আজ বিশ্ব চিঠি দিবস: ডাকবাক্সে জমে থাকা ভালোবাসার দিন

একটি সাদা কাগজ। হাতে লেখা কয়েকটি লাইন। ভাঁজ করে খামের ভেতর রাখা। খামের ওপর প্রাপকের নাম-ঠিকানা। তারপর সেটি পৌঁছে দেওয়া ডাকবাক্সে। এরপর শুরু অপেক্ষা—কবে চিঠিটি পৌঁছাবে, কবে তার উত্তর আসবে! উত্তর আসার দিনটি যেন ছোটখাটো উৎসব।
এখন সেই দৃশ্য অনেকটাই স্মৃতির অংশ। মুঠোফোনের এক ক্লিকেই বার্তা পৌঁছে যায় পৃথিবীর এক প্রান্ত থেকে অন্য প্রান্তে। ই-মেইল, মেসেঞ্জার, হোয়াটসঅ্যাপ কিংবা সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে কয়েক সেকেন্ডেই যোগাযোগ হয়ে যায়। তবু চিঠির আবেদন পুরোপুরি শেষ হয়ে যায়নি। বরং দ্রুতগতির ডিজিটাল যোগাযোগের ভিড়ে হাতে লেখা চিঠি হয়ে উঠেছে আরও ব্যক্তিগত, আরও আবেগময় এবং আরও দুর্লভ।
প্রতি বছর ১ সেপ্টেম্বর বিশ্বব্যাপী পালিত হয় বিশ্ব চিঠি দিবস বা ‘ওয়ার্ল্ড লেটার রাইটিং ডে’। অস্ট্রেলিয়ার লেখক, আলোকচিত্রী ও শিল্পী রিচার্ড সিম্পকিন ২০১৪ সালের ১ সেপ্টেম্বর সিডনির ওয়েভারলি কলেজে দিবসটির সূচনা করেন। তাঁর লক্ষ্য ছিল মানুষকে আবার কাগজ-কলমে চিঠি লেখার অভ্যাসে ফিরিয়ে আনা।
চিঠির প্রতি সিম্পকিনের এই টানও তৈরি হয়েছিল ব্যক্তিগত অভিজ্ঞতা থেকে। ১৯৯০-এর দশকের শেষ দিকে তিনি যাঁদের অস্ট্রেলিয়ার কিংবদন্তি মনে করতেন, তাঁদের কাছে চিঠি লিখতেন। সেসব চিঠির উত্তরও পেতেন। সেই অভিজ্ঞতা পরে ২০০৫ সালে ‘অস্ট্রেলিয়ান লিজেন্ডস’ বইয়ে তুলে ধরেন। আর চিঠি লেখার আনন্দকে আরও ছড়িয়ে দিতেই ২০১৪ সালে শুরু করেন বিশ্ব চিঠি দিবস।
চিঠির সবচেয়ে বড় শক্তি সম্ভবত এর ধীরগতি। এখন কেউ বার্তা পাঠিয়ে উত্তর না পেলে কয়েক মিনিটের মধ্যেই অস্থির হয়ে পড়তে পারেন। অথচ চিঠির যুগে অপেক্ষাটাই ছিল যোগাযোগের একটি অংশ। চিঠি লিখতে বসে মানুষকে ভাবতে হতো—কী লিখবেন, কীভাবে লিখবেন, কোন কথাটি আগে বলবেন, কোন কথাটি শেষে রাখবেন। ফলে চিঠির প্রতিটি বাক্যের পেছনে থাকত সময় ও মনোযোগ।
অস্ট্রেলিয়ান ব্রডকাস্টিং করপোরেশনের একটি প্রতিবেদনে রিচার্ড সিম্পকিনও বলেছেন, ই-মেইল বা তাৎক্ষণিক বার্তার মতো চিঠি দ্রুত লিখে পাঠিয়ে দেওয়া যায় না; কী বলা হবে, তা নিয়ে ভাবতে হয়। তাঁর উদ্যোগের অন্যতম উদ্দেশ্যই ছিল মানুষকে সেই মনোযোগী লেখার অভ্যাসে ফিরিয়ে আনা।
আর চিঠির সঙ্গে জড়িয়ে আছে ডাকবাক্সের গল্পও। একসময় রাস্তার পাশে দাঁড়িয়ে থাকা ছোট্ট একটি ডাকবাক্স ছিল দূরের মানুষের কাছে পৌঁছানোর দরজা। নিজের হাতে লেখা কথাগুলো সেখানে ফেলে দিয়ে মানুষ অপেক্ষা করত অচেনা ডাকপিয়নের পায়ের শব্দের জন্য।
ডাকবাক্সের ইতিহাসও বেশ পুরোনো। যুক্তরাষ্ট্রের ডাক বিভাগের ইতিহাস অনুযায়ী, ১৮৫৮ সালে শহরের রাস্তায় চিঠি সংগ্রহের বাক্স স্থাপন শুরু হয়। এর ফলে চিঠি পাঠাতে প্রতিবার ডাকঘরে গিয়ে হাতে তুলে দেওয়ার প্রয়োজন থাকল না; রাস্তার সংগ্রহ বাক্সেই চিঠি ফেলে দেওয়া সম্ভব হলো।
ডাকব্যবস্থার বিকাশ শুধু চিঠিকে দ্রুত পৌঁছে দেয়নি, মানুষের সামাজিক সম্পর্কও বদলে দিয়েছে। যুক্তরাষ্ট্রের ডাক বিভাগের ইতিহাসে বলা হয়েছে, উনিশ শতকে ডাকের খরচ কমে আসা এবং ডাকব্যবস্থা সহজ হওয়ায় দূরে থাকা বন্ধু, পরিবার ও পরিচিতদের সঙ্গে যোগাযোগের আগ্রহ বেড়েছিল। অর্থাৎ ডাকব্যবস্থা শুধু চিঠি বহন করেনি, দূরত্বের মধ্যেও সম্পর্ক ধরে রাখার সুযোগ তৈরি করেছে।
বাংলার জীবনেও চিঠি একসময় ছিল অতি পরিচিত দৃশ্য। ডাকপিয়ন বাড়ির সামনে এসে কারও নাম ধরে ডাকছেন—এই দৃশ্যের সঙ্গে জড়িয়ে আছে অপেক্ষা, আনন্দ, কখনও উৎকণ্ঠা। দূরে থাকা সন্তান বাবা-মাকে লিখেছে, স্বামী লিখেছেন স্ত্রীকে, বন্ধু লিখেছে বন্ধুকে। কেউ লিখেছে চাকরির খবর, কেউ পরীক্ষার ফল, কেউ বাড়ির অভাব-অভিযোগ, কেউ আবার শুধু লিখেছে—‘ভালো আছি, তুমি কেমন আছ?’
চিঠির ভাষাও তাই সবসময় আনুষ্ঠানিক ছিল না। বরং অনেক সময় চিঠিই হয়ে উঠত এমন কথা বলার জায়গা, যা মুখোমুখি বলা সম্ভব হয়নি। অভিমান, ভালোবাসা, অনুশোচনা, অপেক্ষা কিংবা মনের গোপন কথাগুলো কাগজে লিখে দেওয়া যেত। প্রিয় মানুষের হাতের লেখা দেখেই অনেকের মন ভালো হয়ে যেত।
একটি চিঠির আলাদা একটা শরীরও আছে। কাগজের ভাঁজ, খামের ওপর হাতের লেখা, কালির দাগ, কোথাও ভুল করে কেটে দেওয়া শব্দ, কখনও কাগজে লেগে থাকা পুরোনো গন্ধ—সব মিলিয়ে চিঠিটি হয়ে ওঠে একটি স্মৃতি। ডিজিটাল বার্তার মতো সেটি শুধু পর্দায় দেখা যায় না; হাতে ধরা যায়, যত্ন করে তুলে রাখা যায়, বহু বছর পর আবার পড়া যায়।
চিঠির এই স্পর্শযোগ্যতাই তাকে স্মৃতির বস্তুতে পরিণত করেছে। আজকের একটি মেসেজ হয়তো কয়েক মাস পর হাজারো বার্তার ভিড়ে হারিয়ে যায়। কিন্তু বহু বছর আগের একটি চিঠি পুরোনো বইয়ের ভাঁজে কিংবা কাঠের বাক্সে পাওয়া গেলে সেটি মুহূর্তেই ফিরিয়ে নিয়ে যেতে পারে কোনো এক নির্দিষ্ট সময়, মানুষ কিংবা সম্পর্কের কাছে।
চিঠির গুরুত্ব শুধু ব্যক্তিগত আবেগেই সীমাবদ্ধ নয়। ইতিহাসের অনেক গুরুত্বপূর্ণ অধ্যায়ও চিঠির পাতায় সংরক্ষিত হয়েছে। ব্যক্তিগত চিঠি, রাজনৈতিক চিঠিপত্র, যুদ্ধকালীন চিঠি কিংবা সাহিত্যিকদের পারস্পরিক যোগাযোগ—এসব অনেক সময় অতীতের মানুষ ও সময়কে বুঝতে গুরুত্বপূর্ণ দলিল হিসেবে কাজ করে। ডাকব্যবস্থার ইতিহাসও তাই কেবল যোগাযোগের ইতিহাস নয়; এটি সমাজ, সংস্কৃতি ও মানুষের সম্পর্ক বদলে যাওয়ার ইতিহাসও।
তবে প্রযুক্তির সঙ্গে পাল্লা দিয়ে চিঠির ব্যবহার কমেছে—এ কথা অস্বীকার করার উপায় নেই। এখন জরুরি খবরের জন্য ফোন, দীর্ঘ বার্তার জন্য মেসেজিং অ্যাপ, অফিসের যোগাযোগে ই-মেইল—সবই হাতের মুঠোয়। অপেক্ষার জায়গা দখল করেছে তাৎক্ষণিকতা। ডাকপিয়নের জন্য জানালায় তাকিয়ে থাকার বদলে এখন মানুষ ফোনের নোটিফিকেশনের অপেক্ষা করে।
তারপরও চিঠির আবেদন আলাদা। কারণ, একটি চিঠি লিখতে হলে কাউকে সময় দিতে হয়। নিজের ব্যস্ততার ভেতর থেকে কিছুটা সময় আলাদা করে কাগজের সামনে বসতে হয়। প্রাপককে নিয়ে ভাবতে হয়। আর সেই সময়টুকুই হয়তো চিঠির সবচেয়ে বড় উপহার।
বিশ্ব চিঠি দিবসের মূল বার্তাও সেখানেই—ডিজিটাল যোগাযোগকে বাদ দেওয়া নয়, বরং দ্রুত যোগাযোগের এই যুগে ধীর, ব্যক্তিগত ও অর্থবহ যোগাযোগের জায়গাটুকু বাঁচিয়ে রাখা। দিবসটির প্রতিষ্ঠাতা রিচার্ড সিম্পকিন এখনো স্কুলে চিঠি লেখার কর্মশালা করেন এবং শিশু-কিশোর ও বড়দের সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম থেকে কিছুটা বিরতি নিয়ে কাউকে চিঠি লেখার উৎসাহ দেন।
আজ তাই ডাকবাক্সের দিকে তাকালে হয়তো আগের মতো চিঠির স্তূপ দেখা যাবে না। অনেক ডাকবাক্স হয়তো নীরব দাঁড়িয়ে আছে। তবু তার ভেতরে জমে আছে এক সময়ের গল্প—কেউ অপেক্ষা করেছে, কেউ লিখেছে, কেউ উত্তর পেয়েছে, কেউ আবার উত্তর না পেয়েও বছরের পর বছর চিঠিটি যত্ন করে রেখে দিয়েছে।
মুঠোফোনের পর্দায় ‘ভালো থেকো’ লেখা যায় এক সেকেন্ডে। কিন্তু কাগজে ‘ভালো থেকো’ লিখতে গেলে হাত থামে, মন ভাবে, শব্দ বেছে নেয়। আর সেই কারণেই হয়তো একটি হাতে লেখা চিঠি শুধু কয়েকটি শব্দ নয়—এটি হয়ে ওঠে একজন মানুষের আরেকজন মানুষের জন্য রেখে যাওয়া সময়, স্মৃতি ও ভালোবাসার ছোট্ট দলিল।
বিশ্ব চিঠি দিবসে তাই হয়তো পুরোনো সেই ডাকবাক্সের কথা মনে করার পাশাপাশি একটি কাজ করা যায়—কাগজ-কলম হাতে নিয়ে এমন কাউকে একটি চিঠি লেখা, যাকে অনেক দিন কিছু বলা হয়নি।
কারণ, সব যোগাযোগ দ্রুত হতে হয় না। কিছু কথা একটু দেরিতে পৌঁছালেই বরং তার মূল্য আরও বেড়ে যায়।
source: The Daily Campus