তারেক রহমানকে সহায়তার অভিযোগে লন্ডন থেকে ফেরানো হয়েছিল দাউদ আলীকে, এবার জামায়াত সংশ্লিতায় জাপান থেকে

প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের জাপান সফরের আগে টোকিও থেকে ঢাকায় ফিরেছেন দেশটিতে বাংলাদেশের রাষ্ট্রদূত মো. দাউদ আলী। গত ১৫ অক্টোবর পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের পাঠানো চিঠিতে তাকে ঢাকায় ডেকে পাঠানো হয়। দুই দিনের মধ্যে দেশে ফেরার নির্দেশনা অনুযায়ী তিনি ফিরেছেন। গোয়েন্দা সংস্থার একটি প্রতিবেদনে দাউদ আলীর জামায়াত-সংশ্লিষ্টতার অভিযোগ ওঠার পর পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয় এ পদক্ষেপ নেয় বলে জানিয়েছে দেশের কয়েকটি গণমাধ্যম। এই নিয়ে একটি প্রতিবেদন বিবিসি বাংলাও প্রকাশ করেছে।
এদিকে সরকারপ্রধানের সফরের ঠিক আগে সংশ্লিষ্ট দেশের রাষ্ট্রদূতকে সরিয়ে নেওয়ার ঘটনাকে অস্বাভাবিক ও নজিরবিহীন বলে মনে করছেন সাবেক ও বর্তমান কূটনীতিকদের কেউ কেউ। তাদের মতে, সফরের প্রস্তুতি ও দ্বিপক্ষীয় আলোচনা নিয়ে জাপান সরকারের সঙ্গে সমন্বয়ের দায়িত্বে থাকা রাষ্ট্রদূতকে শেষ মুহূর্তে সরিয়ে নেওয়ার সিদ্ধান্ত কূটনৈতিকভাবে প্রশ্ন তৈরি করতে পারে।
দাউদ আলীর কূটনৈতিক জীবনে এমন প্রত্যাবর্তনের ঘটনা অবশ্য নতুন নয়। ২০০৯ সালে লন্ডনে বাংলাদেশ হাইকমিশনে কাউন্সেলর ও হেড অব চ্যান্সারি হিসেবে দায়িত্ব পালনকালে তৎকালীন বিরোধীদলীয় নেতা তারেক রহমানকে সহায়তার অভিযোগে তাকে দেশে ফিরিয়ে আনা হয়েছিল। সে সময় তার বিরুদ্ধে প্রধানমন্ত্রীর কার্যালয়ে জাতীয় নিরাপত্তা গোয়েন্দা সংস্থার (এনএসআই) একটি প্রতিবেদন দেওয়া হয়েছিল। ওই প্রতিবেদনের ভিত্তিতে তাকে ঢাকায় ফিরিয়ে এনে পরে ফরেন সার্ভিস অ্যাকাডেমির ভাইস প্রিন্সিপাল পদে নিয়োগ দেওয়া হয়। এই নিয়ে তৎকালীন সময়ে বিভিন্ন গনমাধ্যমে তারেক রহমানের সঙ্গে সংশ্লিষ্টাতার কারণে দেশে ফিরিয়ে আনার হয়েছে শিরোনামে নিউজও প্রকাশ করা হয়েছে।
প্রায় ১৭ বছর পর আবারও একটি গুরুত্বপূর্ণ রাজনৈতিক ও কূটনৈতিক সময়ের আগে দেশে ফিরতে হলো তাকে। এবার প্রেক্ষাপট প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের জাপান সফর। তবে ২০০৯ সালের ঘটনা এবং এবার তাকে ঢাকায় ফিরিয়ে আনার সিদ্ধান্তের মধ্যে কোনো যোগসূত্র রয়েছে কি না, তা নিশ্চিত হওয়ার মতো তথ্য পাওয়া যায়নি।
জাপানের প্রধানমন্ত্রী সানায়ে তাকাইচির আমন্ত্রণে আগামী ২৬ থেকে ২৯ অক্টোবর জাপানে সরকারি সফর করবেন প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান। গত ফেব্রুয়ারিতে প্রধানমন্ত্রী হিসেবে দায়িত্ব নেওয়ার পর এটি হবে তার চতুর্থ বিদেশ সফর। আগামী ২৭ অক্টোবর দুই দেশের প্রধানমন্ত্রীর দ্বিপক্ষীয় বৈঠক হওয়ার কথা রয়েছে। বৈঠকে বাণিজ্য, বিনিয়োগ, অবকাঠামো উন্নয়ন এবং বাংলাদেশ-জাপান অর্থনৈতিক অংশীদারত্ব চুক্তি (ইপিএ) বাস্তবায়ন নিয়ে আলোচনা হতে পারে। পাশাপাশি দুই দেশের মধ্যে তিন থেকে চারটি সমঝোতা স্মারক সই হওয়ার সম্ভাবনা রয়েছে।
গত মঙ্গলবার (২০ অক্টোবর) প্রধানমন্ত্রীর জাপান সফর নিয়ে সংবাদ সম্মেলনে পররাষ্ট্র সচিব আসাদ আলম সিয়াম জানান, সফর সামনে রেখে দুই পক্ষের মধ্যে আটটি সমঝোতা স্মারক সইয়ের বিষয়ে প্রস্তুতি চলছে। এর মধ্যে তিন থেকে চারটি সমঝোতা স্মারক সই হতে পারে। এমন গুরুত্বপূর্ণ সফরের প্রস্তুতি ও কূটনৈতিক সমন্বয়ে সহায়তার জন্য পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের সচিব (দ্বিপক্ষীয় বিষয়াবলি) মো. নজরুল ইসলামকে বিশেষ দায়িত্ব দিয়ে টোকিও পাঠানো হয়েছে। দাউদ আলী ঢাকায় ফেরার পর সফরসংশ্লিষ্ট দায়িত্ব পালনে তিনি সহায়তা করবেন।
পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের ১৫ অক্টোবরের চিঠিতে দাউদ আলীকে প্রধানমন্ত্রীর সফর নিয়ে আলোচনার জন্য ঢাকায় ডেকে পাঠানো হয়। নির্দেশনা অনুযায়ী তিনি দুই দিনের মধ্যে দেশে ফেরেন। তবে সফরের আগে তাকে টোকিও থেকে সরিয়ে আনার সিদ্ধান্তের কারণ সম্পর্কে পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয় কিংবা টোকিও দূতাবাসের কর্মকর্তারা স্পষ্ট কোনো ব্যাখ্যা দেননি।
এ বিষয়ে জানতে চাইলে পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের মুখপাত্র একেএম শহীদুল করিম বলেন, ‘আমি এ বিষয়ে কিছুই জানি না।’
প্রধানমন্ত্রীর সফরের ঠিক আগে রাষ্ট্রদূতকে সংশ্লিষ্ট দেশ থেকে সরিয়ে নেওয়ার সিদ্ধান্ত নিয়ে প্রশ্ন তুলেছেন সাবেক ও বর্তমান কূটনীতিকদের কেউ কেউ। তাদের মতে, সফরের প্রস্তুতি এবং দ্বিপক্ষীয় সম্পর্কের বিভিন্ন বিষয়ে রাষ্ট্রদূতের অভিজ্ঞতা ও স্থানীয় পরিস্থিতি সম্পর্কে ধারণা গুরুত্বপূর্ণ।
নাম প্রকাশ না করার শর্তে বিদেশে বাংলাদেশের একটি মিশনের এক রাষ্ট্রদূত বলেন, প্রধানমন্ত্রীর সফরে দাউদ আলীকে জাপানে রাখা হচ্ছে না কেন, তা তার জানা নেই। সফর নিয়ে জাপান সরকারের সঙ্গে বাংলাদেশের প্রতিনিধি হিসেবে দাউদ আলীই আলোচনা করেছেন।
তিনি বলেন, ‘হঠাৎ করে কী এমন হলো যে, প্রধানমন্ত্রী যাওয়ার আগমুহূর্তে তাকে ফেরাতে হবে? যদি তার বিরুদ্ধে কোনো কিছু থেকে থাকে, সেটা তো আরও আগে দেখার দরকার ছিল।’
ওই রাষ্ট্রদূতের মতে, সফরের আগে সংশ্লিষ্ট দেশে রাষ্ট্রদূত না থাকাকে জাপান সরকার কীভাবে দেখবে, সেটিও গুরুত্বপূর্ণ বিষয়। দাউদ আলীর পরিবর্তে যাকে টোকিও পাঠানো হয়েছে, তিনি যোগ্য ব্যক্তি হলেও স্বল্প সময়ে রাষ্ট্রদূতের মতো স্থানীয় পরিস্থিতি ও কূটনৈতিক বাস্তবতা সম্পর্কে সম্যক ধারণা অর্জন করা কঠিন হতে পারে। নতুন দায়িত্বপ্রাপ্ত কর্মকর্তা হয়তো পরিস্থিতি সামলে নিতে পারবেন, তবে রাষ্ট্রদূত যতটা ভালোভাবে স্থানীয় বাস্তবতা জানেন, তা অল্প সময়ে আয়ত্ত করা সহজ নয়।
তিনটি দেশে বাংলাদেশের মিশনে নেতৃত্ব দেওয়া সাবেক এক রাষ্ট্রদূতও এ সিদ্ধান্তকে ‘নজিরবিহীন’ বলে মন্তব্য করেন। প্রধানমন্ত্রীর সফরের আগে রাষ্ট্রদূতকে ফিরিয়ে আনার অর্থ হলো কোথাও কোনো সমস্যা রয়েছে। তবে সেই সমস্যার প্রকৃত কারণ সম্পর্কে তারও নিশ্চিত তথ্য নেই।
জাপান বিষয়টি কীভাবে নেবে, তা নিয়ে উদ্বেগ প্রকাশ করে সাবেক এই রাষ্ট্রদূত বলেন, এত দিন ধরে যে রাষ্ট্রদূতের সঙ্গে জাপান সরকার আলোচনা করে এসেছে, গুরুত্বপূর্ণ সফরের আগে তাকে সরিয়ে নেওয়া স্বাভাবিকভাবে নেওয়ার কথা নয়। জাপানের মতো আত্মমর্যাদাশীল দেশ বিষয়টিকে কীভাবে দেখবে, তা বিবেচনায় নেওয়া প্রয়োজন ছিল।
কারও চাওয়ায় এ সিদ্ধান্ত হয়ে থাকতে পারে বলে মনে করেন তিনি। আমাদের কারও চাওয়ার কারণে এটা হয়েছে। আমাদের দেশের কারও একজনের। এ ধরনের সিদ্ধান্তে আন্তর্জাতিক পরিসরে বাংলাদেশের গ্রহণযোগ্যতা ক্ষতিগ্রস্ত হতে পারে। দাউদ আলীকে ফিরিয়ে আনার প্রয়োজন থাকলে তা আরও আগে করা উচিত ছিল।
আরও পড়ুন:
দাউদ আলীর কূটনৈতিক জীবনের লন্ডন অধ্যায় শুরু হয় ২০০৯ সালের ঘটনার মধ্য দিয়ে নতুন আলোচনায়। সে সময় আওয়ামী লীগ সরকার ক্ষমতায় ছিল। দাউদ আলী লন্ডনে বাংলাদেশ হাইকমিশনের কাউন্সেলর ও হেড অব চ্যান্সারি হিসেবে দায়িত্ব পালন করছিলেন।
তখন বর্তমান প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানকে সহায়তার অভিযোগে তাকে দেশে ফিরিয়ে আনা হয়। এ বিষয়ে তার বিরুদ্ধে তৎকালীন প্রধানমন্ত্রীর কার্যালয়ে এনএসআই একটি প্রতিবেদন দিয়েছিল। ওই প্রতিবেদনের ভিত্তিতে তাকে ঢাকায় ফিরিয়ে এনে ফরেন সার্ভিস অ্যাকাডেমির ভাইস প্রিন্সিপাল পদে নিয়োগ দেওয়া হয়েছিল।
সেই ঘটনার ১৭ বছর পর আবারও একটি গুরুত্বপূর্ণ সফরের আগে দেশে ফিরতে হলো তাকে। এবার তিনি জাপানে বাংলাদেশের রাষ্ট্রদূত হিসেবে দায়িত্ব পালন করছিলেন। তবে এবার তাকে ফিরিয়ে আনার কারণ সম্পর্কে আনুষ্ঠানিক ব্যাখ্যা পাওয়া যায়নি।
সংশ্লিষ্টদের ধারণা, প্রধানমন্ত্রীর জাপান সফর শেষে দাউদ আলী আবার টোকিওতে রাষ্ট্রদূতের দায়িত্ব পালনে ফিরে যেতে পারেন। তবে এ বিষয়ে সরকারের আনুষ্ঠানিক ঘোষণা পাওয়া যায়নি।
সরকারপ্রধানের সফরের আগে সংশ্লিষ্ট দেশের রাষ্ট্রদূতকে সরিয়ে নেওয়ার নজির না থাকলেও অতীতে কনসাল জেনারেল কিংবা তার চেয়ে নিচের পদমর্যাদার কূটনীতিকদের ঢাকা বা অন্যত্র সরিয়ে নেওয়ার ঘটনা ঘটেছে।
২০১৪ সালে তৎকালীন প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার চীন সফরের সময় কুনমিংয়ের তৎকালীন কনসাল জেনারেলকে অন্যত্র সরিয়ে নেওয়া হয়েছিল। শেখ হাসিনা যখন কুনমিংয়ে অবস্থান করছিলেন, তখন ওই কনসাল জেনারেল ছিলেন বেইজিংয়ে। বর্তমানে তিনি ইউরোপের একটি দেশে বাংলাদেশের রাষ্ট্রদূত হিসেবে দায়িত্ব পালন করছেন।
২০২৪ সালের জুলাইয়ে শেখ হাসিনার চীন সফরের আগে বেইজিংয়ে বাংলাদেশের মিশনের এক কর্মকর্তাকে সপরিবারে ঢাকায় ফিরিয়ে আনা হয়। শেখ হাসিনার সফর শেষে ওই কর্মকর্তা আবার মিশনে ফিরে যান। বর্তমানে তিনি বিদেশে বাংলাদেশের একটি মিশনে কনসাল জেনারেলের দায়িত্ব পালন করছেন।
সর্বশেষ, সাবেক অন্তর্বর্তী সরকারের প্রধান উপদেষ্টা অধ্যাপক মুহাম্মদ ইউনূসের চীন সফরের সময়ও বেইজিংয়ে বাংলাদেশের মিশনের এক কর্মকর্তাকে অন্যত্র সরিয়ে নেওয়ার ঘটনা ঘটে। মুহাম্মদ ইউনূস যখন বেইজিংয়ে ছিলেন, তখন ওই কর্মকর্তা চীনের অন্য একটি শহরে অবস্থান করছিলেন।
তবে এসব ঘটনায় কনসাল জেনারেল বা মিশনের কর্মকর্তাদের সরিয়ে নেওয়া হলেও এবার জাপানে বাংলাদেশের রাষ্ট্রদূতকে প্রধানমন্ত্রীর সফরের আগেই ঢাকায় ফিরিয়ে আনার সিদ্ধান্তকে আলাদা করে দেখছেন কূটনীতিকদের কেউ কেউ।
পররাষ্ট্র ক্যাডারের ১৫তম বিসিএস ব্যাচের কর্মকর্তা মো. দাউদ আলী এর আগে রোমানিয়ায় বাংলাদেশের রাষ্ট্রদূত হিসেবে দায়িত্ব পালন করেছেন। ২০২৪ সালের ১২ ডিসেম্বর তিনি টোকিওতে বাংলাদেশের রাষ্ট্রদূতের দায়িত্ব গ্রহণ করেন। চলতি বছরের ৭ ডিসেম্বর তার অবসরোত্তর ছুটিতে (পিআরএল) যাওয়ার কথা রয়েছে।
source: The Dhaka Diary