News

তীব্র গরমে বছরে ১,৭৫০ কোটি ডলার ক্ষতি বাংলাদেশের

বাংলাদেশে জলবায়ু পরিবর্তনের প্রভাবে স্বাস্থ্যঝুঁকি ও অর্থনৈতিক ক্ষতি বাড়ছে। শুধু তীব্র গরমের কারণে ২০২৫ সালে দেশের সম্ভাব্য আয়ের তুলনায় ক্ষতি হয়েছে ১৭.৫ বিলিয়ন বা ১,৭৫০ কোটি মার্কিন ডলার। একই সময়ে ১৯৮৬-২০০৫ সালের তুলনায় তাপপ্রবাহের সংস্পর্শে আসার ঝুঁকি শিশুদের মধ্যে ১৬২ শতাংশ ও প্রবীণদের মধ্যে ১৩৬ শতাংশ বেড়েছে। অন্যদিকে মানবসৃষ্ট সূক্ষ্ম কণাদূষণে ২০২৩ সালে দেশে আনুমানিক দুই লাখ ৩৯ হাজার মানুষের মৃত্যু হয়েছে।

‘ল্যানসেট কাউন্টডাউন ২০২৬ : স্বাস্থ্য ও জলবায়ু পরিবর্তন’ প্রতিবেদনে এসব তথ্য উঠে এসেছে। গতকাল রোববার ঢাকার ব্র্যাক সেন্টার ইনে বাংলাদেশের জন্য প্রতিবেদনটির তথ্য তুলে ধরে ব্র্যাক বিশ্ববিদ্যালয়ের সেন্টার ফর ক্লাইমেট চেঞ্জ অ্যান্ড এনভায়রনমেন্টাল রিসার্চ (সিথ্রিইআর)।

প্রতিবেদনে জলবায়ু পরিবর্তনকে জনস্বাস্থ্যের বৈশ্বিক জরুরি অবস্থা উল্লেখ করে নীতিনির্ধারণ, কার্বন নিঃসরণ কমানো ও অর্থায়নে স্বাস্থ্যকে অগ্রাধিকার দেওয়ার সুপারিশ করা হয়েছে। এতে বলা হয়, ২০১৬-২০২৫ সময়ে জলবায়ুজনিত স্বাস্থ্যঝুঁকি ও ক্ষয়ক্ষতির অনেক সূচক আগের দশকের তুলনায় দ্রুত বেড়েছে। এতে কারিগরি সহায়তা দেয় স্বাস্থ্য ও পরিবারকল্যাণ মন্ত্রণালয়ের স্বাস্থ্যসেবা বিভাগের জলবায়ু পরিবর্তন ও স্বাস্থ্য উন্নয়ন ইউনিট (সিসিএইচপিইউ)।

মূল প্রবন্ধ উপস্থাপন করেন পরিবেশ অর্থনীতিবিদ শৌর্য দাশগুপ্ত। অনুষ্ঠান সঞ্চালনা করেন স্বাস্থ্য ও পরিবারকল্যাণ মন্ত্রণালয়ের জলবায়ু পরিবর্তন ও স্বাস্থ্য উন্নয়ন ইউনিটের সমন্বয়ক ডা. ইকবাল কবির। স্বাগত বক্তব্য দেন ব্র্যাক বিশ্ববিদ্যালয়ের সিইআর-এর পরিচালক গোলাম রব্বানী।

তিনি বলেন, বাংলাদেশের জলবায়ুনীতিতে কৃষি ও পানির পাশাপাশি স্বাস্থ্যকেও অগ্রাধিকার দেওয়া হয়েছে। কিন্তু এসব নীতি বাস্তবায়নে প্রয়োজনীয় মনোযোগ ও অর্থায়নের ঘাটতি রয়েছে। তীব্র গরমে কৃষক, বাইরে কাজ করা শ্রমজীবী মানুষ এবং শহরের বাসিন্দারা ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছেন। ডেঙ্গুও নিয়মিত জনস্বাস্থ্য সমস্যায় পরিণত হয়েছে। এসব ঝুঁকি মানুষের স্বাস্থ্য, জীবিকা এবং নিরাপদে কাজ করার সক্ষমতাকে প্রভাবিত করছে।

প্রতিবেদনের তথ্য কাজে লাগিয়ে প্রতিরোধমূলক ব্যবস্থা, আগাম সতর্কতা এবং স্বাস্থ্যব্যবস্থার প্রস্তুতি জোরদার করার আহ্বান জানান তিনি।

মূল প্রবন্ধে তিনি বলেন, ২০১৬ থেকে ২০২৫ সাল পর্যন্ত বাংলাদেশে গরমের কারণে প্রতি বছর গড়ে ২৬ বিলিয়নের বেশি শ্রমঘণ্টা নষ্ট হয়েছে। ১৯৯০-এর দশকের বার্ষিক গড়ের তুলনায় এ ক্ষতি ৭১ শতাংশ বেশি।

প্রতিবেদন অনুযায়ী, ২০২১ থেকে ২০২৫ সাল পর্যন্ত প্রতি বছর গড়ে এক বছরের কম বয়সি শিশু এবং ৬৫ বছরের বেশি বয়সি মানুষ যথাক্রমেÑ৭.৬ ও ৭.২ দিন তাপপ্রবাহের মধ্যে কাটিয়েছে। ১৯৮৬ থেকে ২০০৫ সালের তুলনায় এ হার যথাক্রমেÑ১৬২ ও ১৩৬ শতাংশ বেশি। এছাড়া ২০২১ থেকে ২০২৫ সাল পর্যন্ত ৬৫ বছরের বেশি বয়সি মানুষের তাপজনিত মৃত্যুর আর্থিক মূল্য বছরে গড়ে ৩৮০ কোটি ডলারে পৌঁছেছে। ২০০০ থেকে ২০০৪ সালের তুলনায় এ ক্ষতি ৪৯৫ শতাংশ বেশি। এ অর্থ ওই বয়সি মানুষের গড় বার্ষিক আয়ের প্রায় দুই লাখ ১৬ হাজার গুণ।

প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, বাংলাদেশে মানবসৃষ্ট অতিক্ষুদ্র বস্তুকণায় (পিএম ২.৫) বায়ুদূষণের কারণে মৃত্যুর সংখ্যা ২০১৬ থেকে ২০২৩ সালের মধ্যে ৪০ শতাংশ বেড়েছে। ২০২৩ সালে এ ধরনের দূষণজনিত মৃত্যুর ৩৭.৫ শতাংশের জন্য দায়ী ছিল জীবাশ্ম জ্বালানি। একই বছরে গৃহস্থালি বায়ুদূষণের সঙ্গে ৭৭ হাজার ৫০০ জনের মৃত্যুর সম্পর্ক পাওয়া গেছে।

২০১৬ সালে এ সংখ্যা ছিল ৯০ হাজার ৭০০। বায়ুদূষণের কারণে অকালমৃত্যুর আর্থিক ক্ষতির পরিমাণ দাঁড়িয়েছে ৭৭.৬ বিলিয়ন বা ৭,৭৬০ কোটি ডলার, যা বাংলাদেশের মোট দেশজ উৎপাদনের (জিডিপি) ১৬.৪ শতাংশের সমান।

অন্যদিকে ২০১৬ থেকে ২০২৩ সালের মধ্যে বাংলাদেশের জ্বালানি ব্যবস্থার কার্বন নিঃসরণ তীব্রতা ৯.৯ শতাংশ বেড়েছে। ২০২৪ সালে জীবাশ্ম জ্বালানিতে নিট ভর্তুকির পরিমাণ ছিল ৫৩০ কোটি ডলার, যা জাতীয় স্বাস্থ্য বাজেটের ৫২.৯ শতাংশের সমান। এতে আরো বলা হয়েছে, ৪৮টি উন্নয়নশীল দেশের স্বাস্থ্য খাতে জলবায়ু অভিযোজনের জন্য বছরে অন্তত ৩৩০ কোটি ডলার প্রয়োজন। অথচ ২০২৪ সালে এ খাতে অর্থায়নের প্রতিশ্রুতি পাওয়া গেছে মাত্র ১১০ কোটি ডলার, যা চাহিদার প্রায় এক-তৃতীয়াংশ।

পরিবেশ অধিদপ্তরের অতিরিক্ত মহাপরিচালক মোহাম্মদ জিয়াউল হক বলেন, বাংলাদেশের জাতীয়ভাবে নির্ধারিত অবদান (এনডিসি) এবং জাতীয় অভিযোজন পরিকল্পনায় (ন্যাপ) স্বাস্থ্যকে গুরুত্ব দেওয়া হয়েছে। এখন এসব অঙ্গীকার বাস্তব পদক্ষেপে রূপ দিতে হবে। বায়ুদূষণে দুই লাখ ৩৯ হাজার মানুষের মৃত্যুর তথ্যদূষণ ও জীবাশ্ম জ্বালানির ব্যবহার কমানোর জরুরি প্রয়োজনীয়তা তুলে ধরেছে।

সেন্টার ফর অ্যাডভান্সড স্টাডিজের (সিএসডি) নির্বাহী পরিচালক ড. আতিক রহমান বলেন, জলবায়ু পরিবর্তনের সঙ্গে মানুষের স্বাস্থ্যের সরাসরি সম্পর্ক রয়েছে। তাপমাত্রা বাড়ায় শ্রমজীবী মানুষ মারাত্মকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছেন। একই সঙ্গে মা ও শিশুর স্বাস্থ্যও জলবায়ু পরিবর্তনের কারণে বাড়তি ঝুঁকিতে পড়ছে।

তিনি বলেন, দুর্ভাগ্যজনকভাবে, যথাযথ পদক্ষেপ নিতে আমরা দেরি করে ফেলেছি ।

ব্র্যাক বিশ্ববিদ্যালয়ের সেন্টার ফর ক্লাইমেট চেঞ্জ অ্যান্ড এনভায়রনমেন্টাল রিসার্চের ইমেরিটাস অধ্যাপক ড. আইনুন নিশাত বলেন, ল্যানসেট কাউন্টডাউনের প্রতিবেদন গুরুত্বপূর্ণ তথ্য দিচ্ছে। তবে পদক্ষেপ নিতে হবে স্থানীয় বাস্তবতা বিবেচনায়। তীব্র গরমের মধ্যেও অনেক মানুষ জীবিকার প্রয়োজনে বাইরে কাজ করতে বাধ্য হন।

source: Daily Amar Desh

Leave a Reply

Back to top button