সৌদিতে হামলা-ফ্লাইট বাতিল/চাকরি বাঁচাতে বিকল্প পথে সৌদি যাচ্ছেন বাংলাদেশিরা

সৌদি আরবের রাজধানী রিয়াদের কিং খালিদ বিমানবন্দরে ক্ষেপণাস্ত্র হামলার ঘটনা ঘটেছে। এতে দুই বাংলাদেশিসহ নিহতসহ অন্তত ২৭ জন আহত হয়েছেন। সৌদির রিয়াদ ও দাম্মাম বিমানবন্দরে ফ্লাইট বন্ধ রয়েছে। এর মাঝেও চাকরি বাঁচানো ও পরিবারের কথা চিন্তা করে সৌদিতে যাচ্ছেন প্রবাসী বাংলাদেশিরা।
রাজধানীর হজরত শাহজালাল আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরে সোমবার (১২ অক্টোবর) বিকেল থেকে রাত পর্যন্ত সৌদি আরবে যাওয়ার উদ্দেশ্যে বিমানবন্দরে আসা প্রবাসী রেমিট্যান্সযোদ্ধাদের কপালে চিন্তার ভাঁজ।
চাঁদপুরের ফরিদগঞ্জ থানাধীন শাহপুর এলাকার বাসিন্দা মোহাম্মদ জয়নাল সৌদিতে যাওয়ার উদ্দেশ্যে বিমানবন্দরে এসেছিলেন। পাঁচবছর ধরে তিনি সৌদিতে কাজ করেন।
জয়নাল এশিয়া পোস্টকে বলেন, ‘দুপুর ২টার দিকে বিমানবন্দরে এসেছিলাম। রাত ৯টার দিকে এয়ারপোর্টের ভেতরে ঢুকব। এরপর বলতে পারব যেতে পারব কিনা। এয়ারলাইন্স থেকে আমাদের কিছুই জানায়নি।’
তিনি বলেন, ‘আমার ইমার্জেন্সি যেতে হবে। কারণ আমার কফিল সমস্যা করছে। সময়মতো না গেলে আমার ভিসা বাতিল করে দেবে। তাই চাকরি বাঁচানোর জন্য হলেও যেতে হবে। এছাড়াও দেশে আমার ফ্যামিলি আছে। তাদের জন্য হলেও যেতে হবে।’
জয়নাল বলেন, ‘এজেন্সির লোকেরা প্রথমে আমাকে দুবাই নিয়ে যাবে। সেখান থেকে বাহরাইন নিয়ে যাবে। তারপর সেখান থেকে দাম্মাম নিয়ে যাবে। বাকিটা বলতে পারব না।’
দুশ্চিন্তার কথা উল্লেখ করে জয়নাল বলেন, ‘এখন যেতে পারব কি না, সেখানে যাওয়ার পর কি হবে, কিছুই বলতে পারছি না। আমাদের আরও দুই তিন ছিল, ওনারা চলে গেছেন।’
কুমিল্লার মুরাদনগরের বারেকনগর গ্রামের বাসিন্দা মো. ইমরান হোসেন। তিনি বিমানবন্দরে এশিয়া পোস্টকে বলেন, ‘আমি সৌদিতে যাচ্ছি। কিন্তু সেখানে কি হবে না হবে সেটা বুঝতে পারছি না। আমার ভিসার সমস্যা হচ্ছে, চাকরির সমস্যা হচ্ছে। সমস্যার মধ্যে দিয়েই এখন যেতে হবে।’
ইমরান বলেন, ‘সৌদি আরবের অনেক ফ্লাইট বাতিল হয়ে যাচ্ছে। তারপরও এয়ারলাইন্স বলেছে ফ্লাইট হবে। তাদের কথায় বিমানবন্দরে এসেছি। বিমানবন্দরের ভেতরে ঢুকার পর বুঝতে পারব, আমার ফ্লাইট হবে কি না।’
তিনি বলেন, ‘সৌদি আরবে ডাইরেক্টর ফ্লাইট পাচ্ছি না। তাই আমাকে দুবাই দিয়ে যেতে হবে। সেখান থেকে রিয়াদ। সৌদির দাম্মাম এয়ারপোর্ট ঠিক না হওয়া পর্যন্ত দুবাই অপেক্ষা করতে হবে। তারপর দাম্মাম যেতে হবে। সেখান থেকে বাসে অথবা ট্যাক্সিতে করে রিয়াদে যেতে হবে। এতে আমার দুই দিন অতিরিক্ত জার্নি করতে হবে। আবার টাকাও খরচ হবে বেশি।’
ভয়-ভীতির কথা উল্লেখ করে ইমরান বলেন, ‘যেভাবেই হোক আমাকে সৌদি যেতেই হবে। কারণ আমার চাকরি আছে, পরিবার আছে।’
বরিশালের বাকেরগঞ্জের বাসিন্দা মো. তানভীর হাওলাদার। সৌদির রাজধানী রিয়াদের একটি কোম্পানিতে চাকরি করেন। তিন মাসের ছুটিতে দেশে এসেছিলেন। ছুটি শেষে রিয়াদে যাওয়ার জন্য তিনিও বিমানবন্দরে এসেছেন।
তানভীর হাওলাদার এশিয়া পোস্টকে বলেন, ‘আমাদের সৌদির টিকিট অনেক আগে থেকেই কাটা। আমি শুনেছি, রিয়াদে অনেক হামলা চলছে। অনেকে মারা গেছে। এই কারণে আমি কোম্পানির সাথে যোগাযোগ করেছি। কোম্পানি আমাকে আশ্বাস দিয়ে বলছে- তোমার কোনো সমস্যা নাই, যদি সমস্যা হয় তাহলে ই-মেইল করা হবে। কিন্তু কোনো মেইল পাইনি। তাই মনে করছি ফ্লাইট হবে। সেই কারণে সৌদি যাওয়ার জন্য বিমানবন্দরে এসেছি। যদি ফ্লাইট হয়, তাহলে আমি সৌদি যাব। নাহলে আবার বাড়ি চলে যেতে হবে।’
তিনি বলেন, ‘আমার দায়িত্ব আমার কোম্পানির। আমি যাওয়ার পর কি করবে, না করবে সেটা কোম্পানিই বুঝবে। সৌদি যাওয়ার জন্য বিমানবন্দরে আসার বিষয়টি কোম্পানিকে জানিয়েছি। আমি সৌদি যাওয়ার পর কোম্পানির লোকজন আমাকে রিসিভ করবে। এরপরও কোনো সমস্যা হলে আলাদা বিষয়।’
এদিকে ফ্লাইট বন্ধের বিষয়ে শাহজালাল বিমানবন্দরের আকাশসীমা ব্যবস্থাপনা ও ফ্লাইট পরিচালনা (এএসএম ফ্লাইট ম্যানেজমেন্ট) বিভাগের স্কোয়াড্রন লিডার মো. সাকিব সোমবার রাতে জানান, রিয়াদের বিমানবন্দরে হামলার ঘটনায় ৬১টি ফ্লাইটের ৮ হাজার ৩৮১ জন সৌদির বিমানযাত্রী ভোগান্তিতে পড়েছেন।
তিনি বলেন, এসব ফ্লাইটের মধ্যে ২২টি সরাসরি ফ্লাইট ও ৩৯টি ট্রানজিট ফ্লাইট ছিল। সরাসরি ফ্লাইটগুলোর মধ্যে বিমান বাংলাদেশ এয়ারলাইন্সের তিনটি, ইউএস বাংলা এয়ারলাইন্সের দুটি, সৌদিয়া এয়ারলাইন্সের চারটি ও রিয়াদ এয়ারওয়েজের সাতটি ফ্লাইট ছিল।
অন্যদিকে ট্রানজিট ফ্লাইটের মধ্যে ইন্ডিগো এয়ারলাইন্সের ১৬টি ফ্লাইট, সালাম এয়ারের তিনটি ফ্লাইট, ইজিপ্ট এয়ারের একটি, কাতার এয়ারওয়েজের পাঁচটি ও ফ্লাই দুবাইয়ের পাঁচটি ফ্লাইট বাতিল হয়েছে বলেও তিনি জানান।
অপরদিকে বিমান বাংলাদেশ এয়ারলাইন্স কর্তৃপক্ষ জানিয়েছে, রিয়াদ বিমানবন্দরের কার্যক্রম স্থগিত থাকায় আগামী শনিবার (১৭ অক্টোবর) পর্যন্ত ঢাকা-রিয়াদগামী সকল ফ্লাইট স্থগিত করা হয়েছে। এছাড়াও নিরাপত্তাজনিত কারণে মঙ্গলবার (১৩ অক্টোবর) বিকেল ৩টা ১০ মিনিটের বিমান বাংলাদেশ এয়ারলাইন্সের বিজি-৩৪৯ ফ্লাইট স্থগিত করা হয়েছে।
উল্লেখ্য, গত শনিবার (১০ অক্টোবর) রাতে রিয়াদের কিং খালিদ আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরে ক্ষেপণাস্ত্র হামলার ঘটনা ঘটে। এতে বগুড়ার শাজাহানপুরের মো. শাহেদ আহমেদ ও কুমিল্লার নাঙ্গলকোটের নাসরুল্লাহ বদরপুরী নামের দুইজন বাংলাদেশি নিহত হয়েছেন। আরও ২৭ বাংলাদেশি আহত হয়েছেন। তাদের মধ্যে চারজনের অবস্থা আশঙ্কাজনক। অন্যদিকে বাংলাদেশিসহ অন্তত ৩০৯ জন আহত হয়েছেন।
source: Asia Post