কক্সবাজার সমুদ্রসৈকতে ৫০ ফুট উচ্চতার ‘প্লাস্টিক দানব’

কক্সবাজার সমুদ্রসৈকতে মাথা তুলে দাঁড়িয়ে আছে ৫০ ফুট উচ্চতার বিশাল এক ‘প্লাস্টিক দানব’। চিপসের প্যাকেট, পরিত্যক্ত পানির বোতল ও পলিথিনসহ মানুষের ফেলে দেওয়া প্রায় পাঁচ টন প্লাস্টিক বর্জ্য দিয়ে তৈরি এই ভাস্কর্য পর্যটকদের দৃষ্টি আকর্ষণ করছে। তবে এটি শুধু দৃষ্টিনন্দন কোনো শিল্পকর্ম নয়; বরং সমুদ্রদূষণের ভয়াবহতা তুলে ধরে পরিবেশ রক্ষার বার্তা দিচ্ছে। যত্রতত্র প্লাস্টিক বর্জ্য ফেলার পরিণতি সম্পর্কে মানুষকে সচেতন করতেই এই উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে।
কক্সবাজার সমুদ্রসৈকতের সুগন্ধা ও সিগাল পয়েন্টের মাঝামাঝি স্থাপন করা হয়েছে ব্যতিক্রমী এই ভাস্কর্য। পর্যটন মৌসুমে সৈকতে ঘুরতে আসা মানুষ বিশাল আকৃতির প্লাস্টিকের দানবটি দেখতে ভিড় করছেন। এর নির্মাণে ব্যবহৃত পরিত্যক্ত বর্জ্য মানুষের অসচেতনতা, যত্রতত্র ময়লা ফেলা এবং পরিবেশের প্রতি দায়িত্বহীনতার চিত্র তুলে ধরছে।
বিদ্যানন্দ ফাউন্ডেশন ও প্রশাসনের যৌথ উদ্যোগে স্থাপন করা হয়েছে ভাস্কর্যটি। এর মাধ্যমে প্লাস্টিক দূষণের ভয়াবহতা তুলে ধরার পাশাপাশি সমুদ্রসৈকত পরিচ্ছন্ন রাখার আহ্বান জানানো হচ্ছে। বিশাল এই শিল্পকর্ম দেখে অনেক পর্যটকও প্লাস্টিক বর্জ্যের ক্ষতিকর প্রভাব সম্পর্কে নতুন করে ভাবার সুযোগ পাচ্ছেন।
সংশ্লিষ্ট সূত্রে জানা গেছে, কক্সবাজারের ইনানী, টেকনাফ ও সেন্ট মার্টিন সৈকত থেকে সংগ্রহ করা প্রায় পাঁচ টন পরিত্যক্ত প্লাস্টিক বর্জ্য দিয়ে ভাস্কর্যটি তৈরি করা হয়েছে। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের চারুকলা অনুষদের শিল্পীরা টানা ২০ দিনের পরিশ্রমে এটি নির্মাণ করেন।
বিদ্যানন্দ ফাউন্ডেশনের নির্বাহী পরিচালক মোহাম্মদ জামাল উদ্দিন বলেন, ‘প্লাস্টিক সমুদ্রের তলদেশে জমা হয়ে সামগ্রিক বাস্তুতন্ত্রকে বিষাক্ত করে তুলছে। প্লাস্টিক বর্জ্যের অনিয়ন্ত্রিত বিস্তার পরিবেশের জন্য বড় হুমকি।’
কক্সবাজার পরিবেশ অধিদপ্তরের উপপরিচালক খন্দকার মাহমুদ পাশা বলেন, ‘প্লাস্টিকের এই আগ্রাসন প্রতিরোধে বৈজ্ঞানিক বর্জ্য ব্যবস্থাপনা ও পুনর্ব্যবহার প্রক্রিয়ার কোনো বিকল্প নেই। আমরা সৈকত ও আশপাশের এলাকায় প্লাস্টিক বর্জ্যের টেকসই ব্যবস্থাপনা এবং জনসচেতনতা বৃদ্ধিতে সর্বোচ্চ গুরুত্ব দিচ্ছি।’
কক্সবাজারের জেলা প্রশাসক এম এ মান্নান বলেন, ‘প্লাস্টিক আজ আমাদের ভবিষ্যৎ প্রজন্ম, পরিবেশ ও সামগ্রিক প্রতিবেশের জন্য একটি বড় সংকট হয়ে দাঁড়িয়েছে। সমুদ্র ও প্রকৃতি রক্ষায় সম্মিলিত ও সমন্বিত উদ্যোগ নিতে হবে। পর্যটকদের জন্য নিয়মকানুনের প্রয়োগ জোরদার করার পাশাপাশি পরিবেশ সুরক্ষায় প্রশাসনের পক্ষ থেকে প্রয়োজনীয় পদক্ষেপ নেওয়া হবে।’
পরিবেশবিদদের মতে, প্লাস্টিক বর্জ্য সামুদ্রিক প্রাণী, জীববৈচিত্র্য ও সামুদ্রিক পরিবেশের জন্য দীর্ঘমেয়াদি হুমকি তৈরি করে। বিশেষ করে একবার ব্যবহারযোগ্য প্লাস্টিকের যথেচ্ছ ব্যবহার এবং বর্জ্য ব্যবস্থাপনার দুর্বলতা সমুদ্রদূষণ বাড়িয়ে দেয়। প্লাস্টিক বর্জ্য সহজে পচে না। ফলে দীর্ঘ সময় ধরে এসব বর্জ্য পরিবেশে থেকে যায় এবং সামুদ্রিক বাস্তুতন্ত্রের ক্ষতি করে।
কক্সবাজারের মতো পর্যটননির্ভর শহরে সমুদ্রসৈকতের সৌন্দর্য ও পরিবেশ রক্ষায় শুধু প্রশাসনিক উদ্যোগ যথেষ্ট নয়। এ জন্য পর্যটক, স্থানীয় বাসিন্দা, ব্যবসায়ী ও সংশ্লিষ্ট সবার সচেতন অংশগ্রহণ প্রয়োজন। সৈকতে যত্রতত্র প্লাস্টিক ফেলা বন্ধ করা, নির্দিষ্ট স্থানে বর্জ্য ফেলা এবং পুনর্ব্যবহারযোগ্য উপকরণ ব্যবহারের অভ্যাস গড়ে তোলা জরুরি।
পর্যটকদের অসচেতনতার কারণে সৈকতে জমে থাকা প্লাস্টিক বর্জ্য একপর্যায়ে সমুদ্রে গিয়ে মিশতে পারে। এতে সামুদ্রিক প্রাণীর জীবন বিপন্ন হওয়ার পাশাপাশি পরিবেশের ভারসাম্যও ক্ষতিগ্রস্ত হয়। তাই প্লাস্টিকের ব্যবহার কমানো এবং উৎপন্ন বর্জ্য সঠিকভাবে ব্যবস্থাপনার মাধ্যমে দূষণ নিয়ন্ত্রণে সবাইকে এগিয়ে আসতে হবে।
কক্সবাজার সমুদ্রসৈকতে দাঁড়িয়ে থাকা ৫০ ফুট উচ্চতার এই ‘প্লাস্টিক দানব’ তাই কেবল একটি ভাস্কর্য নয়; এটি পরিবেশ রক্ষার একটি জোরালো বার্তা। মানুষের ফেলে দেওয়া বর্জ্য কীভাবে প্রকৃতির জন্য বড় সংকট তৈরি করতে পারে, তা চোখে আঙুল দিয়ে দেখাচ্ছে শিল্পকর্মটি। সমুদ্র ও সৈকত পরিচ্ছন্ন রাখা শুধু প্রশাসনের দায়িত্ব নয়, বরং এ দায়িত্ব সবার—এই বার্তাই দিচ্ছে প্লাস্টিক বর্জ্যে তৈরি বিশাল দানবটি।
source: The Daily Campus