জুলাই সনদের যেখানে ‘ভিন্নমত’ সেখানে প্রাধান্য পাবে ইশতেহার

গণভোটের রায় নয়, অন্তর্বর্তী সরকারের আমলে জাতীয় ঐকমত্য কমিশনের সঙ্গে সংলাপে অংশগ্রহণকারী রাজনৈতিক দলগুলোর স্বাক্ষরিত জুলাই সনদ এবং ক্ষমতাসীন বিএনপির নির্বাচনি ইশতেহার ও দলটির ৩১ দফার আলোকেই মূলত সংবিধানে ১৮তম সংশোধনী আনা হচ্ছে। জুলাই সনদে যেসব ইস্যুতে ‘নোট অব ডিসেন্ট’ বা ভিন্নমত রয়েছে, সেখানে প্রাধান্য পাবে বিএনপিসহ মিত্র দলগুলোর নির্বাচনি ইশতেহার। ফলে, সম্ভাব্য এই সংশোধনীর সঙ্গে সরাসরি গণভোটের রায়ের কোনো সম্পর্ক থাকছে না। উল্লেখ্য, এই গণভোটকে ইতিমধ্যেই ‘মহাপ্রতারণা ও সংবিধান পরিপন্থী’ হিসেবে আখ্যায়িত করেছে সরকারি দল বিএনপি।
এ বছরের ডিসেম্বরের মধ্যেই সংসদে প্রতিবেদন দেওয়ার লক্ষ্যে কাজের গতি বাড়িয়েছে ‘সংবিধান সংশোধন-সম্পর্কিত বিশেষ কমিটি’। গত ১৩ জুলাই গঠিত এই কমিটি প্রথম বৈঠক করেছিল ৪ আগস্ট। এরপর দীর্ঘ বিরতি দিয়ে দ্বিতীয় বৈঠক করে গত ২০ সেপ্টেম্বর। গতি বাড়াতে আজ রবিবার আবারও বৈঠকে বসছে বিশেষ কমিটি। ২০ সেপ্টেম্বর কমিটি রাজনৈতিক দলগুলোর মতামত নিয়েছিল। আজ কমিটি জ্যেষ্ঠ সাংবাদিকদের মতামত নেবে। ৪ আগস্টের প্রথম বৈঠকেই বিশেষ কমিটি রাজনৈতিক দল, সংবিধানবিশেষজ্ঞ, আইনজীবী, গণমাধ্যমের সম্পাদকসহ অংশীজনদের সঙ্গে আলোচনা করার সিদ্ধান্ত নেয়। এরই ধারাবাহিকতায় আজ জ্যেষ্ঠ সাংবাদিকদের মত নেবে কমিটি।
ডিসেম্বরের মধ্যে সংসদে প্রতিবেদন দেওয়ার লক্ষ্যে ইতিমধ্যে বিশেষ কমিটি প্রতিবেদন তৈরির কাজও শুরু করেছে। ডিসেম্বরের মধ্যে সংসদে প্রতিবেদন দেওয়া হলে সেক্ষেত্রে আগামী বছরের জানুয়ারিতে সংসদের শীতকালীন ও ইংরেজি নতুন বছর ২০২৭-এর প্রথম অধিবেশনেই আসতে পারে সংবিধানের ১৮তম সংশোধনী বিল।
২০ সেপ্টেম্বরের বৈঠক শেষে বিশেষ কমিটির সভাপতি ও স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী সালাহউদ্দিন আহমদ বলেছেন, আমরা খুব দ্রুত গতিতে এগোতে চাই। সম্ভব হলে আমরা প্রতি সপ্তাহে একটি বৈঠকের আয়োজন করব। জুলাই সনদ নোট অব ডিসেন্টসহ (ভিন্নমত) যেভাবে স্বাক্ষরিত হয়েছে, তারা সেভাবে সেটা বাস্তবায়ন করবেন। তিনি বলেন, আমরা জুলাই জাতীয় সনদ যেভাবে স্বাক্ষরিত হয়েছে সেভাবে অক্ষরে অক্ষরে বাস্তবায়ন করব। বিশেষ কমিটি সংসদে প্রতিবেদন দেওয়ার পর সেটা আইন মন্ত্রণালয় বিল আকারে সংসদে আনবে।
রাষ্ট্রের বিভিন্ন ক্ষেত্রে সংস্কারের লক্ষ্যে ৩০টি রাজনৈতিক দল ও জোটের সঙ্গে আলোচনা করে জুলাই জাতীয় সনদ তৈরি করা হয়েছিল। পাশাপাশি সংবিধানবিশেষজ্ঞদের সঙ্গেও সেসময় আলোচনা হয়েছিল। বাম ধারার চারটি দল সনদে সই করেনি। সব মিলিয়ে ২৬টি রাজনৈতিক দল ও জোট ঐ সনদে সই করে।
জুলাই সনদের ৮৪টি সংস্কার প্রস্তাবের মধ্যে ৪৮টি সংবিধানসম্পর্কিত। এগুলো বাস্তবায়নে অন্তর্বর্তী সরকার জুলাই জাতীয় সনদ (সংবিধান সংস্কার) বাস্তবায়ন আদেশ জারি করেছিল। সংসদ নির্বাচনের সঙ্গে সংস্কার প্রস্তাবগুলো নিয়ে গণভোট হয়। এতে ‘হ্যাঁ’ জয়ী হওয়ায় ঐ আদেশ অনুসারে ত্রয়োদশ সংসদের সদস্যদের নিয়ে ‘সংবিধান সংস্কার পরিষদ’ গঠন এবং ১৮০ কার্যদিবসের মধ্যে সংবিধান সংস্কারকাজ শেষ করার কথা। তবে নির্বাচন শেষে সরকার গঠনের পর এই সংস্কার পরিষদ গঠিত হয়নি। বিএনপি জোটের সদস্যরা সংস্কার পরিষদের সদস্য হিসেবে শপথও নেননি।
জুলাই সনদে থাকা সংবিধান সম্পর্কিত সংস্কার প্রস্তাবের বিষয়ে সালাহউদ্দিন আহমদ বলেন, ৪৮টার মধ্যে অনেক কিছু আছে। আমরা এগ্রিড হয়েছি রাজনৈতিক সমঝোতার দলিল হিসেবে জুলাই জাতীয় সনদে। সেগুলো তো আমরা নেবই। আর যেগুলোতে আমরা নোট অব ডিসেন্ট দিয়েছি, সেগুলো নোট অব ডিসেন্ট আকারে নেব। এর বাইরে আমাদের নির্বাচনি ইশতেহারে আছে। সেগুলো আমরা ধারণ করব।
জুলাই সনদের মৌলিক সংস্কার প্রস্তাবে বিএনপির নোট অব ডিসেন্টের বিষয়ে বিশেষ কমিটির সদস্য ও আইনমন্ত্রী মো. আসাদুজ্জামানের মতে, জুলাই সনদেই সেটার ব্যাখ্যা দেওয়া আছে। কোনো জায়গায় যদি বিএনপি দ্বিমত পোষণ করে থাকে এবং সেই দ্বিমতের আলোকে যদি তার নির্বাচনি ইশতেহার অন্তর্ভুক্ত করা থাকে, তাহলে সেটা প্রিভেইল করবে। সেটাও কিন্তু জুলাই সনদেরই অংশ।
যা ছিল গণভোটে
এ বছরের ১২ ফেব্রুয়ারি জাতীয় সংসদ নির্বাচনের সঙ্গে একই দিনে পৃথক রঙিন ব্যালটে চারটি বিষয়ে অনুষ্ঠিত হয় গণভোট। এই চারটি বিষয়ের ওপর একটিমাত্র প্রশ্নে ‘হ্যাঁ’ বা ‘না’ ভোট দিয়ে ভোটাররা মতামত জানান। গণভোটের ব্যালটের প্রশ্নটি ছিল ‘আপনি কি জুলাই জাতীয় সনদ (সংবিধান সংস্কার) বাস্তবায়ন আদেশ, ২০২৫ এবং জুলাই জাতীয় সনদে লিপিবদ্ধ সংবিধান সংস্কার-সম্পর্কিত নিম্নলিখিত প্রস্তাবগুলোর প্রতি আপনার সম্মতি জ্ঞাপন করছেন?’
(ক). নির্বাচনকালীন সময়ে তত্ত্বাবধায়ক সরকার, নির্বাচন কমিশন এবং অন্যান্য সাংবিধানিক প্রতিষ্ঠান জুলাই সনদে বর্ণিত প্রক্রিয়ার আলোকে গঠন করা হবে। (খ). আগামী সংসদ হবে দুই কক্ষবিশিষ্ট। জাতীয় সংসদ নির্বাচনে দলগুলোর প্রাপ্ত ভোটের সংখ্যানুপাতে ১০০ জন সদস্যবিশিষ্ট একটি উচ্চকক্ষ গঠিত হবে এবং সংবিধান সংশোধন করতে হলে উচ্চকক্ষের সংখ্যাগরিষ্ঠ সদস্যের অনুমোদন দরকার হবে। (গ). সংসদে নারীর প্রতিনিধি বৃদ্ধি, বিরোধী দল থেকে ডেপুটি স্পিকার ও সংসদীয় কমিটির সভাপতি নির্বাচন, প্রধানমন্ত্রীর মেয়াদ সীমিতকরণ, রাষ্ট্রপতির ক্ষমতা বৃদ্ধি, মৌলিক অধিকার সম্প্রসারণ, বিচার বিভাগের স্বাধীনতা ও স্থানীয় সরকারসহ বিভিন্ন বিষয়ে যে ৩০টি প্রস্তাবে জুলাই জাতীয় সনদে রাজনৈতিক দলগুলোর ঐকমত্য হয়েছে সেগুলো বাস্তবায়নে নির্বাচনে বিজয়ী দলগুলো বাধ্য থাকবে। (ঘ). জুলাই সনদে বর্ণিত অন্যান্য সংস্কার রাজনৈতিক দলগুলোর প্রতিশ্রুতি অনুসারে বাস্তবায়ন করা হবে।
জুলাই জাতীয় সনদ (সংবিধান সংস্কার) বাস্তবায়ন আদেশে কী ছিল
গত বছরের ১৩ নভেম্বর ‘জুলাই জাতীয় সনদ (সংবিধান সংস্কার) বাস্তবায়ন আদেশ, ২০২৫’-এর গেজেট জারি হয়েছিল। আদেশের ৭-এ সংবিধান সংস্কার পরিষদ গঠন এবং এর কার্যাবলি ও বিলুপ্তির কথা বলা হয়েছে। এতে বলা হয়, ‘পরিষদ উহার প্রথম অধিবেশন শুরুর তারিখ হতে ১৮০ কার্যদিবসের মধ্যে জুলাই জাতীয় সনদ এবং গণভোটের ফলাফল অনুসারে সংবিধান সংস্কার সম্পন্ন করবে।’
তবে, বিশেষ কমিটির সভাপতি ও স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী সালাহউদ্দিন আহমদ বলেছেন, ১০০ সদস্য নিয়ে উচ্চকক্ষ গঠনের বিষয়ে অনেক দল একমত। এটি সরাসরি জনপ্রতিনিধিদের মাধ্যমে নির্বাচিত হবে না। সংসদে প্রাপ্ত আসনের আনুপাতিক হারে বিভিন্ন শ্রেণি-পেশার বিশিষ্টজনদের নিয়ে উচ্চকক্ষ গঠিত হবে। তবে সংবিধান সংশোধনের ক্ষমতা উচ্চকক্ষের থাকবে না।
শু
source: Barta Bazar