News

দ্বৈত নাগরিক আইন বাতিলের দাবি ফাহামের, বললেন— আরেক দেশের পাসপোর্ট থাকলেই কম বাংলাদেশি হয়ে যায় না

ড. ফাহাম আব্দুস সালাম© সংগৃহীত

রাষ্ট্রপতি মির্জা ফখরুল ইসলামের মেয়ের জামাই, লেখক ও রাজনীতি বিশ্লেষক ড. ফাহাম আব্দুস সালাম বাংলাদেশের দ্বৈত নাগরিক আইন বাতিল করার অনুরোধ জানিয়েছেন। 

তিনি বলেছেন, দ্বৈত নাগরিকত্ব কোনো ডিস্ক্রিমিনেশনের কারণ হতে পারে না। আরেক দেশের পাসপোর্ট থাকলে কেউ কম বাংলাদেশি হয়ে যায় না। বরং প্রবাসীদেরকেই বাংলাদেশ নিয়ে বেশি চিন্তাভাবনা করতে দেখি। তাদেরকে আটকে দেওয়ার ক্ষমতা আইনের থাকা উচিত না।

দেশের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের প্রতিমন্ত্রী হুমায়ুন কবিরের দ্বৈত নাগরিকত্ব নিয়ে আলোচনা ও সমালোচনার মাঝেই গতকাল বুধবার (২৬ আগস্ট) সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম ফেসবুকে নিজ অ্যাকাউন্টে দেওয়া এক পোস্টে তিনি এসব মন্তব্য করেন। 

দ্য ঢাকা ডায়েরির পাঠকদের জন্য ড. ফাহাম আব্দুস সালামের ফেসবুক পোস্টটি তুলে ধরা হলো (অপরিবর্তিত): 

“বাংলাদেশের সবচেয়ে ক্ষতি করেছে – এমন ১০০টা মানুষের লিস্ট করলে প্রথম ৯০টা নাম একজনেরই হবে বলে আমার বিশ্বাস। ৯১তম নামটা এরশাদ হতে পারে। এদের দুইজনের কেবল একটাই নাগরিকত্ব ছিল। যারা মনে করেন যে একটা পাসপোর্ট কোনো মানুষের অনার ও লয়াল্টি ঠিক করার ক্ষেত্রে বিন্দুমাত্র প্রভাব রাখতে পারে – তাদের কোনো ধারণা নাই যে পৃথিবী কীভাবে চলে, মানুষ কীভাবে চলে। 

আপনি যদি রিয়াল ওয়ার্ল্ডে বিচরণ করেন – দেখবেন যে এই দেশে উপর এলাকায় আর কিছুই নাই – শুধু conflicting আর converging interest. এই conflicting আর converging interest প্রায় কখনোই দেশ-কেন্দ্রিক না – নিজের ধান্দা কেন্দ্রিক। মূলত নিজের ধান্দার জন্যেই মানুষ বিএনপি, আওয়ামী লীগ, এনসিপি, জামাত করে। আনফর্চুনেট কিন্তু উপরতলায় আপনি এটাই দেখবেন। একটা, দুইটা বা তিনটা পাসপোর্ট এখানে কিছুই মীন করে না। মানুষ এখানে একটা পাসপোর্ট নিয়েই যেরকম বিশ্বাসঘাতক হয় – আপনার মাথায় প্রশ্ন জাগবে দুইটা পাসপোর্ট থাকলে আর কতই বা কম হতো?

এ ধরনের লেখার আগে বাংলাদেশে জানিয়ে রাখতে হয় যে আমার কোনোই ইচ্ছা নাই বড় কোনো পদ পাওয়ার যেখানে দুই পাসপোর্ট মাকরূহ। ৫ই অগাস্টের পর সেই প্রমাণ যে আমি দিয়েছি আশা করি আপনারা অস্বীকার করবেন না। এ ধরনের ডিসক্লেইমার দেওয়া আমার জন্য ভীষণ লজ্জার। কী করার? এই দেশে আমার মানসিকতার মানুষদের জন্য যথেষ্ট জায়গা হয় না। শুধু সাড়ে তিন হাত জায়গা হয়। নিজের কোনো সুবিধার জন্য লিখছি না। আপনার ভাত কেড়ে নেওয়ার কোনো আগ্রহ আমার নাই। কোনো একজন ব্যক্তির সুবিধা-অসুবিধার জন্যেও লিখছি না। বাংলাদেশের চলমান ফিয়াস্কোকে আমি শুধু একটা ট্রেন্ড হিসাবে দেখতে চাই। শুধুমাত্র আপনি যেন চিন্তা করেন – সেই অনুরোধ করছি।

তারেক রহমান সাহেবের কথাই ধরুন। এ মুহূর্তে তিনি বাংলাদেশের সবচেয়ে জনপ্রিয় মানুষ বললে অত্যুক্তি হবে না। বহু মানুষ আমাকে বলেছেন তার ব্যক্তিত্বে পশ্চিমা ধাঁচ স্পষ্ট। আমার নিজের অভিজ্ঞতাও তাই বলে। তিনি একজন ওয়েস্টার্নাইজড মানুষ। লন্ডনে থাকাটা তার উপকার করেছে প্রায় সব দিক থেকে – সেল্ফ ডেভেলাপমেন্টকে ধর্তব্যে আনলে। আমি বাজি ধরে বলতে পারি যে তার মধ্যে যে নো-ননসেন্স এপ্রোচ এবং যে হিউমিলিটি – এটা বাংলাদেশে থাকলে এই পর্যায়ে আসতো না। আমাদের সমাজে বহু পশ্চিমা ভ্যালুজ  লালন করা প্রয়োজন। কথাটা লজ্জার কিন্তু বলতে দ্বিধা নাই যে প্রধানমন্ত্রী হয়ে নিজের প্রাপ্য সুযোগসুবিধা কমিয়ে ফেলাটা পশ্চিমা ভ্যালু। বাংলাদেশের এখনকার ভ্যালু হলো হ্যাডম দেখানো – ক্ষমতায় গেলে সুযোগ সুবিধা নিংড়ে নেওয়া ও ছ্যাচড়ামি করা। বাসা থেকে বের হওয়ার আগে এক ঘন্টা রাস্তা আটকে রাখা। 

এখন তারেক রহমান সাহেবের য়ুকের নাগরিকত্ব নাই কারণ উনি জানতেন যে একদিন তাকে এই পার্টির হাল ধরতে হবে। এরকম হাই প্রোফাইল মানুষ বাংলাদেশে ১০ জন নাই যার ডেস্টিনি এক প্রকার নির্ধারিত। জেনেবুঝেই তিনি শুধুমাত্র বাংলাদেশের নাগরিকত্ব রেখেছেন। এবং তিনি হাই প্রোফাইল বলেই যুক্তরাজ্য সরকার তার ভিসা এক্সটেন্ড করেছে। আমাদের মতো আম আদমিদের ১৭ বছর লন্ডনে থাকতে হলে যুক্তরাজ্যের নাগরিকত্ব নিতে হতো। অন্য কোনো উপায় নাই এছাড়া। ভিসা এক্সটেন্ড করে থাকতে দিতো না।

তারেক রহমান সাহেবের সাথে অন্য বহু প্রবাসী বাংলাদেশী প্রফেশনালের পার্থক্যের একটা মূল জায়গা হলো অন্যদের য়ুকের নাগরিকত্ব আছে। আপনি কেন ধরে নিচ্ছেন যে অন্যেরা তারেক রহমান সাহেবের মতো হবে না? কেন তারাও বাংলাদেশে আসলে এমন আচরণ করবে না? কেন  দ্বৈত নাগরিকত্ব তাদের জন্যে নেগেটিভ একটা ইস্যু হবে? যারা পশ্চিমে থেকে নিজেদের ডেভেলাপ করেছেন – তাদের তো দেশে ফিরে আসাটা সুসংবাদ। আমরা তাহলে কেন এতো সন্দেহের চোখে দেখি?

ভাতের কম্পিটিশান বেড়ে যাবে – এ কারণে। কথাটা কেউ বলে না কিন্তু এটাই সত্য। প্রবাসীদের শুধুমাত্র একটা অধিকার থাকবে বলে সবাই একমত। তারা শুধু রেমিট্যান্স পাঠাবে। এর বাইরে প্রবাসীদের যেভাবে পারা যায় – আটকানো এবং দোয়ানো হলো আমাদের জাতীয় অধিকার। তুই দেশের বাইরে গেছ, ভালো থাকো। এখন আবার ফিরবি ক্যান?

পুরোনো পৃথিবীর এই মানসিকতার একটা স্পষ্ট নিদর্শন হলো দ্বৈত নাগরিকত্ব আইন। এই আইন করা হয়েছে এই বুঝ থেকে যে দুই নাগরিকত্ব থাকলে কারো লয়াল্টি ভাগ হয়ে যাবে। সে দেশের সাথে বিশ্বাসঘাতকতা করতে পারে। আর দ্বিতীয় কারণ হলো কেউ আকাম-কুকাম করে যেন পালাতে না পারে। আমার কাছে এই যুক্তিগুলো বাস্তবতাবর্জিত ও হাস্যকর মনে হয়। কেউ দুই পাসপোর্টের কারণে বিশ্বাসঘাতকতা করে না। করে নিজের খাইসলতের কারণে। শেখ হাসিনা একটা পাসপোর্ট রেখেই মানুষ খুন করার অর্ডার দিয়েছে, চুরি ডাকাতি করেছে, গুম করিয়েছে।

যেসব আওয়ামী য়োরোপ-এমেরিকায় পালিয়েছে – এরা অল্প কিছু ব্রাহ্মণ আওয়ামী। ইন্ডিয়াতে যেসব আওয়ামী পালিয়ে গিয়ে কাচড়াপল্লী গড়ে তুলেছে – তাদের তো শুধু বাংলাদেশের নাগরিকত্বই ছিল। তাদের পালানো কি আটকানো গেছে? আর ক্ষমতায় না থাকলে কাউকে পালাতে হবে কেন? ইউনুস সরকারের সাথে বিএনপির দহরম-মহরম ছিল বলে আমার মনে হয় নাই। যথেষ্ট বিশ্বাসহীনতা ছিল – যেটা একটা অভ্যুত্থান উত্তর দেশে স্বাভাবিক বলেই মনে করি। ইউনুস সরকারের কাউকে কি পালাতে হয়েছে? 

বিএনপি সরকারেরও সবাই এক্সেপ্টেবল হবে না। কেউ কেউ দুর্নীতিও করবে। তাই বলে একটা সরকারের সবাই পালিয়ে যাবে কেন? আমরা কেন ধরে নিচ্ছি যে ভবিষ্যতে বাংলাদেশে মাফিয়া সরকার হবে? আপনি কি ভবিষ্যতে নিউক্লিয়ার বোমা হামলা হতে পারে – এই আশংকায় বাংকার বানান বাড়ির নিচে?

এখন প্রশ্ন হলো যে কেন একজন প্রবাসী বাংলাদেশে এমপি বা মন্ত্রী হওয়ার আগে নাগরিকত্ব সারেন্ডার করে না। এর উত্তরটা আসলে খুবই সহজ। বৃদ্ধ বয়সে ক্যান্সার হলে চিকিৎসার টাকা জোগাড় করবো কোথা থেকে? আর দ্বিতীয় উত্তর হলো বৃদ্ধ বয়সে ছেলে মেয়ের সাথে দেখা করতে বিদেশে যেতে যেন ভিসা নিতে না হয়। বেশিরভাগ প্রবাসী এই উত্তরটাই দেবে। এর মধ্যে কোনো গ্র্যান্ড ষড়যন্ত্রতত্ত্ব নাই। যারা পশ্চিমে থাকেন তারা খুব লম্বা সময় ধরে খুব উচ্চ হারে অনেক টাকা ট্যাক্স দেন। একটা সুবিধা পাওয়ার নিশ্চয়তা তারা আশা করতেই পারে যে বৃদ্ধ বয়সে তারা চিকিৎসা সুবিধা পাবে। 

তাদের একটা আশংকার জায়গা হলো বৃদ্ধ বয়সে রোগ বালাইয়ের কারণে যেন সর্বস্ব হাসপাতালে না দিয়ে আসতে হয়। নাগরিকত্ব সারেন্ডার করলে এই সুবিধাটা থাকবে না। কোনো প্রাক্তন এমপির ক্যান্সার হলে কি খরচ বাংলাদেশ সরকার দিবে? বাংলাদেশে ফিরে যেতে আগ্রহী কোনো প্রবাসীর এই দুশ্চিন্তাটা কি ডিভিয়াস কিংবা অসংগত? আপনারা খোলা মনে জিজ্ঞেশ করুন। আপনার কি মনে হয়?

ওয়েস্টে থাকা যেকোনো প্রবাসীর বাংলাদেশে ফিরে যাওয়া কোনো লাভজনক প্রপোজিশান না – মূলত এটা একটা ইমোশনাল প্রপোজিশান। বাজি ধরে বলতে পারি যারা রাজনীতি করতে বা সার্ভ করার জন্যে দেশে ফিরে যেতে চান – তারা কোয়ালিটি অফ লাইফ ত্যাগ করে আসেন এবং একটা হিউজ পে কাট নিতে রাজি থাকেন। এটা কোনো rational decision না। ওয়েস্টে থাকা ৯৯% প্রবাসী কাজটা করেন না (ওনলি ব্যতিক্রম হলো ইন্ডাস্ট্রিয়ালিস্টদের ছেলেমেয়ে)। কেউ যদি এই রিস্কটা নিতে চায় তাকে আটকে না দিয়ে সুযোগ করে দেওয়াটাই সঠিক।

বাংলাদেশ পৃথিবীর সবচেয়ে বেশি বহির্মুখী মাইগ্রেশন করা দেশগুলোর একটি। প্রায় ৭০ লক্ষ বাংলাদেশী দেশের বাইরে জন্মেছে। পৃথিবীর অন্তত ১২০টি দেশের এতো বড় জনসংখ্যাই নাই। প্রতি বছর প্রায় ১০ লক্ষ বাংলাদেশী দেশের বাইরে যায়। রেমিট্যান্স হলো বাংলাদেশের আয়ের প্রধানতম উৎসের একটি (প্রতি বছর প্রায় ৩০ বিলিয়ন ডলারের কাছাকাছি)। প্রবাসীরা হলো বাংলাদেশের ক্রুড অয়েল। পার্থক্য এটাই যে ক্রুড অয়েল তুলতে ব্যাপক বিনিয়োগ করতে হয়। বাংলাদেশ তার ক্রু অয়েল বিক্রিতে তেমন কোনোই ইনভেস্ট করে না। বাংলাদেশের মতো একটা দেশে প্রবাসীদের জন্য এরকম ডিসক্রিমিনেটরি আইন থাকাটা খুবই লজ্জাজনক।

সরকারের প্রতি আমার অনুরোধ: দ্বৈত নাগরিকত্ব আইন বাদ দিন। নিয়ম করুন যে যেকোনো প্রার্থীকে ডিক্লেয়ার করতে হবে যে তার কোন কোন দেশের নাগরিকত্ব আছে। কেউ যদি মিথ্যা বলে – তার প্রার্থিতা ও এমপিত্ব খারিজ হয়ে যাবে। আপনার যদি মনে হয় যে দ্বৈত নাগরিকত্বের কারণে সে খারাপ প্রার্থী – বাই অল মীনস – আপনি তাকে ভোট দিয়েন না। কিন্তু ইন ইটসেল্ফ – দ্বৈত নাগরিকত্ব কোনো ডিস্ক্রিমিনেশনের কারণ হতে পারে না। 

আরেক দেশের পাসপোর্ট থাকলে কেউ কম বাংলাদেশী হয়ে যায় না। বরং প্রবাসীদেরকেই বাংলাদেশ নিয়ে বেশী  চিন্তাভাবনা করতে দেখি। এদেরকে আটকে দেওয়ার ক্ষমতা আইনের থাকা উচিত না। আপনার যদি তাকে তাকে ভালো না লাগে – তাকে ভোট দিয়েন না। কিন্তু প্রচলিত আইন ঠিক করে দেবে যে তুই ফুলপ্যান্ট পরে খেলতে পারবা  না – এটা আমার কাছে খুবই অপমানকর লাগে।”

source: The Dhaka Diary

Leave a Reply

Back to top button