News

গুমের শিকার মিরাজ শেখের পরিবারের তিনজনকে দেওয়া হয় ‘ধর্ষণের হুমকি’— কোস্ট গার্ড সদস্যদের বিরুদ্ধে অভিযোগ বোন লিজার

মিরাজ শেখ (ডানে) এবং মিরাজের বোন লিজা ইসলাম (বাঁয়ে)© সংগৃহীত ও সম্পাদিত

বাংলাদেশের সুন্দরবন সংলগ্ন জয়মনি ঠোটা এলাকা থেকে গত ১০ এপ্রিল মোংলার জেলে মিরাজ শেখকে তুলে নেওয়ার অভিযোগ উঠে দুইজন কোস্ট গার্ডের সদস্যের বিরুদ্ধে। নিখোঁজ হওয়ার পর থেকে মিরাজের আর কোনো খোঁজ পাওয়া যায়নি। বিষয়টি নিয়ে বিভিন্ন সময়ে নানা নাটকীয়তার সৃষ্টি হয়েছে। এরই মধ্যে, মিরাজের বোন লিজা ইসলাম কোস্ট গার্ড সদস্যদের বিরুদ্ধে একটি চাঞ্চল্যকর অভিযোগ তুলেছেন। 

লিজা ইসলামের অভিযোগ— বাংলাদেশ কোস্ট গার্ডের সদস্যরা তার ভাইকে ছয় মাসেরও বেশি সময় আগে আটক করার পর তাকে হেফাজতে নেওয়ার কথা অস্বীকার করেন, তথ্য চাইতে যাওয়া পরিবারের সদস্যদের ওপর নির্যাতন চালিয়েছেন এবং সেখানে থাকা তিনজন নারীকে ধর্ষণের হুমকি দিয়েছেন।

দ্য ডিসেন্টের সহযোগিতায় আর্থ নিউজের প্রকাশিত একটি পডকাস্টে গত শুক্রবার (২৩ অক্টোবর) কথা বলতে গিয়ে লিজা মিরাজের সন্ধানে পরিবারের নানা প্রচেষ্টার বিবরণ দেন এবং তার সম্পর্কে তথ্য চাইতে গিয়ে যে নির্যাতনের শিকার হতে হয়েছে তা প্রকাশ করেন।

এ পডকাস্টে লিজা ইসলাম জানান, তিনি ও তার পরিবার দৃঢ়ভাবে বিশ্বাস করে, কোস্ট গার্ডের সদস্যরাই তার ভাইকে তুলে নিয়েছে। একই সঙ্গে গত কয়েক মাস ধরে প্রশ্নের উত্তর খোঁজার চেষ্টা, পরিবারের সম্মুখীন হওয়া ভয়ভীতি এবং ভাইয়ের নিখোঁজ হওয়ার ফলে তৈরি হওয়া মানসিক যন্ত্রণার কথা এতে তুলে ধরেন তিনি।

জানা যায়, ৩০ বছর বয়সী মিরাজ গত ১০ এপ্রিল মোংলার কোস্ট গার্ডের হাড়বাড়িয়া স্টেশনের কাছের একটি চায়ের দোকানের পাশ থেকে নিখোঁজ হন। তার পরিবার ও ঘটনার শুরুতে যারা কথা বলেছিলেন তাদের দাবি, কোস্ট গার্ডের সদস্যরা তাকে তুলে নিয়ে গেছে। তবে কোস্ট গার্ড তাকে আটক করার কথা বারবার অস্বীকার করে আসছে এবং তার অবস্থান সম্পর্কে কোনো তথ্য জানা নেই বলে জানিয়েছে।

অন্যদিকে, মানবাধিকারসংস্থা হিউম্যান রাইটস ওয়াচ (এইচআরডব্লিউ) এই ঘটনাকে জুলাই অভ্যুত্থানের পর বাংলাদেশে প্রথম গুমের ঘটনা হিসেবে উল্লেখ করেছে। নিখোঁজের ছয় মাসেরও বেশি সময় পার হলেও মিরাজের এখনো কোনো খোঁজ মেলেনি।

পডকাস্ট চলাকালে লিজা মান্না মাঝি নামের এক ব্যক্তির গোপনে ধারণ করা একটি ভিডিও উপস্থাপন করেন। ভিডিওতে মান্না স্বীকার করেন যে, কোস্ট গার্ডের সদস্যরা যখন থোডা ঘাট থেকে মিরাজকে হাড়বাড়িয়া স্টেশনে নিয়ে যায়, তখন মিরাজ তার নৌকায় ছিলেন।

মুসা খান নামের এক ব্যক্তি কীভাবে মিরাজের স্ত্রীকে বিষয়টি জানিয়েছিলেন তাও তুলে ধরেন লিজা। তার ভাষ্যমতে, মিরাজের স্ত্রী হাতকড়া পরা অবস্থায় তার স্বামীর সঙ্গে কোস্ট গার্ড সদস্যদের ছবি তুলতে দেখেছেন।

তিনি জানান, মিরাজ খুঁড়িয়ে খুঁড়িয়ে আর খুব ধীরে হাঁটছিলেন, যা দেখে বোঝা যাচ্ছিল তাকে ভীষণ মারধর করা হয়েছে। কোস্ট গার্ডের সদস্যরা তাকে নৌকায় তোলার সময় ধাক্কা দেয়। স্বামীকে এমন অবস্থায় দেখে এবং পুরো ঘটনাটির ধাক্কায় মিরাজের স্ত্রী সংজ্ঞাহীন হয়ে পড়েন বলে লিজা জানান।

লিজার দেওয়া তথ্য অনুযায়ী, ওই দিন (১০ এপ্রিল) রাত ১০টা ৫৩ মিনিটে মিরাজের স্ত্রী হাড়বাড়িয়া স্টেশনের নিয়ন্ত্রণ কক্ষে ফোন করে জানতে চান কেন তাকে আটক করা হয়েছে। জবাবে অপর প্রান্ত থেকে বলা হয়, মিরাজকে সন্দেহভাজন হিসেবে আটক করা হয়েছে। তার বিরুদ্ধে প্রমাণ পাওয়া গেলে মামলা দেওয়া হবে, তা না হলে ছেড়ে দেওয়া হবে। পরদিন তিনি আবার ফোন করলে একই কর্মকর্তা তাকে কোস্ট গার্ডের দিঘরাজ ঘাঁটিতে যেতে বলেন।

লিজা জানান, দিঘরাজ স্টেশনের উকাচিং নামের এক কর্মকর্তা তাকে বিকেলে আসতে বলেন এবং জানান যে তারা মিরাজকে নিয়ে অভিযানে যাবেন।

তিনি আরও অভিযোগ করেন, কয়েক দিন পর পুলিশ কর্মকর্তারা নিজেদের মতো করে একটি সাধারণ ডায়েরি (জিডি) তৈরি করেন, যেখানে লেখা হয় মিরাজ তার বাড়ির কাছ থেকে নিখোঁজ হয়েছেন। পুলিশ পরিবারকে জানায় যে, অভিযোগে কোনো রাষ্ট্রীয় বাহিনীকে অভিযুক্ত করা যাবে না।

কর্তৃপক্ষের শুরুর দিকের প্রতিক্রিয়ার কথা উল্লেখ করে লিজা বলেন, “দুই থেকে তিন দিন তারা আটকের কথা স্বীকার করেছিল।”

তিনি বলেন, “এরপর থেকে তারা কেন এটি অস্বীকার করে চলেছে, তা আজ পর্যন্ত আমাদের কাছে অজানা।”

লিজা অভিযোগ করেন, গত ১১ জুন জয়মনি এলাকায় কোস্ট গার্ডের একটি স্থাপনার সামনে মিরাজের খোঁজে শত শত মানুষ জড়ো হলে তিনি, তার মা এবং তার ভাবি নির্যাতনের শিকার হন।

পডকাস্টে তিনি একটি ভিডিও দেখান, যেখানে কোস্ট গার্ডের সদস্যদের কয়েকজনকে পেটাতে দেখা যায়।

তিনি বলেন, “এমনকি তারা আমাদের তিনজনকে ধর্ষণের হুমকিও দিয়েছিল।”

ওই ঘটনার পর দুটি মামলা করা হয়। কোস্ট গার্ডের করা মামলায় ৪৪ জন নামীয় এবং কয়েকশো অজ্ঞাতপরিচয় ব্যক্তিকে আসামি করা হয়।

আসামিদের মধ্যে লিজা, তার মা ও তার ভাবিও ছিলেন। লিজা জানান, মামলার সূত্রে এই তিন নারীকে ২৭ দিন জেলে কাটাতে হয়েছে।

লিজা জানান, মিরাজের ফিরে আসার আশা ধরে রাখার পাশাপাশি তার ভাগ্যে কী ঘটেছে তা নিয়ে অনিশ্চয়তার সঙ্গেই দিন কাটাতে হচ্ছে পরিবারটিকে।

তিনি বলেন, “আমি এক বছর ধরে আমার ভাইকে দেখিনি। এখনো ইচ্ছা করে অন্তত একবার হলেও তার কণ্ঠ শুনি। মাঝে মাঝে আমি মেসেঞ্জারে তার ভয়েস মেসেজগুলো শুনি। আমি তার সব ভয়েস মেসেজ একটি ফাইলে সেভ করে রেখেছি।”

লিজা আরও বলেন, “আমার এখনো ভাইয়ের সাথে কথা বলতে ইচ্ছে করে। মনে হয় সে ফিরে আসবে। মাত্র তো ছয় মাস হলো। সে কি ফিরে আসতে পারে না? অবশ্যই পারে। আমার মনে হয় সবকিছু যদি একটা দুঃস্বপ্ন হতো, এতগুলো মাস ধরে যা ঘটেছে তা যদি শুধু একটা দুঃস্বপ্ন হতো আর আমার ভাই আবার ফিরে আসত।”

তিনি জানান, তার মা প্রতি রাতে তাহাজ্জুদের নামাজে কাঁদেন, আর তিনি তার মা ও ভাবিকে সান্ত্বনা দেওয়ার চেষ্টা করেন।

তিনি বলেন, “আমি সবসময় তাদের জন্য শক্ত থাকার চেষ্টা করি।”

লিজা আরও জানান, মিরাজের ছোট ছেলেটি এখনো বোঝে না যে তার বাবার কী হয়েছে।

তার ভাষ্য, “আমার ছোট্ট ভাইপো এসব কিছুই বোঝে না। সে ভাবে তার বাবা এখন নেই, তবে ফিরে আসবে। গুম হওয়া বলতে কী বোঝায়, তা সে বোঝে না।”

সাবেক প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার শাসনামলে ঘটে যাওয়া গুমের ঘটনার প্রভাব নিয়ে এখনো সংকট মোকাবিলা করছে বাংলাদেশ।

সাবেক অন্তর্বর্তী সরকারের গঠিত গুমসংক্রান্ত স্বাধীন তদন্ত কমিশন ২০০৯ থেকে ২০২৪ সালের মধ্যে দেড় হাজারের বেশি গুমের ঘটনা চিহ্নিত করেছে। কমিশনের তথ্য অনুযায়ী, অন্তত ২৫১ জন কখনোই ফিরে আসেননি এবং তাদের মৃত বলে ধরে নেওয়া হচ্ছে, আর ৩৬ জনের লাশ উদ্ধার করা হয়েছে।

তথ্যসূত্র: ডেইলি ওয়াদা

source: The Dhaka Diary

Leave a Reply

Back to top button