নির্বাচনে হারলেন, ব্রাজিল ছেড়ে ভাগলেন, মায়ামিয়তে এখন বলসোনারো, কি হবে ভবিষ্যত?

ব্রাজিলের প্রেসিডেন্ট নির্বাচনে পরাজিত হওয়ার পর স্ত্রী ও দুই মেয়েকে নিয়ে যুক্তরাষ্ট্রের ফ্লোরিডার মায়ামিতে পৌঁছেছেন কট্টর ডানপন্থী সিনেটর ফ্লাভিও বলসোনারো। নির্বাচনে হারের মাত্র কয়েক দিনের মাথায় তাঁর এই আকস্মিক দেশত্যাগ ব্রাজিলের রক্ষণশীল রাজনীতিতে ক্ষমতার নতুন সমীকরণ ও লড়াইয়ের সম্ভাবনা তৈরি করেছে। একই সঙ্গে অর্থ পাচার ও মুদ্রা পাচারের অভিযোগে চলমান আইনি তদন্ত থেকে বাঁচতেই তিনি দেশ ছেড়েছেন বলে তীব্র আলোচনা শুরু হয়েছে।
আল জাজিরার প্রতিবেদনে জানা যায়, গত রবিবার রাতে সুপ্রিম কোর্টের বিচারপতি আলেকজান্দ্রে দে মোরায়েস ফ্লাভিওকে তাঁর সাধারণ ও কূটনৈতিক পাসপোর্ট জমা দেওয়ার নির্দেশ দিয়েছিলেন। তদন্তের মুখে তিনি পালিয়ে যেতে পারেন—এমন আশঙ্কায় বিচারপতি এই পদক্ষেপ নেন। ফ্লাভিও ও তাঁর সহযোগী উইলারের তমাজের বিরুদ্ধে অর্থ পাচারের তদন্ত চলছে। স্থানীয় সংবাদমাধ্যমের তথ্যমতে, তমাজ আগেই ব্রাজিল ছেড়ে মায়ামিতে চলে গেছেন।
আর্জেন্টিনার অভিবাসন কর্তৃপক্ষের তথ্য অনুযায়ী, গত মঙ্গলবার রাতে স্থলপথে ফ্লাভিও ও তাঁর পরিবার আর্জেন্টিনায় প্রবেশ করেন। সেখান থেকে বুয়েনস এইরেস ফ্লাই পরিচালিত একটি ব্যক্তিগত উড়োজাহাজে তাঁরা ইকুয়েডরের গুয়ায়াকিলের উদ্দেশে রওনা হন এবং বুধবার সকালে মায়ামির ওপা-লকা বিমানবন্দরে পৌঁছান। এর আগে যুক্তরাষ্ট্রের পররাষ্ট্র দপ্তর নিশ্চিত করেছিল যে ফ্লাভিও ও তাঁর পরিবারকে ভিসা দেওয়া হবে।
সাম্প্রতিক এই নির্বাচনে নাটকীয় প্রত্যাবর্তনের মাধ্যমে পুনর্নির্বাচিত হয়েছেন মধ্য-বামপন্থী প্রার্থী লুইজ ইনাসিও লুলা দা সিলভা। তিনি পেয়েছেন ৫১ দশমিক ৮ শতাংশ ভোট। অন্যদিকে ফ্লাভিও পেয়েছেন ৪৮ দশমিক ২ শতাংশ ভোট, যেখানে ব্যবধান ছিল ৪৪ লাখের বেশি। এই ফলাফল এখনো স্বীকার করেননি যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প ও আর্জেন্টিনার প্রেসিডেন্ট হাভিয়ের মিলেই। সোমবার ট্রাম্প কোনো প্রমাণ ছাড়াই ব্রাজিলের নির্বাচনকে ‘কারচুপিপূর্ণ’ বলে মন্তব্য করলেও লুলার প্রতি নিজের শ্রদ্ধার কথা জানান।
ফ্লাভিওর দেশত্যাগে সাধারণ ভোটারদের মধ্যে তীব্র ক্ষোভের সৃষ্টি হয়েছে। সাও পাওলোর ৩৬ বছর বয়সী বাসিন্দা ক্রিস্তিয়ানা কুনহা আল জাজিরাকে বলেন, “নিজের কাজের পরিণতির মুখোমুখি হতে না চেয়ে তিনি একজন কাপুরুষের মতো পালিয়ে গেছেন।” আরেক মনোবিশ্লেষক প্রিসিলা কারদোসো আরও কঠোর ভাষায় একে ‘নর্দমা দিয়ে পালিয়ে যাওয়ার মতো’ বলে মন্তব্য করেন।
রাজনৈতিক বিশ্লেষক পাওলো রবার্তো দে সুজার মতে, ফ্লাভিওর এই পলায়ন ব্রাজিলের ডানপন্থী রাজনীতিতে অভ্যন্তরীণ ক্ষমতার লড়াইয়ের পথ উন্মুক্ত করে দিয়েছে এবং এর ফলে বলসোনারো পরিবারের প্রভাব ক্রমান্বয়ে কমতে পারে। ২০২২ সালে ফ্লাভিওর বাবা জইর বলসোনারো প্রথম ক্ষমতাসীন প্রেসিডেন্ট হিসেবে হেরেছিলেন, আর এবার ফ্লাভিও প্রথম দফায় এগিয়ে থেকেও দ্বিতীয় দফায় হেরে গেলেন—যা পরিবারটির রাজনৈতিক ক্ষমতার একটা স্পষ্ট সীমারেখা টেনে দিয়েছে।
নির্বাচনের পর সংবাদ সম্মেলনে ফ্লাভিও ভোটের ফল মেনে নেওয়া অসম্ভব বলে দাবি করেন এবং সুপ্রিম কোর্টের শেষ মুহূর্তে ভোট গ্রহণের সময় দুই ঘণ্টা বাড়ানোর সিদ্ধান্তকে কেন্দ্র করে নির্বাচন বাতিলের আবেদন করার কথা জানান। তবে সরকারি হিসাব অনুযায়ী, ওই বাড়তি সময়ে ৩৫ হাজারেরও কম ভোট পড়েছিল, যা লুলার বিশাল ব্যবধানের জয়ে কোনো প্রভাব ফেলেনি। ফ্লাভিও হার না মানলেও তাঁর দল লিবারেল পার্টি এবং প্রভাবশালী মিত্র সাও পাওলোর গভর্নর তারসিসিও দে ফ্রেইতাস নির্বাচনের ফল মেনে নিয়ে সামনে এগিয়ে যাওয়ার ইঙ্গিত দিয়েছেন।
বিশ্লেষকদের ধারণা, ২০৩০ সালের পরবর্তী প্রেসিডেন্ট নির্বাচনে বলসোনারো পরিবারের সরাসরি কোনো সদস্যের প্রার্থী হওয়ার সম্ভাবনা কম। তবে ভোটারদের একাংশ মনে করেন, পরিবারটি রাজনীতিতে টিকে থাকার নানা পথ খুঁজবে, কারণ এর আগে পরিবারের অন্য সদস্যরাও বিভিন্ন পদে নির্বাচিত হয়েছেন। সব মিলিয়ে ফ্লাভিওর দেশত্যাগ ব্রাজিলের ডানপন্থী রাজনীতির গতিপথকে সম্পূর্ণ বদলে দিচ্ছে।
source: Azadir Dak