News
ভাইভার নম্বর, কমিটির নিয়োগ ক্ষমতা, ভেরিফিকেশনের খপ্পর ও প্রশ্নফাঁস— ৫ বিতর্কিত কাণ্ডে সমালোচিত সরকার

ক্ষমতায় আসার পর থেকে বিএনপি সরকারের সঙ্গে চাকরিপ্রত্যাশীদের তিক্ততা বেড়েই চলেছে। জুলাই গণঅভ্যুত্থানের পর সড়ক-চাকরিসহ নানা ক্ষেত্রে ঝামেলামুক্ত ও স্বচ্ছ নিয়োগের আশায় বুক বেঁধেছিল ছাত্রসমাজ। কিন্তু এরপর নানা ইস্যুতে সরকার ও চাকরিপ্রত্যাশী তরুণদের মুখোমুখি হতে দেখা গেছে। আস্থা হারিয়ে হতাশ হতে দেখা গেছে শিক্ষার্থীদের।
গত ১২ ফেব্রুয়ারির নির্বাচনের পর অন্তত পাঁচ ইস্যুতে চাকরিপ্রত্যাশী ও সরকারের মধ্যে মুখোমুখি অবস্থান দেখা দিয়েছে। এর মধ্যে রয়েছে ৪৯তম বিসিএসের চূড়ান্ত গেজেট থেকে ৫৭ জন প্রার্থী বাদ পড়া, সরকারি চাকরিতে ভাইভার নম্বর বাড়ানোর প্রস্তাব, এনটিআরসিএর ক্ষমতা কমিয়ে ম্যানেজিং কমিটির হাতে শিক্ষক নিয়োগের উদ্যোগ, প্রাথমিক শিক্ষক নিয়োগে ভেরিফিকেশনের নামে হাজারো প্রার্থীর নিয়োগপত্র আটকে রাখা এবং যুব উন্নয়ন অধিদপ্তরের পরীক্ষায় প্রশ্নফাঁসের অভিযোগে পরীক্ষা স্থগিত করা।
প্রতিটি ইস্যুতেই চাকরিপ্রত্যাশীরা রাস্তায় নেমেছেন, বিক্ষোভ ও মানববন্ধন করেছেন। সুযোগ বুঝে আন্দোলন চাঙা করতেও পিছপা হয়নি বিরোধীরা। ফলে সরকারের আগামী পাঁচ বছরের পথচলায় চাকরিপ্রত্যাশীরা থাকবে কিনা, কিংবা সরকারের ওপর তাদের আস্থা কতখানি থাকছে—তা নিয়ে রয়েছে ব্যাপক প্রশ্নের সুযোগ।
৪৯তম বিশেষ বিসিএস: চূড়ান্ত গেজেট থেকে ৫৭ জন প্রার্থী বাদ
৪৯তম বিসিএস (বিশেষ) শিক্ষা ক্যাডারের চূড়ান্ত গেজেট থেকে ৫৭ জন প্রার্থী বাদ পড়ার ঘটনাটি সম্প্রতি দেশজুড়ে ব্যাপক আলোচনা ও বিতর্কের সৃষ্টি করেছে। গত ৩০ সেপ্টেম্বর ২০২৫ সালে ৪৯তম বিসিএসের (বিশেষ) চূড়ান্ত গেজেট প্রকাশিত হয়। সরকারি কর্ম কমিশন (পিএসসি) মোট ৬৬৮ জন প্রার্থীকে সুপারিশ করলেও, প্রথম দফায় ৬১১ জনকে নিয়োগ দিয়ে প্রজ্ঞাপন জারি করা হয় এবং ৫৭ জনকে বাদ দেওয়া হয়। কারণ ব্যাখ্যা না থাকায় বাদ পড়া প্রার্থীদের মধ্যে তীব্র ক্ষোভ ও হতাশা দেখা দেয়। অভিযোগ ওঠে, পুলিশ ভেরিফিকেশন বা রাজনৈতিক পরিচয়ের কারণে তাদের বাদ দেওয়া হয়েছে।
এই ঘটনার প্রতিবাদে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় কেন্দ্রীয় ছাত্র সংসদ (ডাকসু) ক্যাম্পাসে বিক্ষোভ মিছিল ও সমাবেশ করে। ডাকসুর ভিপি সাদিক কায়েম ও এজিএস মহিউদ্দিন খান সরকারের সমালোচনা করে বাদ পড়া প্রার্থীদের আগামী ১২ অক্টোবরের মধ্যে গেজেটে অন্তর্ভুক্ত করার আল্টিমেটাম দেন। একই সঙ্গে রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়েও (রাকসু) মানববন্ধন হয়। বাদ পড়া প্রার্থীদের মধ্যে একজন আত্মহত্যার ঘোষণাও দিয়েছিলেন।
স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী সালাহউদ্দিন আহমদ সংবাদ সম্মেলনে জানান, ৫৭ জনের মধ্যে ৩ জন প্রয়োজনীয় সনদ জমা দেননি এবং ৮ জন মেডিকেল পরীক্ষায় অংশ নেননি। ফলে প্রথম প্রজ্ঞাপন থেকে বাদ পড়ার প্রকৃত সংখ্যা ৪৬ জন। তিনি জোর দিয়ে বলেন, “কোনো প্রার্থীকে রাজনৈতিক পরিচয়ের কারণে বৈষম্যের শিকার হতে দেওয়া হবে না।”
সরকারের আশ্বাস অনুযায়ী, ৫ অক্টোবর সোমবার রাতে জনপ্রশাসন মন্ত্রণালয় দ্বিতীয় দফায় ৪০ জনকে নিয়োগ দিয়ে প্রজ্ঞাপন জারি করে। এর মধ্যে মেধাক্রমে প্রথম হওয়া সোহেল রানা ও বুশরা জাহান ঐশীও রয়েছেন। দ্বিতীয় দফায় ৪০ জন নিয়োগ পেলেও, বাকি ৬ জনের নিয়োগ নিয়ে কোনো ব্যাখ্যা দেওয়া হয়নি এবং তারা এখনো অনিশ্চয়তায় রয়েছেন। শিক্ষা মন্ত্রণালয় ৮ অক্টোবর মোট ৬৫১ জনকে (৬১১ + ৪০) নিয়োগ দিয়ে প্রজ্ঞাপন জারি করেছে, যেখানে যোগদানের তারিখ ১২ অক্টোবর নির্ধারণ করা হয়েছে। ৪৯তম বিসিএসের এই ঘটনা সরকারি নিয়োগ প্রক্রিয়ায় স্বচ্ছতা ও জবাবদিহিতা নিয়ে গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্ন রেখে গেছে।
সরকারি চাকরিতে ভাইভার নম্বর বাড়ানোর প্রস্তাব: ব্যাপক প্রতিবাদ
সরকারি চাকরিতে ১১ থেকে ২০তম গ্রেডের কর্মচারী নিয়োগে মৌখিক পরীক্ষার (ভাইভা) নম্বর বাড়ানোর একটি প্রস্তাব আলোচনার জন্ম দিয়েছে। জনপ্রশাসন মন্ত্রণালয়ের খসড়া বিধিমালা অনুযায়ী, ১১-১২তম গ্রেডে লিখিত ১০০ ও মৌখিক ৫০ নম্বর, ১৩-১৬তম গ্রেডে লিখিত ৬০ ও মৌখিক ৪০ নম্বর এবং ১৭-২০তম গ্রেডে লিখিত ২৫ ও মৌখিক ২৫ নম্বর রাখার প্রস্তাব করা হয়েছে। এসব গ্রেডে মৌখিক পরীক্ষার নম্বর ছিল মাত্র ১০।
এই প্রস্তাবের তীব্র বিরোধিতা করেছেন চাকরিপ্রত্যাশী, শিক্ষার্থী ও বিশেষজ্ঞরা। তাদের মতে, লিখিত পরীক্ষা বস্তুনিষ্ঠ হলেও ভাইভা পুরোপুরি সাবজেক্টিভ। ভাইভার নম্বর বাড়ালে স্বজনপ্রীতি, দুর্নীতি, দলীয়করণ ও লবিংয়ের মাধ্যমে পছন্দের প্রার্থীকে এগিয়ে নেওয়ার সুযোগ তৈরি হবে। এতে মেধাবীরা বঞ্চিত হবেন। বিরোধী দল ও বিভিন্ন সংগঠন এই প্রস্তাবকে সরকারের “দলীয়করণের পথ খোলার” উদ্যোগ বলে অভিহিত করেছে। এর প্রতিবাদে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়, রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়, জগন্নাথ বিশ্ববিদ্যালয়সহ বিভিন্ন ক্যাম্পাসে বিক্ষোভ ও মানববন্ধন হয়েছে।
সরকারের পক্ষ থেকে বলা হচ্ছে, এটি কোনো বৈষম্য সৃষ্টির জন্য নয়; বরং দক্ষ ও যোগ্য প্রশাসনিক জনবল নিশ্চিত করতেই এই পরিবর্তন আনা হচ্ছে। প্রধানমন্ত্রীর তথ্য উপদেষ্টা জাহেদ উর রহমান সে সময় বলেন, ভাইভার নম্বর বাড়ালে প্রক্সি প্রতিরোধ করা যাবে এবং প্রার্থীর যোগাযোগ দক্ষতা ও অ্যাপটিটিউড যাচাই করা সহজ হবে। তবে তিনি স্বীকার করেছেন, ভাইভাকে কেন্দ্র করে অনিয়মের সুযোগ থাকলে তা সংস্কার করতে হবে।
বর্তমানে এই খসড়া বিধিমালাটি চূড়ান্ত হয়নি। চাকরিপ্রত্যাশীদের বিক্ষোভ ও বিরোধী দলের সমালোচনার মুখে সরকার ধীরে চলার নীতি নিয়েছে। জনপ্রশাসন প্রতিমন্ত্রী মো. আব্দুল বারী গণমাধ্যমকে জানিয়েছিলেন, `বিষয়টি এখনো পর্যালোচনার পর্যায়ে রয়েছে এবং চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত হয়নি। চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত এলে তা জানানো হবে।’
এনটিআরসিএ নয়, ম্যানেজিং কমিটির হাতে শিক্ষক নিয়োগ
বেসরকারি শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে শিক্ষক নিয়োগের সুপারিশের ক্ষমতা বেসরকারি শিক্ষক নিবন্ধন ও প্রত্যয়ন কর্তৃপক্ষ (এনটিআরসিএ) এর থেকে নিয়ে কমিটিকে দেয়ার কথাও সামনে এসেছে। আগের মতো প্রতিষ্ঠান পরিচালনায় গঠিত ম্যানেজিং কমিটি বা গভর্নিং বডির মাধ্যমে বেসরকারি স্কুল-কলেজে প্রবেশপর্যায়ে শিক্ষক নিয়োগ দেওয়া হতে পারে বলে প্রস্তাব সামনে আসে। গত ৩ আগস্ট বেসরকারি শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে প্রবেশপর্যায়ে শিক্ষক নিয়োগে অনুসরণীয় পদ্ধতি নিয়ে ডাকা এক সভায় এমন প্রস্তাবনা আসে। প্রস্তাবনাটি মূলত জাতীয় সংসদে দেওয়া আইনমন্ত্রীর বক্তব্যের প্রেক্ষাপটে আসে বলে জানিয়েছেন সভায় অংশ নেওয়া একাধিক কর্মকর্তা।
শিক্ষা মন্ত্রণালয় সূত্র জানায়, এনটিআরসিএর কাজের মধ্যে কোথাও শিক্ষক নিয়োগের সুপারিশ করার বিষয়টি উল্লেখ নেই। সংস্থাটি কেবল নিবন্ধন পরীক্ষা নেবে এবং পরবর্তীতে নিবন্ধন সনদ প্রত্যয়ন করবে। ফলে বিষয়টি নিয়ে আইনি জটিলতা হওয়ার আশঙ্কার কথাও বলা হয়। এ নিয়ে আইনমন্ত্রীর বক্তব্য ধরে বৈঠকে আলোচনা করা হয়।
সভায় অংশ নেওয়া এক কর্মকর্তা জানান, মন্ত্রণালয়ের সভায় শিক্ষকদের নিজ বাড়ি থেকে অনেক দূরের শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে নিয়োগ সুপারিশের বিষয়টি গুরুত্ব দিয়ে আলোচনা করা হয়েছে। নিজ বাড়ি থেকে দূরের প্রতিষ্ঠানে শিক্ষকদের পাঠানোর একমাত্র কারণ হিসেবে এনটিআরসিএর সুপারিশের বিষয়টি সামনে এসেছে। সেজন্য এ পদ্ধতি বাতিল করে কমিটির মাধ্যমে নিয়োগ দেওয়া যায় কি না, তা বিবেচনা করা হচ্ছে।
আরেক কর্মকর্তা জানান, শিক্ষক নিয়োগে এনটিআরসিএর সুপারিশ করার আগে ম্যানেজিং কমিটি বা গভর্নিং বডির মাধ্যমে শিক্ষক নিয়োগ করা হতো। প্রার্থীকে আগে এনটিআরসিএর সনদ অর্জন করে আসতে হতো। কমিটির মাধ্যমে নিয়োগ হলে শিক্ষকরা নিজ জেলা বা উপজেলায় চাকরির সুযোগ পেতেন। এজন্য এনটিআরসিএর পরিবর্তে কমিটির মাধ্যমে নিয়োগ দিতে সুপারিশ এসেছে। বিষয়টি নিয়ে আরও যাচাই চলছে।
বিষয়টি নিয়ে জানতে চাইলে শিক্ষা মন্ত্রণালয়ের মাধ্যমিক ও উচ্চশিক্ষা বিভাগের সচিব আবদুল খালেক বলেন, “অনেক বিষয় নিয়ে আলোচনা হয়। বিচার-বিশ্লেষণ করা হয়। যেটা ভালো বলে বিবেচিত হয়, সেটাই সরকার সিদ্ধান্ত নিয়ে থাকে। শিক্ষক নিয়োগের বিষয়টি নিয়ে কোনো চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত হয়নি। বিভিন্ন আলোচনা আছে, সেটা চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত আকারে এলে জানা যাবে।”
২০০৫ সালে এনটিআরসিএ প্রতিষ্ঠিত হয়। প্রথম এক দশক সংস্থাটি কেবল শিক্ষক নিবন্ধন পরীক্ষা নিয়ে সনদ দিত। ২০১৫ সালের ৩০ ডিসেম্বর সংস্থাটি নিবন্ধনধারী শিক্ষকদের সরাসরি শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে নিয়োগের সুপারিশ দেওয়ার কার্যক্রম শুরু করে। ২০২৬ সাল পর্যন্ত এ সংস্থাটি এক লাখ ৭৭ হাজার ৫৭১ জন শিক্ষক নিয়োগের সুপারিশ করেছে।
তবে এর আগ অবধি এমপিওভুক্ত বেসরকারি শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানগুলো শূন্যপদের বিপরীতে নিজেদের উদ্যোগে জাতীয় বা স্থানীয় দৈনিক পত্রিকায় নিয়োগ বিজ্ঞপ্তি প্রকাশ করত। প্রার্থীরা সরাসরি সেই নির্দিষ্ট প্রতিষ্ঠানে আবেদন করতেন এবং ম্যানেজিং কমিটির অধীনে গঠিত বোর্ডের মাধ্যমে লিখিত ও মৌখিক পরীক্ষায় অংশ নিতেন। ম্যানেজিং কমিটি বা গভর্নিং বডি নিজেদের পছন্দ ও সিদ্ধান্ত অনুযায়ী প্রার্থী নির্বাচন করে চূড়ান্ত নিয়োগ দিত।
প্রাথমিক শিক্ষক নিয়োগ: চূড়ান্ত সুপারিশপ্রাপ্ত হাজারো প্রার্থী নিয়োগপত্র পাননি
সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের সহকারী শিক্ষক নিয়োগ-২০২৫-এর লিখিত পরীক্ষা ৯ জানুয়ারি ২০২৬-এ ৬১ জেলায় অনুষ্ঠিত হয়। ৮ ফেব্রুয়ারি চূড়ান্ত ফল প্রকাশ করে প্রাথমিক শিক্ষা অধিদপ্তর; ১৪ হাজার ৩৮৪ জনকে প্রাথমিকভাবে নির্বাচন করা হয়। এর পর পেরিয়ে যায় অনেক সময়। নির্বাচিত সরকার ক্ষমতা গ্রহন করে। ২৪ সেপ্টেম্বর থেকে বিভিন্ন জেলায় নিয়োগপত্র দেওয়া শুরু হলে বিপুলসংখ্যক প্রার্থী অভিযোগ করেন, চূড়ান্ত ফলাফলে নাম থাকা সত্ত্বেও তাদের নাম নিয়োগপত্রের তালিকায় নেই। প্রার্থীদের প্ল্যাটফর্মের দাবি, বাদ পড়ার সংখ্যা প্রায় আড়াই হাজার।
বাদ পড়ার মূল কারণ হিসেবে চারটি বিষয় জানা গেছে—পুলিশ/গোয়েন্দা যাচাই প্রতিবেদন নেতিবাচক, ডোপ টেস্টে সমস্যা, স্বাস্থ্য সনদ না থাকা ও শিক্ষা সনদে গরমিল। এর মধ্যে যাচাই-বাছাই প্রতিবেদন নেতিবাচক থাকার সংখ্যাই বেশি। ১৫ জেলায় অন্তত ৩৫১ জন বাদ পড়ার তথ্য পাওয়া গেছে। খুলনা, সুনামগঞ্জ, মৌলভীবাজার ও যশোরে শত শত প্রার্থী নিয়োগের দাবিতে অবস্থান কর্মসূচি পালন করেছেন।
প্রাথমিক ও গণশিক্ষা মন্ত্রণালয় বলছে, ১ অক্টোবর পর্যন্ত কেউ নিয়োগপত্র না পেলে পরবর্তী সময়ে যথাযথ পরীক্ষা-নিরীক্ষা করে দ্রুততম সময়ে পর্যায়ক্রমে নিয়োগপত্র দেওয়া হবে। ১৮ অক্টোবর পদায়নের নতুন তারিখ নির্ধারণ করা হয়েছে।
যুব উন্নয়ন পরীক্ষায় প্রশ্নফাঁস: পরীক্ষা স্থগিত, সড়ক অবরোধ
১০ অক্টোবর যুব উন্নয়ন অধিদপ্তরের সহকারী উপজেলা যুব উন্নয়ন কর্মকর্তা (১১তম গ্রেড) পদের নিয়োগ পরীক্ষা শুরুর আগমুহূর্তে প্রশ্নপত্র ফাঁসের অভিযোগে স্থগিত করা হয়। ২৪২টি পদের এ পরীক্ষায় রাজধানীর প্রায় ১০০টি কেন্দ্রে পরীক্ষা হওয়ার কথা ছিল। যুব উন্নয়ন অধিদপ্তরের প্রশাসন উইংয়ের পরিচালক ডি এম আতিকুর রহমান জানান, ফেসবুকে একটি পোস্ট দেখার পর পরীক্ষা স্থগিতের সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছে। ছড়িয়ে পড়া প্রশ্নের সঙ্গে পরীক্ষার প্রশ্নের মিল পাওয়া গেছে বলেও তিনি জানান।
পরীক্ষা স্থগিতের প্রতিবাদে রাজধানীর মানিক মিয়া অ্যাভিনিউ, শাহবাগ, নীলক্ষেত মোড় ও সাতমসজিদ সড়ক অবরোধ করেন পরীক্ষার্থীরা। বেলা সোয়া ১১টা থেকে দুপুর ১২টার দিকে এসব সড়ক অবরোধ করা হয়। বেলা দুইটা পর্যন্ত শাহবাগে অবরোধ চলে।
পরে পরীক্ষা বাতিল করে যুব ও ক্রীড়া মন্ত্রণালয় একটি পাঁচ সদস্যের তদন্ত কমিটি গঠন করেছে। কমিটির আহ্বায়ক প্রশাসন অনুবিভাগের অতিরিক্ত সচিব। কমিটির অন্য সদস্যরা হলেন—যুব ও ক্রীড়া মন্ত্রণালয়ের যুগ্মসচিব (ফিন্যান্স অ্যান্ড পারফরম্যান্স ম্যানেজমেন্ট অধিশাখা), জনপ্রশাসন মন্ত্রণালয়ের যুগ্মসচিব পদমর্যাদার একজন প্রতিনিধি, যুব উন্নয়ন অধিদপ্তরের পরিচালক (সিড ফাইন্যান্সিং) এবং যুব ও ক্রীড়া মন্ত্রণালয়ের উপসচিব (প্রশাসন অধিশাখা)। পরীক্ষার্থীরা দ্রুত নতুন প্রশ্নপত্রে পরীক্ষা গ্রহণ এবং প্রশ্নফাঁসের সঙ্গে জড়িতদের চিহ্নিত করে কঠোর শাস্তির দাবি জানিয়েছেন।
প্রশ্নফাঁস ইস্যুতে সরকারের সমালোচনায় ছাত্রসংগঠনগুলো
প্রশ্নফাঁসের অভিযোগে যুব উন্নয়ন অধিদপ্তরের সহকারী উপজেলা যুব উন্নয়ন কর্মকর্তা পদের নিয়োগ পরীক্ষা স্থগিত হওয়ার ঘটনায় ক্ষোভ প্রকাশ করেছে ছাত্রসংগঠনগুলো।
ঘটনার পর সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে এক স্ট্যাটাসে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় কেন্দ্রীয় ছাত্র সংসদ (ডাকসু) ভিপি সাদিক কায়েম বলেন, “ভেরিফিকেশনের পর এবার প্রশ্নফাঁসের তামাশা শুরু করল বিএনপি সরকার, ঠিক যেন আওয়ামী যুগে ফিরে যাচ্ছি আমরা।”
তিনি বলেন, “২৭ লাখ বেকারের দেশে জুলাই বিপ্লব শুরু হয়েছিল কোনো বৈষম্য ছাড়াই মেধার ভিত্তিতে বেকার তরুণদের চাকরির দাবিতে। অথচ এই সরকার তরুণদের সেই আকাঙ্ক্ষার সঙ্গে সুস্পষ্টভাবে বেইমানি করেছে। দায়িত্ব নেওয়ার কয়েক মাসের মধ্যেই প্রাথমিক শিক্ষক নিয়োগ ও ৪৯তম বিসিএসে ভেরিফিকেশনের নামে কোনো কারণ ছাড়াই শত শত শিক্ষার্থীকে বাদ দেওয়া হলো, পরে প্রতিবাদের মুখে আবার নিয়োগপত্র দেওয়া হলো। এবার বেকারদের প্রতি চূড়ান্ত অপমান হিসেবে প্রশ্নফাঁসের পুরোনো সংস্কৃতি ফিরে এসেছে।”
সাদিক কায়েম বলেন, “ প্রশ্নফাঁসের সিন্ডিকেট নির্মূল করতে না পারা সরকারের সুস্পষ্ট ব্যর্থতা। সরকারের কোনো না কোনো পর্যায়ের প্রত্যক্ষ সহযোগিতা ছাড়া প্রশ্নফাঁস করা সম্ভব নয়। যুব ও ক্রীড়া মন্ত্রণালয়ের প্রতিমন্ত্রীও এর দায় কোনোভাবে এড়াতে পারেন না।”
এদিকে ছাত্রদলের সভাপতি রাকিবুল ইসলাম রাকিব ও সাধারণ সম্পাদক নাছির উদ্দীন নাছির এক বিবৃতিতে বলেছেন, প্রশ্নপত্র ফাঁস একটি গর্হিত অপরাধ। সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষ কোনোভাবেই এর দায় এড়াতে পারে না। যারা এই ঘটনায় জড়িত, তাদের কঠোরতম শাস্তি নিশ্চিত করার কোনো বিকল্প নেই। একইসঙ্গে ভবিষ্যতে এমন ঘটনা এড়াতে সর্বোচ্চ স্বচ্ছতা ও জবাবদিহিতা নিশ্চিত করতে হবে।
তারা আরও বলেন, অতীতে প্রশ্নপত্র ফাঁসের প্রমাণিত অভিযোগের মধ্যেও পরীক্ষা চালিয়ে যাওয়ার যে সংস্কৃতি গড়ে তোলা হয়েছিল, তার বিপরীতে প্রশ্নফাঁসের প্রমাণ পেলে পরীক্ষা স্থগিত করা শ্রেয়তর পদক্ষেপ। তবে লক্ষাধিক পরীক্ষার্থী পরীক্ষার জন্য ঢাকায় এসে শেষ মুহূর্তে পরীক্ষা স্থগিত হওয়া অত্যন্ত অনভিপ্রেত। এতে শিক্ষার্থীদের যে মানসিক, আর্থিক ও শারীরিক ক্ষতি হয়েছে, তা অপরিমেয়। চাকরিপ্রার্থীদের এই ক্ষতি ও বিড়ম্বনার বিষয়ে ছাত্রদল সমব্যথী।
ছাত্রদল অবিলম্বে পরিকল্পিতভাবে প্রশ্নপত্র ফাঁসকারী ফ্যাসিবাদের দোসরদের চিহ্নিত করে গ্রেফতারের এবং দ্রুততম সময়ের মধ্যে এই নিয়োগ পরীক্ষার নতুন তারিখ ঘোষণার দাবি জানিয়েছে। ভবিষ্যতে যেকোনো উপায়ে প্রশ্নপত্র ফাঁস বন্ধ করতে হবে বলেও বিবৃতিতে উল্লেখ করা হয়েছে।
অন্যদিকে জাতীয় ছাত্রশক্তি এক বিবৃতিতে বলেছে, বৈষম্যবিরোধী আন্দোলনের চেতনায় যে মেধাভিত্তিক ও স্বচ্ছ রাষ্ট্রের স্বপ্ন দেখা হয়েছিল, প্রশ্ন ফাঁসের এই সংস্কৃতি তার সম্পূর্ণ বিপরীত। নিয়োগ প্রক্রিয়ার গোপনীয়তা রক্ষা করা সরকারের প্রাথমিক দায়িত্ব, আর সেই দায়িত্ব পালনে সরকার ব্যর্থ হয়েছে। ন্যূনতম লজ্জাবোধ থাকলে তিন লাখ বেকার তরুণের স্বপ্ন ধূলিসাৎ করার দায়ে সরকারের রাষ্ট্র পরিচালনার দায়িত্ব থেকে সরে দাঁড়ানো উচিত। যে সরকার প্রশ্নপত্রের গোপনীয়তা রক্ষা করতে পারে না, সে সরকার রাষ্ট্রের গুরুত্বপূর্ণ নথিপত্রের গোপনীয়তা রক্ষা করবে কীভাবে?
জাতীয় ছাত্রশক্তি আরও বলেছে, প্রশ্ন ফাঁসের ঘটনায় অবিলম্বে স্বাধীন ও নিরপেক্ষ তদন্ত কমিটি গঠন করে তদন্ত প্রতিবেদন জনসমক্ষে প্রকাশ করতে হবে। প্রশ্ন ফাঁসের সঙ্গে জড়িত যত বড় প্রভাবশালীই হোক, চিহ্নিত করে দ্রুত আইনের আওতায় আনতে হবে। জাতীয় ছাত্রশক্তি সরকারকে হুঁশিয়ারি করে বলতে চায়—তরুণদের স্বপ্ন নিয়ে ছিনিমিনি খেলা মেনে নেওয়া হবে না। ছাত্রশক্তি চাকরিপ্রত্যাশী তরুণদের পাশে সবসময় ছিল, আছে, থাকবে।
source: The Dhaka Diary