কেন ইরান যুদ্ধে জিততে পারছে না যুক্তরাষ্ট্র

গত ২৫ বছরের মধ্যে ২০ বছরেরও বেশি সময় ধরে তিনটি বড় সংঘাতে জড়িয়েছে যুক্তরাষ্ট্র—প্রথমে আফগানিস্তান, এরপর ইরাক এবং এখন ইরান। প্রতিটি সংঘাতই মধ্যপ্রাচ্য ও তার আশপাশের একই ভূরাজনৈতিক অঞ্চলে।
যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্টরা বারবার দাবি করেছিলেন, তাদের বিপুল সামরিক শক্তি দ্রুতই এসব যুদ্ধে বিজয় নিশ্চিত করবে।
প্রেসিডেন্ট জর্জ ডব্লিউ বুশের আমলে ২০০১ সালে মাত্র কয়েক সপ্তাহের মধ্যেই তালেবানকে ক্ষমতাচ্যুত করা হয়। ২০০৩ সালে ইরাকের প্রেসিডেন্ট সাদ্দাম হোসেনের সরকার উৎখাত করা সম্ভব হয়।
প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের সময়ে ইসরাইলের সঙ্গে যুক্তরাষ্ট্রের যৌথ হামলার প্রথম দিনেই ইরানের বেশ কয়েকজন শীর্ষ সামরিক ও রাজনৈতিক নেতাকে হত্যা করা হয় এবং দেশজুড়ে ব্যাপক হামলা চালানো হয়।
কিন্তু বারবারই দেখা গেছে, বিপুল সামরিক শক্তি রাজনৈতিক সাফল্যে রূপ নেয়নি এবং যুক্তরাষ্ট্র যে মৌলিক পরিবর্তন চেয়েছিল, তা অর্জিত হয়নি।
বর্তমানে আফগানিস্তানে আবারো ক্ষমতায় তালেবান। দীর্ঘ ও রক্তক্ষয়ী যুদ্ধের পর ইরাকে কিছুটা স্থিতিশীলতা এলেও দেশটি এখনো নানা সংকটে জর্জরিত। আর ইরানে ধর্মীয় নেতৃত্বাধীন সরকার বহাল রয়েছে; সংঘাতও শেষ হয়নি।
যুক্তরাষ্ট্রের জন্য যুদ্ধ জয় এত কঠিন কেন
জাতীয় নিরাপত্তাবিষয়ক বিশ্লেষক এবং অল দ্য প্রেসিডেন্টস ওয়ার্স গ্রন্থের লেখক পিটার বার্গেন বলেন, ‘যুদ্ধের শুরুতে ধ্বংসযজ্ঞ চালানো এবং শত্রুকে হত্যা করার ক্ষেত্রে যুক্তরাষ্ট্র সাধারণত সফল হয়। কিন্তু যুদ্ধের সমাপ্তি টানতে এবং যুদ্ধ-পরবর্তী শান্তি প্রতিষ্ঠার পরিকল্পনায় যুক্তরাষ্ট্র ধারাবাহিকভাবে ব্যর্থ।’
তার ভাষায়, ‘যুদ্ধের পর কী হবে—সেই পরিকল্পনা যুক্তরাষ্ট্র প্রায়শই করে না।’
কূটনীতির পরিবর্তে সামরিক শক্তির ওপর অতিনির্ভরতা
লেবাননভিত্তিক মধ্যপ্রাচ্য বিশ্লেষক পল সালেমের মতে, যুক্তরাষ্ট্র কূটনৈতিক সমাধানের চেয়ে সামরিক শক্তির ওপর বেশি নির্ভর করে। ফলে তারা দ্রুত ও তুলনামূলক কম খরচে যুদ্ধ শেষ করতে চায়।
ওয়াশিংটনভিত্তিক গবেষণা প্রতিষ্ঠান সেন্টার ফর স্ট্র্যাটেজিক অ্যান্ড ইন্টারন্যাশনাল স্টাডিজের এই বিশ্লেষক বলেন, ‘যুক্তরাষ্ট্রের সাম্রাজ্যবাদী আকাঙ্ক্ষা আছে, কিন্তু সেটি বাস্তবায়নে তাদের আচরণ অনেকটা পর্যটকের মতো।’
তার মতে, এই বৈপরীত্যই ইরাক ও আফগানিস্তান যুদ্ধকে প্রভাবিত করেছে এবং ইরানের ক্ষেত্রেও একই চিত্র দেখা যাচ্ছে।
সালেম বলেন, ‘এই অঞ্চলের দেশগুলোতে দীর্ঘমেয়াদি স্থিতিশীলতা বা শক্তিশালী প্রতিষ্ঠান গড়ে ওঠেনি। তাই কেবল শীর্ষ নেতৃত্বকে সরিয়ে দিলেই সবকিছু স্বাভাবিক হয়ে যাবে—এমন ধারণা বাস্তবসম্মত নয়।’
পিটার বার্গেনও একই ধরনের মত দিয়েছেন। তার ভাষায়, ‘যুক্তরাষ্ট্র একটি সাম্রাজ্য হতে চেয়েছে, কিন্তু প্রকৃত অর্থে সাম্রাজ্যের দায়িত্ব নিতে চায়নি।’
তিনি বলেন, ‘সাম্রাজ্য পরিচালনা করতে হলে স্থানীয় ভাষা শিখতে হয়, দীর্ঘ সময় সেখানে অবস্থান করতে হয়। কিন্তু যুক্তরাষ্ট্র তা করেনি। দীর্ঘমেয়াদে কোনো ভূখণ্ড ধরে রাখার জন্য যে ধরনের প্রস্তুতি ও প্রতিশ্রুতি দরকার, তা দেখাতে তারা বরাবরই অনিচ্ছুক।’
নির্বাচনী প্রতিশ্রুতি ট্রাম্পের সরে আসা
ডোনাল্ড ট্রাম্প নির্বাচনী প্রচারে ‘অন্তহীন যুদ্ধ’ থেকে যুক্তরাষ্ট্রকে দূরে রাখার প্রতিশ্রুতি দিয়েছিলেন। কিন্তু ইরানের বিরুদ্ধে সামরিক অভিযান চালিয়ে তিনি মধ্যপ্রাচ্যে যুক্তরাষ্ট্রের সবচেয়ে শক্তিশালী প্রতিদ্বন্দ্বীর সঙ্গে সরাসরি সংঘাতে জড়িয়েছেন।
তবে আগের যুদ্ধগুলোর তুলনায় তিনি স্থলবাহিনী না পাঠিয়ে বিমান হামলার ওপর নির্ভর করেছেন। ফলে মার্কিন সেনাদের হতাহতের সংখ্যা সীমিত রয়েছে।
অবসরপ্রাপ্ত মার্কিন সেনা লেফটেন্যান্ট জেনারেল ডগলাস লুট এই যুদ্ধের সমালোচক এবং স্থলবাহিনী পাঠানোরও বিরোধী। তবে তিনি মনে করেন, স্থলবাহিনী ব্যবহার না করলে যুদ্ধের লক্ষ্যও সীমিত রাখতে হবে।
ট্রাম্প বিভিন্ন সময়ে ইরানের পারমাণবিক কর্মসূচি ধ্বংস, সরকার উৎখাত এবং দেশটির বিমান, নৌ ও ক্ষেপণাস্ত্র সক্ষমতা সম্পূর্ণভাবে ধ্বংস করার কথা বলেছেন।
বুশ ও ওবামা প্রশাসনে ইরাক ও আফগানিস্তান যুদ্ধ সমন্বয়ের দায়িত্ব পালন করা লুট বলেন, ‘আমাদের লক্ষ্য, কৌশল ও সক্ষমতার মধ্যে বারবার অসামঞ্জস্য দেখা গেছে। আমরা কী পরিস্থিতির মুখোমুখি হতে যাচ্ছি, সে সম্পর্কে পর্যাপ্ত ধারণাও ছিল না।’
অসম যুদ্ধের বাস্তবতা
বিশ্বের অন্যতম শক্তিশালী সামরিক বাহিনী থাকা সত্ত্বেও যুক্তরাষ্ট্রের সামরিক সক্ষমতারও সীমাবদ্ধতা রয়েছে। নিজ ভূখণ্ডে যুদ্ধরত ছোট ও দুর্বল পক্ষগুলো নানা কৌশলে মার্কিন বাহিনীকে চাপে ফেলতে সক্ষম হয়েছে।
আফগানিস্তান ও ইরাকে বিদ্রোহীরা রাস্তার পাশে পেতে রাখা বোমা ও আত্মঘাতী হামলার মাধ্যমে মার্কিন বাহিনীকে দীর্ঘদিন বিপর্যস্ত রেখেছিল। আর ইরান স্বল্পমূল্যের ড্রোন ব্যবহার করছে এবং যুক্তরাষ্ট্র ইরানের প্রচলিত নৌবাহিনীর বড় অংশ ধ্বংস করলেও দেশটি কার্যকরভাবে হরমুজ প্রণালি অচল করে দিতে সক্ষম হয়েছে।
হার্ভার্ড বিশ্ববিদ্যালয়ের অধ্যাপক স্টিফেন ওয়াল্ট ফরেন পলিসি সাময়িকীতে লিখেছেন, ‘যারা এফ-৩৫ যুদ্ধবিমান বা যুক্তরাষ্ট্র-ইসরাইলের উন্নত সমন্বিত সামরিক অভিযানের প্রযুক্তিগত সক্ষমতায় মুগ্ধ, তারা উপলব্ধি করতে ব্যর্থ হচ্ছেন যে আধুনিক যুদ্ধ ধীরে ধীরে স্থানীয় প্রতিরক্ষাকারীদের অনুকূলে ঝুঁকছে, এমনকি তারা আপাতদৃষ্টিতে অনেক দুর্বল হলেও।’
তিনি আরো লেখেন, ‘ইরাক ও আফগানিস্তানে যুক্তরাষ্ট্র আকাশসীমার পূর্ণ নিয়ন্ত্রণ, তাৎক্ষণিক নজরদারি এবং বিপুল সমরাস্ত্রের অধিকারী ছিল। তবু তারা প্রত্যাশিত রাজনৈতিক ফল অর্জন করতে পারেনি।’
সালেমের মতে, যুক্তরাষ্ট্র বারবার ভেবেছে যে সময়ের সঙ্গে সঙ্গে এসব অপেক্ষাকৃত দুর্বল প্রতিপক্ষকে পরাজিত করা সম্ভব হবে। ফলে কূটনৈতিক সমাধানের পথকে গুরুত্ব দেওয়া হয়নি।
তার ভাষায়, ‘পররাষ্ট্র দপ্তরের পরামর্শকে দুর্বল বা অকার্যকর বলে প্রায়ই উপেক্ষা করা হয়েছে। ইরান যুদ্ধেও একই প্রবণতা দেখা যাচ্ছে। সেখানে কার্যত পররাষ্ট্র দপ্তরের কোনো উল্লেখযোগ্য ভূমিকা নেই।’
মধ্যপ্রাচ্যের যে যুদ্ধকে সফল বলে মনে করা হয়
বিশ্লেষকদের মতে, মধ্যপ্রাচ্যে যুক্তরাষ্ট্রের একটি যুদ্ধ থেকে গুরুত্বপূর্ণ শিক্ষা নেওয়া যায়—১৯৯১ সালের প্রথম উপসাগরীয় যুদ্ধ।
সেই যুদ্ধে যুক্তরাষ্ট্রের লক্ষ্য ছিল সীমিত—কুয়েত দখলকারী ইরাকি বাহিনীকে সেখান থেকে সরিয়ে দেওয়া।
প্রেসিডেন্ট জর্জ এইচ. ডব্লিউ. বুশ জাতিসংঘের সমর্থন আদায় করেন এবং একটি বৃহৎ আন্তর্জাতিক জোট গঠনের পর সামরিক অভিযান শুরু করেন।
ডগলাস লুট বলেন, ‘আমার মতে, সেটিই ছিল শেষ যুদ্ধ যেখানে যুক্তরাষ্ট্র বাস্তবসম্মত লক্ষ্য নির্ধারণ করেছিল।’
ইরান যুদ্ধের ভবিষ্যৎ অনিশ্চিত
ডোনাল্ড ট্রাম্প ইরান যুদ্ধের দ্রুত সমাপ্তি চান। তবে পল সালেম মনে করেন, এই সংঘাত যেভাবেই শেষ হোক না কেন, সেটিই শেষ অধ্যায় হবে না।
তার মতে, যুক্তরাষ্ট্র যখন ইচ্ছা তখনই ইরানের ওপর সামরিক হামলা চালানোর সক্ষমতা রাখে। অন্যদিকে, ইরানও বৈশ্বিক অর্থনীতিতে বড় ধরনের প্রভাব ফেলতে পারে এবং পরোক্ষভাবে মার্কিন প্রেসিডেন্টের ওপরও রাজনৈতিক চাপ সৃষ্টি করতে সক্ষম।
সালেম বলেন, ‘আমার ধারণা, ভবিষ্যতেও যুক্তরাষ্ট্র ও ইরানের মধ্যে নতুন করে সংঘাত হবে।’
তবে বর্তমান যুদ্ধ শেষ পর্যন্ত কীভাবে শেষ হবে, সে প্রশ্নের উত্তর এখনো অজানা।
আরএ
source: Daily Amar Desh

