি ও এর জোট, সমমনা এবং যুগপৎ আন্দোলনের শরিকরা ২১৪ আসনে বিজয়ী হয়েছে। এর মধ্যে বিএনপি ২১১ আসন ও শরিকরা পেয়েছে ৩টি আসন। গণসংহতি আন্দোলনের জোনায়েদ সাকি ও গণঅধিকার পরিষদ সভাপতি নুরুল হক নুর প্রতিমন্ত্রী হন।

বিএনপিতে যোগ দিয়ে নির্বাচন করেন এনডিএম চেয়ারম্যান ববি হাজ্জাজ। তিনি ছিলেন দলটির প্রতিষ্ঠাতা চেয়ারম্যান। ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনের আগে তিনি এ পদ থেকে ইস্তফা দিয়ে বিএনপিতে যোগ দিয়ে এমপি নির্বাচিত হন। এখন তিনিও সরকারের প্রতিমন্ত্রী। এছাড়াও নাগরিক ঐক্যের যুগ্ম সম্পাদকের পদ থেকে ইস্তফা দিয়েছিলেন আলোচিত সোশ্যাল মিডিয়া অ্যাক্টিভিস্ট ও রাজনৈতিক বিশ্লেষক ডা. জাহেদ উর রহমান। তিনি প্রতিমন্ত্রীর মর্যাদায় প্রধানমন্ত্রীর তথ্য ও সম্প্রচার বিষয়ক মন্ত্রণালয় এবং সংস্কৃতি বিষয়ক মন্ত্রণালয়ের উপদেষ্টা পদে অধিষ্ঠিত হয়েছেন। গণঅধিকার পরিষদের সাধারণ সম্পাদকের পদ থেকে ইস্তফা দিয়ে বিএনপিতে যোগ দিয়েছিলেন রাশেদ খান। গতকাল তাকে সচিবের মর্যাদায় প্রধানমন্ত্রীর বিশেষ সহকারীর পদ দেওয়া হয়।

রাজনৈতিক বিশ্লেষকরা জানান, সাড়ে ১৫ বছরের স্বৈরাচার শেখ হাসিনার বিরুদ্ধে আন্দোলনে দেশের বৃহত্তম রাজনৈতিক দল বিএনপির নেতৃত্বে গড়ে ওঠা আন্দোলন সংগ্রামে নিবন্ধিত-অনিবন্ধিত অনেক রাজনৈতিক দল অংশ নিয়েছিল। এর বাইরেও বিভিন্ন নাগরিক ফোরাম বা অধিকারকর্মীরাও স্বৈরাচারের বিরুদ্ধে বলিষ্ঠ ভূমিকা রাখেন। বিএনপির নেতৃত্বে তিনটি জোট স্বৈরাচারবিরোধী আন্দোলনে সক্রিয় ভূমিকা পালন করে। এগুলো হচ্ছে- গণতন্ত্র মঞ্চ, ১২ দলীয় জোট ও জাতীয়বাদী সমমনা জোট।

গণতন্ত্র মঞ্চ

বিএনপি নেতৃত্বের সঙ্গে সমন্বয় রেখে সাতটি দলের সমন্বয়ে গঠিত গণতন্ত্র মঞ্চের মধ্যে আ স ম আবদুর রবের নেতৃত্বাধীন জাতীয় সমাজতান্ত্রিক দল-জেএসডি আসন পায়নি। এ দল থেকে কেউ সরকারের অংশও হতে পারেনি। মাহমুদুর রহমান মান্নার নেতৃত্বে নাগরিক ঐক্য থেকে একটি আসনে প্রার্থী দেওয়া হলেও চূড়ান্ত মনোনয়নে সেটা বাদ পড়ে। এ দলেরই একসময় যুগ্ম সাধারণ সম্পাদক ছিলেন ডা. জাহেদ উর রহমান। তিনি দলটি থেকে পদত্যাগ করেছেন আগেই। নতুন সরকারে তিনি প্রধানমন্ত্রীর তথ্য ও সম্প্রচার মন্ত্রণালয় এবং সংস্কৃতি বিষয়ক মন্ত্রণালয় সম্পর্কিত উপদেষ্টার দায়িত্ব পেয়েছেন। কমরেড সাইফুল হকের নেতৃত্বে বিপ্লবী ওয়ার্কার্স পার্টিকে একটি আসন দেওয়া হলেও নির্বাচনে বিজয়ী হতে পারেননি। জোনায়েদ সাকির গণসংহতি আন্দোলন নির্বাচনে একটি আসনে প্রতিদ্বন্দ্বিতা করে তাতে বিজয়ী হয়। এ দলের প্রধান সমন্বয়ক জোনায়েদ সাকি সরকারের প্রতিমন্ত্রীর পদ পেয়েছেন।

গণঅধিকার পরিষদের আহ্বায়কের পদ হারিয়ে বিএনপিতে যোগ দিয়েছিলেন ড. রেজা কিবরিয়া। নির্বাচনে তিনি বিজয়ী হয়ে সংসদ সদস্য হয়েছেন। এ দলের সভাপতি সাবেক ডাকসু ভিপি নুরুল হক নুর সংসদ সদস্য নির্বাচিত হয়ে নতুন সরকারের প্রতিমন্ত্রী হয়েছেন। এ দলটির সাধারণ সম্পাদকের পদ থেকে বহিষ্কৃত হয়ে বিএনপিতে যোগ দিয়েছিলেন রাশেদ খান। ধানের শীষ প্রতীকে নির্বাচন করে পরাজিত হলেও গতকাল তাকে সচিবের পদমর্যাদায় প্রধানমন্ত্রীর রাজনৈতিক সহকারী করা হয়। তার নিয়োগ ও পদায়ন নিয়ে বিএনপি, ছাত্রদল ও যুবদলের নেতাদের মধ্যে মিশ্র প্রতিক্রিয়া দেখা গেছে। নিয়োগে সন্তোষ প্রকাশ করে রাশেদ খান নিজের ভেরিফায়েড ফেসবুক পেজে লিখেছেন, ‘আলহামদুলিল্লাহ, মাননীয় প্রধানমন্ত্রী আমাকে তার সহকারী (রাজনৈতিক) পদে সচিব পদমর্যাদায় নিয়োগ দিয়েছেন। অশেষ কৃতজ্ঞতা ও ধন্যবাদ জানাই বাংলাদেশের জনগণের আস্থা ও বিশ্বাসের প্রতিমূর্তি, বাংলাদেশ জাতীয়তাবাদী দল-বিএনপির মাননীয় চেয়ারম্যান, মাননীয় প্রধানমন্ত্রী জনাব তারেক রহমান স্যারকে।’

এছাড়াও, গণতন্ত্র মঞ্চ থেকে শেখ রফিকুল ইসলাম বাবলু নেতৃত্বাধীন ভাসানী অনুসারী পরিষদ ও হাসনাত কাইয়ুমের নেতৃত্বাধীন রাষ্ট্র সংস্কার আন্দোলনের কেউই নির্বাচনে প্রার্থী হতে পারেননি। নতুন সরকারের তাদের কেউ কোনো পদ-পদবি পাননি।

১২ দলীয় জোট

১২ দলীয় জোটের মধ্যে রয়েছে জাতীয় পার্টি (জাফর), বাংলাদেশ কল্যাণ পার্টি, বাংলাদেশ লেবার পার্টি, বাংলাদেশ জাতীয় দল, এনডিপি, জাগপা (একাংশ), ইসলামী ঐক্যজোট, বাংলাদেশ ইসলামিক পার্টি, মুসলিম লীগ, জমিয়তে উলামায়ে ইসলাম, পিপলস পার্টি, বিএলডিপি ও সাম্যবাদী দল। নির্বাচনের আগে এ জোট ভেঙে যায়। ২০২৪ সালের একতরফা আমি-ডামির নির্বাচনে অংশ নিতে বাংলাদেশ কল্যাণ পার্টি বেরিয়ে গিয়ে আওয়ামী লীগের সঙ্গে যুক্ত হয়। এর মধ্যে লেবার পার্টি ও জাগপা জামায়াতে ইসলামী নেতৃত্বাধীন ১১ দলীয় জোটে যোগ দেয়। বিএলডিপি ও বাংলাদেশ জাতীয় দল বিলুপ্ত ঘোষণা করে বিএনপিতে যোগ দেয়। এদের মধ্যে বিলুপ্ত বিএলডিপির চেয়ারম্যান শাহাদাত হোসেন সেলিম সংসদ সদস্য নির্বাচিত হন। বাংলাদেশ জাতীয় দলের চেয়ারম্যান সৈয়দ এহসান হুদা বিজয়ী হতে পারেননি। এ জোটের অবশিষ্ট দলগুলোর মধ্যে জমিয়তে উলামায়ে ইসলাম চারটি আসনে নমিনেশন পায়। তবে তাদের কোনো প্রার্থী বিজয়ী হতে পারেনি।

জাতীয়তাবাদী সমমনা জোট

এ জোটের এনপিপি, জাগপা (একাংশ), ডেমোক্রেটিক পার্টি, ন্যাপ, মুসলিম লীগ, জনদল, প্রগতিশীল গণতান্ত্রিক দল (পিডিপি), ন্যাশনাল আওয়ামী পার্টি (ভাসানী), ইসলামিক ডেমোক্রেটিক পার্টি, বাংলাদেশ মাইনরিটি জনতা পার্টি ও বাংলাদেশ সাধারণ ছাত্র অধিকার সংরক্ষণ পরিষদ রয়েছে। এদের মধ্যে এনপিপি চেয়ারম্যান ড. ফরিদুজ্জামান দল থেকে পদত্যাগ করে বিএনপিতে যোগ দিয়ে মনোনয়ন লাভ করলেও নির্বাচনে বিজয়ী হতে পারেননি।

এ তিনটি জোটের বাইরেও বিএনপির সঙ্গে যুগপৎ আন্দোলনে ভূমিকা রেখেছিল ব্যারিস্টার আন্দালিব রহমান পার্থর নেতৃত্বাধীন বাংলাদেশ জাতীয় পার্টি-বিজেপি। এ দল থেকে পার্থ সংসদ সদস্য নির্বাচিত হয়েছেন। তবে, তিনি সরকারের কোনো পদ-পদবি পাননি। এ নিয়ে তার দলের মধ্যে অসন্তোষও রয়েছে বলে জানিয়েছেন দলটির নেতারা।

বিএনপির সঙ্গে যুগপৎ আন্দোলনের শরিক অ্যাডভোকেট সুব্রত রায় চৌধুরীর গণফোরাম থেকে কেউ নমিনেশন পায়নি। সরকারেও কোনো পদ পাননি দলটির কোনো নেতা।

জাতীয়তাবাদী গণতান্ত্রিক আন্দোলন (এনডিএম) থেকে পদত্যাগ করে দলটির সভাপতি ববি হাজ্জাজ বিএনপিতে যোগ দেন। বিএনপির প্রতীক ধানের শীষ নিয়ে নির্বাচন করে তিনি বিজয়ী হয়ে এখন প্রতিমন্ত্রী হিসেবে দায়িত্ব পালন করছেন।

বিএনপির দীর্ঘদিনের সঙ্গী কর্নেল (অব.) অলি আহমদের নেতৃত্বাধীন লিবারেল ডেমোক্রেটিক পার্টি (এলডিপি) বিএনপি জোট থেকে বেরিয়ে জামায়াতে ইসলামী নেতৃত্বাধীন ১১ দলীয় জোটভুক্ত হয়। তবে তার দলের সেক্রেটারি ড. রেদোয়ান আহমেদ দল থেকে পদত্যাগ করে বিএনপিতে যোগ দেন। গত নির্বাচনে তিনি ধানের শীষ প্রতীকে নির্বাচন করে পরাজিত হন।

অসন্তোষ ইসলামপন্থিদের মধ্যে

সরকার গঠনের পাঁচ মাস পর শরিক দল ও সমমনা জোটের শীর্ষ নেতাদের সম্মানে প্রধানমন্ত্রী আয়োজিত নৈশভোজে অংশ নেয়নি বিএনপির দীর্ঘদিনের শরিক দল জমিয়তে উলামায়ে ইসলাম বাংলাদেশ। সোমবার রাতে সব প্রস্তুতি থাকা সত্ত্বেও এই বৈঠকে অংশ নেননি দাওয়াত পাওয়া জমিয়তে উলামায়ে ইসলামের নেতারা।

দলটির প্রচার সম্পাদক ইমরানুল বারী সিরাজী আমার দেশকে বলেন, আমরা বিএনপির প্রধান শরিক ছিলাম। দলটি ক্ষমতায় আসার পর আমাদের কোনো খোঁজ-খবর নেয়নি। এখন শুধু খাওয়ার জন্য গিয়ে কী লাভ?

দলটির অপর এক নেতা জানান, নির্বাচনে জোটগত সমঝোতার ভিত্তিতে চারটি আসনে প্রতিদ্বন্দ্বিতার সুযোগ পেলেও কোনো আসনে জয় পায়নি দলটি। এরপর সরকার গঠনের পর শরিক দল হিসেবে তাদের যথাযথ মূল্যায়ন করা হয়নি বলে মনে করছেন জমিয়তের নেতারা।

এর আগে এক সাক্ষাৎকারে জমিয়তের সভাপতি মাওলানা উবায়দুল্লাহ ফারুক প্রকাশ্যে ক্ষোভ প্রকাশ করে বলেন, নির্বাচনের পর আমাদের সঙ্গে বিএনপির কোনো যোগাযোগ নেই। কুশল বিনিময়ও হয়নি, কোনো বৈঠকও হয়নি। জোটের অন্যদের সঙ্গে সম্পর্ক রাখা হলেও আমাদের ধারাবাহিকভাবে উপেক্ষা করা হয়েছে। এটা রহস্যজনক।

জোটের শরিকদের প্রাপ্তি- অপ্রাপ্তি ও অসন্তোষের বিষয়ে ক্ষমতাসীন সরকারের নীতি নির্ধারক ও বিএনপির শীর্ষ নেতাদের সঙ্গে কথা বলে আমার দেশ। তারা প্রকাশ্যে এ বিষয়ে কোনো মন্তব্য করতে রাজি হননি। তবে, রাশেদ খানের নিয়োগের বিষয়ে ছাত্রদল ও যুবদলের নেতারা তীব্র প্রতিক্রিয়া দেখিয়েছেন। একজন সাবেক ছাত্রদল নেতা আমার দেশকে বলেন, দলের পরীক্ষিত ও ত্যাগী নেতাদের মূল্যায়ন হচ্ছে না। এতে দলের মধ্যে নেতিবাচক প্রভাব পড়তে পারে।

source: Daily Amar Desh

Leave a Reply

Back to top button