News

মেজর জাহিদের স্ত্রীকে আয়নাঘরে নিপীড়নের বিভীষিকা

পিলখানায় সেনা কর্মকর্তাদের হত্যাকাণ্ডের নেপথ্য সত্য জেনে ফেলাই কাল হয়েছিল সেনা কর্মকর্তা মেজর জাহিদুল ইসলামের। ফ্যাসিস্ট শেখ হাসিনার আমলে ২০১৬ সালের ২ সেপ্টেম্বর রাতে সাজানো বন্দুকযুদ্ধে তাকে হত্যা করা হয়। এরপর আড়াই বছর ঢাকা মেডিকেল কলেজ হাসপাতাল মর্গে পড়েছিল তার লাশ। স্বজনরা কাছে থেকেও জানতে পারেননি তার শেষ ঠিকানা কোথায়।

মেজর জাহিদকে (পরবর্তীতে মরণোত্তর বিগ্রেডিয়ার জেনারেল পদে উন্নীত) তুলে নেওয়ার রাতেই তার স্ত্রী জেবুন্নাহার শিলাকে কোলের শিশুসহ ধরে নিয়ে যাওয়া হয় ঢাকা মহানগর গোয়েন্দা পুলিশের (ডিবি) সেলে। পোকায় ভরা নোংরা ঘরে আট মাসের শিশুকে নিয়ে টানা দুদিন-দুরাত চেয়ারে বসেই কাটাতে বাধ্য করা হয় তাকে। তিনি চাদর টাঙিয়ে আড়াল করে নামাজে দাঁড়ালে সে চাদরও ফেলে দেওয়া হতো। আর তার ছয় বছরের শিশুকন্যাকে গণমাধ্যমের সামনে দাঁড় করিয়ে সাজানো হয়েছিল জঙ্গি নাটক।

গত ২০ সেপ্টেম্বর ঢাকা সেনানিবাসের একটি বাসভবনে কথা হয় সম্প্রতি মরণোত্তর ব্রিগেডিয়ার জেনারেল হিসেবে পদোন্নতিপ্রাপ্ত শহীদ জাহিদের স্ত্রী জেবুন্নাহারের সঙ্গে। সাক্ষাৎকারে তিনি স্বামীর নিষ্ঠুর হত্যাকাণ্ড, ডিবি সেলের ভেতরে অবর্ণনীয় কষ্ট আর দীর্ঘ আট বছর ধরে ‘জঙ্গি’ তকমা নিয়ে তার ওপর বয়ে যাওয়া ভয়ংকর ও নির্মম অতীতের দিনগুলোর কথা বর্ণনা করেন ‘আমার দেশ’-এর কাছে।

জাহিদ বিএমএ লং কোর্সে তৃতীয় স্থান অর্জন করে ‘ড. মুহম্মদ শহীদুল্লাহ গোল্ড মেডেল’ লাভ করেছিলেন। সিলেটের ৫২ পদাতিক ব্রিগেডের বিএম (ব্রিগেড মেজর) হিসেবে প্রায় তিন বছর, স্কুল অব ইনফ্যান্ট্রি অ্যান্ড ট্যাকটিকসে (ট্যাকটিকস উইং) প্রায় তিন বছর এবং খাগড়াছড়ির ২০৩ ব্রিগেডে জিএসও-৩ হিসেবে প্রায় দুই বছর দায়িত্ব পালন করেন।

জেবুন্নাহার জানান, তার স্বামীর জীবনের অন্ধকার নেমে আসে ২০০৯ সালের ২৫ ও ২৬ ফেব্রুয়ারি তৎকালীন বিডিআর সদরদপ্তর পিলখানা ট্র্যাজেডির ঘটনায়। পিলখানা থেকে তার কোর্সমেট ও বন্ধু শহীদ ক্যাপ্টেন মোহাম্মদ মাজহারুল হায়দার তাকে ফোন করে জানান, বিডিআরের পোশাকে হিন্দুভাষী কিছু অপরিচিত লোক অফিসারদের হত্যা করছে। সে সময় বগুড়া ক্যান্টনমেন্টে অবস্থানরত জাহিদ এ তথ্য ঊর্ধ্বতন কর্তৃপক্ষকে জানান।

এরপর থেকেই তাকে গোয়েন্দা নজরদারিতে রাখা হয়। এছাড়া দাঁড়ি রাখায় এবং নিয়মিত মসজিদে নামাজ পড়ায় তাকে মানসিক নির্যাতনসহ বিভিন্নভাবে হেনস্তা করা হতো। এমন পরিস্থিতিতে তিনি ২০১৫ সালের ২৮ জুলাই স্বেচ্ছায় চাকরি থেকে অবসর নেন। অবসরের পর মিরপুরের রূপনগরের একটি ভাড়া বাসায় বসবাসকালে ২০১৬ সালের ২ সেপ্টেম্বর রাতে সিটিটিসি ইউনিট বন্দুকযুদ্ধ সাজিয়ে তাকে হত্যা করে।

২০২৪ সালের ৫ আগস্ট ছাত্র-জনতার অভ্যুত্থানের পর প্রকৃত সত্য বেরিয়ে আসে। রূপনগরের সে ফ্ল্যাটে কোনো বন্দুকযুদ্ধই হয়নি। মেজর জাহিদের দুই হাত পেছনে শক্ত করে বেঁধে অত্যন্ত কাছ থেকে বুক ঝাঁঝরা করে দেওয়া হয়েছিল। হত্যার আগে তার দুই হাত মুচড়ে ভেঙে ফেলা হয়েছিল। ফলে হাত দুটি শুধু চামড়া ও পেশির সাহায্যে শরীরে ঝুলে ছিল। তার মুখমণ্ডল পৈশাচিক আঘাতে কালচে লাল এবং চোখ কোটর থেকে ঠিকরে বেরিয়ে এসেছিল, যা অতিরিক্ত টর্চার কিংবা শ্বাসরোধ করে হত্যার স্পষ্ট আলামত। হত্যার পর তার লাশ পরিবারের কাছে হস্তান্তর না করে ঢাকা মেডিকেল মর্গে আড়াই বছর ফেলে রাখা হয়। পরে আঞ্জুমান মফিদুল ইসলামের মাধ্যমে বেওয়ারিশ হিসেবে জুরাইন কবরস্থানে দাফন করা হয়।

ডিবির আয়নাঘরে শিশুসহ জাহিদের স্ত্রী

জেবুন্নাহার বলেন, ২০১৬ সালের ২ সেপ্টেম্বর সাদা পোশাকের লোকেরা আসে আমাদের বাসায়। তারা আমার স্বামীকে বলে, ‘আমরা আপনার সঙ্গে একটু কথা বলতে চাই, আমাদের অফিসে যেতে হবে, একটু জিজ্ঞাসাবাদ করব। ম্যাডামও যাবেন, আপনারা সবাই যাবেন। তাদের সঙ্গে তিনজন নারী পুলিশও ছিল। তারা আমাকে গাড়িতে তুলে বলে, স্যার পেছনের গাড়িতে আসছেন। আমাকে এমন এক জায়গায় নিয়ে যাওয়া হয়, যেখানে একটি সোফা ও একটি রুমের মতো ঘর ছিল। পরে জানতে পেরেছিলাম, সেটি ছিল ডিবির কার্যালয়।’

জানা গেছে, মেজর জাহিদকে তুলে নেওয়ার সে রাতে তার স্ত্রী জেবুন্নাহার ও দুই শিশুসন্তানকে ডিবির ‘আয়নাঘরে’ নেওয়া হয়েছিল। সেখানে চার মাস সাতদিন তাদের গুম করে রাখা হয়েছিল। ডিবির সে কার্যালয়ে ডিসেম্বরের পুরো মাসটাই তাকে কাটাতে হয় একটি রুমের মতো জায়গায়। সেখানে মায়ের সঙ্গে আট মাস বয়সি দুগ্ধপোষ্য শিশু এবং ছয় বছরের কন্যাও ছিল। সেলটি ছিল অত্যন্ত নোংরা এবং এতে পোকামাকড় থাকায় ছোট বাচ্চাটিকে অধিকাংশ সময়ই কোলে রাখতে হতো।

হোলি আর্টিজান হামলার সঙ্গে স্বামীর সম্পৃক্ততা নিয়ে জেবুন্নাহারকে জিজ্ঞাসাবাদ করা হয়। ওই সময় তাকে দুদফায় সাতদিন রিমান্ডে নেওয়া হয়। রিমান্ডের প্রথম দুদিন ও দুরাত তার একটানা কাটে চেয়ারে বসা অবস্থায়, ছোট বাচ্চাকে রাখতে হয়েছিল টেবিলের ওপর। টানা চেয়ারে বসে থাকা এবং বাচ্চার খাবার ও ডায়াপারের তীব্র সংকটে তার চরম কষ্ট হয়।

বন্দিশালার ছোট্ট রুমটিতে শীতে প্রচণ্ড ঠান্ডায় জমে যাওয়ার উপক্রম হতো। তিনি যখন চাদর দিয়ে নিজেকে ঢেকে নামাজ পড়তে দাঁড়াতেন, তখন ডিবির লোকজন এসে সে চাদর ফেলে দিয়ে বলত, ‘আপনারা চাদর দিয়ে ঢাকেন কেন? আপনাদের ক্যামেরায় দেখা যায় না।’ তারা পর্দা করাকে নাটক ও ভান বলে উপহাস করত এবং তাচ্ছিল্য করে বলতÑ‘এরা সবাই শয়তান’।

ডিবি সেলে লাগাতার মানসিক চাপ তৈরি করে বলা হতো, ‘স্বামীকে জঙ্গি হিসেবে স্বীকার না করলে তাকে এবং দুই শিশুকন্যাকেও স্বামীর মতো একই পরিণতি ভোগ করতে হবে।’

অবুঝ শিশুদের সঙ্গে নির্মমতা

জেবুন্নাহার বলেন, ‘গুমের এক সপ্তাহ পর আমার ছয় বছর বয়সি বড় মেয়েকে কেড়ে নেওয়া হয়। আমাকে বলা হয়, নানু-দাদু দেখতে চাচ্ছে, কিছুক্ষণের জন্য নিয়ে যাচ্ছি। এরপর ২০১৬ সালের ১০ সেপ্টেম্বর আজিমপুরে আরেকটি সাজানো নাটক মঞ্চস্থ করা হয়। পুলিশ দাবি করে, একটি জঙ্গি আস্তানা থেকে তিনজনকে আটক করা হয়। আমার শিশুসন্তানকেও যুক্ত করে ঢালাওভাবে প্রচার করা হয়, ছোট্ট মেয়েটিও এ কর্মকাণ্ডের সঙ্গে জড়িত!’

তিনি বলেন, ‘তারা আমার ছয় বছরের কন্যাকে তুলে নিয়ে সংবাদ সম্মেলন করেছিল। বিভিন্ন দিক থেকে ক্যামেরা দিয়ে তার ছবি ও কথা রেকর্ড করা হয়। এতটুকু একটি অবুঝ শিশুর জন্য সে পরিবেশ ছিল চরম অস্বস্তিকর ও আতঙ্কজনক। আজও যেকোনো গণমাধ্যম দেখলে আমার দুই শিশুসন্তান চরম নার্ভাস হয়ে পড়ে এবং আতঙ্ক বোধ করে।’

কারাগারে ছয় বছর, বিপর্যস্ত পরিবার জেবুন্নাহার বলেন, ‘২০১৬ সালের ২৪ ডিসেম্বর আরেকটি জঙ্গি নাটক সাজিয়ে আশকোনার একটি বাসা থেকে আমাকে এবং আমার আট মাসের শিশুকন্যাকে গ্রেপ্তার দেখানো হয়। ডিবি কার্যালয়ে ১৬ দিন রিমান্ডের নামে নির্যাতনের পর পাঠানো হয় কারাগারে।’

সেখান থেকে শুরু হয় দীর্ঘ ছয় বছরের অবর্ণনীয় ও বিভীষিকাময় কারাজীবন। কারাগারে পৌঁছানোর পর প্রথম রাত সাধারণ হাজতিদের সঙ্গে রাখা হলেও পরে নিয়ে যাওয়া হয় ফাঁসির আসামিদের জন্য নির্ধারিত আলাদা সেল বা বাউন্ডারিতে।

তিনি আরো বলেন, কারাগারের খাবার-দাবার ও সামগ্রিক পরিবেশ ছিল অত্যন্ত জঘন্য। ছোট বাচ্চার জন্য একটা মশারি পর্যন্ত ভেতরে ঢুকতে দেওয়া হয়নি। মশার কামড় থেকে শিশুকে রক্ষার জন্য নিজেদের ওড়না দিয়ে নিজেদের মতো করে মশারি বানিয়েছিলেন। কিন্তু কর্তৃপক্ষ সে ওড়নাগুলোও কেড়ে নিয়ে পুড়িয়ে দেয়। কর্মীরা তাদের সঙ্গে এমন নিষ্ঠুর ও পৈশাচিক আচরণ করত, যেন তারা পৃথিবীর নিকৃষ্টতম মানুষ।

২০২৪ সালের ৫ আগস্টের ছাত্র-জনতার অভ্যুত্থানের পর তিনি মুক্তি পান। তার বিরুদ্ধে দুটি মামলা দায়ের করা হয়। একটি মামলায় তাকে বেকসুর খালাস দেওয়া হয়। এখনো আরেকটি মামলার বোঝা বয়ে বেড়াচ্ছেন তিনি।

জেবুন্নাহার আরো বলেন, স্বামীর শেষ ঠিকানার খোঁজ করতে গিয়েও সইতে হয়েছে অন্তহীন যন্ত্রণা। স্বামীর কবর জুরাইনে দেওয়া হয়েছে বলে তারা শুনেছেন। কিন্তু আঞ্জুমান মফিদুলের কেউ তা শনাক্ত করতে পারেননি। আজও তারা জানেন না, তাদের ভালোবাসার মানুষটির শেষ ঠিকানা কোথায়।

২০২৪ সালের ডিসেম্বরে তৎকালীন আইন উপদেষ্টা ড. আসিফ নজরুল এবং ঢাকা জেলা প্রশাসকের কাছে লিখিত আবেদন করেন তারা। পাশাপাশি আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনালে চিফ প্রসিকিউটরের কাছেও একটি আবেদন করা হয়, যেখানে তৎকালীন আইজিপি শহীদুল হক, ডিবিপ্রধান মনিরুল ইসলাম, সিটিটিসিপ্রধান আসাদুজ্জামান, ডিসি মোহাম্মদ মাসুদ আহমেদ, ওসি শহীদ আলম ও ডিসি (ডিবি) কৃষ্ণপদ রায়সহ সংশ্লিষ্টদের যেন মানবতাবিরোধী অপরাধের জন্য অভিযুক্ত করা হয়।

source: Daily Amar Desh

Leave a Reply

Back to top button