ভারত–যুক্তরাষ্ট্রের সম্পর্কে আস্থার ফাটল, নতুন সমীকরণে চীন

ভারত ও যুক্তরাষ্ট্রের মধ্যে সাম্প্রতিক বিরোধকে দ্বিপক্ষীয় সম্পর্কের সমাপ্তি হিসেবে দেখার যথেষ্ট কারণ নেই। প্রতিরক্ষা সহযোগিতা, প্রযুক্তিগত অংশীদারত্ব, বাণিজ্যিক সম্পর্ক এবং ইন্দো-প্যাসিফিক অঞ্চলে অভিন্ন স্বার্থ এখনো দুই দেশের সম্পর্কের গুরুত্বপূর্ণ ভিত্তি। তবে বাণিজ্য, শুল্ক, জ্বালানি, পাকিস্তান ও কৌশলগত স্বাধীনতার প্রশ্নে মতপার্থক্য দুই দেশের সম্পর্ককে নতুন বাস্তবতার মুখোমুখি করছে।
যুক্তরাষ্ট্রের কাছে ভারতের বিশাল বাজার, জনসংখ্যা, প্রযুক্তিগত সক্ষমতা ও ভৌগোলিক অবস্থানের দীর্ঘমেয়াদি গুরুত্ব রয়েছে। অন্যদিকে, ভারতও প্রতিরক্ষা ও প্রযুক্তিসহ বিভিন্ন ক্ষেত্রে যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে সহযোগিতা বজায় রাখতে আগ্রহী। তবে এই অংশীদারত্বের অর্থ ওয়াশিংটনের প্রতিটি অবস্থানের সঙ্গে নয়াদিল্লির একমত হওয়া নয়—ভারতের পররাষ্ট্রমন্ত্রী এস জয়শঙ্করের বক্তব্যে এমন মনোভাবের প্রতিফলন দেখা যায়।
একসময় ভারত–যুক্তরাষ্ট্র সম্পর্কের অন্যতম প্রধান ভিত্তি ছিল চীনের উত্থান মোকাবিলায় অভিন্ন স্বার্থ। বর্তমানে সেই সমীকরণের পাশাপাশি বাণিজ্য, শুল্ক, জ্বালানি নিরাপত্তা, পাকিস্তান এবং ভারতের কৌশলগত স্বাধীনতার বিষয়গুলোও গুরুত্ব পাচ্ছে। ফলে সহযোগিতা অব্যাহত থাকলেও বিভিন্ন ইস্যুতে প্রকাশ্য মতপার্থক্য এবং কঠিন দর-কষাকষির প্রবণতা বাড়তে পারে।
বিশ্লেষকদের মতে, দুই দেশের সম্পর্ক কোন দিকে এগোবে, তা নির্ভর করবে মতপার্থক্য সত্ত্বেও সমঝোতার ক্ষেত্র কতটা বিস্তৃত করা সম্ভব হয় তার ওপর। ওয়াশিংটন যেমন নিজের অর্থনৈতিক ও ভূরাজনৈতিক অগ্রাধিকার থেকে সরে আসার নিশ্চয়তা দিচ্ছে না, তেমনি নয়াদিল্লিও নিজের জাতীয় স্বার্থ ও সিদ্ধান্ত গ্রহণের স্বাধীনতা বজায় রাখতে চায়।
এদিকে ভারতকে একই সঙ্গে যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে গুরুত্বপূর্ণ অংশীদারত্ব, রাশিয়ার সঙ্গে ঐতিহাসিক সহযোগিতা এবং চীনের সঙ্গে প্রতিযোগিতা ও প্রতিবেশীসুলভ সম্পর্কের ভারসাম্য রক্ষা করতে হচ্ছে। এই তিনটি সম্পর্কের মধ্যে সমন্বয় বজায় রাখাই ভারতের কূটনীতির অন্যতম বড় চ্যালেঞ্জ।
ভারত–যুক্তরাষ্ট্র সম্পর্কের বর্তমান অস্বস্তি বাংলাদেশের জন্য নতুন কূটনৈতিক বা অর্থনৈতিক সুযোগ তৈরি করতে পারে। তবে সেই সুযোগ স্বয়ংক্রিয়ভাবে কাজে লাগানো সম্ভব নয়। এর জন্য বাংলাদেশের নিজস্ব অর্থনৈতিক সক্ষমতা, প্রাতিষ্ঠানিক প্রস্তুতি এবং ধারাবাহিক কূটনৈতিক উদ্যোগ প্রয়োজন।
সব মিলিয়ে, ভারত যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে সম্পর্ক কমিয়ে চীনের দিকে ঝুঁকবে কি না, সেটিই মূল প্রশ্ন নয়। বরং পরিবর্তনশীল আন্তর্জাতিক পরিস্থিতিতে ভারত কতটা স্বাধীনভাবে নিজের স্বার্থ নির্ধারণ ও তা রক্ষা করতে পারে, সেটিই হবে দেশটির কূটনৈতিক সক্ষমতার গুরুত্বপূর্ণ পরীক্ষা।
source: Azadir Dak