৪৯তম বিসিএসে গোপালগঞ্জের ১১ প্রার্থীর ৯ জন বাদ

৪৯তম বিসিএসের (বিশেষ) চূড়ান্ত গেজেট প্রকাশের পর গোপালগঞ্জের প্রার্থীদের বাদ পড়ে যাওয়া নিয়ে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে আলোচনা ও প্রশ্ন উঠেছে। জেলার ১১ জন প্রার্থীর মধ্যে ৯ জন বাদ পড়েছেন বলে দাবি করা হয়েছে। নির্বাচিত হয়েছেন দুজন। বাদ পড়া প্রার্থীদের একজন সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে এ নিয়ে ক্ষোভ প্রকাশ করে দাবি করেছেন, জুলাই আন্দোলনে সক্রিয়ভাবে অংশ নেওয়া এবং আন্দোলন-পরবর্তী সময়ে ঢাকায় নিরাপত্তা কার্যক্রমে অংশ নেওয়ার পরও গোপালগঞ্জের পরিচয়ের কারণে তারা বঞ্চিত হয়েছেন।
বাদ পড়া প্রার্থীদের মধ্যে রয়েছেন-মো. নূরনবী শেখ, আহম্মদ উল্লাহ, সোহাগ মন্ডল, বিপ্লব বাড়ৈ, শেখ আরাফাত কবির, বুশরা জাহান, মো. সাজ্জাদ হোসেন, শফিকুল ইসলাম ও মো. রাকিবুল ইসলাম।
প্রার্থীদের পক্ষ থেকে দেওয়া তথ্য অনুযায়ী, নূরনবী শেখ ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ফিন্যান্স অ্যান্ড ব্যাংকিং বিভাগের ২০১৬-১৭ শিক্ষাবর্ষের শিক্ষার্থী এবং মেধাক্রমে পঞ্চম। আহম্মদ উল্লাহ হিসাববিজ্ঞান বিভাগের ২০১৪-১৫ শিক্ষাবর্ষের শিক্ষার্থী ও মেধাক্রমে প্রথম। একই বিভাগের ২০১৬-১৭ শিক্ষাবর্ষের শিক্ষার্থী সোহাগ মন্ডলের মেধাক্রম তৃতীয়।
বিপ্লব বাড়ৈ ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের সংস্কৃত বিভাগের ২০১৭-১৮ শিক্ষাবর্ষের এবং মেধাক্রমে পঞ্চম। শেখ আরাফাত কবির ইতিহাস বিভাগের ২০১৯-২০ শিক্ষাবর্ষের এবং মেধাক্রমে ১৫তম। বুশরা জাহান ইংরেজি বিভাগের ২০১৭-১৮ শিক্ষাবর্ষের এবং মেধাক্রমে ১৪তম।
এ ছাড়া বরিশাল বিশ্ববিদ্যালয়ের হিসাববিজ্ঞান বিভাগের ২০১৮-১৯ শিক্ষাবর্ষের মো. সাজ্জাদ হোসেনের মেধাক্রম ৩০। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের দর্শন বিভাগের ২০১১-১২ শিক্ষাবর্ষের শফিকুল ইসলামের মেধাক্রম ২৫ এবং অর্থনীতি বিভাগের ২০১৭-১৮ শিক্ষাবর্ষের মো. রাকিবুল ইসলামের মেধাক্রম ৩৭ বলে উল্লেখ করা হয়েছে।
৪৯তম বিসিএসে গোপালগঞ্জ থেকে নির্বাচিত দুজনের একজন তন্ময়। তিনি তথ্য ও যোগাযোগ প্রযুক্তি (আইসিটি) ক্যাডারে মেধাক্রম ২১ অর্জন করেছেন বলে জানা গেছে। তাঁর শিক্ষাজীবনের তথ্য অনুযায়ী, তাঁর বাবা বিসিএস শিক্ষা ক্যাডারে কর্মরত ছিলেন। তন্ময়ের জন্মের পর তাঁর বাবার গোপালগঞ্জে কর্মস্থল ছিল না বলে দাবি করা হয়েছে। তাঁর স্কুল ও কলেজজীবন ঝিনাইদহে এবং উচ্চশিক্ষা রাজশাহী প্রকৌশল ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়ে (রুয়েট)।
অন্য নির্বাচিত প্রার্থী মো. অপু খান ম্যানেজমেন্ট ক্যাডারে মেধাক্রম ৬ অর্জন করেছেন বলে জানা গেছে। তিনি ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ২০১৯-২০ শিক্ষাবর্ষের শিক্ষার্থী। পারিবারিক সূত্রের বরাতে বলা হয়েছে, তিনি ষষ্ঠ শ্রেণি থেকে ফরিদপুরে বসবাস করছেন।
এ কারণে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে কেউ কেউ প্রশ্ন তুলেছেন, গোপালগঞ্জের বাদ পড়া প্রার্থীদের ক্ষেত্রে জেলার পরিচয় কোনোভাবে প্রভাব ফেলেছে কি না। ৪৯তম বিসিএসে প্রার্থী বাছাই বা ক্যাডার প্রাপ্তির ক্ষেত্রে গোপালগঞ্জের প্রার্থীদের পরিচয় বিবেচনায় কোনো বৈষম্য করা হয়েছে কি?
নূরনবী শেখ ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ফিন্যান্স অ্যান্ড ব্যাংকিং বিভাগের ২০১৬-১৭ শিক্ষাবর্ষের শিক্ষার্থী এবং মেধাক্রমে পঞ্চম। তিনি বাদ পড়ে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে লিখেছেন, ‘গোপালগঞ্জের মানুষ হয়েও আওয়ামী লীগের রক্তচক্ষু উপেক্ষা করে জুলাই আন্দোলনে সামনের সারিতে ছিলাম। আন্দোলন-পরবর্তী সময়ে ঢাকার নিরাপত্তা রক্ষায় রাতভর পাহারাও দিয়েছি। এরপরও যদি শুধু গোপালগঞ্জের মানুষ হওয়ার কারণে সরকারি চাকরিতে আমাদের অধিকার না থাকে, তাহলে সেটি প্রশ্নের বিষয়।’
মেধা তালিকায় প্রথম হওয়া আহম্মদ উল্লাহ ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের হিসাববিজ্ঞান বিভাগের ২০১৪-১৫ শিক্ষাবর্ষের শিক্ষার্থী। তিনি জানান, ২০১৪ সাল থেকে তিনি ঢাকায় বসবাস করছেন। এর আগে ফরিদপুরের সরকারি রাজেন্দ্র কলেজ থেকে ইন্টারমিডিয়েট সম্পন্ন করেন।
চূড়ান্ত তালিকায় তাঁর নাম না থাকায় ক্ষোভ প্রকাশ করে আহম্মদ উল্লাহ বলেন, ‘আমাদের নয়জন বাদ পড়েছেন, আর দুজনকে নেওয়া হয়েছে। ওই দুজনের বাড়ি গোপালগঞ্জে হলেও তারা দীর্ঘদিন ধরে অন্য জেলায় স্থায়ীভাবে বসবাস করতেন। আমি মনে করি, আমার বাড়ি গোপালগঞ্জে হওয়ার কারণেই আমাকে চূড়ান্ত তালিকা থেকে বাদ দেওয়া হয়েছে।’
তিনি আরও বলেন, ‘আমার বাবা একজন অবসরপ্রাপ্ত পুলিশ কর্মকর্তা। আমাদের পরিবারের কেউই কোনো রাজনৈতিক কর্মকাণ্ডের সঙ্গে সম্পৃক্ত নন। বিশেষ করে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে পড়াশোনার সময় আমি কোনো রাজনৈতিক কর্মকাণ্ডের সঙ্গে যুক্ত ছিলাম না। আমাকে কী কারণে বাদ দেওয়া হয়েছে, সেটি সরকারি কর্তৃপক্ষই বলতে পারবে। তবে আমি মনে করি, গোপালগঞ্জে বাড়ি হওয়ার কারণে আমি বৈষম্যের শিকার হয়েছি।’
বাদ পড়া আরেক এক প্রার্থী মো. রাকিবুল ইসলাম অর্থনীতি বিভাগের ২০১৭-১৮ শিক্ষাবর্ষের শিক্ষার্থী। তার মেধাক্রম ৩৭। তিনি জানান, দীর্ঘ ১৩ বছর ধরে তিনি গোপালগঞ্জের বাইরে অবস্থান করছেন। যশোরের এম এম কলেজে পড়াশোনা শেষ করে পরে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে ভর্তি হন।গোপালগঞ্জের বাড়ি হওয়ার কারণে তাকে বাদ দেওয়া হয়েছে কি না-এমন প্রশ্নের জবাবে রাকিবুল ইসলাম বলেন, তিনি বিষয়টি নিশ্চিতভাবে মনে করেন না। তাঁর ভাষায়, ‘আমার বাবা একজন দিনমজুর ও কাঠমিস্ত্রি। তিনি কখনোই রাজনীতির সঙ্গে সম্পৃক্ত ছিলেন না। বাবা দিন এনে দিন খেয়ে আমাদের পড়াশোনা করিয়েছেন। আমাকে কী কারণে বাদ দেওয়া হয়েছে, সেটা সংশ্লিষ্ট সরকারি কর্তৃপক্ষই বলতে পারবে।’
তিনি আরও লিখেছেন, ‘আমি যে প্রতিদান পেয়েছি, তার জন্য আলহামদুলিল্লাহ।’
এদিকে ৪৯তম বিসিএস (বিশেষ) পরীক্ষার চূড়ান্ত গেজেট বুধবার (৩০ সেপ্টেম্বর) প্রকাশ করা হয়েছে। এতে ৬১১ জনকে নিয়োগ দেওয়া হয়েছে। এর আগে চূড়ান্ত ফলে সাময়িকভাবে মনোনীত ৬৬৮ জনের মধ্যে ৫৭ জনের নাম চূড়ান্ত গেজেটে স্থান পায়নি। তবে গেজেটে তাঁদের বাদ পড়ার কারণ উল্লেখ করা হয়নি।
এর আগে গত বছরের ১১ নভেম্বর ৪৯তম বিসিএসের চূড়ান্ত ফল প্রকাশ করে বাংলাদেশ সরকারি কর্ম কমিশন (পিএসসি)। এতে বিসিএস (সাধারণ শিক্ষা) ক্যাডারের বিভিন্ন পদে ৬৮৩টি শূন্য পদের বিপরীতে ৬৬৮ জনকে নিয়োগের জন্য সাময়িকভাবে মনোনয়ন দেওয়া হয়েছিল।
পিএসসি জানিয়েছিল, যোগ্য প্রার্থী না পাওয়ায় ১৫টি পদে কোনো প্রার্থীকে মনোনয়ন দেওয়া সম্ভব হয়নি। পরবর্তী যাচাই-বাছাই ও অন্যান্য প্রক্রিয়া শেষে চূড়ান্ত গেজেটে ৬১১ জনের নিয়োগ প্রকাশ করা হয়েছে।
গোপালগঞ্জের প্রার্থীদের বাদ পড়ার ক্ষেত্রে কোনো বিশেষ কারণ বা বৈষম্যের অভিযোগের বিষয়ে সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের আনুষ্ঠানিক বক্তব্য পাওয়া যায়নি।
source: The Daily Campus