দিনেশ ত্রিবেদীর বহিষ্কারের দাবিতে ভারতীয় হাইকমিশন ঘেরাও, পুলিশের বাধার অভিযোগ বিপ্লবী পরিষদের

ঢাকায় ভারতীয় হাইকমিশনার দিনেশ ত্রিবেদীকে বহিষ্কারসহ পাঁচ দফা দাবি জানিয়েছে জাতীয় বিপ্লবী পরিষদ। বৃহস্পতিবার (২৯ অক্টোবর) হাইকমিশন ঘেরাও করতে যাওয়ার পথে পুলিশের বাধার মুখে পড়ে সংগঠনটির নেতা-কর্মীরা। এ ঘটনার পর আগামী ১৬ ডিসেম্বর পর্যন্ত দাবিগুলো পূরণের সময়সীমা বেঁধে দিয়ে ১৭ ডিসেম্বর থেকে ‘ভারত খেদাও আন্দোলন’ শুরুর ঘোষণা দিয়েছেন তাঁরা।
বৃহস্পতিবার বেলা পৌনে ১২টার দিকে রাজধানীর শাহজাদপুরের বাঁশতলায় প্রগতি সরণিতে ব্যারিকেড দিয়ে তাঁদের আটকে দেয় পুলিশ। এর আগে সকাল থেকেই শাহজাদপুর বাসস্ট্যান্ডসংলগ্ন কনফিডেন্স সেন্টারের সামনে জড়ো হতে থাকেন জাতীয় বিপ্লবী পরিষদের নেতা-কর্মীরা। পরে বেলা সাড়ে ১১টার দিকে তাঁরা মিছিল নিয়ে গুলশানে ভারতীয় হাইকমিশনের দিকে যেতে চাইলে নিরাপত্তার দায়িত্বে থাকা পুলিশ সদস্যরা সড়কে কাঁটাতারের ব্যারিকেড দিয়ে তাঁদের পথ আটকে দেন।
এ সময় নেতা-কর্মীরা প্রধান সড়কে অবস্থান নিয়ে ‘ভারতের আধিপত্য, রুখে দাও জনগণ’, ‘ফেলানীর বাংলায় ত্রিবেদীর ঠাঁই নাই’, ‘ত্রিবেদীকে বহিষ্কার করতে হবে’, ‘ঘেরাও ঘেরাও হবে, হাইকমিশন ঘেরাও হবে’ এবং ‘দিল্লি না ঢাকা, ঢাকা ঢাকা’সহ বিভিন্ন ভারতবিরোধী ও প্রতিবাদী স্লোগান দেন।
একপর্যায়ে তাঁরা ব্যারিকেড সরিয়ে হাইকমিশনে যাওয়ার সংযোগ সড়ক বাঁশতলার দিকে এগিয়ে যাওয়ার চেষ্টা করেন। তবে পুলিশের বাধায় আর সামনে এগোতে পারেননি। পরে নেতা-কর্মীরা সড়কের এক পাশ দিয়ে যান চলাচলের সুযোগ রেখে সেখানে সমাবেশ করেন।
সমাবেশে জাতীয় বিপ্লবী পরিষদের আহ্বায়ক খোমেনী ইহসান বলেন, সীমান্তে বাংলাদেশিদের হত্যা, তিস্তাসহ অভিন্ন নদীর পানি প্রত্যাহার, অসম ও অধীনতামূলক চুক্তির মাধ্যমে শোষণ এবং জুলাই গণহত্যার দায়ে শেখ হাসিনাকে প্রত্যর্পণ না করার প্রতিবাদে তাঁরা ভারতীয় হাইকমিশনার দিনেশ ত্রিবেদীকে বহিষ্কারের দাবিতে হাইকমিশন ঘেরাও করতে এসেছিলেন। কিন্তু পুলিশ তাঁদের হাইকমিশনের সামনে যেতে দেয়নি।
তিনি বলেন, ‘এ অবস্থায় আমরা বাধ্য হয়ে আগামী ১৬ ডিসেম্বর পর্যন্ত আল্টিমেটাম ঘোষণা করছি। এরমধ্যে ভারতীয় হাইকমিশনার দিনেশ ত্রিবেদীকে বহিষ্কার, শেখ হাসিনাকে ফেরত প্রদান, সীমান্ত হত্যা বন্ধ, অসম চুক্তি বাতিল ও পানির ন্যায্য হিস্যার দাবি পূরণ করতে হবে। তা না হলে ১৭ ডিসেম্বর থেকে ভারত খেদাও আন্দোলন শুরু হবে। সারা দেশে ভারতীয় পণ্য বর্জন করা হবে।’
খোমেনী ইহসান আরও বলেন, তাঁরা অকারণে ভারতের বিরোধিতা করছেন না। তাঁর অভিযোগ, ভারত বাংলাদেশের ওপর নানা ধরনের আগ্রাসন চালাচ্ছে। সীমান্ত হত্যা ও নদীর পানি প্রত্যাহারের পাশাপাশি আধিপত্যবাদবিরোধীদের নিয়মিত হত্যা করা হচ্ছে বলেও দাবি করেন তিনি।
তিনি বলেন, ‘আমাদের দেশপ্রেমিকদের খুনিদের আশ্রয় কেন্দ্রে পরিণত হয়েছে ভারত। আমাদের স্বাধীনতার ঘোষক জিয়াউর রহমানের খুনী মেজর মোজাফফরও দীর্ঘ দিন ভারতে ছিল। ২০০৬ সালের ২৮ অক্টোবর লাশের ওপর নাচানাচি করা বাপ্যাদিত্য বসু ভারতে আছে। শহীদ ওসমান হাদীর খুনীরা ভারতে আছে। সবচেয়ে জঘন্য ব্যাপার হলো জুলাই গণহত্যাকারী শেখ হাসিনাও ভারতেই আছেন। তিনি সেখানে বসে হুমকি দিচ্ছেন আর দেশে জুলাই যোদ্ধাদের লাশ পড়ছে।’
খোমেনী ইহসান আরও বলেন, ‘গতকাল বুধবারও হাসিনার ৫ আগস্টের পালানোর ভিডিও ধারণকারী বিমানবাহিনীর সাবেক কর্মকর্তা কে এম তাহসিফ সাউরির লাশ তুরাগ নদীতে পাওয়া গেছে। আরও অনেককে হত্যা করা হবে বলে হুমকি দেওয়া হচ্ছে।’
তিনি বলেন, ৫ আগস্টের পর ভারতের আচরণে পরিবর্তন আসবে বলে তাঁরা আশা করেছিলেন। কিন্তু ভারত এখনো বাংলাদেশের জনগণের কাছে দুঃখ প্রকাশ করেনি বলে অভিযোগ করেন তিনি। জুলাই গণহত্যায় নিহত ব্যক্তিদের কবরেও ভারত দুঃখ প্রকাশ করতে যায়নি বলে দাবি করেন খোমেনী ইহসান।
তিনি বলেন, ‘বরং ভারতের সরকারি দল বিজেপির নেতা দিনেশ ত্রিবেদী হাইকমিশনার পরিচয়ে বাংলাদেশে এসে ভাইসরয়ের মতে আচরণ করছেন। তিনি সারা দিন বিভিন্ন মন্ত্রণালয় ও দপ্তরে টোটো করে ঘুরে বেড়াচ্ছেন আর মুচকি হাসছেন।’
খোমেনী ইহসানের ভাষ্য, সামগ্রিক পরিস্থিতি প্রমাণ করে যে জুলাই বিপ্লবের পর বাংলাদেশে ভারতীয় আধিপত্যবাদের অবসান হওয়ার কথা থাকলেও পরিস্থিতির আরও অবনতি হয়েছে। বিএনপি সরকার কৌশলে ভারতের তাবেদারিতে লিপ্ত রয়েছে বলেও অভিযোগ করেন তিনি।
তিনি বলেন, ‘তারা জাপানের মাধ্যমে মাতারবাড়ি গভীর সমুদ্র বন্দর ব্যবহার করে ভারতকে ট্রানজিট দিচ্ছে। জাইকার মাধ্যমে মেট্রোরেলের খরচ দ্বিগুণ বাড়িয়ে ভারতীয় কোম্পানিকে কাজ দেওয়া হচ্ছে। জাপান বিগ-বি পরিকল্পনার নামে চীন বিরোধী লড়াইয়ে ভারতের সঙ্গে বাংলাদেশকেও জড়িয়ে ফেলছে। এ অবস্থায় আমাদের সামনে স্বাধীনতা সার্বভৌমত্ব রক্ষায় লড়াই গড়ে তোলার বিকল্প নাই।’
জাতীয় বিপ্লবী পরিষদের আহ্বায়ক বলেন, ‘আমাদের বার্তা পরিষ্কার। বাংলাদেশে ভারতকে নতুন করে আধিপত্য বিস্তার করতে দেওয়া হবে না। আন্দোলনের মাধ্যমে দিনেশ ত্রিবেদীকে বাংলাদেশ ছাড়া করা হবে। জাপানকেও মাতারবাড়ি বন্দর ব্যবহার করে ভারতকে ট্রানজিট প্রদান করতে দেওয়া হবে না। আমাদের সরকারকে বলব বাংলাদেশকে ভারতের করদরাজ্য ও পরাশক্তির খেলার মাঠ বানানো বন্ধ করুন।’
তিনি আরও বলেন, অর্থনৈতিক ও সামরিক সংকট মোকাবিলায় বিপুল বিনিয়োগ ও অনুদানের মাধ্যমে বাংলাদেশের সার্বভৌমত্ব রক্ষায় চীন ও মুসলিম বিশ্ব এগিয়ে আসবে বলে তাঁরা আশা করেন। তাঁর দাবি, এসব দেশ সহযোগিতা না করলে ভারত ও জাপান চীন ও মুসলিম বিশ্ববিরোধী অর্থনৈতিক ও সামরিক দ্বন্দ্বে বাংলাদেশকে ব্যবহারের চেষ্টা করবে।
কর্মসূচিতে উপস্থিত ছিলেন বিশিষ্ট চক্ষু বিশেষজ্ঞ ডা. ফরিদ উদ্দিন, জাতীয় বিপ্লবী পরিষদের সদস্য সচিব ডা. নাবিল আহমদ, সহকারী সদস্য সচিব আবদুস সালাম ও গালীব ইহসান, কেন্দ্রীয় সদস্য সাকিব সামিন, সাইদুল ইসলাম ও জয়নুল আবেদিন এবং বিপ্লবী ছাত্র পরিষদের আহ্বায়ক আবদুল ওয়াহেদ, সহকারী সদস্য সচিব আরিফুল ইসলামসহ সংগঠনটির বিভিন্ন পর্যায়ের নেতা-কর্মীরা।
source: The Daily Campus