ফেনী সদর হাসপাতালে চিকিৎসায় ‘অবহেলায়’ সাপে কাটা রোগীর মৃত্যু, তদন্তে কমিটি

ফেনী জেনারেল হাসপাতালে প্রয়োজনীয় অ্যান্টিভেমন থাকার পরও চিকিৎসা অবহেলায় নাসিমা আক্তার (৪৫) নামের ফেনী সদরের ধলিয়ার এক নারীর মৃত্যু হয়েছে। চিকিৎসার গাফিলতির বিষয়টি স্বীকার করেছেন হাসপাতাল কর্তৃপক্ষ। এ ঘটনার তদন্তে ৫ সদস্যের তদন্ত কমিটি গঠন করা হয়েছে। কমিটিকে আগামী ৩ কার্যদিবসের মধ্যে তদন্ত প্রতিবেদন জমা দিতে নির্দেশ দেওয়া হয়েছে।
রবিবার (৩০ আগস্ট) হাসপাতালের ভারপ্রাপ্ত তত্ত্বাবধায়ক ডা. মোবারক হোসেন দুলাল এ তথ্য নিশ্চিত করেছেন।
এ প্রসঙ্গে ফেনী জেনারেল হাসপাতালের ভারপ্রাপ্ত তত্ত্বাবধায়ক জানান, সাপে কামড়ানোর সঙ্গে সঙ্গে সব সময় বিষক্রিয়ার লক্ষণ দেখা যায় না। লক্ষণ দেখা দেওয়ার পরই অ্যান্টিভেনম প্রয়োগ করা হয়। ওই নারীর ক্ষেত্রে বিষক্রিয়ার লক্ষণ দেখা দিলে অ্যান্টিভেনম দেওয়ার কথা চিকিৎসাপত্রে উল্লেখ করে তাকে হাসপাতালে ভর্তি করা হয়েছিল। ভর্তির পর ওয়ার্ডে রোগীর অবস্থার অবনতি হলে সেখানে দায়িত্বপ্রাপ্ত নার্স (সেবিকা) তাৎক্ষণিকভাবে বিষয়টি চিকিৎসককে জানাননি। এ জন্য ওই নারীকে সঠিক সময়ে অ্যান্টিভেনম দেওয়া সম্ভব হয়নি। এ ঘটনায় নার্সের গাফিলতির প্রাথমিক প্রমাণ পাওয়া গেছে। তদন্ত প্রতিবেদনে পেলে এ ব্যাপারে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নেওয়া হবে।
নিহত নাসিম আক্তার ফেনী সদরের ফেনী সদর উপজেলার বড় ধলিয়া গ্রামের আবদুল হামিদ মৌলভী বাড়ির আহমদ করিমের স্ত্রী। এর আগে গত বৃহস্পতিবার (২৭ আগস্ট) রাতে সাপে কাটার পর চিকিৎসার জন্য ফেনী জেনারেল হাসপাতালে আনা হয়েছিল তাকে।
হাসপাতাল সূত্রে জানা গেছে, শুক্রবার (২৮ আগস্ট) ভোর ৬টার দিকে ফেনী জেনারেল হাসপাতালে চিকিৎসাধীন অবস্থায় মারা যান নাসিমা আক্তার। এর আগে রাত আনুমানিক সাড়ে ৩টার দিকে তাকে হাসপাতালে নিয়ে আসেন স্বামী আহমদ করিম। নাসিমাকে প্রথমে জরুরি বিভাগে নেওয়া হয়। সেখানে তার রক্তের নমুনা সংগ্রহ করে প্রায় ২০ মিনিট পর্যবেক্ষণ করা হয়। ওই সময় তার মধ্যে বিষক্রিয়ার দৃশ্যমান কোনো লক্ষণ ছিল না বলে জানান জরুরি বিভাগে দায়িত্বে থাকা সিনিয়র স্টাফ নার্স আলো রানী নাথ। পরে রক্ত জমাট বাঁধলে পরবর্তী চিকিৎসা ও পর্যবেক্ষণের জন্য তাকে মেডিসিন ওয়ার্ডে ভর্তি দেওয়া হয়।
নাসিমার স্বামী আহমদ করিমের অভিযোগ, ‘রাত ৩টা ২৫ মিনিটের দিকে হাসপাতালে নেওয়ার পর কর্তব্যরত চিকিৎসক চিরঞ্জীব সরকার আমার স্ত্রীকে জরুরি বিভাগে চিকিৎসা না দিয়ে ছয়তলার মেডিসিন বিভাগে ভর্তি করেন। চিকিৎসককে বারবার সাপে কামড়ানোর বিষয়টি বলা হলেও অ্যান্টিভেনম দেওয়ার কোনো উদ্যোগ নেওয়া হয়নি।’
তিনি আরও জানান, মেডিসিন বিভাগে নেওয়ার পর একজন নার্সের মাধ্যমে শুধু স্যালাইন দেওয়া হয়। শয্যা না থাকায় তার স্ত্রীকে মেঝেতে রাখা হয়। পরে বিষক্রিয়ায় শারীরিক অবস্থার অবনতি হলে ভর্তির অল্প সময়ের মধ্যেই নাসিমার মৃত্যু হয়।
একই দিন রাতে মেডিসিন ওয়ার্ডে দায়িত্বে ছিলেন হাসপাতালের সিনিয়র স্টাফ নার্স শাহিনুর আলম। চিকিৎসা গাফিলতি প্রসঙ্গে জানতে চাইলে তিনি বলেন, সেদিন রাত আনুমানিক ৩টা ৩৫ মিনিটে রোগীকে ওয়ার্ডে আনার পর চিকিৎসাপত্র অনুযায়ী প্রয়োজনীয় সব ওষুধ ও সেবা দেওয়া হয়েছে। ক্রিটিক্যাল রোগী হিসেবে তাকে নজরদারিতে রাখা হয়েছিল। পাশাপাশি তার স্বামীকে রোগী যেন ঘুমিয়ে না পড়েন এবং কোনো অস্বাভাবিক আচরণ করলে সঙ্গে সঙ্গে নার্সদের জানানোর জন্য বলা হয়েছিল।
তিনি আরও বলেন, ২৬ শয্যার ওই ওয়ার্ডে সেদিন ৯০ জনের বেশি রোগী ভর্তি ছিলেন। অতিরিক্ত রোগীর চাপ থাকলেও ক্রিটিক্যাল রোগীদের অগ্রাধিকার দিয়ে সেবা দেওয়ার চেষ্টা করা হয়েছে। ভোর আনুমানিক সাড়ে ৫টা থেকে ৬টার দিকে রোগীর স্বামী এসে জানান নাসিমা চোখ খুলছেন না। তখন সঙ্গে সঙ্গে রোগীর কাছে গিয়ে চিকিৎসককে খবর দেওয়া হয়। পালস পরীক্ষা করে দেখা যায়, তিনি ইতোমধ্যে মারা গেছেন।
ওই রাতে হাসপাতালের জরুরি বিভাগে দায়িত্বে থাকা ডা. চিরঞ্জীব সরকারের বক্তব্য জানতে একাধিকবার তার মুঠোফোনে যোগাযোগ করা হলেও তিনি সাড়া দেননি।
ফেনী জেনারেল হাসপাতালের আবাসিক মেডিকেল অফিসার (আরএমও) ডা. রৌকন উদ দৌলা বলেন, হাসপাতালে পর্যাপ্ত অ্যান্টিভেনম মজুত রয়েছে। জরুরি প্রয়োজনে ব্যবহারের জন্য আইসিইউতে দুটি ভাইল রাখা ছিল। এ ছাড়া অন্তত ২০ জন রোগীর ভেনম হাসপাতালে মজুত রয়েছে।
চিকিৎসা অবহেলায় রোগীর মৃত্যুর অভিযোগ প্রসঙ্গে তিনি জানান, ওই রোগীকে হাসপাতালে আনার সময় স্বজনরা সাপের কামড়ের বিষয়টি সুনির্দিষ্টভাবে বলতে পারেননি। শুরুতেও রোগীর মধ্যে বিষক্রিয়ার লক্ষণ দেখা যায়নি। তাই তাকে পর্যবেক্ষণের জন্য মেডিসিন ওয়ার্ডে ভর্তি দেওয়া হয়। পরে সেখানেই বিষক্রিয়ার লক্ষণ দেখা দেয় এবং রোগীর মৃত্যু হয়।
বৃহস্পতিবার দিবাগত রাতে বৃষ্টির পানি সংগ্রহের জন্য ঘরের বাইরে বের হন নাসিমা। এ সময় দরজার সামনে এলে তাকে একটি বিষধর সাপে কামড়ায় বলে জানান স্বজনরা। তবে সাপের পরিচয় সম্পর্কে তারা নিশ্চিত কিছু বলতে পারেননি।
source: The Daily Campus