ইউরোপ ব্যাধিতে নিভছে তরুণদের জীবন,তবু থামছে না নির্মম যাত্রা

ভূমধ্যসাগর পাড়ি দিয়ে অবৈধভাবে ইতালি কিংবা গ্রিসে যাওয়ার চেষ্টা থামছেই না বাংলাদেশি তরুণদের। এটি যেন প্রতিযোগিতা হয়ে দাঁড়িয়েছে। অবৈধভাবে ইউরোপে যাওয়ার নেশায় সাগরে নৌকাডুবিতে প্রাণহানি, খাবারের অভাবে মৃত্যু ও সাগরে লাশ ফেলে দেওয়ার মতো ঘটনা ঘটছে। তবু থেমে নেই সুখের স্বপ্নের আড়ালে এই নির্মম যাত্রা।
সাগরপথে অবৈধ অভিবাসনে ২০২৫ ও ২৬ সালে পরপর দুই বছর বাংলাদেশ বিশ্বে প্রথম হয়েছে। এতে আন্তর্জাতিক অঙ্গনে দেশের ভাবমূর্তি ক্ষুণ্ণ হচ্ছে বলে মনে করছেন অভিবাসন বিশেষজ্ঞরা। এর নেতিবাচক প্রভাব সংশ্লিষ্ট দেশে বসবাস করা বাংলাদেশিদের ওপরও পড়ছে বলে করেন তারা।
ভূমধ্যসাগর পাড়ি দিয়ে ইতালি বা গ্রিসে প্রবেশ করতে গিয়ে লিবিয়ার বিভিন্ন ক্যাম্পে বন্দি থেকে অসংখ্য বাংলাদেশি প্রতিনিয়ত শারীরিক নির্যাতনের শিকার হচ্ছেন। তাদের জিম্মি করে পরিবারের কাছ থেকে ২৫-৩০ লাখ টাকা পর্যন্ত আদায় করা হয়েছে। এতকিছুর পরও ইউরোপের স্বপ্নে বিভোর তরুণদের লিবিয়া যাওয়ার এই প্রবণতা থামছে না।
মৃত্যুঝুঁকি জেনেও স্থানীয় দালালদের ১২-২০ লাখ টাকা দিয়ে কেন এ পথ বেছে নিচ্ছেন তরুণরা—এমন প্রশ্নে অভিবাসন বিশেষজ্ঞরা জানান, সরকারের পক্ষ থেকে সচেতনতার অভাব, আইন প্রয়োগের নাজুক অবস্থা এবং মানবপাচার মামলার বিচারিক কার্যক্রমের দীর্ঘসূত্রতাই দায়ী। যদিও প্রবাসী কল্যাণ মন্ত্রণালয় কয়েকটি জেলায় মাসব্যাপী ব্যাপক প্রচার চালানোর পরিকল্পনার কথা জানিয়েছে।
তথ্যানুযায়ী, এ বছরের মার্চে লিবিয়া থেকে গ্রিসে যাওয়ার পথে অন্তত ১৮ বাংলাদেশির মৃত্যু হয়, যার মধ্যে ১২ জনই সুনামগঞ্জের। এর আগে ২১ মার্চ লিবিয়ার তোবরুক থেকে রওনা হওয়া নৌকাটি দিক হারিয়ে ছয় দিন খাদ্য ও পানিশূন্য অবস্থায় ভেসে ছিল। পরে পাচারকারীদের নির্দেশে লাশগুলো সাগরে ফেলে দেওয়া হয়। এরপরও এমন মৃত্যুযাত্রা থামেনি। পাঁচ মাসের ব্যবধানে একই ঘটনার পুনরাবৃত্তি ঘটে। গত ৩ আগস্ট ভূমধ্যসাগরপথে অবৈধ অভিবাসনপ্রত্যাশী ৪২ জনকে নিয়ে একটি নৌকা লিবিয়া থেকে গ্রিসের উদ্দেশে রওনা হয় । যার মধ্যে ৩৮ বাংলাদেশি এবং চারজন সুদানের নাগরিক ছিলেন। পরে সাগরে নৌকাটি ভেঙে যায় এবং জ্বালানি শেষ হয়ে যায়। এতে ৯ বাংলাদেশিসহ ১০ জনের মৃত্যু হলে লাশ সাগরে ফেলে দেওয়া হয়। প্রায় ১০ দিন সাগরে ভেসে থাকার পর ১৩ আগস্ট অবৈধ অভিবাসনপ্রত্যাশীরা মিসরের মারসা মাতরুহ উপকূলে পৌঁছালে পুলিশ তাদের উদ্ধার করে। এরপর পুলিশের তত্ত্বাবধানে স্থানীয় হাসপাতালে তাদের চিকিৎসা দেওয়া হয়। এদের মধ্যে ২৯ বাংলাদেশি নাগরিক ছিলেন।
তাদের মধ্যে একজন সুনামগঞ্জের হৃদয় পাল। তার বাবা রন্টু পাল আমার দেশকে বলেন, ৩১ জুলাই সর্বশেষ হৃদয়ের সঙ্গে মোবাইল ফোনে কথা হয়। এ সময় হৃদয় জানায়, দুয়েক দিনের মধ্যেই সে লিবিয়া থেকে গ্রিসের উদ্দেশে রওনা দেবে। এটাই ছিল হৃদয়ের সঙ্গে সর্বশেষ কথা।
তিনি আরো বলেন, গ্রিস পাঠানোর জন্য লিবিয়ায় বসবাসরত দালাল চক্রের সদস্য উমর আলী ও শান্তিগঞ্জের ডুংরিয়া গ্রামের দালাল কদ্দুস আলীর সঙ্গে ১৩ লাখ টাকার চুক্তি হয়। হৃদয়কে প্রথমে ঢাকা থেকে ভারত পাঠানো হয়। তারপর ভারত থেকে শ্রীলঙ্কা হয়ে সংযুক্ত আরব আমিরাত। সেখান থেকে লিবিয়া পাঠানো হয় তাকে। তবে লিবিয়া থেকে ভূমধ্যসাগর হয়ে গ্রিসে যাওয়ার সময় থেকে নিখোঁজ রয়েছে।
একই নৌকায় ছিলেন ওই এলাকার সাব্বির হোসেন তালহা। তার ভাই ইমরান হোসেন বলেন, তালহাকে গ্রিসে পাঠানোর জন্য লিবিয়ায় বসবাসরত সিলেটের বিয়ানীবাজারের দালাল আল আমিনের সঙ্গে ১২ লাখ টাকার মৌখিক চুক্তি হয়। আমার ভাইয়ের সঙ্গে আরো ছয়জন ছিল। মাসখানেক পর তাদের ঢাকা নেওয়া হয়। সেখানে ইমিগ্রেশন সমস্যা হওয়ায় চট্টগ্রাম থেকে সৌদি ওমরাহ ভিসায় নেওয়া হয়। পরে সেখান থেকে ট্রানজিটে দুবাই এবং তারপর লিবিয়া পৌঁছায়। আগস্টের ১ তারিখ তালহা ফোন দিয়ে জানায়, তাদের সাগরপাড়ে নিয়ে আসছে। দুয়েক দিন পর গ্রিসের উদ্দেশে নৌকা ছাড়বে।
তিনি বলেন, এর কয়েকদিন পর দালাল আল আমিন ফোন দিয়ে জানায়, আপনার ভাইয়ের জন্য চিন্তা করবেন না। তারা গ্রিসের কাছাকাছি চলে গেছে। পরে যতবার যোগাযোগ করি, ততবারই দালাল শুধু সান্ত্বনা দিয়ে বলে কয়েক দিনের মধ্যে পৌঁছে যাবে। আমার ভাইয়ের সঙ্গে কোনো যোগাযোগ করতে না পেরে বিভিন্নভাবে খোঁজ নিয়ে জানতে পারি, ১১ জন ভূমধ্যসাগরে মারা গেছে। কিন্তু আমার ভাইয়ের খোঁজ পাচ্ছি না।
ইউরোপের সীমান্তরক্ষী বাহিনী ফ্রন্টেক্সের তথ্যানুযায়ী, লিবিয়া থেকে ভূমধ্যসাগর পাড়ি দিয়ে ইউরোপে প্রবেশের চেষ্টাকারীদের মধ্যে বাংলাদেশিরাই সবচেয়ে বেশি। এই পথটি সেন্ট্রাল মেডিটেরেনিয়ান রুট নামে পরিচিত। ২০২৫ সালে ভূমধ্যসাগর পাড়ি দিয়ে ২০ হাজার ২৫৯ বাংলাদেশি ইউরোপে প্রবেশ করেছেন। আর ২০২৬ সালের প্রথম ছয় মাসেই ৪,২৪৯ বাংলাদেশি এভাবে ইতালিতে গেছেন। একই সময়ে লিবিয়া থেকে সাগরপথে গ্রিসে গেছেন ৩,৬০৮ বাংলাদেশি।
এছাড়া ২০০৯ থেকে ২০২৬ সালের জুন পর্যন্ত এই পথে প্রায় ১ লাখ ১০ হাজার বাংলাদেশি ইউরোপে প্রবেশ করেছেন। এভাবে অবৈধভাবে ঢুকতে গিয়ে মাঝে মধ্যেই প্রাণহানির ঘটনা ঘটছে। পাশাপাশি ইতালি বা গ্রিসে পৌঁছানোর পথে নির্যাতন, জিম্মি করে অর্থ আদায় এবং মানবেতর পরিস্থিতিতে আটকে রাখার ঘটনাও নিয়মিত ঘটছে। অনেকেই শেষ পর্যন্ত লিবিয়ায় আটক হয়ে দেশে ফিরতে বাধ্য হয়েছেন। গত ছয় বছরে প্রায় ১৫ হাজার বাংলাদেশিকে এভাবে লিবিয়া থেকে ফেরত পাঠানো হয়েছে।
আন্তর্জাতিক অভিবাসন সংস্থা আইওএমের ‘মিসিং মাইগ্র্যান্টস প্রজেক্ট’-এর গ্লোবাল ডেটাবেজ পর্যালোচনায় দেখা যায়, ২০১৫ থেকে ২০২৫ সাল পর্যন্ত বিশ্বের ৯টি অনিয়মিত অভিবাসনপথে ঘটে যাওয়া ৮৪টি পৃথক দুর্ঘটনায় অন্তত ১,৩২৯ বাংলাদেশির মৃত্যু হয়েছে এবং আরো ৮৫৯ জন নিখোঁজ রয়েছেন। অর্থাৎ গত এক দশকে ২,১৮৮ বাংলাদেশির কোনো না কোনোভাবে মৃত্যু বা নিখোঁজ হওয়ার ঘটনা নথিভুক্ত হয়েছে। এর মধ্যে লিবিয়া বা তিউনিসিয়া থেকে ভূমধ্যসাগর পাড়ি দিয়ে ইতালি পৌঁছার চেষ্টায় ১,১৭১ বাংলাদেশি মারা গেছেন এবং নিখোঁজ হয়েছেন ৭৭৩ জন। অর্থাৎ মোট মৃত্যু ও নিখোঁজের প্রায় ৯০ শতাংশেরও বেশি ঘটেছে শুধু এ রুটে।
ব্র্যাকের এক গবেষণায় দেখা গেছে, ইতালি বা গ্রিসে যাওয়ার চেষ্টা করা বাংলাদেশিদের বেশির ভাগই মাদারীপুর, শরীয়তপুর, ফরিদপুর, সিলেট, সুনামগঞ্জ, হবিগঞ্জ, মুন্সীগঞ্জ, নোয়াখালী, ব্রাহ্মণবাড়িয়া, কিশোরগঞ্জ ও কুমিল্লার বাসিন্দা। তাদের বেশির ভাগের বয়স ২৫ থেকে ৪০ বছরের মধ্যে।
যাত্রাপথ বিশ্লেষণে দেখা গেছে, ঢাকা থেকে মিসর, দুবাই বা তুরস্ক হয়ে সবচেয়ে বেশি মানুষ লিবিয়ায় গেছেন। ভালো চাকরির প্রলোভন দেখানো হলেও ৭৫ শতাংশ কোনো কাজ পাননি। উল্টো তাদের বন্দিদশায় থাকতে হয়েছে। এর মধ্যে ৯৩ শতাংশ ক্যাম্পে বন্দি ছিলেন এবং ৭৯ শতাংশ শারীরিক নির্যাতনের শিকার হয়েছেন। এছাড়া লিবিয়ায় পৌঁছানোর পর ৬৯ শতাংশ মুক্তভাবে চলাফেরার স্বাধীনতা হারিয়েছেন। অধিকাংশই পর্যাপ্ত খাবারও পাননি। এতকিছুর পরও ইউরোপের স্বপ্নে লিবিয়া যাওয়ার এই প্রবণতা থামছে না। পাশাপাশি প্রতারিত বা নির্যাতনের শিকার ব্যক্তিরা দেশে ফিরে মামলা করলেও মূল আসামিরা ধরাছোঁয়ার বাইরে থেকে যাচ্ছে।
এ বিষয়ে অভিবাসন বিশেষজ্ঞ আসিফ মুনির আমার দেশকে বলেন, অবৈধভাবে অভিবাসনরোধের বিষয়ে প্রচার ও সচেতনতার অভাব রয়েছে। পাশাপাশি আইনের প্রয়োগটাও খুব জরুরি। গ্রামাঞ্চলগুলোয় সঠিকভাবে প্রচার পৌঁছায় না। এছাড়া টিটিসিগুলোয় এসব বিষয়ে সচেতনতার জন্য আলাদা ক্লাস রাখা যায়।
তিনি বলেন, ভূমধ্যসাগর পাড়ি দিয়ে অবৈধ অভিবাসনের ঝুঁকি কমিয়ে আনতে শুধু বাংলাদেশের একক আইন যথেষ্ট নয়। এজন্য প্রয়োজন আন্তর্জাতিক সমুদ্রসীমা আইন, ট্রানজিট দেশ এবং গন্তব্য দেশগুলোর অভিবাসন আইনের একটি সমন্বিত প্রয়োগ। এই লক্ষ্য অর্জনে মধ্যপ্রাচ্যের সংশ্লিষ্ট দেশগুলো, লিবিয়া এবং ইউরোপের (বিশেষ করে ইতালি) সঙ্গে শক্তিশালী আন্তঃদেশীয় সমন্বয় নেটওয়ার্ক গড়ে তোলা প্রয়োজন।
এই নেটওয়ার্কের সফল বাস্তবায়নে দেশগুলোর ইমিগ্রেশন কর্তৃপক্ষ, স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয় এবং অভিবাসনবিষয়ক দপ্তরগুলোর পারস্পরিক নীতিগত সমন্বয় প্রয়োজন। একই সঙ্গে মানবপাচারকারী চক্রের রুট ও তৎপরতা ধ্বংস করতে এই দেশগুলোর গোয়েন্দা সংস্থাগুলোর মধ্যে রিয়েল টাইম তথ্য আদান-প্রদান ও যৌথ নজরদারি নিশ্চিত করতে হবে। এই বহুপক্ষীয় উদ্যোগকে টেকসই করতে এবং প্রয়োজনীয় আর্থিক ও কৌশলগত সহায়তার জন্য জাতিসংঘের ড্রাগস অ্যান্ড ক্রাইমবিষয়ক সংস্থাসহ অন্যান্য আন্তর্জাতিক সহযোগী সংস্থার সঙ্গে বিশেষ চুক্তি বা অংশীদারত্ব গঠন করা যেতে পারে।
প্রবাসীকল্যাণ ও বৈদেশিক কর্মসংস্থান মন্ত্রী আরিফুল হক চৌধুরী আমার দেশকে বলেন, অবৈধপথে বিদেশ লোক পাঠানোর সঙ্গে জড়িত চক্র চিহ্নিত করে ব্যবস্থা নেওয়ার
উদ্যোগ চলছে। এ ব্যাপারে সুনামগঞ্জ-হবিগঞ্জ থেকে শুরু করে মাদারীপুরসহ কয়েকটি জেলায় আগামী এক মাস ব্যাপক প্রচার চালানোর পরিকল্পনা রয়েছে।
তিনি বলেন, সরকার নতুন শ্রমবাজার খোলা ও স্বল্প খরচে দক্ষ কর্মী পাঠাতে সর্বোচ্চ গুরুত্ব দিয়ে কাজ করছে। তবু আমাদের তরুণরা মরণপথ বেছে নিচ্ছেন, এটি আমাদের জন্য খুব দুঃখজনক। সাগর পথ বেছে নেওয়ার আগে অন্তত নিজের জীবন ও পরিবারের কথা ভাবা উত্তম। এটি কেবল দুর্ঘটনা না, এটি পুরো পরিবারকে ধ্বংস করার ঘটনা। তবে অবৈধপথে ইউরোপ যাওয়ার প্রবণতা কমানোর জন্য আমরা সর্বোচ্চ গুরুত্ব দিচ্ছি।
এমই
source: Daily Amar Desh