News

জাতীয় সংগীত থেকে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়, রবীন্দ্রনাথকে নিয়ে বিতর্কের নেপথ্যে কী?

রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর© সংগ্রহীত

রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরকে ঘিরে বিতর্ক এ দেশে নতুন নয়। কখনো ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় প্রতিষ্ঠায় তার ভূমিকা, কখনো জাতীয় সংগীত, আবার কখনো শিল্প-সংস্কৃতির পরিসরে তার অবস্থান নিয়ে উঠেছে নানা প্রশ্ন। ইতিহাসের জটিল বাস্তবতা আর সমকালীন রাজনৈতিক বিতর্ক মিলেমিশে বারবার নতুন করে আলোচনায় এসেছেন বিশ্বকবি। সম্প্রতি রাজধানীর সেগুনবাগিচায় ফুটপাত থেকে হকার উচ্ছেদের পর দেয়ালে রবীন্দ্রনাথ, কাজী নজরুল ইসলাম ও সত্যজিৎ রায়ের প্রতিকৃতি আঁকাকে কেন্দ্র করে সেই বিতর্ক আবারও সামনে এসেছে। 

ঘটনার শুরু রাজধানীর সেগুনবাগিচা এলাকায় ফুটপাত থেকে হকার উচ্ছেদকে ঘিরে। উচ্ছেদের পর খালি হয়ে যাওয়া দেয়ালে আঁকা হয় কাজী নজরুল ইসলাম, রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর, সত্যজিৎ রায়সহ আরও কয়েকজন বিশিষ্ট ব্যক্তির প্রতিকৃতি। কিন্তু এই ঘটনাকে ঘিরে তৈরি হওয়া বিতর্কের কেন্দ্রে শুধু দেয়ালচিত্র নেই। অনেকে রসিকতা করে বলছেন, এর পেছনে রয়েছে ঢাকা দক্ষিণ সিটি করপোরেশনের সিদ্ধান্তও। হকার উচ্ছেদ না হলে হয়তো দেয়ালটি এভাবে সাজানোর প্রয়োজন পড়ত না। আর সেখানে প্রতিকৃতি আঁকা না হলে কবি ব্রাত্য রাইসুর আলোচিত পোস্টটিও হয়তো সামনে আসত না।

ব্রাত্য রাইসু তার পোস্টে লিখেছেন, শিল্পকলা-সংলগ্ন দেয়ালে যে কারণে নরেন্দ্র মোদি কিংবা অমিত শাহের ছবি লাগানো যায় না, একই কারণে বিদ্যাসাগর কিংবা সত্যজিৎ রায়ের ছবিও সেখানে লাগানো যায় না। তাঁর এই বক্তব্য সামনে আসার পরপরই শুরু হয় পক্ষে-বিপক্ষে নানা আলোচনা। কেউ কেউ প্রশ্ন তোলেন, বাংলাদেশের দেয়ালে যদি নজরুল, রবীন্দ্রনাথ কিংবা সত্যজিৎ রায়ের ছবি আঁকা যায়, তাহলে ভারতের দেয়ালে বাংলাদেশের জেমস, আইয়ুব বাচ্চু কিংবা হুমায়ূন আহমেদের ছবি থাকবে না কেন? দুই দেশের সাংস্কৃতিক পরিসরে কার প্রতিকৃতি স্থান পাবে, সেই প্রশ্ন ঘিরেও শুরু হয় তর্ক-বিতর্ক।

তবে বিতর্কের পরিধি দেয়ালচিত্র কিংবা সাংস্কৃতিক প্রতিনিধিত্বের প্রশ্নেই সীমাবদ্ধ থাকেনি। আলোচনা গড়িয়েছে মামলা ও কারাবাসের প্রসঙ্গ পর্যন্ত। এর আগেও রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের লেখা বাংলাদেশের জাতীয় সংগীত নিয়ে আপত্তি উঠতে দেখা গেছে। 

এরই ধারাবাহিকতায় গত শনিবার (১০ অক্টোবর) রাজধানীর সেগুনবাগিচায় বিশ্বকবি রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের গ্রাফিতিতে চুনকালি মাখানোর চেষ্টার অভিযোগে ‘রাষ্ট্র সংলাপ ফোরাম’-এর সদস্যসচিব এ এন এম আয়াসসহ চারজনকে আটক করে পুলিশ। পরে গত রবিবার (১১ অক্টোবর) একই ঘটনায় আটক চারজনকে রাষ্ট্রদ্রোহ মামলায় গ্রেপ্তার দেখানো হয়েছে বলে জানায় পুলিশ।

জাতীয় সঙ্গীত রচনার প্রেক্ষাপট

বাংলাদেশের জাতীয় সংগীত ‘আমার সোনার বাংলা’ রচনার প্রেক্ষাপট ১৯০৫ সালের বঙ্গভঙ্গ আন্দোলনের সঙ্গে ওতপ্রোতভাবে জড়িত। তৎকালীন ব্রিটিশ ভাইসরয় লর্ড কার্জন বাংলাকে দ্বিখণ্ডিত করার সিদ্ধান্ত নেন। এই সিদ্ধান্তের বিরুদ্ধে বাংলাজুড়ে তীব্র প্রতিবাদ গড়ে ওঠে, যা বঙ্গভঙ্গ আন্দোলন নামে পরিচিত। ব্রিটিশদের দাবি ছিল, প্রশাসনিক সুবিধার জন্য বাংলাকে ভাগ করা প্রয়োজন। তবে কলকাতাকেন্দ্রিক হিন্দু বাবু সমাজের অধিকাংশ এই সিদ্ধান্তের বিরোধিতা করেন। তাদের অনেকে বিষয়টিকে কলকাতার বিপরীতে ঢাকার শক্তিশালী হয়ে ওঠার সম্ভাবনা হিসেবেও দেখেছিলেন।

রবীন্দ্রনাথ মূলত বাংলাকে বিভক্ত করার বিরোধিতা করেছিলেন এবং দুই বাংলার মানুষের আত্মিক বন্ধন সুদৃঢ় করতে বেশ কিছু স্বদেশি গান রচনা করেন। এরই ধারাবাহিকতায় ১৯০৫ সালে তিনি ‘আমার সোনার বাংলা’ গানটি রচনা করেন। গানটিতে বাংলার প্রকৃতি, মাতৃভূমির প্রতি গভীর আবেগ এবং মমত্ববোধ ফুটে উঠেছে। রবীন্দ্রনাথ এই গানের সুর নিয়েছিলেন কুষ্টিয়ার বাউল গগন হরকরার বিখ্যাত গান ‘আমি কোথায় পাব তারে’ থেকে।

১৯০৫ সালের ২৫ আগস্ট কলকাতার টাউন হলে গানটি প্রথম গাওয়া হয়। পরবর্তীকালে ১৯৭১ সালে বাংলাদেশের মহান মুক্তিযুদ্ধের সময় গানটি মুক্তিযোদ্ধাদের অনুপ্রাণিত করে। স্বাধীন দেশ হিসেবে আত্মপ্রকাশের পর ১৯৭২ সালের ১৩ জানুয়ারি শেখ মুজিবুর রহমানের নেতৃত্বাধীন সরকার গানটির প্রথম ১০ চরণকে বাংলাদেশের জাতীয় সংগীত হিসেবে আনুষ্ঠানিকভাবে স্বীকৃতি দেয়।

বঙ্গভঙ্গে ‘আমার সোনার বাংলা’র ভূমিকা

১৯০৫ সালের বঙ্গভঙ্গ আন্দোলনে রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের ‘আমার সোনার বাংলা’ গানটি কেবল একটি সাধারণ গীতিকবিতা ছিল না; বরং এটি ব্রিটিশ সাম্রাজ্যবাদের বিরুদ্ধে বাঙালির সাংস্কৃতিক প্রতিরোধ ও রাজনৈতিক ঐক্যের অন্যতম হাতিয়ার হয়ে ওঠে। তৎকালীন ব্রিটিশ ভাইসরয় লর্ড কার্জন বাঙালির জাতীয়তাবাদী চেতনাকে খণ্ডিত করতে এবং হিন্দু-মুসলমানের মধ্যে বিভেদ সৃষ্টির উদ্দেশ্যে বাংলা ভাগের সিদ্ধান্ত নেন—এমন ব্যাখ্যা বঙ্গভঙ্গবিরোধী আন্দোলনের ইতিহাসে পাওয়া যায়। এই সিদ্ধান্তের প্রতিবাদে গড়ে ওঠা গণআন্দোলনে গানটি গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করে।

ব্রিটিশদের ‘ভাগ করো ও শাসন করো’ নীতির লক্ষ্য ছিল বাংলার প্রধান দুই ধর্মীয় সম্প্রদায়ের মধ্যে দূরত্ব তৈরি করা—এমন ধারণা বঙ্গভঙ্গবিরোধী আন্দোলনের সমর্থকদের মধ্যে প্রচলিত ছিল। রবীন্দ্রনাথ গানের বাণীতে বাংলার আকাশ, বাতাস ও প্রকৃতির অবিভাজ্য রূপ তুলে ধরেন। গানটি দুই বাংলার মানুষের মধ্যে আত্মিক বন্ধনের ধারণাকে জোরালো করতে ভূমিকা রাখে।

রাখিবন্ধন উৎসবের সঙ্গে সম্পৃক্ততা ছিল। ১৯০৫ সালের ১৬ অক্টোবর বঙ্গভঙ্গ কার্যকর হওয়ার দিনটি বঙ্গভঙ্গবিরোধীরা শোক দিবস হিসেবে পালন করেন। রবীন্দ্রনাথের আহ্বানে সেদিন কলকাতার রাস্তায় বহু মানুষ নেমে আসেন। তারা বাংলার অখণ্ডতার প্রতীক হিসেবে একে অপরের হাতে রাখি বেঁধে দেন। এই ঐতিহাসিক আয়োজন ও শোভাযাত্রায় ‘আমার সোনার বাংলা’ গানটি গাওয়া হয়, যা আন্দোলনকারীদের আবেগ ও ঐক্যকে তুলে ধরে।

বঙ্গভঙ্গবিরোধী স্বদেশি আন্দোলন এবং ব্রিটিশ পণ্য বর্জনের কর্মসূচিতে গানটি অনুপ্রেরণার উৎস হয়ে ওঠে। রাজনৈতিক সভা-সমাবেশ, পিকেটিং এবং ব্রিটিশবিরোধী মিছিলে গানটি গেয়ে তরুণেরা দেশপ্রেমে উদ্বুদ্ধ হতেন। এর সুর ও বাণী সাধারণ মানুষের মধ্যে ব্রিটিশবিরোধী চেতনা ছড়িয়ে দিতে ভূমিকা রাখে।

তবে সমালোচনা আছে। বঙ্গভঙ্গবিরোধী আন্দোলনের একটি অংশ যুগান্তর দল ও অনুশীলন সমিতির মাধ্যমে পরিচালিত হতো। হিন্দু জমিদারদের অর্থায়ন এবং মুসলিম-অধ্যুষিত পূর্ববঙ্গের নতুন প্রদেশ হিসেবে আত্মপ্রকাশকে কেন্দ্র করে ১৯০৫ থেকে ১৯১১ সাল পর্যন্ত নানা সাম্প্রদায়িক উত্তেজনা ও সংঘাতের ঘটনা ঘটে। সমালোচকদের একাংশ মনে করেন, সাহিত্যিক হয়েও নতুন প্রদেশের বিরোধিতা করে রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর তৎকালীন সাম্প্রদায়িক রাজনীতির সঙ্গে সুর মিলিয়েছিলেন।

দীর্ঘ শাসনামলে পূর্ববাংলার মানুষের প্রশাসনিক, আর্থিক, সামাজিক ও রাজনৈতিক ক্ষেত্রে তেমন কোনো অংশগ্রহণ ছিল না। বরং তারা কলকাতাকেন্দ্রিক বাবু সমাজ ও ব্রিটিশদের দয়া-দাক্ষিণ্যের ওপর অনেক বেশি নির্ভরশীল ছিলেন। আবার কলকাতার বাবু সমাজের অধিকাংশের জমিদারি ছিল পূর্ববাংলায়। ফলে তাদের জমিদারি হারানোর ভয় প্রকট হয়ে উঠেছিল বলেও মনে করেন অনেক ইতিহাসবিদ। সমালোচকদের অভিযোগ, ‘আমার সোনার বাংলা’ গানে বাংলার প্রকৃতি ও আবেগের কথা তুলে ধরে তিনি মূলত মুসলিম-অধ্যুষিত পূর্ববঙ্গের স্বার্থের বিরুদ্ধে অবস্থান নিয়েছিলেন এবং বৃহৎ একটি জনগোষ্ঠীর অগ্রগতির পথে বাধা সৃষ্টির ভূমিকা রেখেছিলেন। তবে রবীন্দ্রনাথের বিরুদ্ধে এমন অভিযোগ থাকলেও ব্যক্তি হিসেবে তার দৃষ্টিভঙ্গি উদার ছিল বলে মনে করেন অনেকে।

রবীন্দ্রনাথের জমিদারি কেমন ছিল

রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর প্রচলিত অর্থে শোষক জমিদার ছিলেন কি না, তা নিয়ে ঐতিহাসিক আলোচনা রয়েছে। তবে জমিদারি পরিচালনার সময় তিনি প্রজাদের আত্মনির্ভরশীল ও শিক্ষিত করে তোলার জন্য বেশ কিছু উদ্যোগ নিয়েছিলেন। প্রজাদের আর্থসামাজিক উন্নয়নে তার নেওয়া উদ্যোগগুলোর মধ্যে ছিল কৃষির আধুনিকায়ন, ঋণসহায়তা, শিক্ষা ও চিকিৎসাসেবার প্রসার এবং স্থানীয় বিরোধ নিষ্পত্তির ব্যবস্থা।

তৎকালীন গ্রামীণ বাংলায় দরিদ্র কৃষকেরা মহাজনদের কাছ থেকে উচ্চ সুদে ঋণ নিয়ে আর্থিক সংকটে পড়তেন। এই পরিস্থিতি মোকাবিলায় রবীন্দ্রনাথ পতিসর এলাকায় কৃষিঋণ ও সমবায়ভিত্তিক অর্থনৈতিক উদ্যোগ গ্রহণ করেন।

গ্রামীণ মানুষের উন্নয়নে শিক্ষাকে গুরুত্বপূর্ণ মনে করতেন রবীন্দ্রনাথ। তার জমিদারি এলাকায় প্রাথমিক বিদ্যালয় ও নৈশ বিদ্যালয় স্থাপনের উদ্যোগ নেওয়া হয়। পতিসরে কালীগ্রাম রথীন্দ্রনাথ হাই স্কুল প্রতিষ্ঠার সঙ্গেও তার উদ্যোগ জড়িত ছিল। প্রজাদের চিকিৎসাসেবা দেওয়ার জন্য তিনি দাতব্য চিকিৎসালয় স্থাপন করেন। চিকিৎসকদের বেতন ও ওষুধের খরচ মেটাতে প্রজাদের কাছ থেকে সামান্য অর্থ সংগ্রহ করে স্বাস্থ্য তহবিল গঠনের ব্যবস্থাও ছিল।

প্রচলিত জমিদারি ব্যবস্থায় প্রজাদের ওপর লাঠিয়াল বাহিনীর নির্যাতনের অভিযোগ ছিল। রবীন্দ্রনাথের জমিদারি পরিচালনায় স্থানীয় বিরোধ মীমাংসার জন্য মণ্ডলী প্রথা বা পঞ্চায়েতব্যবস্থার ওপর গুরুত্ব দেওয়া হয়েছিল। এর উদ্দেশ্য ছিল আদালতের দীর্ঘসূত্রতা ও আইনি খরচ এড়িয়ে স্থানীয় পর্যায়ে বিরোধ নিষ্পত্তি করা। তবে এসব উদ্যোগ জমিদারি ব্যবস্থার সব ধরনের বৈষম্য ও শোষণ দূর করতে পেরেছিল কি না, তা পৃথকভাবে মূল্যায়নের বিষয়।

রবীন্দ্রনাথ ব্যক্তিগতভাবে প্রজাদের কল্যাণে আগ্রহী হলেও তার অনুপস্থিতিতে কিংবা মাঠপর্যায়ে রাজস্ব আদায়ের দায়িত্বে থাকা নায়েব ও গোমস্তাদের বিরুদ্ধে কঠোর আচরণের অভিযোগ ছিল। বকেয়া খাজনা আদায়ের জন্য দরিদ্র কৃষকদের ওপর চাপ সৃষ্টি করা হতো বলে বিভিন্ন বিবরণে উল্লেখ রয়েছে। সমসাময়িক সাংবাদিক কাঙাল হরিনাথ তার ‘গ্রামবার্তা প্রকাশিকা’ পত্রিকায় ঠাকুর এস্টেটের কর্মচারীদের কিছু প্রশাসনিক অনিয়ম ও প্রজাপীড়নের খবর প্রকাশ করেছিলেন। এসব অভিযোগ জমিদারি ব্যবস্থার অন্তর্নিহিত কঠোরতা নিয়ে আলোচনার ক্ষেত্রে গুরুত্বপূর্ণ।

রবীন্দ্রনাথের জমিদারি নিয়ে একটি সমালোচনা হলো, তার জমিদারির আয়ের বড় অংশ আসত পূর্ববঙ্গের, অর্থাৎ বর্তমান বাংলাদেশের কৃষকদের কাছ থেকে। অন্যদিকে, তার শিক্ষা ও সাংস্কৃতিক উদ্যোগের বড় প্রতিষ্ঠানগুলোর মধ্যে শান্তিনিকেতন ও বিশ্বভারতী ছিল পশ্চিমবঙ্গে। সমালোচকদের মতে, পূর্ববঙ্গের কৃষকদের কাছ থেকে সংগৃহীত অর্থের একটি অংশ পশ্চিমবঙ্গের এসব প্রতিষ্ঠান গড়ে তোলা ও পরিচালনার কাজে ব্যয় করা হয়েছিল। ফলে যে অঞ্চলের কৃষকেরা জমিদারি রাজস্ব দিতেন, তারা সেই প্রাতিষ্ঠানিক শিক্ষার সুফল একইভাবে বা তাৎক্ষণিকভাবে ভোগ করতে পারেননি।

পূর্ববঙ্গের মুসলিম প্রজাদের একটি অংশের অভিযোগ ছিল, রবীন্দ্রনাথের সাহিত্যকর্ম ও সমাজভাবনায় গ্রামীণ মুসলমানদের দৈনন্দিন জীবন ও অভিজ্ঞতা যথেষ্ট গুরুত্ব পায়নি। ১৯০৫ সালের বঙ্গভঙ্গের সময় পূর্ববঙ্গের অনগ্রসর মুসলিম জনগোষ্ঠীর একটি অংশ প্রশাসনিক সুবিধার আশায় নতুন প্রদেশের পক্ষে অবস্থান নিয়েছিল। অন্যদিকে, রবীন্দ্রনাথ বঙ্গভঙ্গের বিরোধিতা করেন। তৎকালীন মুসলিম নেতৃত্বের একাংশ তার এই অবস্থানকে কলকাতাকেন্দ্রিক উচ্চবর্ণের হিন্দু জমিদার ও বুদ্ধিজীবীদের স্বার্থরক্ষার প্রচেষ্টা হিসেবে দেখেছিল। তবে রবীন্দ্রনাথের ব্যক্তিগত অবস্থান, বঙ্গভঙ্গবিরোধী আন্দোলনের রাজনৈতিক চরিত্র এবং সমসাময়িক বিভিন্ন গোষ্ঠীর স্বার্থ আলাদাভাবে বিশ্লেষণ করা প্রয়োজন।

রবীন্দ্রনাথ কী ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় প্রতিষ্ঠার বিরোধিতা করেছিলেন?

একটি বহুল প্রচারিত দাবি হলো, ১৯১২ সালের ২৮ মার্চ কলকাতার গড়ের মাঠে কিংবা কারও কারও মতে টাউন হলে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় প্রতিষ্ঠার সিদ্ধান্তের বিরুদ্ধে একটি বড় প্রতিবাদ সভা অনুষ্ঠিত হয়েছিল এবং রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর সেই সভায় সভাপতিত্ব করেছিলেন। তবে এই দাবির ঐতিহাসিক সত্যতা নিয়ে প্রশ্ন রয়েছে। দাবিটির বিপরীতে বলা হয়, ১৯১২ সালের ২৮ মার্চ কলকাতায় এ ধরনের কোনো সভা অনুষ্ঠিত হওয়ার নির্ভরযোগ্য প্রমাণ পাওয়া যায় না। একই সঙ্গে রবীন্দ্রনাথের ওই সময়কার অবস্থান নিয়ে তার জীবনী ও দিনলিপির তথ্য উল্লেখ করা হয়। রবীন্দ্র-জীবনীকার প্রশান্তকুমার পাল তার ‘রবিজীবনী’ গ্রন্থে কবির তৎকালীন দিনলিপি ও অবস্থান সম্পর্কে বিস্তারিত তথ্য দিয়েছেন।

প্রচলিত বিবরণ অনুযায়ী, ১৯১২ সালের জানুয়ারি ও ফেব্রুয়ারি মাসে রবীন্দ্রনাথ অসুস্থ ছিলেন। ওই বছরের ১৯ মার্চ তার চিকিৎসার জন্য ইংল্যান্ডে যাওয়ার কথা ছিল। কিন্তু বোম্বে, বর্তমান মুম্বাইয়ে পৌঁছানোর পর তিনি আবার অসুস্থ হয়ে পড়েন। চিকিৎসকদের পরামর্শে সমুদ্রযাত্রা বাতিল করে ২৪ মার্চ বিশ্রামের জন্য কুষ্টিয়ার শিলাইদহে ফিরে আসেন। এরপর ২৮ মার্চ থেকে এপ্রিলের মাঝামাঝি পর্যন্ত তিনি শিলাইদহ কুঠিবাড়িতে অবস্থান করেন এবং সেখানে ‘গীতাঞ্জলি’র ইংরেজি অনুবাদের কাজ শুরু করেন বলে জীবনীভিত্তিক বিবরণে উল্লেখ রয়েছে।

এই বিবরণ সঠিক হলে ২৮ মার্চ কলকাতায় অনুষ্ঠিত কোনো সভায় তার সভাপতিত্ব করার দাবি প্রশ্নবিদ্ধ হয়। তবে বিষয়টি চূড়ান্তভাবে নির্ধারণ করতে সংশ্লিষ্ট ঐতিহাসিক নথি, সংবাদপত্রের প্রতিবেদন ও জীবনীগ্রন্থের তথ্য মিলিয়ে দেখা প্রয়োজন।

১৯১২ সালে লর্ড হার্ডিঞ্জ ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় প্রতিষ্ঠার ঘোষণা দেওয়ার পর কলকাতার প্রভাবশালী হিন্দু বুদ্ধিজীবী, জমিদার ও আইনজীবীদের একটি অংশ এর বিরোধিতা করেছিলেন বলে ঐতিহাসিক বিবরণে উল্লেখ রয়েছে। তবে ওই বিরোধিতাকারীদের তালিকায় রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের নাম না থাকলেও তারা তার সামাজিক পরিসরের কলকাতার বাবু সমাজের লোক ছিলেন, যাঁদের অনেকে শহুরে মধ্যবিত্ত শ্রেণির অন্তর্ভুক্ত। সমালোচকদের অনেকে যুক্তি দেন, তিনি নিজে বিরোধিতা করেননি, তবে তার সমাজে চলমান বিরোধিতার জবাবও দেননি। কলকাতার বাবু সমাজের অযৌক্তিক দাবির বিষয়ে নীরব থেকে তিনি একপ্রকার সায় দিয়েছেন বলে মনে করেন অনেকে।

কারা বিরোধিতা করেছিলেন এবং কেন?

স্মারকলিপি প্রদান: ১৯১২ সালের ১৬ ফেব্রুয়ারি লর্ড হার্ডিঞ্জের কাছে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় প্রতিষ্ঠার সিদ্ধান্তের বিরোধিতা করে একটি প্রতিনিধি দল স্মারকলিপি জমা দেয় বলে বিভিন্ন ঐতিহাসিক বিবরণে উল্লেখ রয়েছে। ওই প্রতিনিধি দলের নেতৃত্বে ছিলেন তৎকালীন প্রখ্যাত আইনজ্ঞ ও রাজনীতিবিদ ড. রাসবিহারী ঘোষ। কলকাতা বিশ্ববিদ্যালয়ের তৎকালীন উপাচার্য স্যার আশুতোষ মুখোপাধ্যায় এবং প্রখ্যাত জাতীয়তাবাদী নেতা সুরেন্দ্রনাথ ব্যানার্জী প্রথম দিকে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় প্রতিষ্ঠার সিদ্ধান্তের বিরোধিতা করেছিলেন বলে প্রচলিত ঐতিহাসিক বিবরণে উল্লেখ রয়েছে। অনেক বিবরণে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়কে ‘মক্কা বিশ্ববিদ্যালয়’ বলে ঠাট্টা করার কথাও জানা যায়।

কলকাতার বাবু ও বুদ্ধিজীবী সমাজের এই বিরোধিতার পেছনে প্রাতিষ্ঠানিক ও অর্থনৈতিক কারণ গুরুত্বপূর্ণ ছিল বলে বিশ্লেষকদের একটি অংশ মনে করেন। তাদের আশঙ্কা ছিল, পূর্ববঙ্গে একটি নতুন ও স্বায়ত্তশাসিত বিশ্ববিদ্যালয় প্রতিষ্ঠিত হলে কলকাতা বিশ্ববিদ্যালয়ের বাজেট, অনুদান ও প্রাতিষ্ঠানিক প্রভাব কমে যেতে পারে। এ ছাড়া জমিদারি ব্যবস্থার কারণে কলকাতার অনেক জমিদারের আয়ের উৎস ছিল পূর্ববঙ্গের সাধারণ প্রজা। সমালোচকদের মতে, পূর্ববঙ্গের মুসলমান ও অনগ্রসর হিন্দুরা উচ্চশিক্ষিত হয়ে উঠলে প্রচলিত জমিদারি শাসন ও শোষণের ভিত্তি দুর্বল হয়ে পড়তে পারে—এমন আশঙ্কাও কিছু জমিদার ও প্রভাবশালী গোষ্ঠীর মধ্যে ছিল।

বিরোধিতা সত্ত্বেও ব্রিটিশ সরকার ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় প্রতিষ্ঠার সিদ্ধান্তে অটল থাকে। পরবর্তীকালে লর্ড হার্ডিঞ্জ স্যার আশুতোষ মুখোপাধ্যায়কে আশ্বস্ত করেন যে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় প্রতিষ্ঠার কারণে কলকাতা বিশ্ববিদ্যালয়ের বাজেটে কাটছাঁট করা হবে না। এরপর আশুতোষ মুখোপাধ্যায় বিরোধিতা প্রত্যাহার করেন এবং ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষাকাঠামো গঠন ও শিক্ষক নিয়োগের ক্ষেত্রে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করেন বলে ঐতিহাসিক বিবরণে উল্লেখ রয়েছে।

‘চাষার দেশে কিসের বিশ্ববিদ্যালয়?’—উক্তিটির সত্যতা

সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম ও কিছু রাজনৈতিক আলোচনায় প্রায়ই দাবি করা হয়, পূর্ববঙ্গে বিশ্ববিদ্যালয় প্রতিষ্ঠার বিরোধিতা করতে গিয়ে রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর অবজ্ঞার সুরে বলেছিলেন, ‘চাষার দেশে আবার কিসের বিশ্ববিদ্যালয়!’ কিংবা ‘মূর্খের দেশে আবার কিসের বিশ্ববিদ্যালয়!’

রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের সাহিত্যকর্ম, চিঠিপত্র, প্রবন্ধ ও সমসাময়িক দিনলিপিতে এই উক্তির কোনো নির্ভরযোগ্য সূত্র পাওয়া গেছে কি না, তা যাচাই করা প্রয়োজন। দাবিটির সমর্থনে নির্ভরযোগ্য লিখিত বা মৌখিক সূত্র উপস্থাপন করা না গেলে এটিকে তার বক্তব্য হিসেবে প্রচার করা উচিত নয়।

রবীন্দ্রনাথের জীবন ও কর্মের আরেকটি দিক হলো, পূর্ববঙ্গের গ্রামীণ মানুষের জীবনযাত্রার উন্নয়নে তার বিভিন্ন উদ্যোগ। কৃষকদের অর্থনৈতিকভাবে স্বাবলম্বী করার লক্ষ্যে তিনি পতিসরে কৃষিঋণ ও সমবায়ভিত্তিক উদ্যোগ গ্রহণ করেছিলেন। কৃষকদের মহাজনি ঋণের ওপর নির্ভরতা কমানো এবং গ্রামীণ শিক্ষার প্রসারেও তিনি কাজ করেন। তার জমিদারি এলাকায় নৈশ বিদ্যালয় ও পাঠশালা প্রতিষ্ঠার উদ্যোগ ছিল।

যা বলছেন ইতিহাস বিশেষজ্ঞরা   

ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ইতিহাস বিভাগে বঙ্গভঙ্গের ইতিহাস পড়ান অধ্যাপক ড. এম এ কাউসার ঢাকা ডায়েরিকে বলেন,  রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের মৃত্যুর ছয় বছর পর, ১৯৪৭ সালে পাকিস্তান প্রতিষ্ঠিত হয়। এরপর আরও ২৪ বছর পর, ১৯৭১ সালে বাংলাদেশের জন্ম। ফলে বাংলাদেশের স্বাধীনতার সঙ্গে রবীন্দ্রনাথের প্রত্যক্ষ কোনো সংশ্লিষ্টতা ছিল না। তবে ১৯০৫ সালের বঙ্গভঙ্গের সময় তিনি বঙ্গভঙ্গের বিরোধিতা করেছিলেন। সেই বিরোধিতার পেছনে তৎকালীন দেশপ্রেমের পাশাপাশি রাজনৈতিক ও প্রশাসনিক বিষয়ও যুক্ত ছিল। রবীন্দ্রনাথ বঙ্গভঙ্গের বিরোধিতা করে ‘আমার সোনার বাংলা’, ‘বাংলার মাটি, বাংলার জল’সহ বেশ কিছু গান রচনা করেন।
 
তিনি বলেন, সেই জায়গা থেকে বাংলাদেশের জন্মের সঙ্গে রবীন্দ্রনাথের সম্পর্ক কীভাবে তৈরি হলো, তা নিয়ে প্রশ্ন থাকতে পারে। তার দেশাত্মবোধক গানগুলো দুই বাংলার মানুষের মধ্যে আবেগ ও প্রেরণা জুগিয়েছে। ১৯৪৭ সালের পর পাকিস্তানবিরোধী আন্দোলনের সময় বাঙালি জাতীয়তাবাদ গঠনে রবীন্দ্রনাথের গান ও কবিতা অনুপ্রেরণা হিসেবে কাজ করে থাকতে পারে। তার লেখায় দেশের কথা, দেশের মানুষের কথা ও বাঙালি সংস্কৃতির যে প্রকাশ রয়েছে, সেগুলোকে ভিত্তি করে এই পরোক্ষ সংযোগ খুঁজে দেখা যায়।
 
ঢাবি অধ্যাপক বলেন, পাকিস্তানবিরোধী আন্দোলনে রবীন্দ্রসংগীতের ভূমিকার একটি প্রমাণ হলো, পাকিস্তান সরকার বেতারে রবীন্দ্রসংগীত প্রচার বন্ধ করে দিয়েছিল। বাঙালির সাংস্কৃতিক পরিচয় ও জাতীয়তাবাদী চেতনার সঙ্গে রবীন্দ্রসংগীতের সংযোগ ছিল বলেই সরকার এ ধরনের পদক্ষেপ নিয়েছিল বলে মনে করা যায়। এভাবেই রবীন্দ্রনাথের গান ও কবিতার সঙ্গে বাংলাদেশের জন্মের একটি দূরবর্তী ও পরোক্ষ সম্পর্ক তৈরি করা সম্ভব।
 
 রবীন্দ্রনাথকে কি প্রজাপীড়ক বা শোষক জমিদার হিসেবে দেখা যায়?
 
এ বিষয়ে অধ্যাপক ড. এম এ কাউসার বলেন, তৎকালীন সমাজে জমিদার বলতে সাধারণত প্রজাপীড়ক, শোষক এবং আড়ম্বরপূর্ণ জীবনযাপনে অভ্যস্ত ব্যক্তির চিত্র সামনে আসত। সেই জায়গা থেকে রবীন্দ্রনাথের কিছু পার্থক্য ছিল। তিনি একেবারে প্রচলিত ধারার জমিদার ছিলেন না; বরং চিন্তাশীল একজন ব্যক্তি ছিলেন।
 
তিনি বলেন, তবে তার জমিদারি কাঠামোর মধ্যে যদি কোনো নিপীড়ন থেকে থাকে, তাহলে সেটি বিবেচনার ক্ষেত্রে জমিদারি ব্যবস্থার ঐতিহাসিক কাঠামো ও প্রচলিত প্রথার বিষয়টিও দেখতে হবে। ১৭৯৩ সালের চিরস্থায়ী বন্দোবস্তের পর থেকে জমিদারি ব্যবস্থার কাঠামোর মধ্যেই কিছু নিপীড়নমূলক উপাদান ছিল। সেই নিপীড়নের দায় রবীন্দ্রনাথের ওপর কতটা বর্তাবে, আর কতটা ব্যবস্থার কাঠামো ও ঐতিহ্যের ওপর বর্তাবে, তা নির্ভর করে বিষয়টি কে কীভাবে ব্যাখ্যা করছেন তার ওপর। তার সময়ে নিপীড়নের ঘটনা কতটা ঘটেছিল, সে বিষয়ে আমার জানা নেই। আর যদি এমন ঘটনা ঘটে থাকে, তাহলে তিনি সেগুলো প্রতিরোধের চেষ্টা করেছিলেন কি না, সেটিও আমার জানা নেই।
 
ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় প্রতিষ্ঠা ও রবিন্দ্রনাথের অবস্থান নিয়ে বিতর্কের বিষয়ে তিনি বলেন, তৎকালীন কলকাতা বিশ্ববিদ্যালয়ের উপাচার্য আশুতোষ মুখোপাধ্যায়ের দিক থেকে আপত্তি ছিল। সাধারণভাবে কলকাতার ওই অংশের মানুষের মধ্যেও পূর্ববঙ্গের মুসলিম কৃষকদের জন্য বিশ্ববিদ্যালয় প্রতিষ্ঠার প্রয়োজনীয়তা নিয়ে আপত্তি ছিল।
 
তবে রবীন্দ্রনাথকে উদ্ধৃত করে তিনি এ ধরনের কথা বলেছিলেন—এমন কোনো বক্তব্যের নির্ভরযোগ্য সূত্র আমার চোখে পড়েনি। এ বিষয়ে আমার পড়াশোনার ঘাটতি থাকতে পারে। কিন্তু নির্দিষ্ট কোনো সূত্রসহ, কোন পত্রিকায় বা কোথায় তিনি এমন কথা বলেছেন, তা আমি দেখিনি। বিষয়টি নিয়ে খুব বেশি নথিভিত্তিক তথ্যও আমার চোখে পড়েনি। তবে পশ্চিমবঙ্গের একটি অংশের মধ্যে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় প্রতিষ্ঠার বিরোধিতা ছিল। বিশেষ করে আশুতোষ মুখোপাধ্যায় ও কলকাতা বিশ্ববিদ্যালয়কেন্দ্রিক একটি গোষ্ঠীর মধ্যে এ বিরোধিতা দেখা যায়।

source: The Dhaka Diary

Leave a Reply

Back to top button