News
জাতিসংঘে জাইমা রহমানের নিয়োগ, লিগ্যাল অফিসার পদটির কাজ কী?

বাংলাদেশের প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের কন্যা জাইমা রহমান জাতিসংঘের সাধারণ পরিষদের সভাপতির কার্যালয়ে লিগ্যাল অফিসার বা আইন কর্মকর্তা হিসেবে দায়িত্ব পেয়েছেন। বিষয়টি নিয়ে নানা আলোচনা চলছে। এই পদে কেন তাকে নিয়োগ দেওয়া হয়েছে এবং সেখানে তিনি কী কাজ করবেন—এমন নানা প্রশ্ন ও আলোচনা দেখা যাচ্ছে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে।
জাতিসংঘের সাধারণ পরিষদের ৮১তম অধিবেশনের সভাপতি হিসেবে বর্তমানে দায়িত্ব পালন করছেন বাংলাদেশের পররাষ্ট্রমন্ত্রী খলিলুর রহমান। জাতিসংঘের ওয়েবসাইটের তথ্য অনুযায়ী, জাইমা রহমান লিগ্যাল অফিসার হিসেবে সাধারণ পরিষদের সভাপতির কার্যালয়ের এক্সিকিউটিভ অফিসের অধীনে কাজ করবেন।
সাধারণ পরিষদের সভাপতির কার্যালয়ের ওয়েবসাইটে প্রকাশিত কর্মকর্তাদের তালিকাতেও জাইমা রহমানের নাম ও পদবি উল্লেখ করা হয়েছে। সেখানে কর্মরত ৪০ জনের মধ্যে জাইমা রহমান ছাড়াও আরও পাঁচজন বাংলাদেশি রয়েছেন।
লিগ্যাল অফিসারের কাজ কী?
জাতিসংঘের ১৯০টি সদস্য দেশের গোপন ভোটাভুটিতে ৯৯ ভোট পেয়ে সাধারণ পরিষদের সভাপতি হিসেবে এক বছরের জন্য নির্বাচিত হয়েছেন বাংলাদেশের পররাষ্ট্রমন্ত্রী খলিলুর রহমান। গত ৯ সেপ্টেম্বর নিউইয়র্কে জাতিসংঘ সদর দপ্তরে এই পদে দায়িত্ব পালনের জন্য শপথ নেন তিনি।
এর আগে ১৯৮৬ সালে জাতিসংঘ সাধারণ পরিষদের ৪১তম অধিবেশনে সভাপতির দায়িত্ব পালন করেছিলেন বাংলাদেশের সাবেক পররাষ্ট্রমন্ত্রী হুমায়ুন রশিদ চৌধুরী। সাধারণ পরিষদের সভাপতি হিসেবে খলিলুর রহমানের টিমে আইন কর্মকর্তা হিসেবে কাজ করবেন জাইমা রহমান।
সভাপতির কার্যালয়ের ওয়েবসাইটের তথ্য অনুযায়ী, লিগ্যাল অফিসার জাতিসংঘের মূল আইন বিভাগের কর্মকর্তা নন। তিনি মূলত সরাসরি সাধারণ পরিষদের সভাপতির ব্যক্তিগত উপদেষ্টা হিসেবে কাজ করেন।
সাবেক রাষ্ট্রদূত ও আন্তর্জাতিক সম্পর্ক বিশ্লেষকদের মতে, কোনো রেজুলেশন কীভাবে উত্থাপন করা হবে, কোনো দেশ পয়েন্ট অব অর্ডার তুললে সভাপতি কী রুলিং দেবেন কিংবা কোনো প্রস্তাবের সংশোধনী গ্রহণযোগ্য কি না এসব বিষয়ে সভাপতিকে আইনি পরামর্শ দেন লিগ্যাল অফিসার।
সাধারণ পরিষদে অনেক সময় ফিলিস্তিন ও ইউক্রেনের মতো স্পর্শকাতর বিষয় নিয়ে আলোচনা হয়। এসব ক্ষেত্রে সভাপতি যেন নিরপেক্ষ থাকতে পারেন এবং তার সিদ্ধান্তকে কেউ যেন ‘পক্ষপাতদুষ্ট’ বলতে না পারে, সে বিষয়েও আইনি সহায়তা দেন লিগ্যাল অফিসার। এ সময় জাতিসংঘ সনদের বিভিন্ন আর্টিকেল ও অতীতের নজির তুলে ধরে সভাপতিকে আইনি সুরক্ষা দেওয়ার কাজও করেন তিনি।
সাধারণ পরিষদে উত্থাপিত কোনো রেজুলেশন বা প্রস্তাব আগের নিয়ম কিংবা আন্তর্জাতিক আইনের সঙ্গে সাংঘর্ষিক কি না, সেটিও যাচাই করেন লিগ্যাল অফিসার। এ ছাড়া বাজেটসংক্রান্ত কোনো প্রস্তাবে অন্য কোনো কমিটির অনুমোদন প্রয়োজন কি না, সে বিষয়টিও তিনি দেখেন।
সাবেক রাষ্ট্রদূত মুন্সি ফয়েজ আহমেদ বলেন, সভাপতি হিসেবে খলিলুর রহমান যেসব দায়িত্ব পালন করবেন, সেগুলোর আইনি দিক দেখভাল করতে হবে জাইমা রহমানকে। এই পদে বেশ কিছু দাপ্তরিক দায়িত্বও রয়েছে।
জাতিসংঘের মূল আইন বিভাগসহ অন্যান্য আইনি সংস্থার সঙ্গে সভাপতির কার্যালয়ের সমন্বয় করতে হবে লিগ্যাল অফিসারকে। সভাপতিকে আন্তর্জাতিক চুক্তি বা আইনি কোনো বিষয়ে বক্তব্য দিতে হলে তার খসড়া তৈরিতেও সহায়তা করবেন তিনি।
সব মিলিয়ে সাধারণ পরিষদে সভাপতির কার্যক্রম যেন জাতিসংঘের আইন ও রীতির মধ্যে থাকে, সেটি নিশ্চিত করার আইনি দায়িত্ব থাকবে লিগ্যাল অফিসারের ওপর। জাতিসংঘ সাধারণ পরিষদের সভাপতির কার্যালয়ের ওয়েবসাইটের তথ্য অনুযায়ী, বর্তমানে এই কার্যালয়ে মোট ৪০ জনের একটি টিম কাজ করছে। এই টিমে বাংলাদেশের ছয়জনসহ ২৯টি দেশের ছয়টি ভাষাভাষী নাগরিক রয়েছেন। তারা মূলত সভাপতির কার্যালয়ের বিভিন্ন দায়িত্ব তদারকি করেন।
জাতিসংঘের সাধারণ পরিষদের সভাপতির কার্যালয়ে দায়িত্ব পাওয়া অন্য বাংলাদেশিরা হলেন কূটনীতিক মো. আব্দুল আলিম, প্রশাসনিক কর্মকর্তা মোয়াজ্জেম হোসেন, মফিজুল ইসলাম, জাকির আহমেদ এবং মো. রফিকুল আলম মোল্লা। এই তালিকায় এখন লিগ্যাল অফিসার হিসেবে যুক্ত হয়েছেন জাইমা রহমান।
সাবেক রাষ্ট্রদূত মুন্সি ফয়েজ আহমেদ বলেন, সাধারণ পরিষদের সভাপতির কার্যালয়ে জাতিসংঘে কর্মরত স্থায়ী কর্মীদের পাশাপাশি নিজের এখতিয়ার থেকে কয়েকজনকে নিয়োগ দিতে পারেন সভাপতি।
তিনি বলেন, এই পদে কাকে নিয়োগ দেওয়া হবে, সেটি মূলত সভাপতি হিসেবে যিনি দায়িত্বে থাকবেন তার এখতিয়ার। জাতিসংঘে স্থায়ীভাবে কাজ করা ব্যক্তিদের মধ্য থেকে কেউ কেউ সভাপতির সঙ্গে যুক্ত হতে পারেন। আবার সভাপতি নিজের চাহিদা অনুযায়ীও কিছু ব্যক্তিকে তার কার্যালয়ে নিয়োগ করতে পারেন। তবে এ ক্ষেত্রে শিক্ষাগত ও পেশাগত যোগ্যতার একটি মানদণ্ড থাকে বলেও জানান তিনি।
বিশেষজ্ঞদের মতে, সাধারণত আন্তর্জাতিক আইনে অভিজ্ঞ এবং বিভিন্ন দেশের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয় বা জাতিসংঘে কাজ করা আইনজীবীদের এই পদে নিয়োগ দেওয়া হয়। ফলে এই পদে জাইমা রহমানের নিয়োগের ক্ষেত্রে সব মানদণ্ড পূরণ হয়েছে কি না, তা নিয়েও নানা আলোচনা সামনে এসেছে।
সভাপতির কার্যালয়ের ওয়েবসাইটে জাইমা রহমানকে একজন ব্যারিস্টার এবং আইন ও নীতি বিষয়ক বিশেষজ্ঞ হিসেবে উল্লেখ করা হয়েছে। সেখানে বলা হয়েছে, যুক্তরাজ্য ও বাংলাদেশে কাজ করার অভিজ্ঞতা রয়েছে তার।
ওয়েবসাইটে আরও উল্লেখ করা হয়েছে, জাইমা রহমান কুইন মেরি ইউনিভার্সিটি অব লন্ডন থেকে আইন ও রাজনীতি বিষয়ে এলএলবি ডিগ্রি অর্জন করেছেন। এ ছাড়া ইংল্যান্ড ও ওয়েলসে ‘দ্য অনারেবল সোসাইটি অব দ্য ইনার টেম্পল’ থেকে সনদ পেয়েছেন তিনি। দেশটিতে ব্যারিস্টারি করার যোগ্যতা অর্জনের স্বীকৃতি হিসেবে এই সনদ দেওয়া হয়। বর্তমানে বাংলাদেশে একজন তালিকাভুক্ত অ্যাডভোকেট হিসেবেও জাইমা রহমান কাজ করছেন বলে ওয়েবসাইটে উল্লেখ করা হয়েছে।
তার অভিজ্ঞতার মধ্যে যুক্তরাজ্যে আবাসন, জনকল্যাণ ও শ্রম আইন নিয়ে কাজ করার বিষয়টি উল্লেখ করা হয়েছে। পাশাপাশি স্বাস্থ্য খাতে আইনি পরামর্শ ও জনসংযোগ এবং সামাজিক কল্যাণ ও শিক্ষা আইনের ওপর ‘প্রো বোনো’ বা বিনামূল্যে আইনি সেবা দেওয়ার অভিজ্ঞতাও রয়েছে তার।
এ ছাড়া সুশাসন, অন্তর্ভুক্তিমূলক জননীতি, ডিজিটাল নিরাপত্তা, বিচার পাওয়ার অধিকার, শিক্ষা ও লিঙ্গসমতা নিয়েও জাইমা রহমানের কাজের আগ্রহ রয়েছে বলে জানানো হয়েছে।
সাবেক রাষ্ট্রদূত মুন্সি ফয়েজ আহমেদ বলেন, এই পদে কাজ করার জন্য যথেষ্ট অভিজ্ঞ না হলেও যে যোগ্যতা থাকা প্রয়োজন, তা জাইমা রহমানের রয়েছে। ফলে আন্তর্জাতিক পরিসরে কাজ করে অভিজ্ঞতা অর্জনের জন্য এটিকে তার একটি সুযোগ হিসেবে দেখছেন তিনি।
মুন্সি ফয়েজ আহমেদ বলেন, সভাপতির যেসব কাজ থাকবে, সেগুলোর আইনি দিকগুলোতে সহায়তা করাই লিগ্যাল অফিসারের কাজ। সেখানে জাইমা রহমান একাই কাজ করবেন বিষয়টি এমন নয়। তার সঙ্গে একটি টিমও থাকতে পারে।
source: The Dhaka Diary