News

হাসিনাসহ খুনিদের ফাঁসি চায় শহীদ পরিবার ও জামায়াত

পতিত ফ্যাসিবাদী আওয়ামী লীগের লগি-বৈঠা তাণ্ডবের দুই দশক পূর্তি আজ বুধবার। ২০০৬ সালের ২৮ অক্টোবর আওয়ামী সন্ত্রাসীরা রাজধানীর পল্টনে লগি-বৈঠাসহ অস্ত্র নিয়ে ঝাঁপিয়ে পড়েছিল জামায়াতে ইসলামী ও ইসলামী ছাত্রশিবিরের নিরস্ত্র নেতাকর্মীদের ওপর। চব্বিশের জুলাই বিপ্লবে গণহত্যার দায়ে মৃত্যুদণ্ডপ্রাপ্ত শেখ হাসিনার নির্দেশে সেদিন প্রকাশ্যে নির্মমভাবে পিটিয়ে ছয়জনকে হত্যা করা হয়।

এরপর লাশের ওপর নৃত্য-উল্লাসে মেতে ওঠে বর্তমানে কার্যক্রম নিষিদ্ধ আওয়ামী লীগের সন্ত্রাসীরা। নারকীয় হত্যাযজ্ঞ চালাতে সেদিন হাসিনার বাসভবন সুধাসদন থেকে অস্ত্র-গোলাবারুদ সরবরাহ করা হয় বলেও জানা যায়।

এ নির্মম হত্যাকাণ্ড ও পাশবিকতায় জাতিসংঘসহ দেশে-বিদেশে তীব্র নিন্দার ঝড় ওঠে। এ বিভীষিকাময় ঘটনায় পরে মামলা হলেও আওয়ামী লীগ ক্ষমতায় ফিরে রাজনৈতিক সিদ্ধান্তে তা প্রত্যাহার করে ইতিহাসের বর্বরতম ঘটনার বিচার প্রক্রিয়া বন্ধ করে দেয়। হত্যার বিচার পাওয়া তো দূরের কথা, পরবর্তী সময়ে নানাভাবে আওয়ামী নির্যাতনের শিকার হয় শহীদ পরিবারগুলো। তবে চব্বিশের গণঅভ্যুত্থানের পর বিচারের নতুন প্রত্যাশা নিয়ে সোচ্চার হচ্ছেন তারা। ২৮ অক্টোবরের খুনিদের বিরুদ্ধে করা মামলাগুলো পুনরায় সচল করা এবং প্রয়োজনে আলাদা ট্রাইব্যুনাল গঠনের মাধ্যমে তাদের বিচার ও শাস্তি নিশ্চিত করার দাবি তুলেছে শহীদ পরিবার ও জামায়াত। এসব দাবির পাশাপাশি নানা কর্মসূচির মধ্য দিয়ে আজ কলঙ্কজনক পল্টন ট্র্যাজেডির সেই ভয়াল স্মৃতি স্মরণ করছে দলটি।

লগি-বৈঠার নির্মম আঘাতে নিহতদের স্মরণ করে গত সোমবার গণমাধ্যমে বিবৃতি দিয়েছেন বিরোধীদলীয় নেতা ও জামায়াতের আমির ডা. শফিকুর রহমান। এতে তিনি বলেন, ২৮ অক্টোবর পল্টনে লগি-বৈঠার তাণ্ডবের ঘটনা ছিল পূর্বপরিকল্পিত মানবতাবিরোধী গণহত্যা। দেশের জনগণের দাবি—অবিলম্বে ২৮ অক্টোবরের খুনিদের বিরুদ্ধে দায়েরকৃত মামলা পুনরায় সচল করে তাদের গ্রেপ্তার ও শাস্তি নিশ্চিত করতে হবে।

কী ঘটেছিল সেদিন

২০০৬ সালে বিএনপি নেতৃত্বাধীন চারদলীয় জোট সরকারের মেয়াদ শেষে ২৮ অক্টোবর লগি-বৈঠা আন্দোলনের ডাক দেয় আওয়ামী নেতৃত্বাধীন ১৪ দল। দলীয়প্রধান হাসিনার নির্দেশে অস্ত্রসজ্জিত আওয়ামী লীগ-যুবলীগসহ দলটির বিভিন্ন পর্যায়ের নেতাকর্মীরা লগি-বৈঠা ও অস্ত্র হাতে মুক্তাঙ্গন-পল্টন এলাকায় অবস্থান নেয়। এর আগে ২৭ অক্টোবর সন্ধ্যায় প্রধানমন্ত্রী খালেদা জিয়া জাতির উদ্দেশে বিদায়ী ভাষণ শেষ হওয়ার পরপরই দেশব্যাপী শুরু হয় তাণ্ডব। বিভিন্ন স্থানে বিএনপি-জামায়াতের অফিসসহ নেতাকর্মীদের বাড়িতে চালানো হয় হামলা, আগুন দিয়ে পুড়িয়ে দেওয়া হয় অনেক অফিস, বাড়িঘর।

অন্যদিকে সরকারের পাঁচ বছর পূর্তি উপলক্ষে বিকালে বায়তুল মোকাররম জাতীয় মসজিদের উত্তর গেটে সমাবেশের ডাক দিয়েছিল জামায়াত। সভার মঞ্চ তৈরির কাজ চলাকালে বেলা ১১টায় লগি, বৈঠা ও অস্ত্রধারীরা জামায়াতের সমাবেশস্থলে হামলা চালায়। তারা একযোগে বিজয়নগর, তোপখানা রোড ও মুক্তাঙ্গন থেকে পল্টন মোড় দিয়ে আক্রমণ চালায়। একপর্যায়ে আওয়ামী সন্ত্রাসীরা পল্টনের বিভিন্ন গলিতে ঢুকে পড়ে এবং নিরীহ জামায়াত-শিবিরের নেতাকর্মীদের বেধড়ক পেটাতে থাকে। তারা শিবির নেতা মুজাহিদুল ইসলামকে লগি-বৈঠা দিয়ে পিটিয়ে নৃশংসভাবে হত্যা করে। এরপর জামায়াত কর্মী জসিম উদ্দিনকে নির্মমভাবে হত্যা করে তার লাশের উপর উঠে নৃত্য-উল্লাস করতে থাকে।

তাদের দফায় দফায় হামলা উপেক্ষা করে জামায়াতের সমাবেশ হয়। জামায়াতের তৎকালীন আমির মাওলানা মতিউর রহমান নিজামীর বক্তব্য শুরু হওয়ার ৪-৫ মিনিট পর পল্টন মোড়ে উত্তেজনা দেখা যায়। এ সময় নির্মাণাধীন র‌্যাংগস টাওয়ারের ছাদ থেকে সমাবেশ লক্ষ্য করে ১০-১২টি বোমা ও প্রকাশ্যে অস্ত্র উঁচিয়ে দফায় দফায় গুলি ছোড়ে সন্ত্রাসীরা। আওয়ামী সন্ত্রাসীদের গুলি মাথায় বিদ্ধ হয়ে লুটিয়ে পড়েন জামায়াত কর্মী হাবিবুর রহমান ও জসিম উদ্দিন। এভাবে সেদিন জামায়াত ও শিবিরের ছয়জন নেতাকর্মী শহীদ এবং আহত হন সহস্রাধিক। মাগরিবের আজানের পর পল্টন মোড়ে বিডিআর অবস্থান নিলে পরিস্থিতি কিছুটা শান্ত হয়ে আসে। ২৭ থেকে ২৯ অক্টোবর ঢাকাসহ সারা দেশে জামায়াত-শিবিরসহ চারদলীয় জোটের ৫৪ নেতাকর্মী নিহত হন, আহত হন পাঁচ হাজারের বেশি। তাদের বাড়িঘর ও ব্যবসাপ্রতিষ্ঠানে হামলা চালানো হয়। এরই ধারাবাহিকতায় ওয়ান ইলেভেনের অবৈধ সরকার আসে এবং দেশ দুই বছর গণতন্ত্রহীন থাকে।

বিচারের প্রত্যাশায় শহীদ পরিবার

দুই দশকেও বিচার পায়নি লগি-বৈঠার হত্যাকাণ্ডে শহীদ পরিবার। ঢাকা কলেজের তৃতীয় বর্ষের শিক্ষার্থী শিপনের মৃত্যুর ঘটনা স্বজনদের কাছে আজও বেদনার স্মৃতি। ছেলেকে হারানোর শোক এবং হত্যাকাণ্ডের বিচার না পাওয়ার হতাশা তাদের দীর্ঘদিন ধরে বয়ে বেড়াতে হচ্ছে।

শহীদ সাইফুল্লাহ মোহাম্মদ মাসুমের মা শামসুন্নাহার রুবি সন্তান হত্যার বিচার চেয়ে আমার দেশকে জানান, আওয়ামী লীগ সরকার মামলা বন্ধ করে দেওয়ার পর এখন পর্যন্ত আর চালু হয়নি। অনেক দুঃখ-কষ্ট নিয়ে আমাদের দিন কাটছে। মাসুমের বাবা কষ্ট নিয়েই দুনিয়া থেকে বিদায় নিয়েছেন। আওয়ামী লীগের সন্ত্রাসীরা তাকে ধরে নিয়ে নির্যাতন করে। আমি নিজেও স্কুলে চাকরি করতে পারিনি। আমার বাবাকেও তারা অত্যাচার করেছে। আমাদের জীবনে প্রতিদিনই ২৮ অক্টোবর আসে। আমরা এই ঘটনায় হাসিনার ফাঁসি চাই।

শহীদ হাফেজ গোলাম কিবরিয়া শিপনের পিতা তাজুল ইসলাম জানান, ২৮ অক্টোবর মানুষকে সাপের মতো পিটিয়ে যেভাবে হত্যা করা হয়, তা আগে কখনো দেখিনি। হাসিনার হুকুমেই এই হত্যাকাণ্ড হয়েছে। তাকে ফাঁসি দিতে হবে। তা নাহলে আমরা শান্তি পাব না।

এদিকে নিহতদের পরিবার ও আহতদের জন্য বিচারের পাশাপাশি, ক্ষতিপূরণ এবং পুনর্বাসনের দাবিও নতুন করে সামনে এসেছে।

পল্টন থানায় মামলা, ৪৬ জনের বিরুদ্ধে অভিযোগপত্র, এরপর থমকে যায় বিচার

ঘটনার পরদিন ২৯ অক্টোবর পল্টন থানায় মামলা করেন জামায়াতের তৎকালীন পল্টন থানা আমির এটিএম সিরাজুল হক। এজাহারে আওয়ামী লীগ ও ১৪ দলীয় জোটের ৪০ নেতার নাম উল্লেখ করা হয়। আওয়ামী লীগের তৎকালীন সাধারণ সম্পাদক আবদুল জলিল, তোফায়েল আহমেদ, মোহাম্মদ নাসিম, আবদুর রাজ্জাক, মোফাজ্জল হোসেন চৌধুরী মায়া, সাহারা খাতুন, জাসদ নেতা হাসানুল হক ইনু এবং ওয়ার্কার্স পার্টির রাশেদ খান মেনন এবং সহস্রাধিক অজ্ঞাত ব্যক্তিকে আসামি করা হয়।

তদন্ত শেষে হুকুমের আসামি হিসেবে হাসিনাকে অন্তর্ভুক্ত করে ২০০৭ সালের ১০ এপ্রিল পল্টন থানা পুলিশ চার্জশিট আদালতে জমা দেয়। ১১ এপ্রিল আদালতে সেটি গৃহীত হয়। হাসিনা, আব্দুল জলিল, নাসিম, মায়া, সাহারা খাতুন, ইনু, মেনন, নানক, ইকবাল ও হাজী সেলিমসহ ৪৬ জনের নামে চার্জশিট দেওয়া হয়। আসামিদের বিরুদ্ধে গ্রেপ্তারি পরোয়ানা জারি করে আদালত। পরে বিকালে আবার অদৃশ্য কারণে ওই চার্জশিট মুলতবি করে এবং অধিকতর তদন্তের নির্দেশ আসে। তারপর বিতর্কিত ওয়ান-ইলেভেন সরকারের সময়ে ওই মামলার বিচার কাজ আর আলোর মুখ দেখেনি।

ক্ষমতায় গিয়ে মামলা প্রত্যাহার

আওয়ামী লীগ ক্ষমতায় আসার পর মামলাটিকে রাজনৈতিক উদ্দেশ্যপ্রণোদিত ও হয়রানিমূলক বিবেচনা করে ২০০৯ সালে মামলাটি প্রত্যাহার করা হয়। এতে হাসিনাসহ ৪৬ জনের বিরুদ্ধে মামলার কার্যক্রম বন্ধ হয়ে যায়। এ সিদ্ধান্তের ফলে পল্টনের হত্যাকাণ্ডে কার কী ভূমিকা ছিল, তা বিচারিক প্রক্রিয়ায় নির্ধারণের সুযোগ আর থাকেনি।

এ লোমহর্ষক হত্যাকাণ্ডে নিহতদের পক্ষের আইনজীবী, ঢাকা আইনজীবী সমিতির সিনিয়র সহসভাপতি আবদুর রাজ্জাক আমার দেশকে বলেন, আওয়ামী সরকারের সময়ে ২০০৯ সালে মামলাটি প্রত্যাহার করে নেওয়া হয়। যে কারণে এ বিষয়ে আর কিছু করা যায়নি। এরপর মামলার নথিপত্র, নকল বা অনুলিপি আমরা চেষ্টা করেও পাইনি। মামলাটি এখন পুনরুজ্জীবনের চেষ্টা করা হচ্ছে। আশা করছি পরিবর্তিত পরিস্থিতিতে জঘন্য এ হত্যাকাণ্ডের বিচার হবে।

দুই দশক পর আবার বিচার দাবি

চব্বিশের গণঅভ্যুত্থানের পর বিচার দাবি নতুন করে জোরালো হয়েছে। ২০২৫ সালেও জামায়াতের নেতারা মামলাটি পুনরুজ্জীবিত করার দাবি জানান। এবার দুই দশক পূর্তির প্রাক্কালে দলটি আবারও বিষয়টি সামনে এনেছে। জামায়াতের কেন্দ্রীয় নির্বাহী পরিষদ সদস্য ড. শফিকুল ইসলাম মাসুদ বলেন, নতুন করে মামলার প্রস্তুতি নেওয়া হচ্ছে।

source: Daily Amar Desh

Leave a Reply

Back to top button