News

মাওকে ‘স্বৈরশাসক’ বলায় চীনের কাছে ক্ষমা চাইতে হলো এমবাপ্পেকে

ইন্টারনেটের একটি মিম নিয়ে ফুটবলারের করা রসিকতা দেশের সীমানার বাইরেও বক্তব্যের ওপর প্রভাব বিস্তারে চীনের সক্ষমতার একটি উদাহরণ হয়ে উঠেছে। একটি অনানুষ্ঠানিক সাক্ষাৎকারে ফরাসি ফুটবল তারকা কিলিয়ান এমবাপ্পে নিজের মুখ মাও সেতুংয়ের শরীরে বসানো একটি মিমকে ‘চীনা স্বৈরশাসক’ হিসেবে বর্ণনা করেন। রসিকতাটি মূলত নিজেকে নিয়েই করা হয়েছিল। যে দলগুলোর হয়ে তিনি খেলেন, সেসব দলের ওপর তাঁর প্রভাব সম্পর্কে ভক্তদের ধারণাকে কেন্দ্র করেই তিনি এমন মন্তব্য করেছিলেন। কিন্তু কয়েক দিনের মধ্যেই চীনের তিনটি স্পনসর প্রতিষ্ঠান তাঁর সঙ্গে অংশীদারত্বের চুক্তি বাতিল করে, দেশটির সম্প্রচারমাধ্যমগুলো ফুটবল সম্প্রচার স্থগিত করে এবং এমবাপ্পে, লা লিগা ও রিয়াল মাদ্রিদ—সবাই ক্ষমা চায়।

এসব ক্ষমা প্রার্থনার মাধ্যমে চীনে তাদের বাণিজ্যিক সম্পর্ক পুনরুদ্ধার হবে কি না, তা এখনো অনিশ্চিত। চীনা কর্তৃপক্ষ ও ব্যবসাপ্রতিষ্ঠানগুলো শেষ পর্যন্ত নিজেদের স্বার্থ বিবেচনায় সহযোগিতা পুনরায় শুরু করার সিদ্ধান্ত নিতে পারে। তবে এরই মধ্যে মতপ্রকাশের স্বাধীনতার ক্ষেত্রে যে নজির তৈরি হয়েছে, তা স্পষ্ট। চীনের বাইরে অরাজনৈতিক প্রেক্ষাপটে কথা বলা একজন ফরাসি ক্রীড়াবিদকে ঐতিহাসিক রাজনৈতিক নেতাকে স্বৈরশাসক বলার জন্য প্রকাশ্যে ক্ষমা চাইতে হয়েছে। এই ঘটনা দেখায়, কীভাবে চীনের অর্থনৈতিক প্রভাব সরাসরি সরকারি নির্দেশ ছাড়াই জাতীয় সীমানা পেরিয়ে রাজনৈতিক সেন্সরশিপ কার্যকর করতে পারে। চীনের রাজনৈতিক প্রত্যাশার কারণে বিদেশি ব্যক্তি ও প্রতিষ্ঠানগুলোর বক্তব্য সীমিত হতে পারে, যদিও তাদের ওপর চীনের আইন সরাসরি প্রযোজ্য নয়। চীনের বাজারের ওপর তাদের বাণিজ্যিক নির্ভরশীলতাই এ ক্ষেত্রে যথেষ্ট হতে পারে।

এমবাপ্পের মন্তব্য ছড়িয়ে পড়ার পর চীনা পানীয় উৎপাদনকারী প্রতিষ্ঠান ডংপেং তাঁর সঙ্গে অংশীদারত্বের চুক্তি বাতিলের ঘোষণা দেয়। এর পরপরই দুগ্ধজাত পণ্য উৎপাদনকারী প্রতিষ্ঠান মেংনিউ ও মিল্কগ্রাউন্ড একই ধরনের বিবৃতি দিয়ে জানায়, তারা এমন মন্তব্যের নিন্দা জানাচ্ছে, যা ‘জাতীয় অনুভূতিতে আঘাত করেছে’। চীনের গণমাধ্যম প্ল্যাটফর্ম ও সম্প্রচারমাধ্যমগুলোও আরও বিধিনিষেধ আরোপ করে। এসব প্রতিক্রিয়া অত্যন্ত দ্রুত ঘটেছে, যদিও মূল বিতর্কের সঙ্গে প্রতিষ্ঠানগুলোর বিক্রি করা পণ্য কিংবা সরবরাহ করা সেবার কোনো সম্পর্ক ছিল না।

এসব প্রতিষ্ঠানকে চুক্তি বাতিলের জন্য চীনা কর্তৃপক্ষ আলাদাভাবে নির্দেশ দিয়েছিল, এমন কোনো জোরালো প্রমাণ নেই। তবে চীনের রাজনৈতিক ও বাণিজ্যিক পরিবেশে সরকারি সংবেদনশীল বিষয়গুলো আগেভাগে বিবেচনায় নেওয়া এবং নির্দেশ পাওয়ার আগেই আনুগত্য প্রদর্শনের প্রণোদনা ব্যবসাপ্রতিষ্ঠানগুলোর মধ্যে রয়েছে। একটি প্রতিষ্ঠান প্রকাশ্যে কোনো অবস্থান নেওয়ার পর অন্য প্রতিষ্ঠানগুলোও সমান বা তার চেয়ে কঠোর প্রতিক্রিয়া দেখানোর প্রয়োজন অনুভব করতে পারে। নীরব থাকা কিংবা তুলনামূলক সংযত প্রতিক্রিয়া জানানোও সুনামের জন্য ঝুঁকির কারণ হয়ে উঠতে পারে।

এর ফলে রাজনৈতিক আনুগত্য প্রদর্শনের এক ধরনের প্রতিযোগিতামূলক ব্যবস্থা তৈরি হয়, যেখানে ব্যবসাপ্রতিষ্ঠান ও সরকারি-বেসরকারি প্রতিষ্ঠানগুলো একে অপরের প্রতিক্রিয়াকে আরও জোরালো করে তোলে। রাজনৈতিক অবস্থানের সঙ্গে সামঞ্জস্য রাখা বাণিজ্যিক হিসাব-নিকাশের অংশ হয়ে ওঠে। লাভজনক কোনো পৃষ্ঠপোষকতার চুক্তি বাতিলের তাৎক্ষণিক আর্থিক ক্ষতির চেয়ে রাজনৈতিক অসন্তোষ, ভোক্তাদের বিরূপ প্রতিক্রিয়া কিংবা দেশপ্রেমের ঘাটতির অভিযোগের আশঙ্কাকে বেশি গুরুত্ব দেওয়া হতে পারে। এই চাপ বিশেষভাবে কার্যকর, কারণ এটি বিকেন্দ্রীভূত। প্রতিষ্ঠানগুলো যখন নিজেরাই রাজনৈতিক সীমারেখা কার্যকর করতে জোরালো প্রণোদনা অনুভব করে, তখন প্রতিটি সেন্সরশিপের ঘটনা তদারকির জন্য রাষ্ট্রের সরাসরি হস্তক্ষেপের প্রয়োজন হয় না।

পরবর্তী সময়ে চীনের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয় এই বিতর্ককে জাতীয় মর্যাদার প্রশ্নে উন্নীত করে। মন্ত্রণালয়ের মুখপাত্র গুও জিয়াকুন বলেন, “চীনা জনগণের অনুভূতিতে আঘাত করে—এমন যেকোনো বক্তব্য বা কর্মকাণ্ড স্বাভাবিকভাবেই চীনের সর্বস্তরে প্রত্যাখ্যাত হবে।” একজন ফুটবলারের ইন্টারনেটের একটি রসিকতা সম্পর্কে দেওয়া বর্ণনা দিয়ে যে বিতর্কের শুরু হয়েছিল, সেটিকে একটি দেশের বিরুদ্ধে কথিত অপরাধ হিসেবে উপস্থাপন করা হয়।

এ ধরনের বক্তব্যে কমিউনিস্ট পার্টির পছন্দের ইতিহাসের ব্যাখ্যাকে চীনা জনগণের অনুভূতির সঙ্গে অবিচ্ছেদ্য হিসেবে তুলে ধরা হয়। এতে খোদ চীনা নাগরিকদের মধ্যেই মতভিন্নতার সুযোগ সীমিত হয়ে পড়ে। অথচ চীনা সমাজ রাজনৈতিক কিংবা ঐতিহাসিক দৃষ্টিকোণ থেকে একক কোনো সত্তা নয়। মাওয়ের উত্তরাধিকার নিয়ে বিভিন্ন প্রজন্ম, সম্প্রদায় ও ব্যক্তিগত অভিজ্ঞতার ভিত্তিতে মানুষের দৃষ্টিভঙ্গি ভিন্ন। বিতর্কটিকে ‘চীনা জনগণের’ প্রতি অবমাননা হিসেবে উপস্থাপন করে পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয় চলমান বাণিজ্যিক প্রতিক্রিয়াকে জাতীয় ক্ষোভের আনুষ্ঠানিক মর্যাদা দেয়।

এ ক্ষেত্রে ঐতিহাসিক পরিহাস হলো, চীনা কমিউনিস্ট পার্টি নিজেই মাওয়ের উত্তরাধিকার সম্পর্কে তাদের ব্যাখ্যা বারবার পরিবর্তন করেছে। ১৯৮১ সালের ঐতিহাসিক প্রস্তাবে সাংস্কৃতিক বিপ্লবের জন্য প্রধানত মাওকে দায়ী করা হয়েছিল এবং তাঁর ক্রমবর্ধমান স্বেচ্ছাচারী ক্ষমতা প্রয়োগের সমালোচনা করা হয়েছিল। তবে একই সঙ্গে বিপ্লবী নেতা হিসেবে তাঁর অবস্থানও অক্ষুণ্ন রাখা হয়। শি জিনপিংয়ের আমলে ২০২১ সালের প্রস্তাবেও সাংস্কৃতিক বিপ্লব শুরুর জন্য মাওয়ের দায় স্বীকার করা হয়। তবে এতে কমিউনিস্ট পার্টির শাসনের ধারাবাহিকতা ও অর্জনের ওপর বেশি গুরুত্ব দেওয়া হয়। নিজেদের ইতিহাসের ব্যাখ্যা পুনর্নির্ধারণের অধিকার পার্টি নিজেদের জন্য সংরক্ষণ করলেও একজন বিদেশি ফুটবলারের অনানুষ্ঠানিকভাবে মাওকে স্বৈরশাসক হিসেবে উল্লেখ করা বাণিজ্যিক শাস্তির কারণ হয়ে উঠতে পারে। ফলে এই বিতর্ক শুধু ইতিহাসের ব্যাখ্যা নিয়েই নয়, বরং সেই ব্যাখ্যা প্রকাশের অধিকার কার রয়েছে, তা নিয়েও।

রিয়াল মাদ্রিদের ক্ষমা প্রার্থনার বিবৃতিতে ‘চীন, দেশটির ইতিহাস, সংস্কৃতি ও নাগরিকদের প্রতি গভীর শ্রদ্ধা’র কথা তুলে ধরা হয়। এ ধরনের ভাষা বাণিজ্যিক দৃষ্টিকোণ থেকে সুবিধাজনক হতে পারে। তবে এর মাধ্যমে এমন ধারণাও মেনে নেওয়া হয় যে, কোনো ঐতিহাসিক নেতাকে নিয়ে একজন ফুটবলারের ব্যক্তিগত মন্তব্যের জন্য একটি প্রতিষ্ঠানকে আনুষ্ঠানিকভাবে দুঃখ প্রকাশ করতে হবে। চীনা জনগণের প্রতি শ্রদ্ধা দেখানোর অর্থ চীনা সরকারের ইতিহাসের ব্যাখ্যার সঙ্গে একমত হওয়া নয়। একইভাবে বন্ধুত্ব ও বাণিজ্যিক সম্পর্ক বজায় রাখার অর্থ এই হতে পারে না যে, চীনা রাজনৈতিক ব্যক্তিত্বদের সম্পর্কে বিদেশিরা কী বলতে পারবেন, তা চীনা কমিউনিস্ট পার্টির রাজনৈতিক সংবেদনশীলতা দিয়ে নির্ধারিত হবে।

প্রকাশ্যে ক্ষমা চাওয়ার পর এই বিতর্কের তাৎপর্য এখন সরাসরি জড়িত পক্ষগুলোর বাইরেও ছড়িয়ে পড়েছে। অন্যান্য ক্রীড়াবিদ, বিনোদন জগতের ব্যক্তি, ব্যবসাপ্রতিষ্ঠান ও গণমাধ্যম সংস্থাগুলো ঐতিহাসিক প্রসঙ্গ, রাজনৈতিক বিষয় কিংবা এমনকি সাধারণ রসিকতা এড়িয়ে চলতে শুরু করতে পারে। কারণ, এসবের সম্ভাব্য বাণিজ্যিক পরিণতি আগে থেকে অনুমান করা কঠিন। এ ধরনের আগাম আত্মনিয়ন্ত্রণের প্রবণতা পরিমাপ করাও কঠিন।

চীনা কর্তৃপক্ষ ও বাণিজ্যিক প্রতিষ্ঠানগুলো একতরফাভাবে সিদ্ধান্ত নিতে পারে, কোন বক্তব্য ‘চীনা জনগণের অনুভূতিতে আঘাত করে’। একই সঙ্গে কোনো বিতর্কের যথেষ্ট সমাধান হয়েছে কি না, ক্ষমা প্রার্থনা গ্রহণযোগ্য কি না এবং কখন স্বাভাবিক ব্যবসায়িক সম্পর্ক পুনরায় শুরু হবে, সেটিও নির্ধারণের ক্ষমতা তাদের রয়েছে। এসব পরিবর্তনশীল মানদণ্ডের ওপর বিদেশি ব্যক্তি ও প্রতিষ্ঠানগুলোর প্রভাব খুবই সীমিত। নিয়ম মেনে চললেও ভবিষ্যতে শাস্তির মুখে পড়তে হবে না, এমন কোনো নিশ্চয়তা নেই। মূল বিরোধের শেষ পর্যন্ত সমাধান হলেও এর মাধ্যমে তৈরি হওয়া নজির অন্যদের সিদ্ধান্তকে প্রভাবিত করতে পারে।

তাই আন্তর্জাতিক পর্যায়ে বক্তব্যের ওপর চীনের প্রভাব শুধু বাতিল হওয়া চুক্তি, স্থগিত সম্প্রচার কিংবা প্রকাশ্যে ক্ষমা প্রার্থনার সংখ্যা দিয়ে বোঝা সম্ভব নয়। এর আরও দীর্ঘস্থায়ী প্রভাব নিহিত রয়েছে এমন এক সক্ষমতার মধ্যে, যার মাধ্যমে চীন থেকে উদ্ভূত রাজনৈতিক বিধিনিষেধ এমন সব সমাজে কার্যরত প্রতিষ্ঠান ও ব্যক্তিদের আচরণকে প্রভাবিত করতে পারে, যেসব সমাজ আনুষ্ঠানিকভাবে এসব বিধিনিষেধ স্বীকার করে না।

রিয়াল মাদ্রিদ শেষ পর্যন্ত চীনে তাদের বাণিজ্যিক অবস্থান পুনরুদ্ধার করতে পারে। কিন্তু মতপ্রকাশের স্বাধীনতার ওপর এর যে প্রভাব পড়েছে, তা কাটিয়ে ওঠা অনেক বেশি কঠিন।

তথ্যসূত্র: দ্য ডিপ্লোম্যাট

source: Barta Bazar

Leave a Reply

Back to top button