মন্ত্রীর নির্দেশের দুই মাসেও ব্যবস্থা নেওয়া হয়নি ডা. চিশতীর বিরুদ্ধে

নরসিংদীর বেলাবো উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সের জুনিয়র কনসালট্যান্ট ডা. মোহাম্মদ মইনুল হাসান চিশতী। গত ৬ আগস্ট সরকারি কর্মঘণ্টা চলাকালে রাজধানীর একটি বেসরকারি প্রতিষ্ঠানে রোগী দেখছিলেন। এ সময় সেখানে হাজির হন স্বাস্থ্যমন্ত্রী সরদার মোহাম্মদ সাখাওয়াত হোসেন। অভিযুক্ত চিশতীকে সরকারি চাকরি থেকে বরখাস্তের নির্দেশ দেন তিনি। একই সঙ্গে তার বাংলাদেশ মেডিকেল অ্যান্ড ডেন্টাল কাউন্সিলের (বিএমডিসি) নিবন্ধনও বাতিলের আদেশ দেওয়া হয়। তবে দুই মাসেও মন্ত্রীর নির্দেশ বাস্তবায়ন হয়নি।
সেদিন রাজধানীর পুরান ঢাকার ইংলিশ রোডের পপুলার ডায়াগনস্টিক সেন্টারে রোগী দেখছিলেন ডা. চিশতী। এ ঘটনায় মন্ত্রীর স্পষ্ট নির্দেশনা সত্ত্বেও স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয়ের ওয়েবসাইটে ডা. চিশতীর বিরুদ্ধে কোনো বিভাগীয় মামলা বা শাস্তিমূলক আদেশের তথ্য নেই। উল্টো তাকে দায়মুক্তি দেওয়ার চেষ্টার অভিযোগ উঠেছে মন্ত্রণালয়ের একটি সিন্ডিকেটের বিরুদ্ধে। অথচ একই ধরনের অভিযোগে অন্তত ডজনখানেক চিকিৎসক-কর্মকর্তার বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নিয়েছে কর্তৃপক্ষ।
দীর্ঘদিন ধরে রাজধানীতে ব্যক্তিগত চেম্বারে রোগী দেখছিলেন ডা. চিশতী। এ নিয়ে ইতিপূর্বে একাধিকবার শোকজ করা হলেও সেটি আমলে নেননি তিনি।
৬ আগস্টের ওই ঘটনার পর স্বাস্থ্যমন্ত্রী বলেছিলেন, সরকারি হাসপাতালে দায়িত্ব পালনের পরিবর্তে এই চিকিৎসক নিয়মিত পপুলারে রোগী দেখেন। এই কাজে তিনি সরকারি হাসপাতালের একটি ভুয়া পদত্যাগপত্র ব্যবহার করছেন।
মন্ত্রী বলেন, ওই চিকিৎসক অনৈতিক কাজ করেছেন। আর এতে এই হাসপাতাল সহযোগিতা করেছে। তার নিবন্ধন বাতিল এবং সরকারি চাকরি থেকে বরখাস্ত করা হবে। অভিযান চলাকালে উপস্থিত নির্বাহী ম্যাজিস্ট্রেটকে সংশ্লিষ্ট চিকিৎসক ও প্রতিষ্ঠানের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেওয়ার নির্দেশ দেন মন্ত্রী।
ডা. চিশতী অবশ্য দাবি করেছেন, তিনি আগেই সরকারি চাকরি থেকে অব্যাহতির আবেদন করেছিলেন। কিন্তু তার দাবির সঙ্গে আবেদনের কপির মিল পাওয়া যায়নি।
মন্ত্রণালয়ে জমা দেওয়া আবেদনের কপি অনুযায়ী, গত ২২ জুলাই তিনি অব্যাহতি চেয়ে আবেদন করেন এবং ১ আগস্ট থেকে চাকরি ছাড়ার কথা জানান। কিন্তু আবেদনটি মন্ত্রণালয়ে গ্রহণ করা হয় ১০ আগস্ট, অর্থাৎ মন্ত্রীর অভিযানের চার দিন পর।
৬ আগস্ট অভিযানের সময় ডা. চিশতী দাবি করেছিলেন, তিনি ৫-৬ মাস আগেই অব্যাহতির আবেদন করেছেন। ফলে তার বক্তব্যের সঙ্গে মন্ত্রণালয়ে জমা থাকা আবেদনের তথ্যের অসংগতি স্পষ্ট।
নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয়ের একাধিক কর্মকর্তা জানিয়েছেন, মোটা অঙ্কের অর্থের বিনিময়ে ডা. চিশতীকে শাস্তির হাত থেকে রক্ষায় তৎপর একটি সিন্ডিকেট। এর মধ্যে মন্ত্রণালয়ের সিনিয়র সহকারী সচিব ও মন্ত্রীর সহকারী একান্ত সচিব মো. মোস্তাফিজুর রহমানও রয়েছেন।
নিয়ম অনুযায়ী, সরকারি চাকরি থেকে অব্যাহতির আবেদন করলেই কেউ চাকরির দায়িত্ব থেকে মুক্ত হয়ে যান না। সরকার আনুষ্ঠানিকভাবে অব্যাহতি না দেওয়া পর্যন্ত দায়িত্ব পালন করতে হয়। সেক্ষেত্রে ৬ আগস্ট মন্ত্রীর অভিযানের সময় ডা. চিশতী সরকারি চাকরিতে বহাল ছিলেন। ফলে ওই সময়ে তার প্রাইভেট প্র্যাকটিস সরকারি কর্মচারী আচরণবিধির সুস্পষ্ট লঙ্ঘন।
ডা. চিশতীর বিরুদ্ধে ব্যবস্থা না নেওয়া হলেও একই সময়ে অন্তত এক ডজন অভিযুক্ত চিকিৎসক, নার্স ও কর্মকর্তার বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নিয়েছে মন্ত্রণালয়। মন্ত্রণালয়ের স্বাস্থ্যসেবা বিভাগের শৃঙ্খলা শাখার নথি অনুযায়ী, গত ৩ আগস্ট থেকে ২৪ আগস্ট পর্যন্ত সরকারি কর্মচারী (শৃঙ্খলা ও আপিল) বিধিমালা, ২০১৮ অনুযায়ী অনেকের বিরুদ্ধে শাস্তিমূলক পদক্ষেপ নেওয়া হয়েছে। অপারেশন থিয়েটারে রান্না, নিয়োগ পরীক্ষার প্রশ্নপত্র ফাঁস, ভুয়া বিল উত্তোলন, অর্থ আত্মসাৎ, ভুয়া মেডিকেল সার্টিফিকেটের মাধ্যমে বাণিজ্য, অনুমতি ছাড়া বেসরকারি হাসপাতালের শেয়ারহোল্ডার হওয়ার মতো নানা অভিযোগে তাদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেওয়া হয়। কিন্তু ধরাছোঁয়ার বাইরে থেকে যান ডা. মইনুল হাসান চিশতী।
সম্প্রতি যাদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেওয়া হয়েছে তাদের একজন ডা. তাহেরা খাতুন রোজি। ফেনীর ২৫০ শয্যাবিশিষ্ট জেনারেল হাসপাতালের গাইনি অ্যান্ড অবস বিভাগের এই চিকিৎসকের বিরুদ্ধে অসদাচরণের অভিযোগে বিভাগীয় মামলা হয়েছে।
ব্যবস্থা নেওয়া হয়েছে এমন কর্মকর্তাদের তালিকায় আছেন বান্দরবানের নাইক্ষ্যংছড়ি উপজেলা স্বাস্থ্য ও পরিবার পরিকল্পনা কর্মকর্তা (ইউএইচএফপিও) ডা. মোহাম্মদ আবুল মনজুর। তার বিরুদ্ধেও বিভাগীয় মামলা হয়েছে।
কুষ্টিয়া ২৫০ শয্যাবিশিষ্ট জেনারেল হাসপাতালের ডা. হোসেন ইমাম এবং গোপালগঞ্জের ২৫০ শয্যাবিশিষ্ট জেনারেল হাসপাতালের ডা. উর্মি হকের বিরুদ্ধেও বিভাগীয় মামলা হয়েছে।
অভিযোগের বিষয়ে যোগাযোগ করা হলে ডা. মইনুল হাসান চিশতী দাবি করেন, তিনি মন্ত্রী হাসপাতাল পরিদর্শনের আগেই গত জুলাইয়ে চাকরি থেকে অব্যাহতি নিয়েছেন। এশিয়া পোস্টকে তিনি বলেন, ‘যেখানে আমি অব্যাহতি নিয়েছি, সেখানে কর্মস্থলে থাকার প্রসঙ্গ আসার কথা নয়। আমার বিরুদ্ধে মিডিয়া ট্রায়াল হয়েছে।’ তবে অব্যাহতি নেওয়ার সুনির্দিষ্ট তারিখ জানাতে পারেননি তিনি।
বেলাবো উপজেলা স্বাস্থ্য ও পরিবার পরিকল্পনা কর্মকর্তা ডা. সৈয়দা তানজিনা আফরিনের সঙ্গে একাধিকবার যোগাযোগের চেষ্টা করা হলেও তার ফোন বন্ধ পাওয়া যায়।
অর্থের বিনিময়ে অভিযুক্ত চিকিৎসকের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেওয়ার না অভিযোগ অস্বীকার করেন স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয়ের সিনিয়র সহকারী সচিব ও মন্ত্রীর সহকারী একান্ত সচিব মো. মোস্তাফিজুর রহমান। তিনি বলেন, ‘এসব অভিযোগ সম্পূর্ণ মিথ্যা ও ভিত্তিহীন। ওই চিকিৎসকের সঙ্গে আমার ব্যক্তিগত পরিচয় নেই।’
source: Asia Post