News

ভারতেই তৈরি হবে ৯৬টি রাফাল, নতুন ধাপে ভারত-ফ্রান্স প্রতিরক্ষা সহযোগিতা

ফ্রান্সের নকশায় তৈরি রাফাল যুদ্ধবিমানের প্রতি ভারতের অব্যাহত আগ্রহের কারণে দেশটির নিজস্ব প্রযুক্তিতে তৈরি তেজস এমকে-১এ ও এমকে-২ যুদ্ধবিমানের উন্নয়ন কার্যক্রম ব্যাহত হচ্ছে না বলে জানিয়েছেন ভারতের প্রতিরক্ষা সচিব আর কে সিং।

২০৩০-এর দশকের মাঝামাঝি সময়েও ফ্রান্সের কাছ থেকে রাফাল যুদ্ধবিমান কেনার পরিকল্পনা কেন অব্যাহত রাখা হচ্ছে, যখন ওই সময়ের মধ্যে দেশীয় প্রযুক্তিতে তৈরি তেজস এমকে-২ যুদ্ধবিমান পাওয়া যেতে পারে—এমন প্রশ্নের জবাবে আর কে সিং বলেন, ‘আমার মনে হয়, রাফাল একটি পরীক্ষিত যুদ্ধবিমান। এটি ইতোমধ্যে আমাদের বহরে রয়েছে। অপারেশন সিন্দুরে এটি ভালো করেছে। নৌবাহিনীর জন্যও রাফালের সংস্করণ কেনার আদেশ দেওয়া হয়েছে। ফ্রান্সের সঙ্গেও আমাদের ভালো সম্পর্ক রয়েছে। তারা আমাদের শর্তে সম্মত হয়েছে যে, উল্লেখযোগ্য মাত্রায় দেশীয় প্রযুক্তি সংযোজনের মাধ্যমে যুদ্ধবিমানটি ভারতেই তৈরি করবে।’

এনডিটিভি ডিফেন্স কনক্লেভ ২০২৬-এ বক্তব্য দেওয়ার সময় এসব কথা বলেন তিনি।

মিগ-২১-এর মতো পুরোনো যুদ্ধবিমানগুলো অবসরে যাওয়ায় ভারতীয় বিমানবাহিনীর (আইএএফ) স্কোয়াড্রনের সংখ্যা কমে আসছে। এমন পরিস্থিতিতে রাফাল যুদ্ধবিমানের ওপর গুরুত্ব দিচ্ছে বিমানবাহিনী। অন্যদিকে, বিমানবাহিনীর তাৎক্ষণিক চাহিদা পূরণে তেজস এমকে-১এ ও তেজস এমকে-২ সরবরাহের দায়িত্ব পাওয়া হিন্দুস্তান অ্যারোনটিকস লিমিটেড (এইচএএল) প্রকল্প দুটিতে নির্ধারিত সময় ও সরবরাহের লক্ষ্যমাত্রা ধারাবাহিকভাবে পূরণ করতে ব্যর্থ হয়েছে।

তেজস এমকে-১এ যুদ্ধবিমানের প্রথম চালান ২০২৪ সালের ফেব্রুয়ারিতে সরবরাহের কথা ছিল। অন্যদিকে, আকারে বড় ও অধিক উন্নত তেজস এমকে-২-এর প্রোটোটাইপ প্রথমবারের মতো ২০২২ সালের আগস্টে উন্মোচনের কথা ছিল। তবে বর্তমানে তেজস এমকে-১এ এখনো বিমানবাহিনীর কোনো স্কোয়াড্রনে যুক্ত হয়নি। তেজস এমকে-২-এর প্রোটোটাইপও এখনো উন্মোচন করা হয়নি, এমনকি এর উড্ডয়ন পরীক্ষাও শুরু হয়নি।

ভারত বর্তমানে মাল্টি-রোল ফাইটার এয়ারক্রাফট (এমআরএফএ) চুক্তির আওতায় আরও ১১৪টি রাফাল যুদ্ধবিমান কেনার বিষয়ে ফ্রান্স সরকারের সঙ্গে আলোচনা করছে। প্রায় ৩ লাখ ২৫ হাজার কোটি রুপি (৩৪ থেকে ৩৯ বিলিয়ন মার্কিন ডলার) মূল্যের এ চুক্তি সম্পন্ন হলে এটি ভারতের ইতিহাসে সবচেয়ে ব্যয়বহুল প্রতিরক্ষা চুক্তি হতে পারে।

২০২৬ সালের ৬ আগস্ট ফরাসি প্রতিষ্ঠান দাসো আনুষ্ঠানিক প্রস্তাব জমা দিয়েছে। বর্তমানে ভারতের প্রতিরক্ষা মন্ত্রণালয় সেটি পর্যালোচনা করছে। পরিকল্পনা অনুযায়ী, ১৮টি যুদ্ধবিমান ফ্রান্স থেকে সম্পূর্ণ প্রস্তুত অবস্থায় আনা হতে পারে এবং বাকি ৯৬টি ভারতে তৈরি করা হবে। তবে এ বিষয়ে বিস্তারিত এখনো চূড়ান্ত হয়নি।

আর কে সিং বলেন, ‘এর মাধ্যমে দেশে যুদ্ধবিমান তৈরির জন্য দ্বিতীয় একটি উৎপাদন লাইন গড়ে তোলার সুযোগ তৈরি হবে।’ তিনি বলেন, ‘এসব কারণেই দেশীয় প্রকল্পের কাজ চালিয়ে যাওয়ার পাশাপাশি আমরা এই চুক্তিও এগিয়ে নিচ্ছি।’

ভারতে তৈরি তেজস এমকে-১এ যুদ্ধবিমান চলতি বছর থেকে বিমানবাহিনীর স্কোয়াড্রনে যুক্ত হতে পারে বলে আশা করা হচ্ছে। এ যুদ্ধবিমানের উন্নয়নে ‘স্পাইরাল ডেভেলপমেন্ট’ মডেল অনুসরণ করা হবে। এ পদ্ধতিতে ধাপে ধাপে নতুন সক্ষমতা যুক্ত করার পরিকল্পনা রয়েছে সরকারের। এর মধ্যে আরও শক্তিশালী ভারতে তৈরি উত্তম এয়ার-সার্চ রাডার সংযোজনও রয়েছে।

সিং বলেন, ‘প্রসঙ্গত, দেশীয় প্রযুক্তিতে তৈরি রাডারগুলো অত্যন্ত শক্তিশালী এবং বৈশ্বিক সমমানের রাডারের চেয়েও উন্নত।’

ভারত বর্তমানে তেজস যুদ্ধবিমানের জন্য উত্তম রাডার এবং সম্ভাব্য আধুনিকায়নের অংশ হিসেবে সুখোই-৩০এমকেআই যুদ্ধবিমানের জন্য বিরূপাক্ষ রাডার তৈরি করছে।

অতিরিক্ত রাফাল যুদ্ধবিমান কেনার আলোচনা চলাকালে ফ্রান্সের তৈরি এ যুদ্ধবিমানে ভারতীয় নকশায় তৈরি অস্ত্র সংযোজনের বিষয়টিও আলোচনায় রয়েছে। বিভিন্ন প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, ফ্রান্স রাডার, মিশন কম্পিউটার এবং স্পেকট্রা ইলেকট্রনিক-ওয়ারফেয়ার স্যুটের সোর্স কোড দিতে অস্বীকৃতি জানিয়েছে। এতে অ্যাস্ট্রা ক্ষেপণাস্ত্রের মতো নিজস্ব অস্ত্র রাফালে সংযোজনের ক্ষেত্রে ভারতের সক্ষমতা সীমিত হতে পারে।

এ বিষয়ে বিস্তারিত কিছু না জানিয়ে ফরাসি কূটনৈতিক সূত্রগুলো গত জুলাইয়ে এনডিটিভিকে জানিয়েছিল, নতুন চুক্তির প্রক্রিয়া আগের চুক্তির (যার আওতায় ভারতীয় বিমানবাহিনী ৩৬টি যুদ্ধবিমান কিনেছিল) তুলনায় ভিন্ন। এ নিয়ে দুই পক্ষের মধ্যে নিবিড় আলোচনা অব্যাহত রয়েছে।

২০১৬ সালের ২৩ সেপ্টেম্বর ভারত ও ফ্রান্সের মধ্যে বিমানবাহিনীর জন্য ৩৬টি রাফাল যুদ্ধবিমান কেনার বিষয়ে একটি আন্তসরকার চুক্তি স্বাক্ষরিত হয়। প্রায় ৫৯ হাজার কোটি রুপি (৭ দশমিক ৮৭ বিলিয়ন মার্কিন ডলার) মূল্যের ওই চুক্তির আওতায় প্রথম পাঁচটি যুদ্ধবিমান ২০২০ সালের ২৯ জুলাই ভারতে পৌঁছায়।

ভারতীয় নৌবাহিনীর জন্য ২৬টি রাফাল-এম যুদ্ধবিমান কেনার চুক্তি হয় ২০২৫ সালের ২৮ এপ্রিল। প্রায় ৬৩ হাজার কোটি রুপি মূল্যের এ চুক্তিতে ২২টি এক আসনবিশিষ্ট যুদ্ধবিমান এবং চারটি দুই আসনবিশিষ্ট প্রশিক্ষণ বিমান রয়েছে। চুক্তির প্যাকেজে অস্ত্র, সিমুলেটর, প্রশিক্ষণ, লজিস্টিক সহায়তা এবং ভারতে রক্ষণাবেক্ষণ সুবিধা স্থাপনের বিষয়গুলো অন্তর্ভুক্ত রয়েছে।

২০২৮ সালে এসব যুদ্ধবিমান সরবরাহ শুরু হওয়ার কথা এবং ২০৩০-৩১ সালের মধ্যে তা শেষ হওয়ার কথা রয়েছে। যুদ্ধবিমানগুলো ভারতের বিমানবাহী রণতরি আইএনএস বিক্রান্ত থেকে পরিচালিত হবে। এর মাধ্যমে ভারত হবে নৌবাহিনীর জন্য তৈরি রাফাল যুদ্ধবিমানের প্রথম বিদেশি ব্যবহারকারী।

আর কে সিং বলেন, প্রস্তাবিত ১১৪টি রাফাল যুদ্ধবিমান কেনার মাধ্যমে ভারতীয় বিমানবাহিনীর বর্তমান যুদ্ধবিমান স্কোয়াড্রনের ঘাটতি মোকাবিলা করা সম্ভব হবে। তবে একই সঙ্গে ভারতের নিজস্ব প্রযুক্তিতে যুদ্ধবিমান তৈরির কর্মসূচিও অব্যাহত থাকবে।

তেজস এমকে-২ তৈরি হলে রাফালের প্রয়োজনীয়তা থাকবে কি না, এমন প্রশ্নের জবাবে তিনি বলেন, ফ্রান্সের তৈরি রাফাল একটি পরীক্ষিত যুদ্ধবিমান, যা ইতোমধ্যে ভারতের বহরে রয়েছে।

তিনি বলেন, ‘রাফাল একটি পরীক্ষিত যুদ্ধবিমান। এটি ইতোমধ্যে আমাদের বহরে রয়েছে। অপারেশন সিন্দুরে এটি ভালো করেছে। নৌবাহিনীর জন্যও আমরা এর সংস্করণ কেনার আদেশ দিয়েছি। ফ্রান্সের সঙ্গে আমাদের ভালো সম্পর্ক রয়েছে। তারা আমাদের শর্তে সম্মত হয়েছে যে, যুদ্ধবিমানটি ভারতে তৈরি করবে এবং এতে উল্লেখযোগ্য মাত্রায় দেশীয় প্রযুক্তি সংযোজন করা হবে। অবশ্যই, এর মাধ্যমে দেশে যুদ্ধবিমান তৈরির জন্য দ্বিতীয় একটি উৎপাদন লাইন গড়ে তোলার সুযোগ তৈরি হবে।’

তিনি আরও বলেন, সরকার ‘স্পাইরাল ডেভেলপমেন্ট’ মডেলের আওতায় এলসিএ মার্ক-১এ-এর উন্নয়ন অব্যাহত রাখবে। এ প্রক্রিয়ায় ধাপে ধাপে আরও উন্নত দেশীয় রাডার ও অস্ত্র সংযোজন করা হবে।

সিং বলেন, ‘এসব কারণেই দেশীয় কর্মসূচি—এলসিএ মার্ক-১এ প্রকল্পের কাজ চালিয়ে যাওয়ার পাশাপাশি আমরা এই চুক্তিও এগিয়ে নিচ্ছি। এতে স্পাইরাল ডেভেলপমেন্ট ধরনের একটি মডেল অনুসরণ করা হবে। আমরা আশা করছি, ধাপে ধাপে এর সক্ষমতা আরও উন্নত করব। দেশীয় রাডারের সঙ্গে এর সমন্বয় আরও কার্যকর করব। প্রসঙ্গত, দেশীয় প্রযুক্তিতে তৈরি রাডারগুলো অত্যন্ত শক্তিশালী এবং বৈশ্বিক সমমানের রাডারের চেয়েও উন্নত। একইভাবে দেশীয় অস্ত্র সংযোজনের মাধ্যমে এটি ক্রমেই আরও শক্তিশালী একটি যুদ্ধবিমানে পরিণত হবে। তবে এরই মধ্যে আমরা এই চুক্তিও সম্পন্ন করব। আপনার উল্লেখ করা ঘাটতি পূরণের জন্য এটি আমার বিবেচনায় তাৎক্ষণিক একটি ব্যবস্থা। অবশ্যই, এর পাশাপাশি চালকবিহীন বিমানসহ আরও অনেক কার্যক্রম চলছে, যা নিয়ে আমরা পরে আলোচনা করতে পারি।’

তথ্যসূত্র: এনডিটিভি

source: Barta Bazar

Leave a Reply

Back to top button