২০২৬ সালে ভারত-যুক্তরাষ্ট্র-জাপান-অস্ট্রেলিয়ার জোট কোয়াডে নতুন গতি

সপ্তাহান্তে আটলান্টায় অনুষ্ঠিত জি-২০ পররাষ্ট্রমন্ত্রীদের বৈঠকের ফাঁকে কোয়াডভুক্ত দেশগুলোর পররাষ্ট্রমন্ত্রীরা বৈঠকে বসেন। চলতি বছরে এটি ছিল কোয়াডের পররাষ্ট্রমন্ত্রীদের তৃতীয় বৈঠক। এর আগে মে মাসে নয়াদিল্লি এবং জুলাইয়ে ম্যানিলায় তাঁদের বৈঠক অনুষ্ঠিত হয়। তবে কোয়াডের কার্যক্রম নিয়ে অধিকাংশ আলোচনা ও বিশ্লেষণে এখনো দীর্ঘদিন ধরে প্রতীক্ষিত কোয়াড নেতাদের শীর্ষ সম্মেলনকে গুরুত্ব দেওয়া হচ্ছে। চলতি মাসের শেষের দিকে ম্যানিলায় এ সম্মেলন অনুষ্ঠিত হওয়ার কথা রয়েছে।
২০২৫ সালে নয়াদিল্লিতে কোয়াড নেতাদের শীর্ষ সম্মেলন আয়োজনের কথা থাকলেও তা শেষ পর্যন্ত অনুষ্ঠিত না হওয়ায় সম্মেলনটি নিয়ে ব্যাপক আলোচনা শুরু হয়। যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প হোয়াইট হাউসে ফিরে আসার পর এটিই হবে কোয়াড নেতাদের প্রথম বৈঠক। এ কারণে সম্মেলনটি নিয়ে স্বাভাবিকভাবেই ব্যাপক আগ্রহ রয়েছে।
এ ছাড়া ক্রমবর্ধমান ভূরাজনৈতিক সংঘাত, জ্বালানি ও প্রযুক্তি সরবরাহে সীমাবদ্ধতা এবং ‘প্রভাববলয়’ পরিচালনায় চীন, রাশিয়া ও যুক্তরাষ্ট্রকে নিয়ে নতুন জি-৩ মডেল গড়ে ওঠার জল্পনার মধ্যে কোয়াডের ভবিষ্যৎ নিয়ে বাড়তে থাকা নানা প্রশ্নের অবসান ঘটাতে পারে এই সম্মেলন।
তবে নেতাদের শীর্ষ সম্মেলন না হলেও ২০২৬ সাল কোয়াডের জন্য গুরুত্বপূর্ণ ছিল। এ বছর পররাষ্ট্রমন্ত্রী পর্যায়ে তিনটি বৈঠকের মাধ্যমে যৌথ অগ্রাধিকার চূড়ান্ত হয়েছে, ঘোষিত উদ্যোগ বাস্তবায়নের পথে এগিয়েছে এবং পারস্পরিক সম্পৃক্ততার ক্ষেত্র বিস্তৃত হয়েছে।
প্রথমত, ৩১ অক্টোবর আটলান্টায় কোয়াডের বৈঠক নিয়ে প্রকাশিত অধিকাংশ সংবাদ শিরোনামে গুরুত্ব পেয়েছে দুটি বিষয়। এর একটি হলো, ইন্দো-প্যাসিফিক অঞ্চলে নির্ভরযোগ্য কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা বা এআই ব্যবহারের সুযোগ বাড়াতে ৮ কোটি ৫০ লাখ ডলারের বেশি কারিগরি ও আর্থিক সহায়তা দেওয়ার বিষয়ে জোটটির ‘অভিপ্রায়’। অন্যটি হলো, বর্জ্য থেকে গুরুত্বপূর্ণ খনিজ পুনরুদ্ধারের জন্য ভারত ও আসিয়ানের অবকাঠামো ও স্থাপনা উন্নয়নে ১ কোটি ডলার দেওয়ার যুক্তরাষ্ট্রের অঙ্গীকার।
সক্ষমতা বৃদ্ধিতে যৌথ উদ্যোগের ক্ষেত্রে এগুলো উল্লেখযোগ্য অগ্রগতি। বিশেষ করে ‘অর্থনৈতিক জবরদস্তি’ নিয়ে কোয়াডভুক্ত দেশগুলোর দৃষ্টিভঙ্গি ক্রমেই এক জায়গায় আসছে। আটলান্টার বৈঠক শেষে প্রকাশিত যৌথ বিবৃতিতে দেশগুলো ‘যেকোনো ধরনের স্বেচ্ছাচারী রপ্তানি নিষেধাজ্ঞা এবং বাজারবহির্ভূত নীতি ও চর্চা নিয়ে উদ্বেগ’ প্রকাশ করেছে। এসব নীতি ও চর্চার ফলে অতিরিক্ত উৎপাদন সক্ষমতা তৈরি হয়, যা গুরুত্বপূর্ণ শিল্প খাতে বৈশ্বিক সরবরাহব্যবস্থাকে বিঘ্নিত করে।
যৌথ অগ্রাধিকার ও উদ্বেগের বিষয়ে এই স্পষ্ট অবস্থানের পাশাপাশি গুরুত্বপূর্ণ খনিজ নিয়ে সর্বশেষ ঘোষণাটি কোয়াডের ২০২৬ সালের মে মাসে নয়াদিল্লির বৈঠকে ঘোষিত ‘কোয়াড ক্রিটিক্যাল মিনারেলস ফ্রেমওয়ার্ক’-এর ধারাবাহিকতায় এসেছে, সেটিও উল্লেখ করা প্রয়োজন।
বর্জ্য ব্যবস্থাপনার সময় সেখান থেকে গুরুত্বপূর্ণ খনিজ পুনরুদ্ধারে সহায়তার মাধ্যমে এই খাতে অর্থনৈতিক উপকরণ ও সহযোগিতা কাজে লাগানোর কাঠামোটির মূল লক্ষ্য বাস্তবায়নে গুরুত্বপূর্ণ পদক্ষেপ নিয়েছে কোয়াড।
ভারতের জন্য এ ধরনের যৌথ উদ্যোগ অভ্যন্তরীণভাবে গুরুত্বপূর্ণ খনিজের উৎপাদন ও পরিশোধন সক্ষমতা বাড়ানোর প্রচেষ্টার সঙ্গেও সামঞ্জস্যপূর্ণ। এ লক্ষ্য অর্জনে নয়াদিল্লি সমমনা দেশগুলোর সঙ্গে প্রযুক্তিগত অংশীদারত্ব, প্রণোদনা প্রকল্প এবং নীতিনির্দেশনা আরও কার্যকর করার ওপর জোর দিচ্ছে।
এ ছাড়া ২০২৬ সালে ইন্দো-প্যাসিফিক অঞ্চলে কোয়াডের অবস্থান নিয়েও আরও স্পষ্ট ধারণা পাওয়া গেছে। ‘অর্থনৈতিক জবরদস্তি’র বিরুদ্ধে স্পষ্ট অবস্থানের মতোই কোয়াডভুক্ত দেশগুলোর নিজেদের ‘আসিয়ানের ব্যাপক কৌশলগত অংশীদার’ হিসেবে পরিচয় দেওয়াও গুরুত্বপূর্ণ অগ্রগতি।
২০২৬ সালের জুলাইয়ে ম্যানিলায় অনুষ্ঠিত বৈঠকে কোয়াডভুক্ত দেশগুলো ‘ইন্দো-প্যাসিফিকবিষয়ক আসিয়ান আউটলুক’ (এওআইপি) বাস্তবায়নে বাস্তবভিত্তিক উদ্যোগের প্রতি সমর্থন ঘোষণা করে। এ ক্ষেত্রে অভিন্ন অগ্রাধিকারের মধ্যে রয়েছে সামুদ্রিক ও আন্তঃদেশীয় নিরাপত্তা, অর্থনৈতিক সমৃদ্ধি ও নিরাপত্তা, গুরুত্বপূর্ণ ও উদীয়মান প্রযুক্তি এবং মানবিক সহায়তা ও জরুরি পরিস্থিতিতে সাড়া দেওয়া।
বিশ্লেষকেরা দ্রুতই উল্লেখ করেন, বছরের পর বছর ধরে কোয়াডের বিভিন্ন বিবৃতিতে ‘আসিয়ানের কেন্দ্রীয় ভূমিকা’র বিষয়টি উঠে এসেছে। তবে এওআইপির প্রতি সরাসরি সমর্থন ঘোষণার ফলে কোয়াডের কর্মসূচি কীভাবে আসিয়ান নেতৃত্বাধীন প্রতিষ্ঠান ও আঞ্চলিক কর্মসূচির সঙ্গে সাংঘর্ষিক হবে কিংবা সেগুলোর পুনরাবৃত্তি ঘটাবে, তা নিয়ে দীর্ঘদিনের অস্পষ্টতা দূর হয়েছে।
এই অস্পষ্টতা দূর করাই যে একটি উদ্দেশ্য ছিল, তা স্পষ্ট। জাপানের পররাষ্ট্রমন্ত্রী মোতেগি তোশিমিৎসু উল্লেখ করেন, আসিয়ান-সংশ্লিষ্ট পররাষ্ট্রমন্ত্রীদের বৈঠকের ফাঁকে ম্যানিলায় অনুষ্ঠিত কোয়াডের বৈঠক ‘আসিয়ানের কেন্দ্রীয় ভূমিকা ও ঐক্যের প্রতি কোয়াডের সমর্থনের একটি জোরালো বার্তা’ দিয়েছে।
নীতিগত সমন্বয়ের পাশাপাশি গত সপ্তাহে আটলান্টায় কোয়াডের বৈঠকে প্রথমবারের মতো ‘কোয়াড বিজনেস লিডার্স ফোরাম’ আয়োজনের ঘোষণাও দেওয়া হয়েছে। এতে কোয়াডভুক্ত দেশগুলোর শিল্প খাতের নেতা, সরকারি কর্মকর্তা এবং নীতিবিশেষজ্ঞরা অংশ নেবেন।
কোয়াডের লক্ষ্য বাস্তবায়নে সহায়তা এবং ভারত, যুক্তরাষ্ট্র, জাপান ও অস্ট্রেলিয়ার বেসরকারি খাতের মধ্যে পারস্পরিক অভিজ্ঞতা ও ধারণার বিনিময় উৎসাহিত করতে দীর্ঘদিন ধরে একটি নির্দিষ্ট বেসরকারি খাতভিত্তিক যোগাযোগমাধ্যমের অভাব ছিল। নতুন এই ফোরাম সেই ঘাটতি পূরণ করবে।
এদিকে সরকারি অর্থায়ন কাজে লাগিয়ে সহযোগিতার সুযোগ চিহ্নিত করতে কোয়াডভুক্ত দেশগুলোর রপ্তানি ঋণ সংস্থাগুলো আগামী ১৮ নভেম্বর টোকিওতে বৈঠকে বসবে।
আটলান্টার বৈঠকের আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ ফলাফল ছিল ‘ইন্দো-প্যাসিফিক জ্বালানি নিরাপত্তাবিষয়ক কোয়াড উদ্যোগ’। ২০২৬ সালের মে মাসে কোয়াডের বৈঠকে এ উদ্যোগের ঘোষণা দেওয়া হয়েছিল। গত সপ্তাহের বৈঠক শেষে প্রকাশিত যৌথ বিবৃতি অনুযায়ী, ইন্দো-প্যাসিফিক অঞ্চলে জ্বালানি নিরাপত্তা জোরদারের লক্ষ্যে ২০২৬ সালের সেপ্টেম্বরে প্রথমবারের মতো ‘কোয়াড ফুয়েল সিকিউরিটি ফোরাম’ আয়োজন করা হয়। কৌশলগত পেট্রোলিয়াম মজুত ও জ্বালানির মজুত সক্ষমতা শক্তিশালী করার মাধ্যমে এ নিরাপত্তা এগিয়ে নেওয়াই ছিল ফোরামের উদ্দেশ্য।
হরমুজ সংকটের প্রভাব দীর্ঘস্থায়ী হওয়ায় কোয়াডের সহযোগিতার ক্ষেত্রে এটি একটি গুরুত্বপূর্ণ ক্ষেত্র। উদাহরণস্বরূপ, ইরান সংঘাতের আগের পর্যায়ের সঙ্গে সামঞ্জস্য রেখে ২০২৬ সালের অক্টোবরে এশিয়ার অপরিশোধিত তেল আমদানি পুনরুদ্ধার হলেও জ্বালানি বাজারে প্রকৃত চাপ এখন পরিশোধিত জ্বালানি পণ্য এবং ডিজেলের মতো পরবর্তী ধাপের উপজাতের ওপর পড়ছে। এর কারণ, মধ্যপ্রাচ্য ও রাশিয়ায় পরিশোধন কার্যক্রম সীমাবদ্ধ হয়ে পড়েছে।
সবশেষে, আটলান্টায় কোয়াডের বৈঠক শেষে প্রকাশিত যৌথ বিবৃতিতে ২০২৬ সালের মে মাসে নয়াদিল্লির বৈঠকে আলোচিত কয়েকটি প্রাথমিক পর্যায়ের উদ্যোগের অগ্রগতির তথ্যও তুলে ধরা হয়েছে। এর মধ্যে রয়েছে ২০২৬ সালের সেপ্টেম্বরে অনুষ্ঠিত দ্বিতীয় ‘কোয়াড-অ্যাট-সি’ জাহাজ পর্যবেক্ষণ মিশন এবং একই মাসে জাপানের প্রতিরক্ষা মন্ত্রণালয়ের আয়োজনে অনুষ্ঠিত দ্বিতীয় ‘ইন্দো-প্যাসিফিক লজিস্টিকস নেটওয়ার্ক’ (আইপিএলএন) টেবিলটপ এক্সারসাইজ (টিটিএক্স)।
সুতরাং, কোয়াডের প্রাসঙ্গিকতা নিয়ে অনেকে প্রশ্ন তুলতে থাকলেও ২০২৬ সালে এই জোটের কর্মকাণ্ডের ধারাবাহিকতা ইন্দো-প্যাসিফিক অঞ্চলে এর কার্যকারিতা ও অবস্থান সম্পর্কে আরও স্পষ্ট ধারণা দিয়েছে।
নয়াদিল্লি, ম্যানিলা ও আটলান্টায় পৃথক তিনটি বৈঠকের মধ্য দিয়ে কোয়াডের পররাষ্ট্রমন্ত্রীরা যৌথ অগ্রাধিকারগুলো আরও সুনির্দিষ্ট করেছেন, ঘোষিত উদ্যোগগুলো বাস্তবায়নের পথে এগিয়ে নিয়েছেন এবং জোটটির কার্যক্রমের পরিধি বিস্তৃত করেছেন।
বহুল প্রতীক্ষিত কোয়াড নেতাদের শীর্ষ সম্মেলনের আগে ২০২৬ সালে জোটটি নিজের কার্যক্রমে ছন্দ খুঁজে পেয়েছে। সামনে এর প্রধান কাজ হলো, এই ছন্দকে আরও বড় পরিসরে ছড়িয়ে দেওয়া।
তথ্যসূত্র: দ্য ডিপ্লোম্যাট
source: Barta Bazar