News

৩৫ বছর পর ব্যালটে রাষ্ট্রপতি নির্বাচন, যেভাবে ভোট দেবেন সংসদ সদস্যরা

মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর ও কর্নেল অলি আহমদ© দ্যা ঢাকা ডায়েরি ছবি
রাষ্ট্রপতি নির্বাচনে ক্ষমতাসীন দল ও বিরোধী জোটের দুই প্রার্থীর মনোনয়ন ফরম বৈধ হওয়ার পর নির্ধারিত সময়ের মধ্যে কেউ প্রত্যাহার করেননি। ফলে ৩৫ বছর পর আবারও রাষ্ট্রপতি পদে সরাসরি ভোট হতে যাচ্ছে। আগামী ২০ আগস্ট জাতীয় সংসদের অধিবেশন কক্ষে ভোট দেবেন সংসদ সদস্যরা।
 
আজ মঙ্গলবার (১৮ আগস্ট) বিকেলে নির্বাচন ভবনে প্রার্থিতা প্রত্যাহারের সময়সীমা (বিকেল ৪টা) শেষ হওয়ার পর আয়োজিত সংবাদ সম্মেলনে নির্বাচন কমিশন (ইসি) সচিব আখতার আহমেদ আনুষ্ঠানিকভাবে এ তথ্য নিশ্চিত করেন।
 
ইসি সচিব জানান, রাষ্ট্রপতি নির্বাচন আইন ১৯৯১ অনুযায়ী নির্ধারিত সময়ের মধ্যে কোনো প্রার্থী তাদের মনোনয়নপত্র প্রত্যাহার করেননি। ফলে আগামী ২০ আগস্টের নির্বাচনে বিএনপির প্রার্থী মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর এবং জামায়াতের নেতৃত্বাধীন ১১ দলীয় ঐক্যের প্রার্থী কর্নেল (অব.) অলি আহমদ প্রতিদ্বন্দ্বিতা করবেন। ঘোষিত তফসিল অনুযায়ী, গত ১৩ আগস্ট মনোনয়নপত্র জমা ও ১৬ আগস্ট বাছাই সম্পন্ন হয়েছিল।
 
সংসদের অধিবেশন কক্ষে ভোট গ্রহণের বিস্তারিত প্রক্রিয়া ব্যাখ্যা করে সচিব জানান, ২০ আগস্ট দুপুর ২টা থেকে বিকেল ৫টা পর্যন্ত ভোট গ্রহণ চলবে। ভোট শুরু করার আগে প্রধান নির্বাচন কমিশনার (নির্বাচনকর্তা) উপস্থিত সংসদ সদস্যদের ভোট দেওয়ার নিয়মকানুন অবহিত করবেন।
 
ভোটদানের সুনির্দিষ্ট নিয়ম তুলে ধরে ইসি সচিব জানান, ব্যবহৃত ব্যালট পেপারের দুটি অংশ থাকবে একটি মুড়ি অংশ এবং অপরটি মূল ব্যালট পেপার। মুড়ি অংশে থাকবে ক্রমিক নম্বর, সংশ্লিষ্ট সংসদ সদস্যের নাম এবং বিভক্তি নম্বর। সেখানে ভোটদানকারী সংসদ সদস্যকে নিজ হাতে পূর্ণ নাম লিখে স্বাক্ষর করতে হবে। এরপর তিনি মূল ব্যালট গ্রহণ করবেন।
 
মূল ব্যালট পেপারের ডান পাশে প্রতিদ্বন্দ্বী দুই প্রার্থীর নাম বাংলা বর্ণমালার আদ্যাক্ষর অনুসারে সাজানো থাকবে। সংসদ সদস্যরা তাদের পছন্দের প্রার্থীর নামের পাশে নির্ধারিত স্থানে পূর্ণ নাম লিখে ও স্বাক্ষর করে ভোট দেবেন। এরপর নির্ধারিত ব্যালট বাক্সে সেই ব্যালট পেপার জমা দিতে হবে। বিকেল ৫টায় ভোট গ্রহণ শেষ হওয়ার পরপরই শুরু হবে ভোট গণনা।
 
ইসি সচিব আরও জানান, ত্রয়োদশ সংসদে বর্তমানে মোট ভোটার ৩৪৯ জন। ভোট গণনা শেষে কতজন ভোট দিয়েছেন, কতটি ব্যালট বৈধ বা বাতিল হয়েছে এবং কয়টি ব্যালট অব্যবহৃত রয়েছে তার হিসাব করা হবে। এরপর বৈধ ভোটের সংখ্যা গণনায় যিনি বেশি ভোট পাবেন, তাকে নির্বাচনকর্তা বিজয়ী ঘোষণা করবেন। পরবর্তীতে নির্বাচন কমিশনে গিয়ে চূড়ান্ত ফলাফলের গেজেট প্রকাশ করা হবে।
 
এদিকে সংবিধানের ৭০ অনুচ্ছেদের বৈধতা চ্যালেঞ্জ এবং ২০ আগস্টের নির্বাচন স্থগিত চেয়ে করা রিট আবেদন সরাসরি খারিজ করে দিয়েছেন হাইকোর্ট। বিচারপতি খিজির আহমেদ চৌধুরী ও বিচারপতি এ এফ এম সাইফুল করিমের সমন্বয়ে গঠিত হাইকোর্ট বেঞ্চ আজ মঙ্গলবার এ আদেশ দেন।
 
আদালত তার পর্যবেক্ষণে বলেন, রিট আবেদনটির কোনো সারবত্তা নেই। পাশাপাশি সংবিধানের ৭০ অনুচ্ছেদ সংশোধন বা পরিবর্তনের বিষয়টি সম্পূর্ণভাবে জাতীয় সংসদের এখতিয়ারভুক্ত।
 
আদালতে রাষ্ট্রপক্ষে শুনানি পরিচালনা করেন অ্যাটর্নি জেনারেল মো. রুহুল কুদ্দুস কাজল। তার সঙ্গে ছিলেন ডেপুটি অ্যাটর্নি জেনারেল মামুন চৌধুরী ও আখতার হোসেন মো. আব্দুল ওয়াহাব। অন্যদিকে রিটকারী আইনজীবী ইউনুছ আলী আকন্দ নিজেই নিজের পক্ষে শুনানি করেন। গত ১৩ আগস্ট তিনি জনস্বার্থে এই রিটটি করেছিলেন।
 
রিট আবেদনে ৭০ অনুচ্ছেদকে সংবিধানের সঙ্গে সাংঘর্ষিক ঘোষণা এবং ৬ আগস্ট ঘোষিত রাষ্ট্রপতি নির্বাচনের তফসিলকে কেন আইনগত কর্তৃত্ববহির্ভূত ঘোষণা করা হবে না, সে বিষয়ে রুল চাওয়া হয়েছিল। একই সঙ্গে বিচার চলাকালে তফসিলের ওপর স্থগিতাদেশ প্রার্থনা করা হয়।
 
আদেশের পর অ্যাটর্নি জেনারেল রুহুল কুদ্দুস কাজল সাংবাদিকদের জানান, রিটকারীর যুক্তি ছিল ৭০ অনুচ্ছেদের কারণে কোনো সংসদ সদস্য স্বাধীনভাবে মত বা ভোট দিতে পারেন না এবং রাষ্ট্রপতি নির্বাচনেও দলের সিদ্ধান্তের বাইরে গিয়ে ভোট দেওয়ার সুযোগ নেই। পাশাপাশি নির্বাচনের দ্রুততা নিয়েও প্রশ্ন তোলা হয়েছিল।
 
রাষ্ট্রপক্ষের আইনি যুক্তি তুলে ধরে অ্যাটর্নি জেনারেল বলেন, ১৯৭২ সালের মূল সংবিধানে থাকা ৭০ অনুচ্ছেদটি আজও বহাল রয়েছে। ১৯৯০-এর গণআন্দোলনের পর যখন সরকারব্যবস্থা প্রেসিডেন্টভিত্তিক থেকে সংসদীয় পদ্ধতিতে ফিরে আসে, তখন ১২তম সংশোধনীর ওপর গণভোট অনুষ্ঠিত হয়। সে সময় জনগণের মতামতের ভিত্তিতেই কিছুটা পরিবর্তিত আকারে ৭০ অনুচ্ছেদ অনুমোদিত হয়। পরবর্তীতে ১৫তম সংশোধনীর মাধ্যমে ১৯৭২ সালের মূল বিধানটি পুনঃপ্রতিষ্ঠিত হয়।
 
অ্যাটর্নি জেনারেল আরও যুক্ত দেখান, যে বিধানের পক্ষে দেশের জনগণ গণভোটে রায় দিয়েছেন এবং যা ৫৪ বছর ধরে সংবিধানে অক্ষুণ্ণ রয়েছে, তা নির্বাচনের ঠিক পূর্বে চ্যালেঞ্জ করে প্রতিকার পাওয়ার আইনি সুযোগ নেই। ১৯৯১ সালেও অনুরূপ একটি রায়ে হাইকোর্ট স্পষ্ট জানিয়েছিলেন যে ৭০ অনুচ্ছেদ সংবিধানের সঙ্গে কোনোভাবেই সাংঘর্ষিক নয়।
 
রাষ্ট্রপতি নির্বাচনের সময় জাতীয় সংসদের অধিবেশন চালুই থাকতে হবে—এমন কোনো বাধ্যবাধকতা নেই। আইন অনুযায়ী, অধিবেশন না থাকলে নির্বাচন কমিশন স্পিকারের সঙ্গে পরামর্শ করে ভোটের দিন নির্ধারণ করে এবং সেই দিনটির জন্য সংসদ সদস্যদের বিশেষ বৈঠক আহ্বান করা হয়। এই নির্বাচনে কোনো গোপন ব্যালট নয়, বরং সংসদ সদস্যদের প্রকাশ্য ভোটের মাধ্যমে রাষ্ট্রপতি নির্বাচিত হন। একজন এমপি একটিমাত্র ভোট দিতে পারেন।
 
স্বাধীনতার পর থেকে দেশে সরকারব্যবস্থার পরিবর্তনের কারণে একাধিকবার রাষ্ট্রপতি নির্বাচনের নিয়ম বদলেছে। ১৯৭২ সালের সংবিধানের দ্বিতীয় তফসিল অনুযায়ী সংসদ সদস্যদের গোপন ভোটে রাষ্ট্রপতি নির্বাচনের বিধান ছিল। পরবর্তীতে ৪র্থ সংশোধনীর মাধ্যমে প্রত্যক্ষ (জনগণের) ভোট এবং ১৯৯১ সালে ১২তম সংশোধনীর মাধ্যমে আবার পরোক্ষ (সংসদ সদস্যদের) ভোটের নিয়ম প্রবর্তিত হয়। সংবিধানের ৪৮ অনুচ্ছেদ অনুযায়ী বর্তমানে সংসদ সদস্যদের ভোটাধিকারেই রাষ্ট্রপতি নির্বাচিত হন।
 
ইতিহাস পর্যালোচনা করলে দেখা যায়, ১৯৭৪ সালের ২৭ জানুয়ারি প্রথমবারের মতো সংসদ সদস্যদের ভোটে মোহাম্মদ মুহম্মদউল্লাহ রাষ্ট্রপতি নির্বাচিত হলেও তখন কোনো প্রতিদ্বন্দ্বী বা ভোটাভুটি ছিল না। এর আগে ১৯৭১ থেকে ১৯৭৩ সময়কালে পর্যায়ক্রমে বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান ও আবু সাঈদ চৌধুরী রাষ্ট্রপতির দায়িত্ব পালন করেন।
 
১৯৭৫ সালের ২৫ জানুয়ারি সংবিধান সংশোধন করে বহুদলীয় সংসদীয় ব্যবস্থা বাতিল করা হলে বিনা ভোটে শেখ মুজিবুর রহমান রাষ্ট্রপতি হন। একই বছরের ১৫ আগস্ট তাকে সপরিবারে হত্যার পর ১৬ আগস্ট খন্দকার মোশতাক আহমদ এবং পরবর্তীতে ৬ নভেম্বর বিচারপতি আবু সাদাত মোহাম্মদ সায়েম রাষ্ট্রপতির দায়িত্ব নেন।
 
১৯৭৭ সালের ২১ এপ্রিল জিয়াউর রহমান রাষ্ট্রপতির দায়িত্ব গ্রহণ করেন। পরবর্তীতে ১৯৭৮ সালের ৩ জুন দেশে প্রথমবারের মতো সরাসরি জনগণের ভোটে রাষ্ট্রপতি নির্বাচন অনুষ্ঠিত হয়। সেই নির্বাচনে ৭৭.৬ শতাংশ ভোট পেয়ে জিয়াউর রহমান বিজয়ী হন; তাঁর প্রধান প্রতিদ্বন্দ্বী জেনারেল আতাউল গণি ওসমানী পান ২১.৭ শতাংশ ভোট।
 
১৯৮১ সালের ৩০ মে চট্টগ্রাম সার্কিট হাউজে জিয়াউর রহমান নিহত হলে অস্থায়ী রাষ্ট্রপতি হন বিচারপতি আব্দুস সাত্তার। ওই বছরের ১৫ নভেম্বর দ্বিতীয়বারের মতো সরাসরি জনগণের ভোটে রাষ্ট্রপতি নির্বাচন হলে ৬৫.৫ শতাংশ ভোট পেয়ে বিচারপতি আব্দুস সাত্তার নির্বাচিত হন। তার প্রতিদ্বন্দ্বী ড. কামাল হোসেন পান ২৬ শতাংশ ভোট।
 
বিচারপতি সাত্তারের মেয়াদকালে ১৯৮২ সালের ২৪ মার্চ তৎকালীন সেনাপ্রধান জেনারেল হুসেইন মুহম্মদ এরশাদ সামরিক শাসন জারি করেন। প্রথমে আবুল ফজল মোহাম্মদ আহসান উদ্দীন চৌধুরীকে বসানো হলেও ১৯৮৩ সালের ১১ ডিসেম্বর এরশাদ নিজেই রাষ্ট্রপতির পদ দখল করেন। ১৯৮৬ সালের ১৫ অক্টোবর দেশের তৃতীয় সরাসরি রাষ্ট্রপতি নির্বাচন অনুষ্ঠিত হয়। প্রধান রাজনৈতিক দল বিএনপি ও আওয়ামী লীগ তা বর্জন করায় এরশাদ বিনা প্রতিদ্বন্দ্বিতায় নির্বাচিত হন। ১৯৯০ সালের ৬ ডিসেম্বর গণঅভ্যুত্থানে এরশাদ পতনের পর অস্থায়ী রাষ্ট্রপতি হিসেবে দায়িত্ব নেন বিচারপতি সাহাবুদ্দীন আহমদ।
 
১৯৯১ সালের ৯ অক্টোবর সংবিধানের ১২তম সংশোধনীর মাধ্যমে আবারও সংসদীয় সরকারব্যবস্থা প্রবর্তিত হলে সংসদ সদস্যদের ভোটে রাষ্ট্রপতি নির্বাচনের ধারা ফিরে আসে। ওই বছরের ৮ অক্টোবর সংসদ সদস্যদের প্রত্যক্ষ প্রতিদ্বন্দ্বিতামূলক ভোটে আব্দুর রহমান বিশ্বাস (১৭২ ভোট) তার প্রতিদ্বন্দ্বী আওয়ামী লীগের বিচারপতি বদরুল হায়দার চৌধুরীকে (৯২ ভোট) পরাজিত করে রাষ্ট্রপতি নির্বাচিত হন।
 
১৯৯১ সালের ওই ঐতিহাসিক নির্বাচনের পর থেকে আজ পর্যন্ত রাষ্ট্রপতি পদে আর কোনো ভোটগ্রহণের প্রয়োজন পড়েনি। পরবর্তীতে বিচারপতি সাহাবুদ্দীন আহমদ, অধ্যাপক ডা. একিউএম বদরুদ্দোজা চৌধুরী, ব্যারিস্টার জমির উদ্দিন সরকার, অধ্যাপক ইয়াজউদ্দিন আহমেদ, জিল্লুর রহমান, আবদুল হামিদ ও মো. সাহাবুদ্দিন—সবাই বিনা প্রতিদ্বন্দ্বিতায় নির্বাচিত হয়েছেন।
 
ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদের ৩০০টি এলাকার আসনের মধ্যে বর্তমানে একটি আসনে প্রার্থিতা বাতিল রয়েছে। এর পাশাপাশি সংরক্ষিত নারী আসনের ৫০ জনসহ মোট সদস্যসংখ্যা ৩৪৯ জন। আইন অনুযায়ী এই ৩৪৯ জন সংসদ সদস্যই ২০ আগস্টের ভোটে অংশ নিতে পারবেন।
 
দলভিত্তিক সংসদ সদস্যদের পরিসংখ্যানে দেখা যায়, সংরক্ষিত আসনসহ বর্তমানে এককভাবে বিএনপির সংসদ সদস্য সংখ্যা ২৪৭ জন এবং জামায়াতে ইসলামীর সদস্য সংখ্যা ৭৭ জন। এছাড়া অন্যান্য দলের মধ্যে স্বতন্ত্র ৮ জন, এনসিপির ৮ জন, বাংলাদেশ খেলাফত মজলিশের ৩ জন এবং ইসলামী আন্দোলন বাংলাদেশ, বিজেপি, গণসংহতি আন্দোলন, গণপরিষদ, খেলাফত মজলিশ ও জাগপার ১ জন করে সংসদ সদস্য রয়েছেন।
 
বর্তমান সংসদে বিএনপির দুই-তৃতীয়াংশ একক সংখ্যাগরিষ্ঠতা থাকার কারণে দলীয় মনোনীত প্রার্থী বিজয়ী হওয়ার সম্ভাবনা নিশ্চিত। তবুও বিরোধী প্রার্থী থাকায় ফলাফলের আনুষ্ঠানিক ঘোষণার জন্য ২০ আগস্ট ভোট গণনা শেষ হওয়া পর্যন্ত অপেক্ষা করতে হচ্ছে।

source: The Dhaka Diary

Leave a Reply

Back to top button