হাকালুকি হাওরের ২০ হাজার মানুষের চলাচলের একটিমাত্র সড়ক, বাধার মুখে যাতায়াত

সিলেটের গোলাপগঞ্জ উপজেলার শরীফগঞ্জ ইউনিয়নের চার গ্রামের প্রায় ২০ হাজার মানুষের যোগাযোগের একমাত্র ভরসা কাদিপুরসংলগ্ন একটি সড়ক ও খেয়াঘাট। ভাঙাচোরা কাঁচা রাস্তা আর খেয়া পারাপারের দুর্ভোগ পেরিয়ে তাঁদের উপজেলা ও বিভাগীয় শহরে যাতায়াত করতে হয়। এর মধ্যে সড়কটি ব্যবহার করতে গিয়ে কাদিপুরের সিএনজিচালকদের বাধার মুখে পড়ার অভিযোগ উঠেছে। এতে দীর্ঘদিনের যোগাযোগসংকটের পাশাপাশি ভোগান্তিতে পড়েছেন স্থানীয় বাসিন্দারা।
স্থানীয় সূত্রে জানা যায়, হাকালুকি হাওরের উত্তর-পূর্বাঞ্চলে অবস্থিত কালীকৃষ্ণপুর, নুরজাহানপুর, ইসলামপুর ও রাংজিয়ল গ্রামে কয়েক শতাব্দী ধরে মানুষের বসবাস। শরীফগঞ্জ ইউনিয়নের ১১ নম্বর ওয়ার্ডের অন্তর্ভুক্ত এসব গ্রামের বাসিন্দাদের উপজেলা ও বিভাগীয় শহরে যাতায়াতের প্রধান পথ কাদিপুরের খেয়াঘাটসংলগ্ন সড়ক। সড়কটির বেহাল দশা ও খেয়া পারাপারের কারণে জরুরি প্রয়োজনে যাতায়াত করতে গিয়ে তাঁদের চরম দুর্ভোগ পোহাতে হয়। স্থানীয়দের ভাষ্য, প্রসূতি রোগীকে হাসপাতালে নিতে কখনো কখনো দুই থেকে তিন ঘণ্টা সময় লাগে।
বাসিন্দাদের অভিযোগ, কাদিপুর সিএনজি স্ট্যান্ডের চালকেরা প্রায়ই তাঁদের সঙ্গে দুর্ব্যবহার করেন। স্থানীয়দের ‘আবাদি’ বলে হেয় করা, নিজস্ব মোটরসাইকেল নিয়ে চলাচলে বাধা দেওয়া এবং সিএনজি ছাড়া অন্য যানবাহন চলতে না দেওয়ার অভিযোগও রয়েছে। এমনকি জনপ্রতিনিধিরাও এ ধরনের আচরণের শিকার হয়েছেন বলে দাবি তাঁদের। সম্প্রতি সড়কটি দিয়ে যাতায়াতে নিষেধাজ্ঞা আরোপের অভিযোগ ওঠায় পরিস্থিতি আরও জটিল হয়েছে।
চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়ের সাবেক শিক্ষার্থী নাজিম হোসেন চমন বলেন, দুনিয়ার এমন কোথাও কখনো শুনছেন কিনা জানি না- সিএনজি চালকদের পছন্দমতো গাড়িতে না উঠলে ৪ গ্রামের হাজার হাজার লোকের যাতায়াত বন্ধ করে দিতে! মানে এরা ঠিক করে দেয় যাত্রী কার গাড়িতে চলতে পারবে আর কার টাতে পারবে না। ইভেন পারসোনাল বাইক গেলেও তাদের গাড়ি আটকিয়ে দিবে। মোটরবাইক চালানো নিষিদ্ধ করে দিয়ে, নিজেদের ইচ্ছা মতো সিএনজি ভাড়া বাড়াবে। কেউ কিছু বলতে পারবে না। গত দুইদিন আগে অত্র এলাকার একটা বাচ্চা মারা গেছে এই সিএনজি সিন্ডিকেটের কবলে পড়ে সময় মতো হাসপাতালে নিয়ে যেতে পারে নি বলে। এর থেকে বড় জুলুমবাজি আর হয় না। জনপ্রতিনিধিদের দৃষ্টি আকর্ষণ করছি তারা যেন যাতায়াত সংক্রান্ত বিষয়টি নিয়ে একটি স্থায়ী সমাধানে আসে।
শরীফগঞ্জ ইউনিয়ন পরিষদের সাবেক সদস্য ইসমাইল হোসেন সিরাজী বলেন, ‘কাদিপুরসংলগ্ন সড়কটিই আমাদের চলাচলের একমাত্র পথ। সিএনজি স্ট্যান্ডের চালকেরা বিভিন্ন সময়ে আমাদের হেনস্তা করেন। কয়েকবার সমঝোতা হয়েছে, তাঁরা ক্ষমাও চেয়েছেন। কিন্তু একই ঘটনার পুনরাবৃত্তি হচ্ছে। এখন আমাদের চলাচল বন্ধ করে দেওয়া হয়েছে। আমরা প্রশাসনের কাছে এর স্থায়ী সমাধান চাই।’
ইউনিয়ন পরিষদের সাবেক সদস্য ও বিএনপির ওয়ার্ড সভাপতি নাসির উদ্দীন বলেন, ‘নিজস্ব মোটরসাইকেল নিয়েও চলাচল করতে গেলে বাধা দেওয়া হয়। শুধু সিএনজি দিয়ে যাতায়াত করতে বাধ্য করায় আমাদের দুর্ভোগ বাড়ছে। আমরা নিরাপদ ও নির্বিঘ্ন চলাচলের নিশ্চয়তা চাই।’
এ বিষয়ে গোলাপগঞ্জের উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা (ইউএনও) মো. রফিকুল ইসলাম বলেন, ‘বিষয়টি সম্পর্কে আমি অবগত আছি। স্থানীয় চেয়ারম্যান ও জনপ্রতিনিধিদের সঙ্গে যোগাযোগ করেছি। তাঁরা নিজেদের মধ্যে আলোচনা করে সমাধানের চেষ্টা করছেন। লিখিত অভিযোগ পেলে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নেওয়া হবে। কারও চলাচলের স্বাধীনতায় হস্তক্ষেপ করা যাবে না।’
লাক্কাবাজার পুলিশ ফাঁড়ির উপপরিদর্শক (এসআই) শঙ্কর বলেন, ‘সিএনজি চালকদের বাড়াবাড়ির কারণে চার গ্রামের মানুষ তাঁদের গাড়িতে উঠবেন না বলে জানিয়েছেন। বিষয়টি সমাধানে জেলা কমিটিসহ সংশ্লিষ্টদের নিয়ে বসা হবে।’
সিলেটের জেলা প্রশাসক আব্দুল্লাহ আল মামুন বলেন, ‘বিষয়টি সম্পর্কে আমি অবগত আছি। খোঁজ নিতে ইউএনওকে বলেছি। কারও সাংবিধানিক অধিকার খর্ব করা যাবে না। বিষয়টি যাচাই করে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নেওয়া হবে।’
সংবিধানের ৩৬ অনুচ্ছেদে বাংলাদেশের সর্বত্র অবাধ চলাফেরা, বসবাস ও বসতি স্থাপনের অধিকার স্বীকৃত, যা আইন দ্বারা আরোপিত যুক্তিসংগত বিধিনিষেধের অধীন। স্থানীয় বাসিন্দাদের অভিযোগের সত্যতা যাচাই করে তাঁদের নিরাপদ ও নির্বিঘ্ন যাতায়াত নিশ্চিত করতে কার্যকর পদক্ষেপ নেওয়া এখন জরুরি।
source: The Daily Campus