News

রাষ্ট্রপতি বদরুদ্দোজা চৌধুরীকে কেন সরে যেতে হয়েছিল?

বাংলাদেশের রাজনৈতিক ইতিহাসে কিছু ঘটনা আছে, যেগুলো কেবল একটি সরকারের মেয়াদ বা একটি রাজনৈতিক দলের অভ্যন্তরীণ সংকটের গল্প নয়; বরং রাষ্ট্রের প্রতিষ্ঠান, দলীয় আনুগত্য এবং ক্ষমতার রাজনীতির সম্পর্ককে বুঝতে গুরুত্বপূর্ণ হয়ে ওঠে। ২০০২ সালের ২১ জুন রাষ্ট্রপতি অধ্যাপক এ. কিউ. এম. বদরুদ্দোজা চৌধুরীর পদত্যাগ তেমনই একটি ঘটনা। রাষ্ট্রপতি হিসেবে তাঁর পাঁচ বছরের মেয়াদ হওয়ার কথা ছিল, অথচ বঙ্গভবনে তাঁর অবস্থান স্থায়ী হয়েছিল মাত্র সাত মাসের কিছু বেশি সময়।

ঘটনার শুরু আরও অনেক আগে। চিকিৎসক হিসেবে বি. চৌধুরী ছিলেন সুপরিচিত ও জনপ্রিয়। বাংলাদেশ টেলিভিশনের ‘আপনার ডাক্তার’ অনুষ্ঠানের উপস্থাপক হিসেবে সাধারণ মানুষের কাছেও তাঁর পরিচিতি ছিল ব্যাপক। ১৯৭৮ সালে জিয়াউর রহমানের আহ্বানে তিনি সক্রিয় রাজনীতিতে প্রবেশ করেন এবং বিএনপির প্রতিষ্ঠাতা মহাসচিব হন। পরবর্তী সময়ে জিয়া সরকারের উপপ্রধানমন্ত্রী এবং খালেদা জিয়ার সরকারে শিক্ষামন্ত্রী ও পররাষ্ট্রমন্ত্রীসহ গুরুত্বপূর্ণ দায়িত্ব পালন করেন।

২০০১ সালের নির্বাচনে বিএনপি নেতৃত্বাধীন চারদলীয় জোট ক্ষমতায় আসার পর তিনি প্রথমে পররাষ্ট্রমন্ত্রী হন। এরপর ১৪ নভেম্বর ২০০১ তিনি রাষ্ট্রপতি নির্বাচিত হন এবং রাষ্ট্রপতির দায়িত্ব গ্রহণের আগে বিএনপির দলীয় পদ থেকে সরে দাঁড়ান।

এখানেই তৈরি হয় মূল দ্বন্দ্বের বীজ।

রাষ্ট্রপতি হওয়ার পর বি. চৌধুরী নিজেকে দলীয় রাজনীতির সরাসরি অংশ হিসেবে না রেখে রাষ্ট্রের সাংবিধানিক পদটির মর্যাদা অনুযায়ী তুলনামূলক নিরপেক্ষ অবস্থান গ্রহণের চেষ্টা করেন। পরবর্তী গবেষণামূলক বিশ্লেষণেও এই বিষয়টি গুরুত্ব পেয়েছে। *Asian Survey*-এর ২০০৩ সালের এক পর্যালোচনায় বলা হয়, বিএনপির প্রতিষ্ঠাতা জিয়াউর রহমানের স্মৃতির প্রতি যথেষ্ট সম্মান দেখাননি—এই অভিযোগের পাশাপাশি বি. চৌধুরী দলীয় রাজনীতির ঊর্ধ্বে ওঠার চেষ্টা করায় জিয়া-অনুগতদের বিরাগভাজন হয়েছিলেন।

বিস্ফোরণ ঘটে ২০০২ সালের ৩০ মে। সেদিন ছিল জিয়াউর রহমানের মৃত্যুবার্ষিকী। বি. চৌধুরী জিয়ার মাজারে গিয়ে শ্রদ্ধা নিবেদন করেননি। বিষয়টি বিএনপির অভ্যন্তরে ব্যাপক ক্ষোভের জন্ম দেয়। একই সময়ে তাঁর দেওয়া একটি বাণীতে জিয়াউর রহমানের ভূমিকার উল্লেখ থাকলেও তাঁকে ‘স্বাধীনতার ঘোষক’ হিসেবে উল্লেখ না করার বিষয়টিও দলীয় মহলে অসন্তোষ সৃষ্টি করে। সমসাময়িক সংবাদ প্রতিবেদনে মাজারে না যাওয়ার বিষয়টিকেই বিএনপির অভিযোগের অন্যতম প্রধান কারণ হিসেবে তুলে ধরা হয়েছিল।

তবে এখানেই প্রশ্ন আসে—একজন রাষ্ট্রপতি কি কেবল দলীয় প্রত্যাশা পূরণের জন্য কোনো রাজনৈতিক নেতার মাজারে যাবেন? নাকি তিনি রাষ্ট্রের সর্বোচ্চ সাংবিধানিক পদে থেকে নিজের বিবেচনায় কর্মসূচি নির্ধারণ করতে পারেন?

এই প্রশ্নটির উত্তরই সম্ভবত তখনকার রাজনৈতিক সংঘাতের গভীরে ছিল।

বিএনপির সংসদীয় দলের কাছে বি. চৌধুরীর আচরণ ক্রমশ ‘দলবিরোধী’ বলে মনে হতে থাকে। ১৯ ও ২০ জুন সংসদীয় দলের বৈঠকে তাঁর ওপর অনাস্থা প্রকাশের সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়। ২১ জুন সংসদে আনুষ্ঠানিক অভিশংসন প্রক্রিয়া এগিয়ে নেওয়ার আগেই তিনি পদত্যাগ করেন। সমসাময়িক প্রতিবেদনে বলা হয়, বিএনপির সংসদীয় দল তাঁর ওপর আস্থা হারিয়েছে এবং তাঁকে পদত্যাগের জন্য চাপ দেওয়া হয়েছিল।

অর্থাৎ বি. চৌধুরীকে আনুষ্ঠানিকভাবে অভিশংসিত করা হয়নি; অভিশংসনের উদ্যোগ ও রাজনৈতিক চাপের মুখে তিনি নিজেই পদত্যাগ করেন। এই পার্থক্যটি গুরুত্বপূর্ণ।

তাঁর পদত্যাগকে কেন্দ্র করে তখন রাজনৈতিক মহলে নানা ব্যাখ্যাও ছড়িয়ে পড়ে। বিশেষ করে বি. চৌধুরীর ছেলে মাহী বি. চৌধুরী এবং তৎকালীন ক্ষমতাসীন রাজনৈতিক পরিবারের আরেক প্রভাবশালী উত্তরসূরিকে ঘিরে ক্ষমতার অভ্যন্তরীণ সমীকরণের কথাও বিভিন্ন মহলে আলোচিত হয়েছিল। তবে এসব দাবির সবকিছুর সমান নির্ভরযোগ্য প্রামাণ্য ভিত্তি নেই। তাই এগুলোকে প্রতিষ্ঠিত কারণ হিসেবে না দেখে তৎকালীন রাজনৈতিক পটভূমির আলোচিত ব্যাখ্যা হিসেবে দেখা বেশি যুক্তিসঙ্গত।

আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো, বি. চৌধুরী শেষ পর্যন্ত বিএনপির রাজনীতিতেও ফিরে যাননি। ২০০৪ সালের ৮ মে তিনি মাহী বি. চৌধুরী ও অন্য সহযোগীদের নিয়ে বিকল্পধারা বাংলাদেশ গঠন করেন।

তাহলে শেষ পর্যন্ত প্রশ্নটির উত্তর কী?

বি. চৌধুরী কেন সরে যেতে বাধ্য হয়েছিলেন?

সংক্ষিপ্ত উত্তর হলো—জিয়ার মাজারে না যাওয়াটি ছিল তাৎক্ষণিক রাজনৈতিক বিস্ফোরণের দৃশ্যমান কারণ; কিন্তু গভীরতর কারণ ছিল রাষ্ট্রপতির নিরপেক্ষ সাংবিধানিক ভূমিকা বনাম ক্ষমতাসীন দলের দলীয় আনুগত্যের প্রত্যাশার সংঘাত।

তিনি বিএনপির প্রতিষ্ঠাতা মহাসচিব ছিলেন, জিয়াউর রহমানের ঘনিষ্ঠ রাজনৈতিক সহযোগী ছিলেন এবং বিএনপির মনোনয়নেই রাষ্ট্রপতি হয়েছিলেন। কিন্তু রাষ্ট্রপতি হওয়ার পর তিনি দলীয় পরিচয়ের ঊর্ধ্বে উঠে একটি রাষ্ট্রীয় ভূমিকা পালন করতে চেয়েছিলেন। অন্যদিকে ক্ষমতাসীন বিএনপির একটি বড় অংশ রাষ্ট্রপতির কাছ থেকে দলীয় আনুগত্য ও রাজনৈতিক প্রতীকের প্রতি দৃশ্যমান শ্রদ্ধা প্রত্যাশা করেছিল। দুই অবস্থানের সংঘাত শেষ পর্যন্ত এমন পর্যায়ে পৌঁছায়, যেখানে রাষ্ট্রপতির পদটিই হয়ে ওঠে রাজনৈতিক সংঘর্ষের কেন্দ্রবিন্দু।

বি. চৌধুরীর বিদায় তাই বাংলাদেশের রাজনৈতিক ইতিহাসে একটি গভীর প্রশ্ন রেখে গেছে—রাষ্ট্রপতি কি কোনো দলের নির্বাচিত প্রতিনিধি, নাকি তিনি একবার রাষ্ট্রপতির আসনে বসার পর দলীয় আনুগত্যের ঊর্ধ্বে উঠে রাষ্ট্রের সাংবিধানিক অভিভাবক?

২০০২ সালের সেই ঘটনা হয়তো আজও এই প্রশ্নটির সবচেয়ে তাৎপর্যপূর্ণ রাজনৈতিক উদাহরণগুলোর একটি। কারণ রাষ্ট্রের প্রতিষ্ঠান যতক্ষণ দলীয় আনুগত্যের মাপকাঠিতে বিচার করা হবে, ততক্ষণ ব্যক্তি বদলালেও সেই দ্বন্দ্বের অবসান ঘটবে না। আর বি. চৌধুরীর সাত মাস সাত দিনের রাষ্ট্রপতিত্ব সেই দ্বন্দ্বের ইতিহাসে এক দীর্ঘস্থায়ী রাজনৈতিক উপাখ্যান হয়ে আছে।

source: Azadir Dak

Leave a Reply

Back to top button