News

ঢাকার আবাসন ও নাগরিক সংকট কাটছে না

আগের তুলনায় রাজধানী ঢাকায় নগর উন্নয়ন, যোগাযোগ অবকাঠামো ও আবাসন খাতে নানা উদ্যোগ দেখা গেলেও নাগরিকদের বসবাসের মান কতটা বেড়েছে, তা নিয়ে প্রশ্ন রয়ে গেছে। একদিকে বহুতল ভবন ও আধুনিক আবাসন প্রকল্প বাড়ছে, অন্যদিকে যানজট, বায়ুদূষণ, জলাবদ্ধতা, বর্জ্য ব্যবস্থাপনার দুর্বলতা এবং বাড়িভাড়ার চাপ নগরজীবনকে কঠিন করে তুলছে। ফলে রাজধানীতে বসবাসের সুযোগ বাড়লেও নিরাপদ, স্বাস্থ্যকর ও সাশ্রয়ী পরিবেশে বসবাসের নিশ্চয়তা সবার জন্য তৈরি হয়নি।

এই প্রেক্ষাপটে সোমবার পালিত হচ্ছে বিশ্ব বসতি দিবস। ১৯৮৬ সাল থেকে প্রতি বছর অক্টোবরের প্রথম সোমবার পালন করা হয় ওয়ার্ল্ড হ্যাবিট্যাট ডে (বিশ্ব বসতি দিবস)। এর আগে ১৯৮৫ সালে ইউনেসকো অক্টোবরের প্রথম সোমবারকে বিশ্ব বসতি দিবস ঘোষণা করে।

বিশ্ব বসতি দিবসের এবারের প্রতিপাদ্য ‘সর্বজনীন বাসস্থান, টেকসই নগরায়ণ’। দিবসটি উপলক্ষে আবাসনের অধিকার, পরিকল্পিত নগরায়ণ এবং নিম্নআয়ের মানুষের জন্য নিরাপদ ও সাশ্রয়ী বাসস্থানের গুরুত্ব তুলে ধরা হচ্ছে।

বাংলাদেশে নগরায়ণের গতি বাড়ার সঙ্গে সঙ্গে রাজধানীর ওপর জনসংখ্যা, কর্মসংস্থান ও নাগরিক সেবার চাপও বাড়ছে। গত সেপ্টেম্বরে ঢাকায় জাতীয় নগর ফোরামের আলোচনায় পরিকল্পিত নগরায়ণ, আবাসন, পরিবহন, অবকাঠামো, পরিবেশ ও নাগরিক সেবার ওপর এই চাপের বিষয়টি উঠে আসে। সেখানে জাতীয় নগর নীতি-২০২৫-কে গুরুত্বপূর্ণ অগ্রগতি হিসেবে উল্লেখ করা হলেও নীতির কার্যকর বাস্তবায়ন, স্থানীয় প্রতিষ্ঠানের সক্ষমতা এবং বিভিন্ন সংস্থার মধ্যে সমন্বয়ের ওপর গুরুত্ব দেওয়া হয়।

বাংলাদেশ ইনস্টিটিউট অব প্ল্যানার্সের (বিআইপি) গত আগস্টে উপস্থাপিত তথ্য অনুযায়ী, বিশ্বের ১৭৩টি শহরের মধ্যে ঢাকার অবস্থান বাসযোগ্যতার সূচকে ১৭১তম। নগর পরিকল্পনাবিদদের মতে, অপরিকল্পিত নগরায়ণ, পরিবেশের অবনতি, যানজট, বায়ু ও শব্দদূষণ এবং জলাবদ্ধতা রাজধানীর বাসযোগ্যতাকে ক্রমেই সংকুচিত করছে।

বিআইপির তথ্যানুযায়ী, একসময় ঢাকায় ৫৬টি খাল থাকলেও এখন চিহ্নিত করা যায় এমন খালের সংখ্যা ২৬। নগরীর ৪৮টি এলাকাকে জলাবদ্ধতাপ্রবণ চিহ্নিত করা হয়েছে। এছাড়া ঢাকার প্রায় ৯৯.২৯ বর্গকিলোমিটার এলাকার মধ্যে সবুজ জায়গা মাত্র ৭.৯৯ শতাংশ। ফলে জনসংখ্যার ঘনত্ব বৃদ্ধির সঙ্গে পার্ক, খেলার মাঠ ও উন্মুক্ত স্থানের স্বল্পতা নগরবাসীর জীবনযাত্রায় নেতিবাচক প্রভাব ফেলছে।

বর্ষা মৌসুমে সামান্য ভারী বৃষ্টিতেই রাজধানীর বিভিন্ন সড়ক ও আবাসিক এলাকায় পানি জমে যাওয়ার ঘটনা নগর ব্যবস্থাপনার দুর্বলতা সামনে এনেছে। গত জুলাইয়ে জলাবদ্ধতা নিয়ে প্রকাশিত প্রতিবেদনে বিশেষজ্ঞরা খাল ও জলাধার হারিয়ে যাওয়া, অপর্যাপ্ত নালা, পানি নিষ্কাশন ব্যবস্থার সীমাবদ্ধতা এবং সংস্থাগুলোর মধ্যে সমন্বয়হীনতাকে প্রধান কারণ হিসেবে উল্লেখ করেন।

বাড়ছে না সাশ্রয়ী বাসস্থানের সুযোগ

রাজধানীতে বহুতল ভবন ও বেসরকারি আবাসন প্রকল্প বাড়লেও বাড়েনি সাশ্রয়ী বাসস্থানের সুযোগ। চাকরিজীবী, ক্ষুদ্র ব্যবসায়ী ও নিম্নআয়ের পরিবারকে কর্মস্থলের কাছাকাছি বাসা নিতে গিয়ে আয়ের বড় অংশ ব্যয় করতে হয়।

বিশ্বব্যাংকের ২০২৪ সালের এক প্রতিবেদনে বাংলাদেশের দ্রুত নগরায়ণ, আবাসনের ঘাটতি এবং গৃহঋণ প্রাপ্তির সীমাবদ্ধতার কথা তুলে ধরা হয়েছিল। সংস্থাটির মতে, ঢাকার প্রায় ৮০ শতাংশ বাসিন্দা সারা জীবন ভাড়া বাসায় কাটাতে পারেন এবং নিম্ন ও মধ্যম আয়ের মানুষের জন্য সাশ্রয়ী গৃহঋণ পাওয়া কঠিন।

বিশ্বব্যাংকের বাংলাদেশের জলবায়ু ও উন্নয়নবিষয়ক প্রতিবেদনে ২০৩০ সাল পর্যন্ত নগর এলাকায় প্রায় ১ কোটি ৫ লাখ আবাসন ইউনিট নতুন করে নির্মাণ বা সংস্কারের প্রয়োজনীয়তার হিসাব দেওয়া হয়েছে।

উন্নয়ন উদ্যোগ আছে, বাস্তবায়নই বড় পরীক্ষা

রাজধানীর পরিবেশ ও নাগরিক সুবিধা উন্নয়নে সরকারের উদ্যোগও রয়েছে। গত ৩১ আগস্ট ঢাকার খাল খনন ও সীমানা নির্ধারণ, বৃক্ষরোপণ, সৌন্দর্যবর্ধন, বর্জ্য অপসারণ এবং জলাবদ্ধতা নিরসনের অগ্রগতি পর্যালোচনা করে স্থানীয় সরকার বিভাগ। ‘ক্লিন সিটি, গ্রিন সিটি’ পরিকল্পনা বাস্তবায়নে স্বল্প, মধ্য ও দীর্ঘমেয়াদি পদক্ষেপ নেওয়ার নির্দেশনাও দেওয়া হয়।

পরিকল্পনাবিদ ড. আদিল মুহাম্মদ খান আমার দেশকে বলেন, দেশে পরিকল্পিত কর্মসংস্থান তৈরি না হওয়ায় ঢাকামুখী মানুষের চাপ বহুগুণ বেড়েছে। সরকার এই অনিয়ন্ত্রিত চাপ রোধ করতে পারছে না। গত ১৫-২০ বছরে শহরে প্রচুর আবাসন প্রকল্প হলেও শহরের ৪০-৫০ শতাংশ নিম্ন ও নিম্ন-মধ্যবিত্ত মানুষ মৌলিক নাগরিক সুবিধাবঞ্চিত ঝুঁকিপূর্ণ অবস্থায় বাস করছেন। প্রাতিষ্ঠানিক বাজারে ৩০০-৫০০ বর্গফুটের ছোট ফ্ল্যাটের সুযোগ না থাকায় নিম্নবিত্ত মানুষ বাধ্য হয়ে বস্তি বা ঘিঞ্জি ঘরবাড়িতে প্রতি বর্গফুটে তুলনামূলক বেশি ভাড়া দিয়ে থাকছেন।

তিনি বলেন, সরকার নিজে সরাসরি আবাসন ব্যবস্থা না করে পুরো খাতটিকে বাজারের ওপর ছেড়ে দিয়েছে। বেসরকারি আবাসন প্রকল্পে মোট ইউনিটের ২০-৩০ শতাংশ নিম্ন ও নিম্ন-মধ্যবিত্তদের জন্য বরাদ্দ রাখার মতো কোনো বাধ্যবাধকতা বা নীতিমালা সরকার তৈরি করেনি।

এই পরিকল্পনাবিদ বলেন, পূর্বাচল আবাসন প্রকল্পে নিম্নবিত্তদের জন্য ১০-১৫ শতাংশ জমি রাখা দরকার ছিল, কিন্তু রাখা হয়েছে মাত্র দুই শতাংশ। উত্তরায় নিম্নবিত্তের কথা বলে ১৬০০ বর্গফুটের বড় ফ্ল্যাট বানিয়ে মূলত উচ্চ-মধ্যবিত্তদের সুবিধা দেওয়া হয়েছে।

গৃহায়ন ও গণপূর্ত প্রতিমন্ত্রী আহম্মদ সোহেল মনজুর আমার দেশকে বলেন, পরিকল্পিত নগরায়ণ, পরিবেশবান্ধব, নিরাপদ এবং সবার জন্য অন্তর্ভুক্তিমূলক আবাসন নিশ্চিত করতে মন্ত্রণালয় বিভিন্ন সমন্বিত উদ্যোগ পরিচালনা করছে। পরিবেশের ভারসাম্য রক্ষায় শহরের বিভিন্ন স্থানে গাছপালা লাগিয়ে ‘গ্রিন সিটি’ হিসেবে গড়ে তোলার চেষ্টা চলছে।

তিনি আরো বলেন, শহরকে পরিচ্ছন্ন ও নিরাপদ করতে হাতিরঝিলসহ গুরুত্বপূর্ণ এলাকায় সোলার লাইটিং ও সিসিটিভি ক্যামেরা বাড়ানোর পদক্ষেপ নেওয়া হয়েছে। প্রতিমন্ত্রী বলেন, ঢাকা ও অন্যান্য শহরে মধ্যবিত্ত ও নিম্ন-মধ্যবিত্তদের জন্য দীর্ঘমেয়াদি কিস্তিতে সাশ্রয়ী আবাসনের ব্যবস্থা করা হচ্ছে। মিরপুরে বস্তিবাসীদের জন্য ফ্ল্যাট তৈরি করা হয়েছে এবং কড়াইলসহ অন্য বস্তিবাসীর জীবনযাত্রার মান উন্নয়নে আরো আড়াই হাজার এক বেডরুমের অ্যাপার্টমেন্ট নির্মাণের ডিপিপি প্রক্রিয়াধীন রয়েছে।

স্বল্পআয়ের মানুষের জন্য আবাসন পরিকল্পনা

সারা দেশে সুপরিকল্পিত নগরায়ণ ও বাসস্থানের সুষম উন্নয়ন নিশ্চিত করতে সব সিটি করপোরেশন ও বিভাগীয় জেলা শহরকে মাস্টারপ্ল্যানের আওতায় আনার উদ্যোগ নিয়েছে সরকার। একই সঙ্গে দেশের স্বল্পআয়ের মানুষের জন্য গৃহনির্মাণের বিশেষ পরিকল্পনা বাস্তবায়নে কাজ চলছে। বিশ্ব বসতি দিবস উপলক্ষে গতকাল রোববার গৃহায়ন ও গণপূর্ত মন্ত্রণালয় আয়োজিত র‍্যালি শুরুর আগে সংক্ষিপ্ত উদ্বোধন অনুষ্ঠানে এসব পরিকল্পনার কথা তুলে ধরেন মন্ত্রী জাকারিয়া তাহের।

গণপূর্তমন্ত্রী বলেন, নগরায়ণ যেন সারা দেশে সুশৃঙ্খলভাবে পরিকল্পিত হয়, সে লক্ষ্যে সংসদে পাঁচটি নতুন উন্নয়ন কর্তৃপক্ষ গঠন করা হয়েছে এবং শিগগিরই বগুড়া উন্নয়ন কর্তৃপক্ষ গঠনের প্রস্তাব আসছে। সুনির্দিষ্ট মাস্টারপ্ল্যানের অধীনে সারা দেশে আবাসন ও নগরায়ণ পরিচালনা করাই সরকারের মূল উদ্দেশ্য।

দিবস উপলক্ষে কর্মসূচি

দিবসটি উদযাপন উপলক্ষে আজ বাংলাদেশ-চীন মৈত্রী সম্মেলন কেন্দ্রের ‘হল অব ফেমে’ বিশেষ আলোচনা সভা হবে। এতে প্রধান অতিথি হিসেবে উপস্থিত থাকবেন প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান। মন্ত্রী জাকারিয়া তাহেরের সভাপতিত্বে অনুষ্ঠানে বিশেষ অতিথি হিসেবে থাকবেন পরিবেশ, বন ও জলবায়ু পরিবর্তনমন্ত্রী আবদুল আউয়াল মিন্টু, গণপূর্ত প্রতিমন্ত্রী আহম্মদ সোহেল মনজুর এবং জাতিসংঘের আবাসিক সমন্বয়ক ক্যারল ফ্লোর-স্মেরেজনিয়াক।

গণপূর্ত মন্ত্রণালয় জানায়, দিবসটি উপলক্ষে বাংলাদেশ-চীন মৈত্রী সম্মেলন কেন্দ্র লবিতে তিন দিনব্যাপী আবাসন মেলার আয়োজন করা হয়েছে। এতে রিহ্যাব, ব্যাংকিং খাত, রাজউক ও গণপূর্তের বিভিন্ন সংস্থার ১৫৭টি স্টল থাকছে। এছাড়া টেকসই আবাসন বিষয়ে বুয়েট, এইচবিআরআই ও বিআইপির অংশগ্রহণে বিশেষ সেমিনার হবে।

এমই

source: Daily Amar Desh

Leave a Reply

Back to top button