News

পূজার আগে ৩৪ মন্দির-মণ্ডপে হামলা-ভাঙচুরের অভিযোগ, ‘অন্তর্কোন্দল’সহ তদন্তে পুলিশ যেসব কারণ খুঁজে পেল

বাংলাদেশ পুলিশ লোগো© সংগৃহীত
বর্তমানে চলমান দুর্গা পূজার আগে দেশের ৩৪টি স্থানে হামলা, প্রতিমা ভাঙচুর এবং মন্দিরে চুরির ঘটনা ঘটেছে বলে অভিযোগ তোলে বাংলাদেশ পূজা উদযাপন পরিষদ ও মহানগর সার্বজনীন পূজা কমিটি। এসব ঘটনার তদন্ত করেছে বাংলাদেশ পুলিশ। পুলিশ বলছে, অধিকাংশই চুরি, বিরোধ ও অন্তর্কোন্দলসহ নানা কারণে ঘটেছে। উদ্দেশ্যপ্রণোদিতভাবে সাম্প্রদায়িক সম্প্রীতি ক্ষুণ্ন করা, সংখ্যালঘু নির্যাতন কিংবা নির্বিঘ্নে পূজা উদযাপনে বাধা দেওয়ার মতো ঘটনার সত্যতা পাওয়া যায়নি বলে দাবি পুলিশের।
 
গতকাল সোমবার (১৯ অক্টোবর) বাংলাদেশ পুলিশের ফেসবুক পেজে দেওয়া এক বিবৃতিতে এ দাবি করা হয়। বিবৃতিতে বলা হয়, গণমাধ্যমে প্রকাশিত সংবাদে পূজা উদযাপন পরিষদ ও মহানগর সার্বজনীন পূজা কমিটির অভিযোগের ভিত্তিতে দুর্গাপূজার আগে ৩৪টি স্থানে হামলা, প্রতিমা ভাঙচুর ও মন্দিরে চুরির ঘটনা ঘটেছে বলে জানা যায়।
 
বিবৃতিতে আরও বলা হয়, ঘটনাগুলো পর্যালোচনা ও মাঠপর্যায়ে তথ্য যাচাই করে অধিকাংশ ক্ষেত্রে নিজেদের মধ্যে নেতৃত্বের দ্বন্দ্ব, পেশাগত বা অভ্যাসগত চোরের মাধ্যমে মূল্যবান জিনিসপত্র চুরি, সরকারি বরাদ্দ বণ্টন নিয়ে অন্তর্দ্বন্দ্ব এবং মানসিক ভারসাম্যহীন ব্যক্তির মাধ্যমে প্রতিমা ভাঙচুরের মতো বিষয় উঠে এসেছে।
 
ধর্মীয় সম্প্রীতি বিনষ্টের উদ্দেশ্যে ঘটনাগুলো ঘটেছে বলে প্রচার করা হলেও তার সত্যতা পাওয়া যায়নি বলে জানায় পুলিশ। বিবৃতিতে এমন কয়েকটি ঘটনার বিবরণ তুলে ধরা হয়।
 
নারায়ণগঞ্জের আড়াইহাজারে প্রতিমার হাত ভাঙে
গত ১৬ অক্টোবর দুপুর আনুমানিক ২টা ৩০ মিনিটে নারায়ণগঞ্জের আড়াইহাজার থানাধীন রামচন্দ্রদী মধ্য মনিপাড়া সার্বজনীন দুর্গাপূজা মণ্ডপে প্রতিমা গাড়ি থেকে নামিয়ে স্থাপনের জন্য নেওয়ার সময় অসুরের ডান হাত সামান্য ভেঙে যায়। স্থানীয়ভাবে ঘটনাটি অসাবধানতাবশত ঘটেছে বলে জানা যায়। মণ্ডপের সভাপতি মোহন বাশি দাস ও সাধারণ সম্পাদক রাজিব চন্দ্র দাস প্রতিমা ক্ষতিগ্রস্ত হওয়ার বিষয়টি নিশ্চিত করেন। এ ঘটনায় ১৭ অক্টোবর আড়াইহাজার থানায় সাধারণ ডায়েরি করা হয়, যার নম্বর ৯৫০।
 
ময়মনসিংহে পারিবারিক বিরোধের জেরে প্রতিমা ক্ষতিগ্রস্ত
গত ৫ অক্টোবর বিকেল ৪টার দিকে ময়মনসিংহের কোতোয়ালি থানাধীন ঋষিপাড়া এলাকায় সুপারি পাড়াকে কেন্দ্র করে পল্লব দাসের পরিবারের সঙ্গে প্রতিবেশী জীবন ঋষির পরিবারের কথা-কাটাকাটি হয়। এর জেরে বিকেল ৫টা ৫৫ মিনিটের দিকে জীবন ঋষি, তাঁর ছেলে জয়ন্ত ও ভাগ্নে রায়মোহন প্রতিপক্ষকে লক্ষ্য করে ঢিল ছুড়লে ময়না রানী দাস (৫৮) আহত হন। ঢিলের আঘাতে মণ্ডপের সামনে রং করার জন্য রাখা গণেশ মূর্তির কিছু অংশও ভেঙে যায়।
 
মণ্ডপের সভাপতি নৃপেন্দ্র দাস ও সাধারণ সম্পাদক পরিমল চন্দ্র দাস জানান, দুই পরিবারের পূর্ববিরোধের জেরেই এ ঘটনা ঘটেছে। এ ঘটনায় ৫ অক্টোবর কোতোয়ালি থানায় সাধারণ ডায়েরি করা হয়, যার নম্বর ৫৫৪।
 
পাবনায় মানসিক ভারসাম্যহীন নারীর বিরুদ্ধে শামিয়ানা ছেঁড়ার অভিযোগ
গত ১৫ অক্টোবর সকাল ১১টার দিকে পাবনার সুজানগর থানাধীন ভায়না এলাকায় মথুরাপুর সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়সংলগ্ন রাধানগর সার্বজনীন দুর্গা মন্দিরের পূজামণ্ডপের শামিয়ানা ছিঁড়ে ফেলেন এক নারী। মন্দির কমিটি পুলিশকে জানালে সুজানগর থানা পুলিশ ঘটনাস্থলে গিয়ে তাঁকে হেফাজতে নেয়।
 
স্থানীয়দের তথ্যমতে, ওই নারী ঘটনার আগে চার থেকে পাঁচ দিন ধরে এলাকায় অবস্থান করছিলেন। মণ্ডপের সভাপতি সমীর কুমার সরকার ও সাধারণ সম্পাদক মিলন কুমার সরকার তাঁর মানসিক ভারসাম্যহীনতার বিষয়টি নিশ্চিত করেন। এ ঘটনায় ১৫ অক্টোবর সুজানগর থানায় সাধারণ ডায়েরি করা হয়, যার নম্বর ৮৪৭।
 
ঠাকুরগাঁওয়ে ইসকন ও সনাতন সম্প্রদায়ের বিরোধ
গত ১ অক্টোবর সকাল ৯টার দিকে ঠাকুরগাঁওয়ের ভুল্লী থানাধীন ভাতগাঁও এলাকায় শ্রীশ্রী রসিক রায় জিউ ইসকন মন্দিরে প্রতিমা স্থাপনকে কেন্দ্র করে বিরোধের ঘটনা ঘটে। পুলিশের বিবরণ অনুযায়ী, সনাতন সম্প্রদায়ের ৭০ থেকে ৮০ জন লাঠিসোঁটা নিয়ে মন্দিরে প্রবেশ করেন। এ সময় তাঁরা মন্দিরে থাকা ইসকন সম্প্রদায়ের চার থেকে পাঁচজনকে মারধর ও মালামাল ভাঙচুর করে বের করে দেন। পরে ইসকনের প্রতিমা সরিয়ে নিজেদের প্রতিমা স্থাপন করেন।
 
পরবর্তীতে ইসকন সম্প্রদায়ের ১০০ থেকে ১২০ জন ঘটনাস্থলে উপস্থিত হয়ে বাধা দিলে দুই পক্ষের মধ্যে মারামারি হয়। পরে স্থানীয় গণ্যমান্য ব্যক্তি, প্রশাসন ও রাজনৈতিক ব্যক্তিদের উপস্থিতিতে আলোচনার মাধ্যমে সমঝোতা হয়। ইসকন মন্দিরের পুরোনো প্রতিমা সরিয়ে নতুন করে তৈরি প্রতিমা স্থাপন করা হয়।
 
এলাকার পূজা উদযাপন কমিটির সভাপতি মনোরঞ্জন সিংহ জানান, হিন্দুধর্মের ইসকন ও সনাতন সম্প্রদায়ের মধ্যে বিরোধের জেরেই ঘটনাটি ঘটে। এ ঘটনায় ১ অক্টোবর ভুল্লী থানায় সাধারণ ডায়েরি করা হয়, যার নম্বর ৪২।
 
ঠাকুরগাঁওয়ে সরকারি বরাদ্দের অর্থ নিয়ে দুই মন্দিরের বিরোধ
গত ২ অক্টোবর রাত ১১টা ৩০ মিনিটের দিকে ঠাকুরগাঁওয়ের বালিয়াডাঙ্গী থানাধীন কাশিডাঙ্গী বৈরাগীপাড়া এলাকায় পাশাপাশি অবস্থিত কৃষ্ণ মন্দির ও কালী মন্দিরের দুই পক্ষের মধ্যে সরকারি বরাদ্দের অর্থ নিয়ে বিরোধ দেখা দেয়। কথা-কাটাকাটির একপর্যায়ে হাতাহাতি ও মারামারি হয়।
 
পুলিশ জানায়, কৃষ্ণ মন্দিরের সভাপতি কৈলাস মোহন্ত (৪৫) ও কালী মন্দিরের সভাপতি সুধীর মোহন্ত (৪৮) নিজ নিজ মন্দিরের উন্নয়নের জন্য ঠাকুরগাঁও জেলা পরিষদের কাছে আর্থিক অনুদানের আবেদন করেন। কৃষ্ণ মন্দিরের নামে এক লাখ টাকা বরাদ্দ এসেছে জানতে পেরে উভয় পক্ষই অর্থটি নিজেদের আবেদনের বিপরীতে বরাদ্দ হয়েছে বলে দাবি করে। এ থেকেই বিরোধের সূত্রপাত হয়। এ ঘটনায় ৩ অক্টোবর বালিয়াডাঙ্গী থানায় সাধারণ ডায়েরি করা হয়, যার নম্বর ১২৭।
 
টাঙ্গাইলে প্রতিমা স্থাপনের স্থান নিয়ে বিরোধ
গত ৪ অক্টোবর বিকেল ৪টা ৩০ মিনিটের দিকে টাঙ্গাইলের দেলদুয়ার থানাধীন নলখীপাড়া এলাকায় পূর্ণচন্দ্র নাট মন্দিরের নবগঠিত অস্থায়ী কমিটির উদ্যোগে দুর্গোৎসব উদযাপনের প্রস্তুতির সময় প্রতিমা স্থাপনের স্থান নিয়ে বিরোধ দেখা দেয়। মন্দিরের ভেতরে না বাইরে প্রতিমা স্থাপন করা হবে, তা নিয়ে সভাপতি জয়রথ পাল ও সাধারণ সম্পাদক দুলাল চন্দ্র পালের পক্ষের লোকজনের মধ্যে কথা-কাটাকাটি হয়। একপর্যায়ে দুই পক্ষের মধ্যে মারামারি শুরু হলে পুলিশ ঘটনাস্থলে গিয়ে পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে আনে।
 
পুলিশের বিবরণ অনুযায়ী, সাধারণ সম্পাদক দুলাল চন্দ্র পালের লোকজন প্রতিমা মন্দিরের ভেতরে স্থাপন করে সার্বজনীন রাধাগোবিন্দ নাট মন্দিরের নাম দিয়ে একটি ব্যানার টাঙান। দেলদুয়ার থানা পূজা উদযাপন কমিটির সভাপতি রঘুনাথ বসাক জানান, পরে স্থানীয় সংসদ সদস্যের মধ্যস্থতায় হিন্দু সম্প্রদায়ের লোকজনের মধ্যে সমঝোতা হয়। পূজা চলাকালে কোনো ধরনের বিশৃঙ্খলা সৃষ্টি হবে না বলে সবাই অঙ্গীকার করেন। বর্তমানে সেখানে শান্তিপূর্ণ ও উৎসবমুখর পরিবেশে পূজা উদযাপিত হচ্ছে। এ ঘটনায় ৪ অক্টোবর দেলদুয়ার থানায় সাধারণ ডায়েরি করা হয়, যার নম্বর ১৫৩।
 
বাংলাদেশ পুলিশের বিবৃতিতে বলা হয়, দুর্গাপূজাকে কেন্দ্র করে দুর্বৃত্তদের মাধ্যমে সংঘটিত হামলা, প্রতিমা ভাঙচুর ও মন্দিরে চুরির ঘটনায় পুলিশ তাৎক্ষণিকভাবে সাড়া দিয়েছে। পরিস্থিতি স্বাভাবিক রাখা, আইনগত ব্যবস্থা গ্রহণ, অধিকাংশ ঘটনায় প্রকৃত আসামিদের গ্রেপ্তার ও চোরাই মালামাল উদ্ধার, বিবদমান পক্ষগুলোর মধ্যে সমঝোতা এবং পূজামণ্ডপের সার্বিক নিরাপত্তা নিশ্চিত করা হয়েছে । বর্তমানে সারা দেশে ৩৩ হাজারের বেশি পূজামণ্ডপে নিরাপদে, নির্বিঘ্নে ও উৎসবমুখর পরিবেশে দুর্গাপূজা উদযাপিত হচ্ছে।
 
প্রসঙ্গত, দুর্গাপূজার আগে দেশের বিভিন্ন স্থানে প্রতিমা ভাঙচুর, মন্দিরে হামলা ও সংঘাত-সহিংসতার ৩৪টি ঘটনা ঘটেছে বলে জানিয়েছিল বাংলাদেশ পূজা উদযাপন পরিষদ। এসব ঘটনায় করা ১১টি মামলায় কয়েকজনকে গ্রেপ্তার করা হয়েছে বলেও জানায় সংগঠনটি।
 
গত বৃহস্পতিবার ঢাকেশ্বরী মন্দিরে আয়োজিত সংবাদ সম্মেলনে পরিষদের সাধারণ সম্পাদক সন্তোষ শর্মা বলেন, “নিরাপত্তা শুধু পূজার পাঁচ দিনের চিন্তা হতে পারে না। বছরের ৩৬৫ দিনই সবার জন্য নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে হবে।”
 
সংবাদ সম্মেলনে জানানো হয়, এ বছর দেশে ৩৩ হাজার ৮৫১টি মণ্ডপে দুর্গাপূজা অনুষ্ঠিত হবে। এর মধ্যে ঢাকা মহানগরে রয়েছে ২৫৮টি মণ্ডপ। গত বছর ঢাকা মহানগরে মণ্ডপের সংখ্যা ছিল ২৬১টি।
 
পূজার নিরাপত্তায় জেলা ও উপজেলা পর্যায়ে ২২ দফা নির্দেশনা জারির কথা জানায় পরিষদ। এসব নির্দেশনার মধ্যে রয়েছে সার্বক্ষণিক স্বেচ্ছাসেবী মোতায়েন, সম্ভব হলে সিসিটিভি ক্যামেরা স্থাপন, পর্যাপ্ত আলোকসজ্জা ও অগ্নিনির্বাপক সরঞ্জামের ব্যবস্থা এবং কোনো অপ্রীতিকর ঘটনা ঘটলে দ্রুত কর্তৃপক্ষকে জানানো।
 
হিন্দু কল্যাণ ট্রাস্টের জন্য সরকারি বরাদ্দ এক কোটি টাকা বাড়ানোর সিদ্ধান্তকে স্বাগত জানিয়ে পরিষদ ট্রাস্টটিকে ফাউন্ডেশনে রূপান্তরের দাবি পুনর্ব্যক্ত করে। একই সঙ্গে ধর্মীয় সংখ্যালঘুদের বছরজুড়ে নিরাপত্তা নিশ্চিত করা এবং হামলায় জড়িতদের দৃষ্টান্তমূলক শাস্তির দাবি জানায় সংগঠনটি।
 
সংখ্যালঘু সুরক্ষা আইন প্রণয়ন, জাতীয় সংখ্যালঘু কমিশন গঠন এবং দুর্গাপূজায় তিন দিনের সরকারি ছুটিসহ আট দফা দাবি নতুন করে তুলে ধরে পূজা উদযাপন পরিষদ। আগামী ২১ অক্টোবর প্রতিমা বিসর্জনের মধ্য দিয়ে দুর্গাপূজা শেষ হওয়ার কথা রয়েছে।

source: The Dhaka Diary

Leave a Reply

Back to top button