News

রোহিঙ্গা সংকট পুরো অঞ্চলের জন্য নিরাপত্তা চ্যালেঞ্জ: প্রধানমন্ত্রী

একটি দেশে দীর্ঘদিন অমীমাংসিত থেকে যাওয়া সংকট পুরো অঞ্চলের জন্য নিরাপত্তাজনিত চ্যালেঞ্জে পরিণত হতে পারে বলে সতর্ক করেছেন প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান। তিনি বলেছেন, নয় বছরেরও বেশি সময় ধরে ১২ লাখের বেশি রোহিঙ্গাকে আশ্রয় দেওয়ায় বাংলাদেশের ওপর সামাজিক, অর্থনৈতিক, পরিবেশগত ও নিরাপত্তাজনিত চাপ এখন বিপুল। মানবপাচার, মাদকপাচার, অবৈধ অভিবাসী পাচারসহ আন্তঃদেশীয় অপরাধের ঝুঁকিও বাড়ছে। তাই শুধু মানবিক সহায়তা নয়, রোহিঙ্গা সংকটের মূল কারণ সমাধানে এখনই কার্যকর আন্তর্জাতিক উদ্যোগ প্রয়োজন।

বুধবার নিউইয়র্কে জাতিসংঘ সাধারণ পরিষদের ৮১তম অধিবেশনের সাইডলাইনে ‘দ্য রোহিঙ্গা ক্রাইসিস: এ রিনিউড কল ফর এ ডিউরেবল সলিউশন ফ্রম প্রোট্র্যাক্টেড ডিসপ্লেসমেন্ট, উইথ জাস্টিস অ্যান্ড অ্যাকাউন্ট্যাবিলিটি’ শীর্ষক উচ্চপর্যায়ের সাইড ইভেন্টে বক্তব্যে প্রধানমন্ত্রী এসব কথা বলেন। বাংলাদেশ ও গাম্বিয়ার যৌথ আয়োজনে অনুষ্ঠিত এ অনুষ্ঠানে জাতিসংঘের বিভিন্ন সংস্থা, সংশ্লিষ্ট দেশ ও আন্তর্জাতিক সম্প্রদায়ের প্রতিনিধিরা অংশ নেন।

তারেক রহমান বলেন, দীর্ঘ কয়েক দশক ধরে মিয়ানমারে রোহিঙ্গারা বৈষম্য, নিপীড়ন ও বঞ্চনার শিকার হয়ে আসছে। ১৯৭৮ সালে এবং পরবর্তী সময়ে ১৯৮০-এর দশকজুড়ে বাংলাদেশ রোহিঙ্গাদের কয়েকটি বড় দফার আগমন প্রত্যক্ষ করেছে। শহীদ রাষ্ট্রপতি জিয়াউর রহমান এবং পরবর্তীকালে প্রয়াত প্রধানমন্ত্রী বেগম খালেদা জিয়ার নেতৃত্বাধীন সরকারগুলোর সময়ে রোহিঙ্গাদের সফলভাবে প্রত্যাবাসনের ব্যবস্থা করা হয়েছিল। কিন্তু ২০১৭ সালে মিয়ানমারে সহিংসতার পর সংকট আরও গভীর হয়।

প্রধানমন্ত্রী বলেন, মানবিকতার তাগিদে বাংলাদেশ সীমান্ত খুলে দিয়েছিল। বর্তমানে ১২ লাখের বেশি রোহিঙ্গা বাংলাদেশে আশ্রয়ে রয়েছে। দুঃখজনকভাবে মিয়ানমারে সহিংসতার কারণে মানুষ এখনো পালিয়ে আসছে। শিবিরগুলোতে প্রতিবছর হাজার হাজার শিশুর জন্ম হচ্ছে। ফলে দীর্ঘস্থায়ী বাস্তুচ্যুতির সঙ্গে যুক্ত হচ্ছে নতুন প্রজন্ম। মায়েরা নিরাপদ ভবিষ্যতের স্বপ্ন দেখছেন, তরুণরা অনিশ্চয়তার মধ্যে বেড়ে উঠছে এবং প্রবীণরা ফেলে আসা ঘরবাড়িতে ফেরার আকাঙ্ক্ষা পোষণ করছেন।

বাংলাদেশ রোহিঙ্গাদের খাদ্য ও স্বাস্থ্যসেবা দেওয়ার পাশাপাশি প্রায় ৬ হাজার লার্নিং সেন্টারের মাধ্যমে মিয়ানমারের পাঠ্যক্রমভিত্তিক শিক্ষা দিচ্ছে। তরুণদের দক্ষতা উন্নয়ন ও সক্ষমতা বৃদ্ধির প্রশিক্ষণও দেওয়া হচ্ছে, যাতে ভবিষ্যতে রাখাইন রাজ্যে তাদের পুনঃএকীভূত হওয়ার সুযোগ তৈরি হয়। তবে দীর্ঘমেয়াদি বসবাসের জন্য শিবিরগুলো কোনো আদর্শ স্থান নয় বলে উল্লেখ করেন প্রধানমন্ত্রী।

বাড়ছে নিরাপত্তাঝুঁকি

দীর্ঘস্থায়ী অনিশ্চয়তা ও হতাশা নতুন নিরাপত্তাঝুঁকি তৈরি করছে উল্লেখ করে তারেক রহমান বলেন, মানবপাচার, অবৈধ অভিবাসী পাচার, মাদকপাচার ও অন্যান্য আন্তঃদেশীয় অপরাধ বাড়ছে। কেউ কেউ জীবনের ঝুঁকি নিয়ে নৌকায় মালয়েশিয়ার উদ্দেশে পাড়ি দিচ্ছেন। একটি দেশে অমীমাংসিত থাকা সংকট পুরো অঞ্চলের জন্য নিরাপত্তাজনিত চ্যালেঞ্জে পরিণত হতে পারে।

তিনি বলেন, প্রয়োজন বাড়লেও মানবিক সহায়তার জীবনরেখা সংকুচিত হচ্ছে। ২০২৫ সালের যৌথ সাড়াদান পরিকল্পনায় ৯৩৪ মিলিয়ন মার্কিন ডলারের বেশি সহায়তার আবেদন করা হয়েছিল। ২০২৬ সালে তা কমিয়ে প্রায় ৭১০ মিলিয়ন ডলারে নামিয়ে আনা হয়েছে, যা কেবল ন্যূনতম জীবনরক্ষাকারী প্রয়োজন মেটানোর জন্য। এই প্রবণতা অব্যাহত থাকতে পারে না।

বাংলাদেশের পাশে থাকা আন্তর্জাতিক অংশীদারদের প্রতি কৃতজ্ঞতা জানিয়ে প্রধানমন্ত্রী বলেন, এখন আগের যেকোনো সময়ের চেয়ে আন্তর্জাতিক সহায়তা বেশি প্রয়োজন। তবে মানবিক সহায়তার উদারতা রাজনৈতিক নিষ্ক্রিয়তার অজুহাত হতে পারে না। একইভাবে অনির্দিষ্টকাল ধরে এই দায়িত্ব শুধু বাংলাদেশের ওপর চাপিয়ে দেওয়া যায় না।

সংকটের সমাধান মিয়ানমারেই

প্রধানমন্ত্রী বলেন, রোহিঙ্গা সংকটের উৎপত্তি মিয়ানমারে এবং এর সমাধানও মিয়ানমারেই নিহিত। রাখাইন রাজ্যের পরিস্থিতি এখনো গভীরভাবে উদ্বেগজনক। রোহিঙ্গারা জোরপূর্বক নিয়োগ, নির্বিচারে আটক, চলাচলে বিধিনিষেধ, জোরপূর্বক শ্রম ও অন্যান্য গুরুতর লঙ্ঘনের শিকার হচ্ছে। মিয়ানমারের সামরিক বাহিনী এবং আরাকান আর্মি—উভয়ের বিরুদ্ধেই গুরুতর লঙ্ঘনের অভিযোগের তথ্য পাওয়া গেছে। ফলে নিরাপদ ও মর্যাদাপূর্ণ প্রত্যাবাসনের উপযোগী পরিস্থিতি এখনো তৈরি হয়নি।

পাঁচ দফা প্রস্তাব

রোহিঙ্গা সংকটের টেকসই সমাধানে প্রধানমন্ত্রী পাঁচটি জরুরি পদক্ষেপের প্রস্তাব দেন। প্রথমত, দ্রুত, নিরাপদ, স্বেচ্ছামূলক, মর্যাদাপূর্ণ ও টেকসই প্রত্যাবাসনের জন্য আন্তর্জাতিক ও আঞ্চলিক অংশীজনদের একটি বিশ্বাসযোগ্য রোডম্যাপ প্রণয়ন করতে হবে।

দ্বিতীয়ত, রোহিঙ্গাসহ মিয়ানমারের বেসামরিক জনগণের ওপর সহিংসতা বন্ধ এবং রোহিঙ্গাদের নিজভূমিতে মৌলিক অধিকার ও নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে হবে। তৃতীয়ত, রোহিঙ্গা ও আশ্রয়দাতা স্থানীয় জনগোষ্ঠীর জন্য পর্যাপ্ত ও পূর্বানুমেয় মানবিক সহায়তা নিশ্চিত করতে হবে।

চতুর্থত, টেকসই প্রত্যাবাসনের জন্য ন্যায়বিচার ও জবাবদিহি নিশ্চিত করতে হবে। আন্তর্জাতিক বিচার আদালতে জবাবদিহি প্রতিষ্ঠায় গাম্বিয়ার নেতৃত্বের প্রতি কৃতজ্ঞতা জানিয়ে আন্তর্জাতিক অপরাধ আদালতসহ আন্তর্জাতিক বিচার ও তদন্তব্যবস্থাকে অব্যাহত সহায়তার আহ্বান জানান তিনি। গুরুতর অপরাধের জন্য দায়ীদের জবাবদিহির আওতায় আনার ওপরও গুরুত্ব দেন প্রধানমন্ত্রী।

পঞ্চমত, মাদকভিত্তিক অর্থনীতি, মানবপাচার, ডিজিটাল প্রতারণা, অবৈধ অস্ত্রসহ আন্তঃসীমান্ত অপরাধ মোকাবিলায় আঞ্চলিক ও আন্তর্জাতিক সহযোগিতা জোরদার করতে হবে।

প্রধানমন্ত্রী বলেন, বাংলাদেশ চায় না রোহিঙ্গারা চিরকাল বাস্তুচ্যুত অবস্থায় থাকুক। তারা যেন নিরাপদে, স্বেচ্ছায়, মর্যাদার সঙ্গে এবং অধিকার সুরক্ষিত রেখে মিয়ানমারে নিজ ঘরে ফিরতে পারে, সেটিই বাংলাদেশের প্রত্যাশা। প্রয়োজনীয় পরিস্থিতি সৃষ্টি হলে বাংলাদেশ প্রত্যাবাসনে সহায়তা করতে প্রস্তুত।

তিনি বলেন, রোহিঙ্গাদের ভাগ্য যেন নিপীড়ন, বিতাড়ন ও বাস্তুচ্যুতির আরেকটি গল্প না হয়ে ন্যায়বিচার, মর্যাদা ও আশার গল্প হয়ে ওঠে। আর সেই গল্পের সূচনা এখনই হতে হবে।

source: Daily Amar Desh

Leave a Reply

Back to top button