Jannah Theme License is not validated, Go to the theme options page to validate the license, You need a single license for each domain name.
বিশ্ব

মানুষই কি পৃথিবীর প্রথম উন্নত সভ্যতা, নাকি আগে কেউ ছিল

জ্যোতির্বিজ্ঞানী অ্যাডাম ফ্রাঙ্ক যখন নাসার বিজ্ঞানী গ্যাভিন স্মিথের অফিসে যান, তখন তার মনে এমন একটি প্রশ্ন ছিল যা তিনি সবচেয়ে অদ্ভুত প্রশ্ন বলে বিশ্বাস করতেন। তিনি জিজ্ঞেস করেন, এলিয়েনরাও কি জলবায়ু পরিবর্তনের শিকার হয়? কিন্তু স্মিথ তাকে মুহূর্তের মধ্যেই বোঝালেন যে, তার ধারণার চেয়েও বরং আরো অদ্ভুত প্রশ্ন হতে পারে।

ইউনিভার্সিটি অব রোচেস্টারের অধ্যাপক অ্যাডাম ফ্রাঙ্ক অনুসন্ধান করছিলেন, মানুষের মতোই অন্য কোনো উন্নত সভ্যতাও জলবায়ু পরিবর্তনের ভূমিকা রেখেছে কিনা। তিনি বিভিন্ন গ্রহ নিয়ে গবেষণা করছিলেন। ২০১৭ সালের সেই দিনে স্মিথকে তিনি বলেছিলেন, ‘কারণ আমরা তো জানি যে পৃথিবীতে আমাদের আগে অন্য কোনো সভ্যতা ছিল না।’

কথাটি শোনামাত্রই স্মিথ তাকে থামিয়ে দিয়ে প্রশ্ন করলেন, ‘আপনি কীভাবে জানলেন?’

আমাদের পূর্বে কারা ছিল, তারা কি কোন প্রমাণ রেখে গেছে

ফ্রাঙ্ক বলেন, এটি ছিল একটি হঠাৎ ধাক্কা খাওয়ার মতো মুহূর্ত। আর সেখান থেকেই দুই বিজ্ঞানী মিলে একটি নতুন অনুসন্ধানের সূচনা করেন। লাখ লাখ বছর আগে যদি পৃথিবীতে কোনো উন্নত সভ্যতা বাস করে থাকে এবং তারা যদি নিজেদের শক্তিতে পরিচালিত হয়ে থাকে এবং পরবর্তীতে বিলুপ্ত হয়ে যায়, তবে কি আমরা তা জানতে পারতাম? তারা কি আমাদের গ্রহে এমন কোনো চিহ্ন রেখে যেতে পারে?

তারা এই ভাবনাটির নাম দেন ‘সিলুরিয়ান হাইপোথিসিস’— ‘ডক্টর হু’ টিভি শোর এক কাল্পনিক ও উন্নত সরীসৃপ জাতির নামানুসারে এটি রাখা হয়। ২০১৮ সালে এ নিয়ে তারা একটি গবেষণাপত্র প্রকাশ করেন।

এটি একটি অত্যন্ত কৌতূহলোদ্দীপক চিন্তা, যা কেবল পৃথিবীর সুদূর অতীতের দিকেই তাকায় না, বরং এর ভবিষ্যতের দিকেও নির্দেশ করে—যেহেতু মানুষ জীবাশ্ম জ্বালানি ব্যবহার করে দ্রুত ও মারাত্মকভাবে জলবায়ু পরিবর্তন করছে।

টেক্সাস টেক ইউনিভার্সিটির আবহাওয়া গবেষক ক্যাথরিন হেহো (যিনি এই গবেষণার সাথে যুক্ত ছিলেন না) বলেন, ‘এটি একটি চিন্তাশীল পরীক্ষা, তবে এটি বিশ্বব্যাপী আমাদের সম্ভাব্য আক্রান্ত হওয়াকে তুলে ধরে।’

ছবি: সংগৃহীত।
ছবি: সংগৃহীত।

সিলুরিয়ান হাইপোথিসিস উন্নত সভ্যতার গতিপথ এবং বিশ্বব্যাপী শক্তি ব্যবহারকারী প্রতিটি সভ্যতা কি ধ্বংস হয়ে যেতে বাধ্য, নাকি তাদের পক্ষে টেকসইভাবে বেঁচে থেকে লক্ষ লক্ষ বছর টিকে থাকা সম্ভব—তা নিয়ে কিছু বড় প্রশ্ন তোলে।

ফ্রাঙ্ক বলেন, ‘এই প্রশ্নগুলো আমাদের বর্তমান পরিস্থিতির সাথেই সম্পর্কিত। আমরা এই গ্রহের পরিবেশকে এক নতুন সংকটের দিকে ঠেলে দিচ্ছি… আমরা জানি এটা সত্যি, তাই না? অথচ আমরা এ বিষয়ে কিছুই করছি না।’

গ্যাভিন স্মিথ যে- অতীতের কোনো উন্নত সভ্যতার সম্ভাবনা নিয়ে ভাবছিলেন, তার পেছনে ছিল পৃথিবীর সুদূর অতীতের এক বিশেষ ঘটনা।

প্রায় ৫ কোটি ৫০ লক্ষ বছর আগে পৃথিবীর জলবায়ুর স্বাভাবিক অবস্থা বা ভারসাম্য নষ্ট হয়ে যায়। বায়ুমণ্ডল দ্রুতই উষ্ণ হয়ে উঠে, কার্বন নির্গত হওয়ার ফলে বিশ্বব্যাপী তাপমাত্রা ১৫ ডিগ্রি ফারেনহাইট পর্যন্ত বেড়ে যায় এবং পরিবেশের ভারসাম্য ভেঙে পড়ে।

‘প্যালিওসিন-ইওসিন থার্মাল ম্যাক্সিমাম’ নামে পরিচিত এই সময়কালটি প্রথম ১৯৯০-এর দশকে চিহ্নিত করা হয়। এটি কোনো বিশাল আগ্নেয়গিরির অগ্ন্যুৎপাত বা মিথেন গ্যাসের হঠাৎ নির্গমনের ফলে হতে পারে বলে ধারণা করা হয়। তবে ঠিক কী কারণে এমনটি ঘটেছিল তা এখনো রহস্যের আড়ালেই রয়ে গেছে। স্মিথকে যা সবচেয়ে বেশি আকর্ষণ করেছিল তা হলো—বর্তমান সময়ের সাথে এর মিল, যেখানে মানুষ তাপমাত্রা বাড়াচ্ছে এবং প্রজাতি বিলুপ্তির দিকে ঠেলে দিচ্ছে।

আর পৃথিবীর অতীতের এই একটি ঘটনা একা নয়; রহস্যময় আরও অনেক পরিবর্তন রয়েছে যা আমাদের বর্তমান সময়ের সাথে মেলে। অন্য সময়গুলোতেও মহাসাগরগুলোতে অক্সিজেনের অভাব দেখা গিয়েছিল এবং তাপমাত্রা হঠাৎ বৃদ্ধি পেয়েছিল।

সম্ভাবনা এটাই যে এগুলো হয়তো প্রাকৃতিক জলবায়ুগত ঘটনা, কিন্তু এগুলো যদি প্রাকৃতিক না হয়ে থাকে তবে তা আমরা কীভাবে তা জানতাম? ফ্রাঙ্ক এবং স্মিথ তাদের প্রতিবেদনে অতীতে একটি উন্নত সভ্যতা থাকার পক্ষে সম্ভাব্য কিছু প্রমাণ তুলে ধরেছেন।

অতীতে একটা উন্নত সভ্যতার ছিল?—তার প্রমাণ কী

সিএনএনের প্রতিবেদ অনুযায়ী, বর্তমান পৃথিবীর মাত্র ১ শতাংশ এলাকায় নগরায়ন হয়েছে। আমরা যা নির্মাণ করেছি তা নিশ্চিহ্ন হতে বেশি সময় লাগবে না। একটি কাল্পনিক সভ্যতা যত পেছনে অবস্থান করে, সেখান থেকে প্রমাণ খুঁজে পাওয়া ততটাই কঠিন । লাখ লাখ বছর ধরে টেকটোনিক প্লেটের পরিবর্তন, আগ্নেয়গিরির অগ্ন্যুৎপাত এবং ভূমিক্ষয়ের ফলে পৃথিবী নতুন রূপ নেয়। পৃথিবীর সবচেয়ে প্রাচীনতম ভূখণ্ড হলো দক্ষিণ ইসরাইলের নেগেভ মরুভূমি, যা প্রায় ১৮ লাখ বছর পুরোনো।

মাটির উপরিভাগের গঠন হয়তো তেমন কোনো প্রমাণ দিতে পারবে না, তাই বিজ্ঞানীরা জীবাশ্মের দিকে নজর দেন। কিন্তু যেকোনো প্রাণীর জীবাশ্ম হওয়ার হার অত্যন্ত কম, আর তার মধ্যে থেকে উদ্ধার হওয়া জীবাশ্মের সংখ্যা আরো কম। প্রায় ১৮ কোটি বছর ধরে ডাইনোসররা পৃথিবীতে ছিল, অথচ তার মাত্র কয়েক হাজার অর্ধ-সম্পূর্ণ বা সম্পূর্ণ জীবাশ্ম খুঁজে পাওয়া গেছে।

অতএব, যে সভ্যতা হয়তো মাত্র ১ লাখ বছর টিকে ছিল—যা এই গ্রহের ৪০ কোটি বছরের জটিল জীবনের ইতিহাসে খুবই সামান্য সময়—তাকে সহজেই মিস করে যাওয়া অসম্ভব কিছু নয়।

গ্র্যান্ড ক্যানিয়ন ন্যাশনাল পার্ক মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের একটি জাতীয় উদ্যান যা উত্তর-পশ্চিম অ্যারিজোনায় অবস্থিত। ছবি: সংগৃহীত।
গ্র্যান্ড ক্যানিয়ন ন্যাশনাল পার্ক মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের একটি জাতীয় উদ্যান যা উত্তর-পশ্চিম অ্যারিজোনায় অবস্থিত। ছবি: সংগৃহীত।

গবেষকরা এরপর রাসায়নিক পরিবর্তনের মাধ্যমে রেখে যাওয়া প্রমাণের কথা বিবেচনা করেন। ফ্রাঙ্ক গ্র্যান্ড ক্যানিয়নের উদাহরণ দিয়ে বলেন, যেখানে বিভিন্ন লাইনের মাধ্যমে পৃথিবীর ভিন্ন ভিন্ন যুগকে দেখা যায়। ‘সেই প্রতিটি স্তর হলো গুঁড়ো হয়ে যাওয়া পাথর, যা তখনকার সময়ে পৃথিবীর রাসায়নিক গঠন কেমন ছিল তার স্মৃতি ধরে রাখে।’ মানুষ যেমন বিপুল পরিমাণ কার্বন দূষণ ঘটিয়ে গ্রহের রসায়নে পরিবর্তন এনেছে, ঠিক তেমনি অতীতের কোনো সভ্যতাও যদি পরিবর্তন এনে থাকে, তবে তার একটি রেকর্ড থাকার সম্ভাবনছে। পারে।

তাহলে আমাদের পৃথিবী ধ্বংস হলে আমরা কী চিহ্ন রেখে যাব

বিজ্ঞানীরা আরও ভেবেছেন যে, আমাদের সভ্যতা শেষ হওয়ার পর মানুষ কী ধরণের চিহ্ন রেখে যেতে পারে। যেমন—বিপুল পরিমাণ প্লাস্টিক, কৃষিকাজে ব্যবহৃত কৃত্রিম হরমোন এবং বিষাক্ত রাসায়নিক পদার্থ যা পরিবেশে সহজে নষ্ট হয় না। কোটি কোটি বছর পর ভবিষ্যতের পলিমাটিতে বা পাথরে এগুলো প্রমাণের মতো রয়ে যেতে পারে। ইলেকট্রনিক্সে ব্যবহৃত ভারী ধাতুগুলোর ক্ষেত্রেও একই কথা প্রযোজ্য।

ফ্রাঙ্ক জানান, গবেষণাপত্রের মূল উদ্দেশ্য সিলুরিয়ান হাইপোথিসিস সঠিক কি না তা প্রমাণ করা ছিল না। বরং এর উদ্দেশ্য ছিল, ‘আমাদের আগে অন্য কোনো সভ্যতা ছিল কি না তা জানতে অত্যন্ত সূক্ষ্মভাবে আমাদের কী কী জিনিস খোঁজা উচিত—তা তুলে ধরা।

ফ্রাঙ্ক এবং স্মিথ উভয়েই এমন একটি তত্ত্ব নিয়ে কাজ করেছেন যা তারা নিজেরাও পুরোপুরি বিশ্বাস করেন না—তারা কেবল বলছেন যে, আমরা এখনই একে একেবারে উড়িয়ে দিতে পারি না।

পরবর্তীতে অনেকে এই বিষয়ে গভীর অনুসন্ধানের আহ্বানে সাড়া দেয়নি, তবে কিছু বিজ্ঞানী প্রশ্ন তুলেছেন।

যুক্তরাজ্যের লেস্টার বিশ্ববিদ্যালয়ের ভূতত্ত্ববিদ, জীবাশ্মবিদ এবং ইমেরিটাস অধ্যাপক জান জালাসিউইচ বলেন, সিলুরিয়ান হাইপোথিসিস একটি ‘চমৎকার এবং গভীর চিন্তাজাগানিয়া ধারণা।’ তবে তার মতে, স্মিথ এবং ফ্রাঙ্ক আধুনিক মানুষ যেভাবে গ্রহকে পরিবর্তন করেছে, এবং জীবাশ্ম হওয়ার প্রক্রিয়া ও গ্রহের ইতিহাস সংরক্ষণে এটি কতটা কার্যকর—সে বিষয়টিকে কিছুটা কম মূল্যায়ন করেছেন।

আমরা বুদ্ধিমান প্রাক-মানব সমাজকে পুরোপুরি অস্বীকার করতে পারি না, ‘যেমন এমন ডাইনোসর যারা জটিল সুর গাইতে পারত, কিংবা জুরাসিক যুগের অ্যামোনাইট যারা কবিতা লিখতে পারত,” বলেন জালাসিউইচ। তিনি ২০২৫ সালের ‘ডিসকার্ডেড: হাউ টেকনোফসিলস উইল বি আওয়ার আল্টিমেট লিগ্যাসি’— বইটির সহ-লেখক। কিন্তু যেইমাত্র শহর তৈরি হবে, ধাতু গলানো হবে, প্লাস্টিক তৈরি ও বর্জন করা হবে—এগুলো একটি স্পষ্ট পদচিহ্ন রেখে যাবে, তিনি বলেন।

জালাসিউইচ সাবলীলভাবে আজকের মতো শক্তি-অপচয়কারী, প্রাকৃতিক উপাদান পরিবর্তনকারী, বিপুল পরিমাণে বর্জ্য উৎপাদনকারী উন্নত সভ্যতার পূর্ব অস্তিত্বকে নাকচ করে দেন।

তবে কী মানবজাতি পরীক্ষায় ব্যর্থ

ফ্রাঙ্ক বলেন, এটাই বিজ্ঞানের সৌন্দর্য। ‘আপনি একটি গবেষণা প্রকাশ করেন এবং বলেন ‘বাহ, এটা দারুণ!’, আর তারপর অন্য কেউ এসে বলবে ‘আপনি ভুল।’ আবার অন্য কেউ হয়তো ভিন্ন কিছু নির্দেশক কিছু খুঁজে পাবে, এবং শেষ পর্যন্ত অনেক গবেষণার শেষে সব একত্র করলে একটি সর্বসম্মত সিদ্ধান্ত আসবে।’

আপাতত, এই তত্ত্বটি অন্বেষণ করার সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ কারণ হলো—এটি আমাদের মতো প্রযুক্তিগতভাবে উন্নত সভ্যতার স্থায়িত্ব নিয়ে গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্ন তোলে।

ফ্র্যাঙ্ক বলেন, ‘আমরা প্রযুক্তি উদ্ভাবন করার মতো যথেষ্ট বুদ্ধিমান, কিন্তু জলবায়ু পরিবর্তনকারী পরিণতিগুলো কীভাবে মোকাবেলা করার মতো আমরা হয়তো যথেষ্ট বুদ্ধিমান নই।

সবশেষে ফ্যাঙ্ক সংশয় প্রকাশ করে বলেন, তবে আমরা কি এই গ্রহের চালানো একটি পরীক্ষা, যা ব্যর্থ হতে চলেছে?

এমএমআর

source: Daily Amar Desh

Leave a Reply

Back to top button