News

চাকরি নয়, চরাঞ্চলের শিশুদের ভবিষ্যৎ গড়ছেন ‘শিক্ষা ফেরিওয়ালা’ আতিক

উচ্চশিক্ষা শেষে সরকারি চাকরি কিংবা শহুরে জীবনে প্রতিষ্ঠিত হওয়ার সুযোগ ছিল সামনে। কিন্তু সেই পথ বেছে নেননি আতিক। নিজের ভবিষ্যতের চেয়ে জন্মভূমির পিছিয়ে থাকা মানুষের ভবিষ্যৎকে গুরুত্ব দিয়ে ফিরে এসেছেন প্রত্যন্ত চরাঞ্চলে। স্বপ্ন দেখেছেন অবহেলিত এই জনপদের শিশুদের শিক্ষার আলোয় আলোকিত করার।

সেই স্বপ্ন থেকেই ২০২১ সালে শেরপুর সদর উপজেলার বেতমারী-ঘুঘুরাকান্দি ইউনিয়নের চরখারচর মজিবরের মোড়সংলগ্ন এলাকায় প্রতিষ্ঠা করেন ‘মেধাবিকাশ মডেল একাডেমি’। দুর্গম চরাঞ্চলে গড়ে ওঠা এ প্রতিষ্ঠানটি এরই মধ্যে ছয় শতাধিক শিক্ষার্থীর পদচারণায় মুখর হয়ে উঠেছে। স্থানীয়দের কাছে আতিক এখন পরিচিত ‘শিক্ষা ফেরিওয়ালা’ হিসেবে।

দরিদ্র ও অসহায় পরিবারের সন্তানদের পড়াশোনা যাতে অর্থের অভাবে বন্ধ না হয়, সে জন্য নিজের সামর্থ্য অনুযায়ী সহযোগিতা করে আসছেন তিনি। অতিদরিদ্র শিক্ষার্থীদের বিনামূল্যে কোচিং, বই ও শিক্ষা উপকরণ বিতরণসহ নানা সহায়তা দেওয়া হচ্ছে প্রতিষ্ঠানটির পক্ষ থেকে।

শুধু পাঠদানেই সীমাবদ্ধ নেই তার উদ্যোগ। শিক্ষার্থীদের আধুনিক শিক্ষার সঙ্গে যুক্ত করতে অনলাইন ক্লাস ও ডিজিটাল শিক্ষাসামগ্রী ব্যবহারের সুযোগ তৈরির উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে। পাশাপাশি বৃক্ষরোপণসহ বিভিন্ন সামাজিক ও মানবিক কর্মকাণ্ডেও সম্পৃক্ত রয়েছেন তিনি।

আতিক রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ের পদার্থবিজ্ঞান বিভাগে পড়াশোনা করেছেন। বিশ্ববিদ্যালয়জীবন থেকেই সামাজিক ও স্বেচ্ছাসেবামূলক কর্মকাণ্ডের সঙ্গে যুক্ত ছিলেন তিনি। বিভিন্ন সামাজিক সংগঠনের সঙ্গে কাজ করার অভিজ্ঞতা তার মধ্যে মানুষের জন্য কিছু করার মানসিকতা আরও দৃঢ় করে।

জানা যায়, তিনি স্বেচ্ছাসেবী রক্তদাতা গ্রুপ, সুজন ও বাঁধনের মতো সামাজিক কর্মকাণ্ডের সঙ্গে যুক্ত ছিলেন। এ ছাড়া রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ের পদার্থবিজ্ঞান বিভাগ সমিতির সাধারণ সম্পাদক এবং শেরপুর সদরের ‘বাতিঘর স্বেচ্ছাসেবী সংগঠন’-এর সভাপতি হিসেবেও দায়িত্ব পালন করেছেন।

সামাজিক কর্মকাণ্ডে দীর্ঘদিনের সম্পৃক্ততা থেকেই নিজের জন্মভূমির অনুন্নত চরাঞ্চলের শিক্ষাব্যবস্থা নিয়ে ভাবতে শুরু করেন তিনি। একপর্যায়ে সিদ্ধান্ত নেন, শুধু নিজের ক্যারিয়ার গড়ার পরিবর্তে এলাকার শিশুদের জন্য একটি শিক্ষার পরিবেশ তৈরি করবেন।

আরও পড়ুন: রাবি ভর্তি পরীক্ষার সম্ভাব্য তারিখ নির্ধারণ কর্তৃপক্ষের, কেন্দ্র ৭ শহরে

দুর্গম চরাঞ্চলে একটি শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান গড়ে তোলা সহজ ছিল না। প্রতিষ্ঠান প্রতিষ্ঠার পর থেকেই নানা প্রতিকূলতার মুখোমুখি হতে হয়েছে আতিককে। স্থানীয় কিছু মহলের বিরোধিতা ও ষড়যন্ত্রের পাশাপাশি ব্যক্তিগতভাবে বাধা ও নির্যাতনের শিকার হওয়ার অভিযোগও রয়েছে তার।

তবে এসব প্রতিকূলতা তাকে থামাতে পারেনি। বরং বাধাগুলোকে নতুন চ্যালেঞ্জ হিসেবে নিয়ে নিজের লক্ষ্য ও স্বপ্নের পথে এগিয়ে গেছেন তিনি। ধীরে ধীরে মেধাবিকাশ মডেল একাডেমিকে চরাঞ্চলের একটি পরিচিত শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে পরিণত করার চেষ্টা চালিয়ে যাচ্ছেন।

প্রতিষ্ঠানটির শিক্ষার্থীদের পরীক্ষার ফলাফলেও সাফল্যের ছাপ দেখা যাচ্ছে। মেধাবিকাশ মডেল একাডেমির প্রকাশিত ২০২৬ সালের ফলাফল অনুযায়ী, নিয়মিত মোট ৭০ জন পরীক্ষার্থীর মধ্যে ৬২ জন কৃতকার্য হয়েছে। অকৃতকার্য হয়েছে আটজন।

ফলাফলে সাতজন শিক্ষার্থী জিপিএ-৫ পেয়েছে। এছাড়া গোল্ডেন এ প্লাস পেয়েছে দুইজন, এ গ্রেড অর্জন করেছে ২৩ জন এবং এ-মাইনাস পেয়েছে ৩২ জন শিক্ষার্থী।

প্রত্যন্ত চরাঞ্চলের একটি শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের এমন ফলাফলে আশাবাদী স্থানীয় অভিভাবকরাও। তাদের মতে, প্রতিষ্ঠানটি চালু হওয়ার পর সন্তানদের ভালো শিক্ষার সুযোগ আগের তুলনায় অনেক সহজ হয়েছে। দরিদ্র পরিবারের সন্তানদের জন্য সহযোগিতার সুযোগ থাকায় অনেক শিক্ষার্থী পড়াশোনা চালিয়ে যাওয়ার সুযোগ পাচ্ছে।

আতিকের স্বপ্ন এখন শুধু একটি স্কুল প্রতিষ্ঠার মধ্যে সীমাবদ্ধ নেই। ভবিষ্যতে মেধাবিকাশ মডেল একাডেমিকে একটি আধুনিক ও আবাসিক শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে রূপ দেওয়ার পরিকল্পনা রয়েছে তার। পাশাপাশি বিজ্ঞান ল্যাব, ডিজিটাল লাইব্রেরি এবং মেধাবী ও দরিদ্র শিক্ষার্থীদের উচ্চশিক্ষায় সহায়তার জন্য স্কলারশিপ ফান্ড গড়ে তোলার স্বপ্ন দেখছেন তিনি।

তার বিশ্বাস, শিক্ষা কেবল একটি পেশা নয়; এটি মানুষের জীবন ও সমাজ পরিবর্তনের অন্যতম শক্তিশালী মাধ্যম। তাই শহুরে জীবনের সুযোগ কিংবা নিজের ক্যারিয়ারকে প্রাধান্য না দিয়ে জন্মভূমির চরাঞ্চলের শিশুদের ভবিষ্যৎ গড়ার কাজেই নিজেকে নিয়োজিত করেছেন তিনি।

দুর্গম চরাঞ্চলের মাটিতে দাঁড়িয়ে আতিক এখন যে স্বপ্ন দেখছেন, তা শুধু একটি বিদ্যালয়কে ঘিরে নয়—তার স্বপ্ন একটি শিক্ষিত প্রজন্ম তৈরি করা। যে প্রজন্ম একদিন নিজের পরিবার, সমাজ ও এলাকার উন্নয়নে ভূমিকা রাখবে।

মালিম উদ্দিনের সন্তান আতিকের এই পথচলা যেন দেখিয়ে দিচ্ছে, পরিবর্তনের জন্য সবসময় বিপুল অর্থ কিংবা বড় কোনো প্রতিষ্ঠানের প্রয়োজন হয় না। প্রয়োজন মানুষের জন্য কিছু করার ইচ্ছা, একটি স্বপ্ন এবং সেই স্বপ্ন বাস্তবায়নে অবিচল থাকার মানসিকতা।

আর সেই স্বপ্নের পথেই চরাঞ্চলের শিশুদের কাছে আতিক হয়ে উঠেছেন সত্যিকারের শিক্ষা ফেরিওয়ালা।

source: The Daily Campus

Leave a Reply

Back to top button