আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর ১৯ ফেসবুক পেজে মনিটাইজেশন, আয় যাচ্ছে কোথায়?

বাংলাদেশের আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর অন্তত ১৯টি ফেসবুক পেজে মনিটাইজেশনের সুযোগ চালু হয়েছে। এসব পেজের মধ্যে বাংলাদেশ পুলিশ, বাংলাদেশ নৌবাহিনী, বিমানবন্দর আর্মড পুলিশ ব্যাটালিয়ন, ট্যুরিস্ট পুলিশ ও বিভিন্ন জেলা পুলিশের পেজ রয়েছে।
ভুয়া খবর ও অপতথ্য যাচাইকারী প্রতিষ্ঠান ডিসমিসল্যাবের এক গবেষণায় এসব তথ্য উঠে আসে।
বুধবার (৩০ সেপ্টেম্বর) প্রকাশিত গবেষণার বরাতে বিবিসি বাংলার খবরে বলা হয়েছে, ২০২৫ সালের সেপ্টেম্বর থেকে আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর বিভিন্ন পেজ মেটার কনটেন্ট মনিটাইজেশন কর্মসূচিতে যুক্ত হতে শুরু করে।
ডিসমিসল্যাবের তালিকায় থাকা ১৯টি পেজের মধ্যে রংপুর রেঞ্জের ডিআইজি, বান্দরবানের পুলিশ সুপার এবং বগুড়া, চুয়াডাঙ্গা, কুমিল্লা, ব্রাহ্মণবাড়িয়া, নওগাঁ, শেরপুর, লক্ষ্মীপুর, মাগুরা, নেত্রকোণা, নড়াইল, ঝিনাইদহ, মৌলভীবাজার ও কুড়িগ্রাম জেলা পুলিশের পেজও রয়েছে।
ফেসবুক ২০২৫ সালের ৩১ আগস্ট নতুন কনটেন্ট মনিটাইজেশন ব্যবস্থা চালু করে। এতে ভিডিওর পাশাপাশি ছবি ও লিখিত পোস্ট থেকেও আয় করার সুযোগ তৈরি হয়। ডিসমিসল্যাবের তথ্য অনুযায়ী, ওই বছরের সেপ্টেম্বরে আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর ১২টি পেজ এই কর্মসূচিতে যুক্ত হয়। পরে আরও সাতটি পেজ যুক্ত হয়েছে।
তবে এসব পেজ থেকে পাওয়া অর্থ কোথায় যাচ্ছে, তা নিয়ে প্রশ্ন উঠেছে। সংশ্লিষ্ট কয়েকটি সংস্থার কর্মকর্তারা জানিয়েছেন, কোনো কোনো পেজ মনিটাইজড হলেও সেখান থেকে এখন পর্যন্ত অর্থ তোলা হয়নি। আবার কেউ কেউ মনিটাইজেশনের বিষয়টিই অস্বীকার করেছেন।
বিমানবন্দর আর্মড পুলিশ ব্যাটালিয়নের কমান্ডিং অফিসার অতিরিক্ত ডিআইজি মো. বশির আহমেদ জানান, তাদের ফেসবুক পেজে কিছু অর্থ জমা হয়েছে। তবে নির্দিষ্ট কোড না পাওয়ায় সেই অর্থ তোলা হয়নি।
তার ভাষ্য, মনিটাইজেশন করা হয়েছিল, যাতে আয় হলে তা কল্যাণমূলক কাজে ব্যবহার করা যায়। কিন্তু অর্থ উত্তোলন করা সম্ভব না হওয়ায় তা এখনো জমা রয়েছে।
ট্যুরিস্ট পুলিশ অবশ্য জানিয়েছে, তাদের পেজ এখনো মনিটাইজড হয়নি। সংস্থাটির সংশ্লিষ্ট শাখার সাব-ইন্সপেক্টর জাহাঙ্গীর আলম বলেন, মনিটাইজেশনের চেষ্টা করা হলেও দায়িত্বপ্রাপ্ত কর্মকর্তা চলে যাওয়ার পর কাজটি আর এগোয়নি।
চুয়াডাঙ্গা জেলা পুলিশের পেজের ক্ষেত্রে সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তা জানিয়েছেন, ২০২২-২৩ সালের দিকে সেটি মনিটাইজড হলেও পরে বন্ধ করে দেওয়া হয়। বর্তমানে সেখান থেকে কোনো আয় হচ্ছে না। তবে মেটার সহযোগী প্রকাশকদের তালিকা ও হোয়াট টু ফিক্সের তথ্য অনুযায়ী, ২০২৫ সালের নভেম্বরে যুক্ত হওয়া মনিটাইজেশন কর্মসূচিটি এখনো সক্রিয়।
কুমিল্লা জেলা পুলিশের পেজের দায়িত্বে থাকা কর্মকর্তাও আয় হওয়ার কথা জানিয়েছেন। তবে টাকা তোলার ব্যবস্থা না করায় সেই অর্থ এখনো উত্তোলন করা হয়নি।
বাংলাদেশ পুলিশ সদর দপ্তরের মিডিয়া অ্যান্ড পাবলিক রিলেশন্স বিভাগের এআইজি এ. এইচ. এম. শাহাদাত হোসাইন বলেন, সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম জনসেবা ও জনগণের সঙ্গে পুলিশের যোগাযোগের একটি মাধ্যম। কোনো প্ল্যাটফর্ম থেকে মনিটাইজেশনের সুযোগ থাকলে এবং তা বিধি-বিধানের আওতায় থাকলে প্রাতিষ্ঠানিক প্রক্রিয়া অনুসরণ করেই তা ব্যবহার করা হবে। এক্ষেত্রে বিধি-বহির্ভূতভাবে অর্থ ব্যবহারের কোনো সুযোগ নেই।
মেটার নীতিমালা নিয়ে প্রশ্ন
মেটার নীতিমালা অনুযায়ী সরকারি সংস্থা ও প্রতিষ্ঠানগুলো আয়ের জন্য বিবেচ্য নয়। কিন্তু ডিসমিসল্যাবের গবেষণায় আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর ১৯টি পেজে মনিটাইজেশনের সুযোগ থাকার তথ্য উঠে এসেছে। গবেষণায় বলা হয়েছে, বাংলাদেশ ছাড়াও ভারত, ফিলিপিন্স, ইসরায়েল, যুক্তরাষ্ট্র ও যুক্তরাজ্যের আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর বিভিন্ন পেজও মেটার মনিটাইজেশন কর্মসূচির আওতায় রয়েছে।
এদিকে নেদারল্যান্ডসভিত্তিক সংস্থা হোয়াট টু ফিক্স মনে করে, সামাজিক মাধ্যম থেকে আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর আয় করার সুযোগ তাদের কাজের ওপর প্রভাব ফেলতে পারে। তাদের মতে, বেশি অনলাইন সাড়া পাওয়ার সঙ্গে আর্থিক প্রণোদনা যুক্ত হলে জননিরাপত্তা ও গোপনীয়তার চেয়ে অর্থনৈতিক লাভকে বেশি গুরুত্ব দেওয়ার ঝুঁকি তৈরি হতে পারে।
মানবাধিকারকর্মী নূর খান লিটনও সরকারি প্রতিষ্ঠানের সামাজিক মাধ্যম থেকে আয়ের বিষয়ে উদ্বেগ জানিয়েছেন। তার মতে, আয়কে গুরুত্ব দিতে গিয়ে আইনশৃঙ্খলা রক্ষার মূল দায়িত্ব যেন ক্ষতিগ্রস্ত না হয়, সেটিই গুরুত্বপূর্ণ।
source: Asia Post