পূজার ছুটির আগে সাজেক ভ্রমণের নিষেধাজ্ঞা প্রত্যাহার

শারদীয় দুর্গাপূজা উপলক্ষে রাঙামাটির বাঘাইছড়ি উপজেলার সাজেক সড়কে চলমান অনির্দিষ্টকালের অবরোধ শিথিল করা হয়েছে। বৃহস্পতিবার (১৫ অক্টোবর) সন্ধ্যা ৬টা থেকে আগামী ২১ অক্টোবর পর্যন্ত অবরোধ শিথিলের ঘোষণা দিয়েছে সাজেক গণ অধিকার রক্ষা কমিটি ও সাজেক কার্বারী অ্যাসোসিয়েশন। একই সঙ্গে পর্যটকদের নিরাপত্তার কথা বিবেচনায় সাজেক ভ্রমণে রাঙামাটি জেলা প্রশাসনের জারি করা নিষেধাজ্ঞাও প্রত্যাহার করা হয়েছে।
বৃহস্পতিবার সন্ধ্যায় সংগঠন দুটি যৌথ বিবৃতিতে এ তথ্য জানায়। বিবৃতিতে বলা হয়, সনাতন ধর্মাবলম্বীদের প্রধান ধর্মীয় উৎসব শারদীয় দুর্গাপূজা উপলক্ষে ২১ অক্টোবর পর্যন্ত সাজেক সড়কে চলমান অনির্দিষ্টকালের অবরোধ শিথিল থাকবে।
এর ফলে দীর্ঘদিনের অচলাবস্থা কাটিয়ে সাজেকে পর্যটন কার্যক্রম স্বাভাবিক হওয়ার সম্ভাবনা তৈরি হয়েছে। তবে পর্যটকদের যাতায়াত ও নিরাপত্তা পরিস্থিতি কতটা স্বাভাবিক হয়, তা পরিস্থিতির ওপর নির্ভর করছে।
এর আগে বৃহস্পতিবার সকালে এক অনুষ্ঠানে খাগড়াছড়ি আসনের সংসদ সদস্য ও পার্বত্য চট্টগ্রামবিষয়ক মন্ত্রণালয়ের সংসদীয় স্থায়ী কমিটির সভাপতি ওয়াদুদ ভূইয়া পর্যটকদের নির্বিঘ্নে ভ্রমণের সুযোগ দিতে সাজেক সড়কের অবরোধ তুলে নেওয়ার আহ্বান জানান। কোনো সংকট বা বিরোধ থাকলে তা আলোচনার মাধ্যমে সমাধানের ওপরও গুরুত্ব দেন তিনি।
এর আগে গত ১১ অক্টোবর থেকে সাজেক সড়কে অনির্দিষ্টকালের অবরোধ শুরু হয়। এতে সাজেকে কয়েক হাজার দেশি-বিদেশি পর্যটক আটকা পড়েন। পরে সেনাবাহিনীর বিশেষ নিরাপত্তায় পর্যটকদের সাজেক থেকে ফিরিয়ে আনার উদ্যোগ নেওয়া হলে উজোবাজার এলাকায় পর্যটকবাহী নিরাপত্তা বহর আটকে দেন অবরোধকারীরা।
আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর সঙ্গে কয়েক ঘণ্টা আলোচনার পর বহরটিকে খাগড়াছড়ির দিকে যেতে দেওয়া হয়। পরবর্তী সময়ে সোমবার ও মঙ্গলবার দুই দিনের জন্য অবরোধ শিথিল করা হলেও বুধবার (১৪ অক্টোবর) আবারও দ্বিতীয় দফায় অনির্দিষ্টকালের অবরোধের ডাক দেওয়া হয়।
পরিস্থিতির অবনতি ও পর্যটকদের নিরাপত্তাঝুঁকি বিবেচনায় রাঙামাটি জেলা প্রশাসন অনির্দিষ্টকালের জন্য সাজেক ভ্রমণে নিষেধাজ্ঞা জারি করে। বৃহস্পতিবার অবরোধ শিথিলের ঘোষণার পর প্রশাসনও সেই নিষেধাজ্ঞা প্রত্যাহার করেছে।
সাজেকের চলমান পরিস্থিতিতে পর্যটননির্ভর ব্যবসা-বাণিজ্যে ব্যাপক আর্থিক ক্ষতির আশঙ্কা করছেন সংশ্লিষ্ট ব্যবসায়ীরা। তাঁদের দাবি, পাহাড়ের দুটি আঞ্চলিক সংগঠন—ইউপিডিএফ ও জেএসএসের মূল দলের মধ্যে আধিপত্য বিস্তারকে কেন্দ্র করে সৃষ্ট অস্থিরতার প্রভাব পড়েছে পর্যটন খাতে। এ খাতের সঙ্গে জড়িত ৩০ হাজারের বেশি মানুষ ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছেন বলেও দাবি তাঁদের।
পর্যটনসংশ্লিষ্ট ব্যক্তিরা বলছেন, সাজেকের পর্যটন কার্যক্রম দীর্ঘ সময় বন্ধ থাকলে হোটেল-মোটেল, রিসোর্ট, পরিবহন, রেস্তোরাঁ ও ক্ষুদ্র ব্যবসার সঙ্গে জড়িত মানুষের জীবিকা আরও সংকটে পড়বে।
এদিকে সাজেক ইউনিয়নে একের পর এক সংঘাত ও গোলাগুলির ঘটনায় স্থানীয় বাসিন্দাদের মধ্যে উদ্বেগ ও আতঙ্ক বাড়ছে। সর্বশেষ গত ২৯ সেপ্টেম্বর সকালে মাচালং এলাকার মন্দিরছড়া পাড়ায় গুলিবিদ্ধ হয় মাচালং সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের তৃতীয় শ্রেণির শিক্ষার্থী সঞ্জিতা ত্রিপুরা (৯)। সে অলেন্দ্র ত্রিপুরার মেয়ে।
স্থানীয় পর্যায়ে বিভিন্ন সময়ে সংগঠন দুটির মধ্যে গোলাগুলির ঘটনা ঘটেছে বলে জানা গেছে। এ পরিস্থিতিতে সাধারণ মানুষের নিরাপত্তা ও স্বাভাবিক জীবনযাত্রা নিয়েও উদ্বেগ তৈরি হয়েছে।
এদিকে, সংগঠন দুটির পক্ষ থেকে দাবি করা হয়েছে, দ্রুত সময়ের মধ্যে সাজেক এলাকা থেকে পার্বত্য চট্টগ্রাম জনসংহতি সমিতির (জেএসএস) সন্তু গ্রুপকে সরিয়ে না নিলে দুর্গাপূজার পরও অনির্দিষ্টকালের অবরোধ অব্যাহত রাখা হতে পারে।
সাজেক ভ্যালিতে পর্যটক ভ্রমণের নিষেধাজ্ঞা প্রত্যাহারের দাবিতে বুধবার খাগড়াছড়ি শহরের শাপলা চত্বরে মানববন্ধন ও বিক্ষোভ মিছিল করেন পর্যটনসংশ্লিষ্ট বিভিন্ন পেশাজীবী সংগঠনের নেতাকর্মীরা। এ সময় তাঁরা প্রশাসনকে ২৪ ঘণ্টার আলটিমেটাম দেন।
এর পরদিনই দুর্গাপূজা উপলক্ষে সাজেক সড়কের অবরোধ শিথিল এবং পর্যটক ভ্রমণে প্রশাসনের নিষেধাজ্ঞা প্রত্যাহারের ঘোষণা আসে।
এখন ২১ অক্টোবর পর্যন্ত অবরোধ শিথিল থাকায় সাজেকের পর্যটন কার্যক্রম কতটা স্বাভাবিক হয়, সেদিকে তাকিয়ে রয়েছেন পর্যটন ব্যবসায়ী, স্থানীয় বাসিন্দা ও ভ্রমণপ্রত্যাশীরা। একই সঙ্গে দুর্গাপূজার সময় সাজেক সড়কে নিরাপদ যাতায়াত এবং স্থানীয় বাসিন্দাদের স্বাভাবিক জীবনযাত্রা নিশ্চিত করাও গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠেছে।
source: The Daily Campus